Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বর্তমান ভারত: বিদ্যাসাগরের প্রাসঙ্গিকতা (১)

রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য
এইখানেই বিদ্যাসাগরের আসল কৃতিত্ব। তিনি শুধু নিজেই প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ হননি, অধ্যাপক ও ছাত্রদেরও উদ্‌বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সাদা চামড়ার মানুষরা যে-চোখে বাঙালিদের দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন, সেই চোখে আঙুল দিয়ে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যাপক-ছাত্ররা তাই বারবার মিলিতভাবে দেখিয়ে দিলেন: তোমাদের ধারণা ভুল, সুযোগ পেলে আমরাও সবই করতে পারি।
 Contemporary India: Relevance of Vidyasagar-I

পর্ব ১

আমাদের দেশে, হয়তো সব দেশেই, মনীষীদের নিয়ে দুধরণের কাণ্ড-কারখানা চলে। প্রথমটি হল বীরপূজা। একবার মনীষী বলে কাউকে মেনে নেওয়া হলে তাঁকে দেবতার আসনে বসানো হয়। পুজোর যা কিছু উপকরণ– ছবি বা বিগ্রহ, ফুল, মালা, ধূপ, ধুনো— কিছুই বাদ পড়ে না। পুরুষ তখন শুধু মহাপুরুষ থাকেন না, হয়ে ওঠেন ঠাকুর। 

এর ঠিক উল্‌টো দিকে দেখা দেয় কিছু কালাপাহাড়। বিগ্রহ ভাঙাতেই তাদের ফুর্তি। এদের জীবনের প্রায় একমাত্র লক্ষ্য: মহাপুরুষকে বামনে পরিণত করা। 

এই দুই চেষ্টাই ক্ষতিকর। এর দরুনই কোনো কৃতী, প্রতিভাশালী মানুষকে তাঁর সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মূর্তিপূজা ব্যাপারটাই যুক্তিহীন। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করার মতো: বিগ্রহ ভাঙার নামে যা করা হয় সেটাও আসলে আর-এক বিগ্রহ গড়া। তফাতের মধ্যে, সেটি আর দেবতার নয়, দানবের। দেবতা আর দানব দুই-ই কাল্পনিক। তাদের বিগ্রহও উৎকল্পনার সৃষ্টি। 

বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রে এই দুটি ঝোঁকই এখনও পর্যন্ত সমান জোরদার। তাঁর মতো বহুকর্মা মানুষ বাঙলায় খুব বেশি জন্মান নি। তাঁর কাজের ক্ষেত্রও ছিল বহু ও বিচিত্র। সমাজসংস্কার, সংস্কৃত শিক্ষা সংস্কার, প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার (তার মধ্যে স্ত্রীশিক্ষাও আছে), বাঙলা ও সংস্কৃতর প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই রচনা, নীতিশিক্ষা ও আনন্দ পাওয়ার মতো বই লেখা— মোটের ওপর এই হল বিদ্যাসাগরের কর্মক্ষেত্র। 

এর সঙ্গে আলাদা করে আরও একটি সৃষ্টির কথা বলতে হয়। সেটি হলো মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন নামে প্রথমে একটি স্কুল (১৮৬৪), পরে স্নাতকস্তর পর্যন্ত কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮৭২)। সরকারি ও মিশনারি কলেজের সঙ্গে টক্কর দিয়ে গড়ে উঠেছিল এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জীবনের শেষ পর্বে মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনই ছিল বিদ্যাসাগরের একমাত্র চিন্তা। 

এই প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন ছাত্র হিসেবে আমরা ন্যায্যতই গর্ববোধ করি। বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ছড়িয়ে আছেন সব মহাদেশে। এই সম্পর্কসূত্রে বাঁধা আছেন হাজার হাজার মানুষ। সেই বন্ধনের গৌরব অনুভব করি সকলেই। 

কিন্তু এই গৌরব ঠিক কোথায়? বিদ্যাসাগর যে-বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার মধ্যে তাঁর মৌলিক শিক্ষাচিন্তা প্রকাশ পায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পাঠক্রম ও পাঠ্যসূচি মেনেই এখানে লেখাপড়া হত। শিক্ষণের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো সুযোগই এখানে ছিল না। সংস্কৃত কলেজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময়ে তিনি যেসব নতুন উদ্ভাবন ও প্রয়োগের সুযোগ পেতেন, মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে বাস্তব কারণেই তার পথ বন্ধ ছিল। সরকারি ও মিশনারি এই দু-ধরণের স্কুল-কলেজের বাইরে দাঁড়িয়ে একটি প্রতিষ্ঠান তিনি গড়লেন, যার সব শিক্ষকই বাঙালি; সকলে এমনকি এম. এ. পাশও নন, বিলেতফেরত তো ননই (পরে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও নগেন্দ্রনাথ ঘোষের মতো দু-চারজন ছাড়া)।– এইটুকুই কি বিদ্যাসাগরের কৃতিত্ব? 

সকলেই জানেন, মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন থেকে প্রথম যেবার ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের এফ.এ. পরীক্ষায় বসল (১৮৭৪), বিদ্যাসাগর তখন খুবই উৎকণ্ঠায় আছেন: শেষরক্ষা হবে তো? পরীক্ষার ফলাফল কী দাঁড়াবে? ফল বেরনোর পর প্রেসিডেন্সি কলেজের এক সাহেব অধ্যাপক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার, জে. সাটক্লিফ নাকি বলেছিলেন: ‘The Pundit has done wonders’— পণ্ডিত তাক লাগিয়ে দিলেন। পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেন যোগীন্দ্রচন্দ্র বসু, আটজন পাশ-করা ছাত্রর মধ্যে চারজন পেলেন সরকারি বৃত্তি। 

সঠিক ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত না-দেখলে সাটক্লিফ-এর এই মন্তব্যর তাৎপর্য বোঝা যায় না। মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন ছিল সাম্রাজ্যবাদী আত্মগর্বর বিরুদ্ধে প্রথম সফল স্বদেশি প্রতিবাদ। সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষানীতির আওতায় নির্ভেজাল ‘নেটিভ’ বাঙালি পরিচালনায় একটি কলেজ, তার বাঙালি ছাত্র ও শিক্ষকরা নিজেদের ক্ষমতা দেখালেন। একে বলা যায় Self-assertion, নিজের দৌড় দেখিয়ে দেওয়া। কজন বাঙালি আই. সি. এস হল, ব্যারিস্টার হল— তার চেয়ে অনেক বড়ো কথা: গ্রাম ও শহরের ছাপোষা ঘরের কতজন ছেলে প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতির মধ্যে পরদেশি ভাষায় ভিনদেশি ছাঁচের শিক্ষাব্যবস্থায় নিজেদের কৃতিত্ব দেখালেন। 

কেউ কি খেয়াল করেছেন: বিদ্যাসাগর কখনও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের কোনো পাঠ-সংকলন বা পাঠ্যপুস্তক লেখেন নি? কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-এ তাঁকে সদস্য মনোনীত করা হয়েছিল। তবু মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন-এর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন পাওয়া সহজ হয়নি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে সেই অনুমোদন আদায় হয়েছিল। তারপর এল আসল পরীক্ষার পালা: ছাত্ররা কলেজের মুখ রাখতে পারবে তো? তখন এত পরীক্ষার্থী-সহায়ক বই পাওয়া যেত না। ক্লাসে অধ্যাপক যা পড়াচ্ছেন তার নোট নেওয়াই ছিল ছাত্রদের প্রধান কাজ। তবু বিদ্যাসাগরের গড়া কলেজের অধ্যাপক ও ছাত্ররা বারেবারে তাঁদের ক্ষমতার প্রমাণ দিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের দর্শনের অধ্যাপক, এ. ই. গফ সাহেবের ধারণা হল: নির্ঘাত তাঁর ছাত্রদের নোট মেট্রোপলিটান-এর ছাত্রদের হাতে পড়েছে। তিনি তাই হুকুম জারি করলেন: তাঁর নোট যেন কখনও বাইরে না-যায়। ক্ষুদিরাম বসুর মতো ছোকরা অধ্যাপক, তাও আবার এম. এ. পরীক্ষায় ফেল করা, তাঁর কাছে পড়েও ছেলেরা কিছু শিখতে পারে, এমনকি প্রথম শ্রেণিতে অনার্স পেতে পারে— একথা গফ সাহেবের বিশ্বাস হয়নি!

এইখানেই বিদ্যাসাগরের আসল কৃতিত্ব। তিনি শুধু নিজেই প্রেরণায় উদ্‌বুদ্ধ হননি, অধ্যাপক ও ছাত্রদেরও উদ্‌বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সাদা চামড়ার মানুষরা যে-চোখে বাঙালিদের দেখতে অভ্যস্ত ছিলেন, সেই চোখে আঙুল দিয়ে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যাপক-ছাত্ররা তাই বারবার মিলিতভাবে দেখিয়ে দিলেন: তোমাদের ধারণা ভুল, সুযোগ পেলে আমরাও সবই করতে পারি। 

এই সুযোগ কিন্তু কেউ স্বেচ্ছায় বিদ্যাসাগরের হাতে তুলে দেয়নি। প্রথমে স্কুল শুরু হয়েছিল ভাড়া বাড়িতে। উত্তর কলকাতার নানান জায়গা ঘুরে শেষ পর্যন্ত জমি কিনে বাড়ি তৈরি হলো শঙ্কর ঘোষ লেনে। কেউ দানছত্র খুলে বসেনি। টাকা জোগাড় থেকে শিক্ষক জোগাড়— সবই করতে হয়েছিল একা বিদ্যাসাগরকেই। নিশ্চয়ই তাঁর কিছু সহযোগী ছিলেন। কিন্তু আসল দায়টা বইতে হত তাঁকেই। ১৮৮৭-তে শঙ্কর ঘোষ লেনের নতুন বাড়িতে কলেজ উঠে এল। তার দু-বছর আগে এক বিঘে এগারো কাঠা জমি কেনা হয়েছিল কলেজেরই টাকায়। বাড়ি তৈরিতে ঠিক কত খরচ পড়েছিল তা নিশ্চিত বলা যায় না। তবে এক লাখের কম নয়। ভাগ্যকুলের রাজা শ্রীনাথ রায়ের কাছে জমি বন্ধক রেখে বাড়িটি তোলা হয়। সব ধার শোধ হয় ১৮৯১-এ। 

মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন-এর ওপর বিদ্যাসাগরের কতটা আশা-ভরসা ছিল তা এর থেকেই বোঝা যায়। বিধবা-বিবাহ দিতে গিয়ে তিনি যা করেছিলেন এই কলেজকে দাঁড় করাতে ঠিক তাই করলেন। তার জন্যে বন্ধু বিচ্ছেদ, আত্মীয় বিচ্ছেদ— সবই তাঁকে সইতে হয়েছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন কলেজের গর্ব। আই. সি. এস. থেকে তাঁকে যখন বিদায় করা হল, ১৮৭৬-এ বিদ্যাসাগরই তাঁকে নিয়ে এলেন মেট্রোপলিটান কলেজে ইংরিজির অধ্যাপক হিসেবে। তিনি কিন্তু আনন্দমোহন বসুর সঙ্গে মিলে সিটি কলেজ প্রতিষ্ঠায় যোগ দিলেন (১৮৮১)। বিদ্যাসাগর তখন তাঁকেও রেয়াত করলেন না। পরিষ্কার বলে দিলেন: সুরেন্দ্রনাথের যদি না-পোষায়, তিনি চলে যেতে পারেন। সহকর্মীরা খুব উদ্‌বিগ্ন হলেন: সুরেন্দ্রনাথ চলে গেলে ইংরিজি বিভাগের কী দশা হবে। বিদ্যাসাগরের স্পষ্ট উত্তর: সুরেন্দ্র এ-কলেজে কতটুকু represent করে? মোট পাঠ্যসূচির দশ ভাগের এক ভাগ! ‘যদি সুরেন্দ্র না হলে কলেজ না চলে, তাহলে বলতে হবে আমি কেউ নই। আমি তাহলে মরে গেছি!’

এই আত্মবিশ্বাস বিদ্যাসাগর কলেজকে চিরদিনই বাঁচিয়ে রেখেছিল। বাইরের পরিবেশ থেকে কোনো সাহায্য না-পেয়েও বিদ্যাসাগর গড়ে তুলেছিলেন এমন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যা অচিরেই হয়ে উঠল, প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ভাষায়, সত্যিকারের ‘জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’। 

কথাটা বোধহয় একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। বাঙলায় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গড়ে উঠেছিল স্বদেশি আন্দোলনের যুগে। ১৪ অগস্ট ১৯০৬-এ বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজের সূচনা। তারও আগে নিশ্চয়ই বিচ্ছিন্নভাবে সে চেষ্টা হয়েছিল। দীনেশচন্দ্র সেনকে লেখা একটি চিঠিতে (১৭.১১.১৯০৫) রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা (১৯০২) তাঁর স্বদেশি ভাবনার অঙ্গ ছিল। কিন্তু এ-হল একান্ত ব্যক্তিগত, ধর্মশিক্ষাভিত্তিক বিদ্যালয়— প্রাচীন আশ্রম ও গুরুকুলের অনুসরণে এক বিক্ষিপ্ত প্ৰয়াস। তবে সে-বিদ্যালয়ে ইংরিজি, বাঙলা, অঙ্ক, বিজ্ঞান সবই পড়ানো হত— যদিও সেই সঙ্গে মানা হতো জাতিভেদ; প্রার্থনা-উপাসনাও তার নিত্যচর্চার বিষয়। 

স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে ডাক দেওয়া হয়েছিল গোলামখানা ছেড়ে বেরিয়ে আসার। গোলামখানা মানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়— এন্ট্রান্স থেকে সব পরীক্ষাই যার হাতে। গোলামখানা থেকে বেরিয়ে ছেলেরা যাবে কোথায়? তার জন্যে গড়া হলো জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন, তৈরি হল ন্যাশনাল কলেজ। বরোদার লাভজনক কাজ ছেড়ে, তার অধ্যক্ষ হয়ে যোগ দিলেন অরবিন্দ ঘোষ (পরে শ্রীঅরবিন্দ)। তৈরি হল নতুন ধরণের পাঠক্রম, বাঙলার প্রশ্নপত্র রচনার দায়িত্ব নিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজে। 

কিন্তু এ-উদ্যোগ স্থায়ী হল না। স্বদেশীর ঢেউ চলে গেল। ছেলেরা আবার যোগ দিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত স্কুল-কলেজে। জাতীয় শিক্ষার প্রতীকী মূল্যটুকু টিকে রইল। অনেক পরে তারই পরিণত রূপ দেখা গেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। 

১৯২১-এ আবার গাঁধি দিলেন বয়কটের ডাক। এবার কিন্তু লক্ষ্য ছিল আরও ছোটো: সরকারি স্কুল-কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে আসা। ফলে প্রেসিডেন্সি কলেজ আর সেই সঙ্গে মিশনারি কলেজগুলোতেও ছাত্রসংখ্যা কমে গেল। ন্যায্যতই মিশনারি কলেজগুলোকে মনে করা হতো ব্রিটিশ সরকারের ধামাধরা। কিন্তু বিদ্যাসাগর কলেজের কোনো ক্ষতি হলো না । কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য লিখে গেছেন, ‘অন্য কলেজের অধ্যাপকদিগের মুখে বিষাদের কালিমা, কিন্তু বিদ্যাসাগর কলেজের অধ্যাপকগণ নিশ্চিন্ত মনে নিদ্ৰা যাইতে পারিয়াছিলেন’। অর্থাৎ বিদ্যাসাগর কলেজ তখন সত্যিই জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিহাসই তাকে এই মর্যাদা দিল। 

ঘটনার পরম্পরাকে সঠিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখার মতো চোখ সকলের থাকে না। এই ঘটনাটিও তথাকথিত বিদ্যাসাগর-বিশেষজ্ঞদের নজর এড়িয়ে গেছে। বিদ্যাসাগরের শিক্ষাচিন্তা নিয়ে যাঁরা খুঁতখুঁত করেন, নিম্নবর্গের দুরবস্থা ভেবে যাঁদের রাত্তিরে ঘুম হয় না, ঐতিহ্য আর আধুনিকতার পরীক্ষায় যাঁদের বিচারে বিদ্যাসাগর কিছুতেই পাশ করেন না— তাঁদের কাছে এই সব ঘটনার কোনো মূল্যই নেই। ব্যক্তি বিদ্যাসাগরের খুঁত ধরতে তাঁরা এতই ব্যতিব্যস্ত, তাঁর ‘সীমা ও স্ববিরোধ’ খুলে দেখাতে এতই তৎপর যে, বিদ্যাসাগরের জীবনের শেষ কীর্তিটি তাঁদের নজরেই আসে না। অথচ ইতিহাসের মজাই এই: কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে কলেজটি তৈরি হয়নি, তবু কালান্তর ও পরিস্থিতির পরিবর্তনে এই কলেজ হয়ে উঠল বাস্তবিকই এক বিকল্প জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যটি সকলেরই জানা, তবু আর-একবার সেটি বোঝার চেষ্টা করা ভালো : 

সংস্কৃতকলেজের কর্ম ছাড়িয়া দিবার পর বিদ্যাসাগরের প্রধানকীর্তি মেট্রোপলিটান ইনস্টিটুশ্যন। বাঙালির নিজের চেষ্টায় এবং নিজের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার কলেজ-স্থাপন এই প্রথম। আমাদের দেশে ইংরাজি শিক্ষাকে স্বাধীনভাবে স্থায়ী করিবার এই প্রথম ভিত্তি বিদ্যাসাগর-কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হইল। যিনি দরিদ্র ছিলেন তিনি দেশের প্রধান দাতা হইলেন; যিনি লোকাচার রক্ষক ব্রাহ্মণপণ্ডিতের বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তিনি লোকাচারের একটি সুদৃঢ় বন্ধন হইতে সমাজকে মুক্ত করিবার জন্য সুকঠোর সংগ্রাম করিলেন— এবং সংস্কৃত বিদ্যায় যাঁহার অধিকারের ইয়ত্তা ছিল না তিনিই ইংরাজিবিদ্যাকে প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বদেশের ক্ষেত্রে বদ্ধমূল করিয়া রোপণ করিয়া গেলেন।১০

রবীন্দ্রনাথ একথা লিখেছিলেন ১৮৯৫ (ভাদ্র ১৩০২)-এ। শিক্ষা, বিশেষত শিশুশিক্ষা, সম্পর্কে তখনও হয়তো তাঁর মনে কোনো নির্দিষ্ট ধারণা দানা বাঁধেনি। তার সাত বছর পরে শান্তিনিকেতনে, খোলা আকাশের নীচে, যে-পরীক্ষা তিনি শুরু করলেন, সেখানে চার দেওয়ালের মধ্যে, বেঞ্চিতে বসে একই গতে পড়ালেখা শেখার ব্যবস্থা তিনি রাখেন নি। নিজের ছেলেবেলায় স্কুল-কলেজের অভিজ্ঞতা তাঁকে ঐ বাঁধা ছক সম্পর্কে অবিশ্বাসী করে তুলেছিল। কিন্তু বিদ্যাসাগরের শেষ জীবনের প্রধান কীর্তি মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন স্থাপন— এই সিদ্ধান্তর পেছনে অনেক বড়ো তাৎপর্য আছে। সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী স্বাবলম্বী উদ্যোগের অংশ হিসেবেই রবীন্দ্রনাথ এই কলেজ স্থাপনকে দেখেছেন। 

‘যিনি দরিদ্র ছিলেন তিনি দেশের প্রধান দাতা হইলেন'—এই বাক্যটিও খেয়াল করার মতো। যে-প্রসঙ্গে এটি বলা হয়েছে সেখানে অর্থ সাহায্যর কথা ওঠে না, এখানে দান অর্থে শিক্ষাদান। বিদ্যাসাগরের চেয়ে ধনী লোক তাঁর আগে ও পরে অনেকেই ছিলেন। টাকাকড়ি দান-খয়রাতের ব্যাপারে তাঁদেরও নামডাক ছিল। সেই দাতাদের সঙ্গে বিদ্যাসাগরকে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। এই দানশীলদের অনেকেই গ্রামে-শহরে অবৈতনিক স্কুল খুলেছিলেন। মতি শীলের স্কুলটির কথা অনেকেরই মনে পড়বে। কিন্তু তাকে ধাপে ধাপে এফ. এ, বি. এ, বি. এল, ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি স্তরে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো পরিকল্পনাই তাঁদের ছিল না। গরিব ঘরের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া চালাতে সাহায্য করছি— এই ছিল তাঁদের একমাত্র আত্মতুষ্টি। 

এর সঙ্গে বিদ্যাসাগরের কাজের কোনো তুলনাই হয় না। আর সেই দিকটির দিকেই বেশি করে জোর দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘সংস্কৃতবিদ্যা' বনাম ইংরাজিবিদ্যা, অর্থাৎ প্রাচীন দেশীয় ধারা আর আধুনিক বিদেশীয় ধারা— এ দুই-এর মধ্যে বিদ্যাসাগর বিনা দ্বিধায় বেছে নিয়েছিলেন দ্বিতীয়টিকে। সংস্কৃত আর ইংরিজি এখানে শুধু দুটি বাহন, অর্থাৎ ভাষার নাম নয়। সেই ভাষার মাধ্যমে যে দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞান বাহিত হয়ে আসবে— সেটিই আসল কথা। 

এখন দেশের অনেক জায়গাতেই ভাটার টান। জাতীয় শিক্ষার নামে কিছুদিন আগেও চোরাপথে আনার চেষ্টা হচ্ছিল দেশীয় প্রাচীন কুসংস্কারকে [প্রবন্ধটি ২০০৫ সালে লেখা। নতুনশিক্ষা নীতির (২০২০) ছদ্মবেশে এ-প্রবণতা আরও জোরদার হয়েছে । -- মার্কসবাদী পথ]। তার পাশাপাশি আসছে সমুদ্র পারের নাম-না-জানা বিশ্ববিদ্যালয়। তার বিরুদ্ধে লড়াই-এ আজও বিদ্যাসাগর আমাদের বড় খুঁটি। এখানেই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা। বিদ্যাসাগর শুধু একটি জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন নি, তাকে লালন করেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।


টীকা 
১. চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদ্যাসাগর, কলেজ স্ট্রিট পাবলিকেশনস্, ১৩৯৪, পৃ. ৩২১। 
২. সুরেশপ্রসাদ নিয়োগী, ‘মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনের ইতিহাস। আদিপর্ব (১৮৫৯-১৮৯১)', রমাকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখ সম্পা., শতবর্ষ স্মরণিকা বিদ্যাসাগর কলেজ ১৮৭২-১৯৭২, বিদ্যাসাগর কলেজ, ১৯৭৫, পৃ. ৩৬২-৩৬৫ দ্র.। ৩. ক্ষুদিরাম বসু, 'বিদ্যাসাগর স্মৃতি', পঞ্চ পুষ্প, আষাঢ় ১৩৩৬; বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ওরিয়েন্ট লংম্যান, ১৯৭৩, পৃ. ৫৫১-৫৫২-এ পুনর্মুদ্রিত। প্রসঙ্গত বলা যায়, অধ্যাপক গফ-এর মাইনে ছিল ১৫০০ টাকা আর ক্ষুদিরাম বসু প্রথমে পেতেন ৮০ টাকা, বেড়ে বেড়ে সেটি দাঁড়িয়েছিল ২৮৫ টাকা । 
৪. সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও একথা তাঁর আত্মজীবনীতে স্বীকার করেছেন (জাতি যেদিন গঠন পথে, ভারতসভা / ইণ্ডিয়ান এসোসিয়েসন, [১৯৭৭], পৃ. ৫৬)।  বিপিনচন্দ্র পাল লিখেছেন: 'ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় যদি সুরেন্দ্রনাথকে মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে ইংরেজীর অধ্যাপক পদে নিয়োগ না করিতেন, তাহা হইলে সুরেন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ জীবন কি হইত তাহা বলা যায় না।' ইন্দ্রমিত্র, করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯২, পৃ. ৩৭১-এ উদ্ধৃত। 
৫. টী. ৩, পৃ. ৫৫৫। 
৬. টী. ২, পৃ. ৩৭৯-তে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের আত্মজীবনী থেকে প্রাসঙ্গিক অংশটি উদ্ধৃত হয়েছে।
৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চিঠিপত্র, খণ্ড ১০, বিশ্বভারতী, ১৪০২, পৃ. ৩৩। তার পরের বাক্যেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘এ সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় অগ্রণী। তিনি ইংরেজি ধরনের বিদ্যালয় দেশীয় লোকের দ্বারা চালাইতে সুরু করেন—আমার চেষ্টা যাহাতে বিদ্যা শিক্ষার আদর্শ যথাসম্ভব স্বদেশী হয়' (ঐ)। 
৮. রবীন্দ্র-রচনাবলী, খণ্ড ১৪, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৯২, পৃ. ২৯৫-৩০৭-এ প্রশ্নপত্রগুলি ছাপা হয়েছে। 
৯. কালীকৃষ্ণ ভট্টাচার্য, ‘মেট্রোপলিটান কলেজ ও বিদ্যাসাগর মহাশয়' (বিদ্যাসাগর কলেজ পত্রিকা, মার্চ, ১৯২৬)। রমাকান্ত চক্রবর্তী প্রমুখ সম্পা. (টী. ২), পৃ. ২৭০। 
১০. ‘বিদ্যাসাগর চরিত', রবীন্দ্র-রচনাবলী, খণ্ড ১১, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ১৯৮৯, পৃ. ১৮১। ১১. অমলেন্দু চক্রবর্তী, গোষ্ঠবিহারীর জীবনযাপন, দে'জ, ১৯৯১, পৃ. ১৮৬। 


প্রবন্ধটি বিদ্যাসাগর: নানা প্রসঙ্গ বই থেকে পুনর্মুদ্রিত। কৃতজ্ঞ- শম্পা ভট্টাচার্য, সিদ্ধার্থ দত্ত।


প্রকাশের তারিখ: ২৬-সেপ্টেম্বর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুবই উচ্চমানের আলোচনা।
- শিবানন্দ পাল, ২৭-সেপ্টেম্বর-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬