Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত নারী শ্রমিকদের দুর্দশা

সোহম ভট্টাচার্য
এই কারণে স্ব-নিযুক্ত নারীরা ক্ষুদ্র পুঁজির সর্বনিম্ন স্তরের জীবিকায় অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। তাঁদের প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা অবৈতনিক ঘরের কাজ, গৃহস্থালি-পরিবারের পরিচর্যা করতে হয় যে কাজে তাদের পুরুষসঙ্গীরা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে। এই শ্রমসহ তাদের মোট পরিশ্রম দিনে ৯-১০ ঘণ্টা, অথচ সে কাজে পারিশ্রমিক নেই। সবচাইতে বড় কথা এই কাজের সামাজিক বা রাজনৈতিক স্বীকৃতিও নেই। এই প্রেক্ষাপটে ৯ জুলাইয়ের আসন্ন সাধারণ ধর্মঘটের ডাক— ‘সব নারীই শ্রমিক’ এই স্বীকৃতি অর্জনের ডাক এবং কোটি কোটি অসংগঠিত নারী শ্রমিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক।
Vulnerabilities of Informal Women in West Bengal

১। নারী শ্রমিক বাড়ছে: কিন্তু কীভাবে?

ভারতের শ্রমবাজারে সাম্প্রতিক কিছু পরিবর্তনের ফলে— বিশেষভাবে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে— এক অদ্ভুত বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। টানা দুই দশক ধরে নিযুক্ত শ্রমিকদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ও অংশগ্রহণ কমছিল, কিন্তু এখন হঠাৎ তার উল্টো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই তথাকথিত ‘উন্নতি’ ঘটছে এমন সময়ে, যখন কোভিড ১৯-জনিত অর্থনৈতিক ধাক্কায় সার্বিক অর্থনীতি মন্দায় নিমজ্জিত ছিল (এবং সম্ভবত এখনও রয়েছে)। 

এই প্রেক্ষাপটে নারী শ্রমিকদের কাজে যোগ দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা মাথায় রেখেই তাদের কাজের ধরন, কাজের অবস্থা ও পরিবেশ এবং প্রাপ্ত পারিশ্রমিক সম্পর্কে গুরুত্ব সহকারে বিচার ও বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি। সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় ইতিমধ্যেই বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে ভারতের ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণে এই অগ্রগতি মূলত বিপর্যয়-নির্ভর (১)। তবে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমবাজারে বিদ্যমান বর্তমান পরিস্থিতির বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করার ক্ষেত্রে এখনও একটা বড়সড় ফাঁক রয়ে গেছে। সংক্ষেপে বললে, এই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ও বঞ্চনার। এই উদ্বেগ এবং বঞ্চনা ত্রিমাত্রিক—

  • প্রথমত, কাজের ধরন নির্ধারিত হচ্ছে ক্ষুদ্র পুঁজির ক্ষেত্র থেকে, যেখানে জীবনধারণের চরম সংকট এড়াতে নারীরা স্ব-নিযুক্তি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।  
  • দ্বিতীয়ত, এই স্ব-নিযুক্তি ঘটছে এমন এক পরিসরে, যার অবস্থান প্রচলিত শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের গণ্ডির বাইরে; ফলে ট্রেড ইউনিয়নগুলি চিরাচরিতভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারছে না। 
  • তৃতীয়ত, এর ফলে অসংগঠিত ক্ষেত্রে নিযুক্ত নারীদের ওপর দু-খানা বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে— একদিকে স্বল্প আয়, অন্যদিকে সামাজিক পুনরুৎপাদনমূলক অবৈতনিক গৃহশ্রম।


চিত্র ১: এমপ্লয়মেন্ট আনএমপ্লয়মেন্ট সার্ভে (২০১২) অ্যান্ড পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে 

অতএব, শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নতির দাবিতে যে সাধারণ ধর্মঘটের ডাক উঠছে, তা লিঙ্গ-বাস্তবতার প্রশ্নেও গুরুত্ব বহন করে। কারণ, সকল নারীই শ্রমিক— কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্র ও পুঁজির সম্মিলিত শক্তি তার সেই পরিচয়কে স্বীকৃতি দিচ্ছে না, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে। 

প্রথম সংকটটি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা যাক। সাম্প্রতিককালে নারীর শ্রম-অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মধ্যেই এই সংকট নিহিত আছে।


চিত্র ২:  সূত্র: পূর্বোক্ত 

২০১১-১৯-এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বয়স অনুযায়ী কর্মক্ষম নারীদের শ্রম-অংশগ্রহণ ২৬% থেকে ২২%-এ নেমে গিয়েছিল; এরপর তা রাতারাতি বেড়ে ২০২৩-২৪-এ ৪১.৬%-এ পৌঁছেছে (সর্বভারতীয় হারের থেকে সামান্য কম)। এই ঊর্ধ্বগতি এসেছে সম্পূর্ণভাবে স্ব-নিযুক্তির আওতাভুক্ত পেশার মাধ্যমে। ২০২৩-২৪-এ সমস্ত কর্মরত নারীদের অর্থাৎ ওই বছরে অন্তত এক মাস কাজ করেছেন এমন নারীর মোট সংখ্যার ৭০%-ই স্ব-নিযুক্ত। একইসঙ্গে বেতনভিত্তিক চাকরি ২০১৭-এর ২৭% থেকে ২০২৩-এ ১৬.৬%-এ নেমে এসেছে; অনিয়মিত মজুরির কাজেও একই রকম হ্রাস লক্ষ করা যায় (চিত্র ২)

অতএব, সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে নিয়োগকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কভিত্তিক কাজ সে বেতনভিত্তিক হোক বা অনিয়মিত মজুরির কাজ—বাড়ছে না। যে বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে তা একটা অনিয়মিত ব্যবস্থার ফসল, যেখানে নারী শ্রমিকরা নিয়মিত পুঁজির আওতায় ঠাঁই পাচ্ছেন না। এই বিশেষ পরিস্থিতি সামগ্রিক অর্থনীতির শ্রম শোষণ ক্ষমতার (কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে) বেহাল দশার দিকে ইঙ্গিত করে। তার ওপর, আরও আফসোসের কথা এই যে, এমন এক সংকটে নারীরা ‘ক্ষুদ্র পুঁজির উৎপাদক’-এ পর্যবসিত—এক দিকে তারা শ্রমিক, অন্য দিকে জীবিকা নির্বাহের জন্য পুঁজি জোগাড়ের দায় তাদের কাঁধেই।

নীতি আয়োগ-বিজেপি-ব্র্যান্ড-মমতা জোট নারীর এই অর্থনৈতিক দুর্দশাকেই ‘কর্মসংস্থান’ বলে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে চলেছে।

২। স্ব-নিযুক্তির বাস্তবতা: পশ্চিমবঙ্গের অসংগঠিত-পুঁজি ও নামমাত্র মজুরি পাওয়া নারী শ্রমিক

স্ব-নিযুক্ত নারী শ্রমিকেরা যে উদ্যোগগুলোতে যুক্ত, সেগুলির আকার, যা পুঁজির আকারেরও ইঙ্গিত দেয়, বুঝতে এইসব সংস্থায় কর্মরত শ্রমিকসংখ্যা কেমন তা দেখা দরকার। ২০১৭-১৮-এ, স্ব-নিযুক্ত নারীদের ৯৪% এমন উদ্যোগে কর্মরত ছিলেন, যেখানে শ্রমিক ৬ জন বা তার কম; ২০২৩-২৪-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯%। এটাই সংকটের দ্বিতীয় ধাপের সূচনা করে। এই পরিসরগুলিতেই অসংগঠিত সম্পর্কগুলি টিকে থাকে পুঁজি ও শ্রম— দুইয়ের সাপেক্ষেই (১৯৪৮ সালের ফ্যাক্টরি আইন অনুযায়ী অন্তত ১০ জন কর্মী ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না-থাকলে একটি কারখানা/সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া যাবে না)। 


চিত্র ৩:  সূত্র

এই নিম্ন পর্যায়ের স্বল্প আয়-স্বল্প পুঁজি-আবার স্বল্প আয়ের দুষ্টচক্রের প্রতিফলন লক্ষ করা যায় গড় মাসিক আয়ে। ২০১৭-২৪ (সাময়িক মূল্যে) গ্রামীণ স্ব-নিযুক্ত নারীদের মাসিক আয় ১,২৬৭ টাকা থেকে মাত্র ১,৯৮৬ টাকায় উঠেছে; শহরে তা ২,২৫৮ থেকে ৩,৯৬৯ টাকা। এইসব অসংগঠিত ক্ষেত্রে পুরুষ সহকর্মীরা তাঁদের তুলনায় প্রায় তিন-চার গুণ বেশি উপার্জন করেন (চিত্র ৪)

২০২৩-২৪-এ, মাথাপিছু দৈনিক ৫০ টাকার মজুরি সাপেক্ষ দারিদ্র্যসীমা ধরা হলে, গ্রামীণ স্ব-নিযুক্ত নারীদের ৪৮% ও শহুরে স্ব-নিযুক্ত নারীদের ৩৭%-ই মজুরি সাপেক্ষে দারিদ্র্যরেখার নীচে অবস্থান করেন।

ফলে স্ব-নিযুক্তির এই ‘ক্ষুদ্র উৎপাদন’ আসলে আর্থিক বিপর্যয়েরই বহিঃপ্রকাশ— যেখানে নারীরা দ্বিতীয় শ্রেণির অর্থনৈতিক নাগরিক। গ্রামে প্রতি দু-জনের এক জন ও শহরে প্রতি তিন জনের একজন স্ব-নিযুক্ত নারী সমপরিমাণ শ্রম দিয়েও মাথাপিছু দৈনিক ৫০ টাকাও রোজগার করতে পান না।


চিত্র ৪


চিত্র ৫

৩। অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলিকে টিকিয়ে রাখা কেন তৃণমূল-RSS জোটের জন্য লাভজনক?

অসংগঠিত, ক্ষুদ্র ও প্রায় ঘরোয়া ধরনের এই কর্মসংস্থান আরএসএস-ঘনিষ্ঠ যে কোনও বুর্জোয়া শক্তি (এমনকি AITC/TMC-ও) উৎসাহিত করতে চাইবে— এর পিছনে রয়েছে রাজনৈতিক হিসাব। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমকালীন পশ্চিমবঙ্গের উদীয়মান হিন্দুত্ববাদ ও ব্যর্থ অর্থনৈতিক উন্নয়ন-এর অশুভ আঁতাত থেকে উদ্ভূত। একদিকে আরএসএস প্রচার করে ‘মনুবাদী’ মতাদর্শে পরিবার গঠন করা হোক যেখানে নারীরা ঘর ও গৃহস্থালির পরিসরে আবদ্ধ থাকবে ও পুরুষ তাকে নিরন্তর শাসন করবে। অন্যদিকে এ-রাজ্যে আঞ্চলিক নব্য ধনিক শ্রেণির গড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় উপজাত শক্তি তৃণমূল কংগ্রেস যার অর্থনৈতিক ভিত্তি হল ক্রমাগত জনসম্পদ নিষ্কাশন করে চলা। তারা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকরী, সুস্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি করে না। ফলে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম ও উন্নত নাগরিক হয়ে উঠতে পারেন না।


এই কারণে স্ব-নিযুক্ত নারীরা ক্ষুদ্র পুঁজির সর্বনিম্ন স্তরের জীবিকায় অবরুদ্ধ হয়ে আছেন। তাঁদের প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা অবৈতনিক ঘরের কাজ, গৃহস্থালি-পরিবারের পরিচর্যা করতে হয় যে কাজে তাদের পুরুষসঙ্গীরা সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত থাকে। এই শ্রমসহ তাদের মোট পরিশ্রম দিনে ৯-১০ ঘণ্টা, অথচ সে কাজে পারিশ্রমিক নেই। সবচাইতে বড় কথা এই কাজের সামাজিক বা রাজনৈতিক স্বীকৃতিও নেই।

এই প্রেক্ষাপটে ৯ জুলাইয়ের আসন্ন সাধারণ ধর্মঘটের ডাক— ‘সব নারীই শ্রমিক’ এই স্বীকৃতি অর্জনের ডাক এবং কোটি কোটি অসংগঠিত নারী শ্রমিকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ডাক।


টীকা ও সূত্র
  1. Some studies have identified this increase in self-employment as a statistical manoeuvre by changing the way questions are asked in the survey. See Aloke Kar and P.C. Mohanan (2025):  Kar, Aloke., Mohanan, P.C.,(2025) ‘Is the Rise in Female Work Participation due to an Odd Set of Instructions to Enumerators?’. The India Forum. February 10, 2025. Retrieve Link:  Is the Rise in Female Work Participation due to an Odd Set of Instructions to Enumerators? | The India Forum
  2. There are studies which does reflect on the distress-led meaning of self-employed women workers in India. 
See: Agrawal, N., Narayan, S., & Bhattacharya, S. (2024). New working poor in contemporary India. Economic and Political Weekly, 59(26-27).  
Ghosh, Jayati (2025). “What Does Self-Employment Mean for Women in India?”. The India Forum. January 14. 2025. Retrieve Link: What Does Self-Employment Mean for Women in India? | The India Forum  
  1. In contemporary rural India, it is often observed that women take up multiple care-activities at the same time, for example taking care of children while cooking for the household. If one adds up all the activities, the overall time spent in social reproductive labour would further rise up to 12 hours or more. See Swaminathan et.al. (2020) for a more detailed analysis of the same. 
Swaminathan, M., Nagbhushan, S., & Ramachandran, V. K. (Eds.). (2020). Women and work in rural India (p. 20203484080).

প্রকাশের তারিখ: ০৫-জুলাই-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

একটা সার্বিক ছবি ধরা পড়েছে
- ratna shome, ০৫-জুলাই-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নির্বাচন ২০২৬ বিভাগে প্রকাশিত ৯১ টি নিবন্ধ
২৭-এপ্রিল-২০২৬

২৬-এপ্রিল-২০২৬

২১-এপ্রিল-২০২৬

২০-এপ্রিল-২০২৬

১৯-এপ্রিল-২০২৬

১৮-এপ্রিল-২০২৬

১৭-এপ্রিল-২০২৬

১৬-এপ্রিল-২০২৬

১৪-এপ্রিল-২০২৬

১৩-এপ্রিল-২০২৬