Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

রাষ্ট্রের কোনো দায় নেই!

সৃজনী গঙ্গোপাধ্যায়
একই ভারতবর্ষে এই এক প্রজন্ম, যাদের জীবনে কোনো নিশ্চয়তা নেই, সাধারণ ভদ্র জীবনযাপনের জন্য যাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছাড়িয়েও উঞ্ছবৃত্তি করতে হয়, যাদের মৃতদেহের দায় নেয় না কেউই, তারা এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা মন্ত্রী, বিচারপতি, প্রশাসনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সব জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছতাকে আঙুল দেখিয়ে তামাশা করার ইচ্ছার সহাবস্থান একদিন-না-একদিন ধাক্কা খেতই। তবে তার আগে রাষ্ট্র কেড়ে নিল একুশটা প্রাণ, একথা বারেবারে মনে করা প্রয়োজন।
The state bears no responsibility!

কলেবরে বিশাল আমাদের এই দেশ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র। এখানে মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে বেছে নেন কোনো একটি দলকে, সংখ্যাগুরুর মতামতের ভিত্তিতে পাঁচ বছর দায়িত্বে থাকে সেই দল। তারপর, তাদের রিপোর্ট কার্ড তারা পায় পাঁচ বছর পরের আরেকটা নির্বাচনে। কিন্তু গণতন্ত্র মানে কি শুধুই এটুকু? ইভিএম মেশিনে বোতাম টিপে দেওয়ার পরের মুহূর্ত থেকেই আমরা নোবডি? আমাদের কি দেখা যায়? আমাদের অস্তিত্ব কি কোথাও কোনো ছাপ ফেলে? দুটো নির্বাচনের মাঝের সময়টা হাম হ্যায় কে হাম নেহি? দিল্লিতে গত দু-মাস ধরে এই প্রশ্নটা নিয়ে খানিক তোলপাড় হয়ে গেল। উত্তরও আপাতত মিলল কিছুটা। আমরা অনেকেই দূর থেকে তার গুঞ্জন শুনতে পেলাম। আবার অনেকে ঢুকে পড়লাম তার বুকের ভিতরে।

দু-হাজার চোদ্দ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের রাজনীতিতে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ একটা গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ক্ষমতা ও সামর্থ্যের বিচারে এতদিন এই ‘স্পেস’কে যথেষ্ট পরিমাণে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে সরকারপক্ষের আইটি সেল। এই সেলের মধ্যে পেশাদার কর্মীরা যেমন আছেন তেমনই আছেন অন্যান্য বিভিন্ন পেশায় থাকা মানুষ যারা বিরোধী মতের সঙ্গে সুস্থ বিতর্কের বদলে তাদের কোনো একটি আইডেন্টিটির খোপে ঢুকিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর হয়ে থাকেন। সেক্ষেত্রে চেনা ন্যারেটিভের ফাঁসে জড়িয়ে যে কোনো বিরোধী স্বরকেই দমিয়ে দেওয়া সহজ হয়। তবে এই প্রথম হয়তো তাদের চোখের সামনে একটা আয়না তুলে ধরল ভারতের ইনস্টাগ্রাম প্রজন্ম। এই প্ল্যাটফর্মে জন্ম নিল একটি রাজনৈতিক দল। তাদের জনপ্রিয়তা খুব অল্প সময়েই পৌঁছল বহুদূর। ভারতের বেকার, চাকরিপ্রার্থী প্রজন্ম ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর কোনোটাকেই বেছে নিলেন না এক্ষেত্রে, সম্ভবত ওই একই কারণে, ছকে বাঁধা আইডেন্টিটির পোশাক পরে নিতে বাধ্য না-হতে চেয়েও একটি পোশাক তাঁরা সগর্বে পরে নিলেন, ভারতের প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের সূত্র ধরে— আরশোলা হয়ে উঠলেন অনেকেই। কাফকার গল্পে গ্রেগর সামসা একদিন পোকায় পরিণত হয়েছিলেন। তারপর তাঁর পরিবার তাঁকে ঘৃণা করতে শুরু করে, যার প্রতিফলন হয় সামসার বাবার ছুঁড়ে মারা একটি আপেলে। আহত হয় সামসা। একদিন সে মারা যায়। ভারতে আমাদের বা তার পরের প্রজন্ম দেখতে মানুষের মতো হলেও বেঁচে আছে পোকামাকড়ের মতো করেই। জন্মের পর বিরাট বিরাট দামি প্রাইভেট স্কুলে কলেজে পড়াশোনা, নিয়মানুবর্তিতার ঠুনকো মোড়কে দাসবৃত্তি শেখানোর চেষ্টার মধ্যে দিয়ে পড়াশোনা শেষ, তারপর একদিন অসংখ্য পোকার সাথে মিলে খুঁটে খাওয়ার চেষ্টা শুরু। ভারতের প্রধান বিচারপতি ক্ষমতার এবং আয়রনিকালি বিচারব্যবস্থার শীর্ষ স্তরে বসে যখন ঘৃণা ছুঁড়ে দেন এই পোকাদের দিকে, যখন তাঁর গলায় ঝরে পড়ে এদের পেশা নিয়ে বিদ্রূপ, তখন সামসার বাবার কথাই মনে পড়ে। আরশোলা এমন একটা অকিঞ্চিকর প্রাণী, যাকে সাধারণত আমরা ঘৃণা করি, এড়িয়ে চলি। দেখতে অসুন্দর এবং নালায় নর্দমায় বাস। অপরিষ্কার এবং ক্ষতিকর। আর যাকে দেখলেই বিনা অপরাধবোধে মেরে ফেলা যায়। অর্থাৎ, যার অস্তিত্ব কোনো মানে বহন করে না। ভারতের প্রধান বিচারপতি মাননীয় সূর্যকান্ত আসলে অজান্তেই আমাদের একবার দাঁড় করিয়েছেন নিজেদের মুখোমুখি। একই ভারতবর্ষে এই এক প্রজন্ম, যাদের জীবনে কোনো নিশ্চয়তা নেই, সাধারণ ভদ্র জীবনযাপনের জন্য যাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ছাড়িয়েও উঞ্ছবৃত্তি করতে হয়, যাদের মৃতদেহের দায় নেয় না কেউই, তারা এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা মন্ত্রী, বিচারপতি, প্রশাসনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর এই সব জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছতাকে আঙুল দেখিয়ে তামাশা করার ইচ্ছার সহাবস্থান একদিন-না-একদিন ধাক্কা খেতই। তবে তার আগে রাষ্ট্র কেড়ে নিল একুশটা প্রাণ, একথা বারেবারে মনে করা প্রয়োজন।

এনটিএ বা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি ভারতে যে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো নেওয়ার দায়িত্বে আছে, যেমন নেট বা নিট, সেই পরীক্ষাগুলোতে আপনারাও অনেকে হয়তো অংশগ্রহণ করেছেন। আমিও করেছি। এই ধরনের পরীক্ষার ফলের উপর যেহেতু আগামী জীবনের পড়াশোনা, গবেষণা বা চাকরির সুবিধার অনেকটাই নির্ভর করে থাকে, তাই গোটা দেশে লক্ষ লক্ষ ছাত্র তাদের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে এখানে ভালো ফল করতে। কারুর কারুর কাছে একবারের বেশি সুযোগ আসে না এই পরীক্ষাগুলোতে বসার। কারণ এই পরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতিতে এতখানি পরিশ্রম, সময় এবং অর্থ ব্যয় করতে হয়, যেটা একজন নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মানুষের পক্ষে দিতে পারাই মুশকিল। একবার এই সুযোগ চলে গেলে তাদের বেছে নিতে হয় অন্য কোনো জীবিকা, কাউকে ঢুকে পড়তে হয় সংসারধর্ম পালন করতে আর তাদের স্বপ্ন, বলাই বাহুল্য, স্বপ্ন হয়েই রয়ে যায়। অথচ গত কয়েক বছরে যদি এই পরীক্ষাগুলো নেওয়ার সাফল্যের পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখা যায়, দেখা যাবে একের পর এক পরীক্ষা বাতিল এবং আবার পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনা। ২০২৪ সালের নেট পরীক্ষা বাতিল, ২০২৬ এর নিট-ইউজি বাতিল, এর মধ্যে এবং আগে পরে ঘটে গেছে এরকম আরও অনেকগুলো ছোটো বড়ো ঘটনা, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারণ দর্শানো হয়েছে পরীক্ষা ব্যবস্থার ভেতরকার দুর্নীতি এবং প্রশ্ন ফাঁসের দিকে। সরকারকে স্বীকার করে নিতে হয়েছে তাদের গাফিলতি। আবারও পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। সেকথা বারেবারে রাষ্ট্রের পক্ষে থাকা মানুষ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বলছেন “পরীক্ষা যদি আবার নেওয়াই হয় তবে সমস্যা কোথায়?” তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে, রাষ্ট্রের গাফিলতিতে এরকম কোনো ঘটনা ঘটার পর দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে তার দায়ভার নিতে বাধ্য করা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। নিট-ইউজি পরীক্ষা বাতিল হওয়ার ফলে যে একুশজন ছাত্র আত্মহত্যা করল, তার দায় পরীক্ষা নেওয়ার কথা যার ছিল আর যে তাতে ব্যর্থ তার নয়? এই প্রশ্নগুলো তোলা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। আবার পরীক্ষা নিতে রাষ্ট্রকে একটি তারিখ ঘোষণার দায়িত্ব নিতে হয় মাত্র। তাতে তার একবার পরীক্ষা বাতিলের দায় মুছে যায় না। কিন্তু যখন এই দেশের ভোটাধিকারওলা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষরা দায়িত্ব নিয়ে সরকারের ঘাড় থেকে দায় ঝেড়ে ফেলার কাজ নেন, যখন তাঁরা দায়ী করেন ওই মৃত ছাত্রদেরই মানসিক স্থিতিকে, দৃঢ়তাকে, সংকল্পকে, যখন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এই প্রশ্ন ফাঁস কাণ্ডের দায় নিয়ে পদত্যাগ করলে আসলে তা হবে ‘পালিয়ে যাওয়া’-র সামিল বলে মনে করে সরকার, তখন বোঝা যায়, এ-কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। যেমন আমরা দেখেছি বিজেপি সরকারের গত বারো বছরের শাসনকালে, ক্ষমতা ও সামর্থ্য থাকা প্রচুর মানুষ কোভিড-১৯ সময়কালে ভারতজুড়ে লকডাউনে যখন ছুটির আমেজ পেয়েছিলেন, তখন রেললাইন ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরতে গিয়ে ট্রেনে চাপা পড়ছিল এই ভারতেরই আরেকদল মানুষ, নোটবন্দির সময় লাইনে দাঁড়িয়ে মারা যাচ্ছিল এই ভারতেরই একদল মানুষ, আর বিপুল অঙ্কের লোন মকুব হচ্ছিল বিজেপি ঘেঁষা শিল্পপতিদের। সেভাবেই, আবারও দুটো স্পষ্ট পক্ষ তৈরি হয়েছে দেশে। অথচ তা কাম্য ছিল না। সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা অপ্রাপ্তবয়স্ক এই নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আসার কথা ছিল তাদের শিক্ষকদের, প্রতিবেশীদের, অভিভাবকদের। অথচ তাঁরা অনেকেই এদের দিকভ্রষ্ট বলে মনে করলেন। আসলে যে অনুশাসন আর নিয়মের জালে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা, তাতে বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে জানলার দিকে তাকানো ততটা প্রত্যাশিত নয়। বরং আরশোলার মতো পরিচিতিহীন, ভীরু জীবন কাটাতে কাটাতে কোনো একদিন পিষে যাওয়াই সকলের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে দেখা গেল এইসব নর্মের তোয়াক্কা না-করেই সতেরো-আঠেরো-উনিশের এই প্রজন্ম রাস্তায় এসে দাঁড়াল রাষ্ট্রের মুখোমুখি। ঘরের কোণ থেকে সারিবদ্ধ হয়ে তারা এসে দাঁড়াল বড়ো রাস্তায়। পরিচিতিহীনতার বড়ো সুবিধা এই যে, হারানোর বেশি কিছু থাকে না। যা নেই, তা হারানোর সুযোগই বা কোথায়। আমরা দেখলাম, তারা দাবি করল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। তারা তুলে ধরল ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির ক্ষমতা বাতিলের দাবি। তারা ওই একুশজন সহযোদ্ধার জীবনের অ্যাকাউন্টেবিলিটি নেওয়ার দাবি রাখল রাষ্ট্রের সামনে। রাজধানীতে এসে জড়ো হল তারা। গোটা দেশ থেকে ধেয়ে আসতে থাকল ইঁট পাটকেল লাল হিট বেগন স্প্রে-র সওগাত। তবুও প্রায় দু-মাস ধরে এই আন্দোলন আস্তে আস্তে আরও বড়ো হয়ে উঠল। গত পঁচিশে জুলাই শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সরকারপক্ষ মেনে নিতে বাধ্য হলেন সবকটি দাবিই।

ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে এই আন্দোলনে ভারতের শিক্ষাসংস্কারক, উদ্ভাবক ও পরিবেশবিদ সোনম ওয়াংচুক এসে যোগ দেন জুনের শেষের দিকে। আন্দোলনের দাবিগুলোর স্বপক্ষে অনশন শুরু করেন তিনি। এই ঘটনা নিশ্চিতভাবেই এই আন্দোলনকে এক বিশেষ অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করেছিল। সোনমের সাথে অনশন শুরু করেন আরও কয়েকজন গবেষক, ছাত্র-ছাত্রী৷ অথচ দীর্ঘ দু-সপ্তাহেরও বেশি অনশন চলার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের হেলদোল হয়নি। বরং আইটি সেলের মারফত সোনম ওয়াংচুকেরা পরিণত হয়েছেন বহিঃশক্তির প্রভাবে প্রভাবিত সমাজবিরোধী, দেশদ্রোহীতে, ততদিনে ছাত্র-ছাত্রীরাও আরশোলা থেকে হয়ে উঠেছে পশ্চিমা টাকায় পুষ্ট ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’। প্রত্যেকদিন মিডিয়া ট্রায়ালের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের। দেশের প্রথম সারির মিডিয়া হাউজগুলো দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা কুৎসিতভাবে প্রচার করেছে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই লাগাতার কুৎসা থেকে আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীদের গালাগালি, স্লাটশেম, যৌন অভিমুখ নিয়ে আপত্তিকর ইঙ্গিত, আন্দোলনকারীদের চরিত্রহনন, তাদের খোলাখুলি চিহ্নিত করে বিপদে ফেলার চেষ্টা সবই তারা চালিয়ে গেছে। তার বিপরীতে আন্দোলনে উঠে এসেছে অভিনব প্রতিবাদের ভাষা। পোস্টারে, রিলে, মিমে যে-আবহাওয়াটা তৈরি হয়েছিল, সেটা আপাতদৃষ্টিতে একটু লঘুচালের। তবে ন্যায্য দাবি নিয়ে প্রতিবাদ করায় যে যে তকমা জুটেছে তাদের, যে-সব ভয়ঙ্কর কন্সপিরেসি থিওরি খাড়া করেছে মিডিয়া নিজে, যেসব ভায়োলেন্সের মুখোমুখি পড়তে হয়েছে, তার সামনে ব্যঙ্গ ছাড়া আর কী বা জন্ম নিতে পারত? পুলিশের লাঠিচার্জের মুখে সাবওয়ে সার্ফারের মিউজিক ব্যবহার করে রিল বানাচ্ছিল যে-তরুণ, সত্যি সত্যিই তার ওই প্রশাসনিক ভায়োলেন্সের থেকে পালানোর ক্ষমতা তো ছিল না, কিন্তু ওই রিলের মাধ্যমে সে হয়ে উঠল এমন কেউ যাকে ধরা পড়ার থেকে বাঁচতে একটানা দৌড়ে যেতে হয়, যতক্ষণ বেঁচে থাকে সে। কিন্তু সেই আমাদের হিরো, পিছনে দৌড়ানো পুলিশ যতবার ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে পড়ে, আমরা তুড়ি মেরে উঠি। আবার যে দুই তরুণ টিয়ার গ্যাস আর জলকামানের খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন পুলিশের কাছে, তাঁরা তো আসলে দেখালেন কীভাবে প্রশাসনের ব্যবহার করা হাতিয়ারগুলোর ভয় একেবারে কাটিয়ে দিতে হয়। যখন পোস্টারে লেখা হল “The boot you licked stomped your kids”, “Dande Mataram”, “So bad even the privileged are here”, “ Protestor tha isiliye utha liya, rapist hote to ticket de dete”-র মতো লাইনগুলো, আমরা ভাবলাম এত তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য শেষ কবে আমরা স্বতঃস্ফূর্ত কোনো আন্দোলনে দেখেছি! এবং এই আন্দোলন আরও একটা কথা জানান দিয়ে গেল, কোনো অরাজনৈতিক আন্দোলনের ধাক্কা দেওয়ার ক্ষমতা এ-কারণেই কম হয় যে তার লক্ষ্য কে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা স্থির থাকে না। অরাজনীতি দিয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে দু-চার কথা বলা যায় বইকি, কিন্তু অপরাধীকে চিহ্নিত করে তার শাস্তির দাবি তুলতে গেলে তার ছদ্মবেশ, তার আসল চরিত্র, তার ক্ষমতা, তার দুর্বলতা সবই জানা জরুরি। নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন এ-কারণেই একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকবে যে প্রথম বার ভোট দিতে পারারও আগে একটা প্রজন্ম সঠিকভাবে চিনে নিয়েছে যে আসলে রাষ্ট্র তাদের কতটুকু শুভাকাঙ্ক্ষী অথবা তাদের প্রতি কতখানি উদাসীন। 

গত কয়েক বছরে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে জেন-জি প্রজন্মকে প্রতিবাদের সামনের সারিতে দেখা গেছে। বাংলাদেশে এবং নেপালে ক্ষমতা হস্তান্তরিতও হয়েছে তার জেরে। দুই জায়গাতেই প্রাণ দিতে অথবা প্রশাসনিক অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। ভারতেও আমরা দেখলাম শান্তিপূর্ণ ‘সংসদ চলো’ মার্চে পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ। অনশনক্লিষ্ট সোনম ওয়াংচুককে টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। সর্বসাধারণের চোখের আড়ালে একরকম জোর করেই অনশন ভঙ্গ করানো হল তাঁর, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জে.পি. নাড্ডার হাত দিয়ে। এতে সরকারের ঝুঁকি কিছুটা কমল। কিন্তু ততদিনে এই আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন আরও বহু বহু মানুষ। শুধু ভারত নয়, বিভিন্ন দেশ থেকে মুহূর্তে মুহূর্তে খাবার, জল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস এসে পৌঁছাতে শুরু করল যন্তর মন্তরে, আন্দোলনের কেন্দ্রে। একদিকে যখন সহমর্মিতার এই অনন্য ছবি দেখছি আমরা, তখনই দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরের কাছাকাছি সমস্ত পাবলিক টয়লেটে তালা দিয়ে দিচ্ছে, যাতে আন্দোলনে থাকা সাধারণ মানুষ তার সুবিধা না-পায়। একদিকে প্রশাসন, একদিকে বিচারব্যবস্থা আরেকদিকে সংবাদমাধ্যম, প্রত্যেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং মানুষের ভরসা তারা হারিয়ে ফেলেছে, আজ কোনো রাখঢাক না-করেই একথা বলা যায়, বলা উচিত। এ-দেশে, কোথাও একবিন্দু ন্যায় নেই দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য; নেই কোনো সহানুভূতি, কিছুই অবশিষ্ট নেই। আন্দোলনের মধ্যে এসে একদিন হাজির হয়েছিল দুটি ছেলে। স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদী। পুলিশের সাথে মিলে তারা বেধড়ক পিটিয়েছে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের। তারা গর্বিত ভারতীয়। পুলিশ পেলেট গান ব্যবহার করায় নষ্ট হয়েছে এক আন্দোলনকারীর চোখ। পুলিশ কোথা থেকে এর অনুমতি পেল? কে নেবে এর দায়? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সহ অনেক সরকারপক্ষীয়কেই বারেবারে ক্ষোভ উগরে দিতে শুনেছি আন্দোলনের ফলে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করার বিপক্ষে। কথাটা ঠিক। দেশের ঝকঝকে একুশটা প্রাণ কেড়ে নিয়ে, কারো চোখ কেড়ে নিয়ে, কাউকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে দেশের সম্পদ ধ্বংসের এই যে প্রকল্প, আমরাও চাই এর শেষ। আমরাও চাই দোষীরা শাস্তি পাক। দোষীদের চিহ্নিত করুক সরকার নিজে, আমরাও তাই চাই। 

অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ককরোচ জনতা পার্টির এই আন্দোলন অনেকাংশেই সফল। শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা এনটিএ-র সার্বিক কাঠামোয় বদলের যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, এটাই একমাত্র প্রাপ্তি নয়। কোনো আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, এই শর্তে অটল থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেওয়াতে এই আন্দোলনের বিরাট জয় বলে মনে হয়। কারণ, আমাদের সরকার বা প্রশাসন যে স্বভাবতই প্রতিহিংসাপরায়ণ, তা আমাদের জানতে বাকি নেই। বিনা বিচারে, বিনা চার্জশিট ফাইলে, বিনা জামিনে আমাদের রাষ্ট্র ছাত্রদের জেলবন্দি করে রাখে, স্ট্যান স্বামী জেলে অন্ধত্বের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সামান্য ওষুধটুকুও পান না, আমরা ভুলিনি এর কোনোটাই। এমনকি সরকারের এই বিষয়ে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও কলকাতায় আন্দোলনের সমর্থনে মিছিল থেকে গ্রেফতার হন সত্তর জন, মুখ্যমন্ত্রী তিন প্রজন্ম মনে রাখার মতো শাস্তি দেওয়ার অঙ্গীকারও করেন। বিভিন্ন পোস্টার, স্লোগানের সূত্র ধরেও ধরপাকড় শুরু হয়, যার জের এখনও চলছে। আশার কথা এই যে, আন্দোলনের নেতৃত্ব তাদের দাবিতে অটল থেকে দিল্লি ছাড়াও বিহার, আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গে সমস্ত এফআইআর প্রত্যাখ্যান করে নিতে বাধ্য করেছে সরকারকে। না-হলে এই আন্দোলনের সূত্রে আরও অনেকগুলো জীবন নষ্ট করত আমাদের মহান রাষ্ট্র, সন্দেহ নেই এতে।

গত কয়েক বছরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে এনআরসি-সিএএ বিরোধী আন্দোলন, কৃষি আইন সংক্রান্ত আন্দোলন সহ বেশ কয়েকটা বড়ো আন্দোলন দেখেছি আমরা। কিন্তু নিট-ইউজি বাতিলের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি ও বামদলগুলোর এই আন্দোলন অল্প দিনেই ভারতবর্ষের সাম্প্রতিক অতীতে সবচেয়ে বড়ো ছাত্র আন্দোলনগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তার একটা বড়ো কারণ, এই আন্দোলন বিজেপি সরকারের সাথে মতাদর্শগত বিরোধ থেকে জন্ম নেওয়া নয়, বরং এর উত্থান সার্বিকভাবে প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যর্থতার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন থেকে। যা বিজেপি সরকারের কাছে একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। এই আন্দোলনকে মতাদর্শগত বিরোধ হিসাবে খোপবদ্ধ করতে পারলে সরকারের কাছে অনেক সহজ হত তার ফুট সোলজারদের এবং মিথ্যা ভাষ্য ছড়ানোর ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এই আন্দোলনের ভিত দুর্বল করে দেওয়া। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। আর এই আন্দোলনও প্রাথমিক কারণকে ছাপিয়ে হয়ে উঠেছে বিশাল। একটা গভীর বিপুল হতাশা, ক্ষোভ, বঞ্চনার বিস্ফোরণ হয়েছে এই আন্দোলনে, এর পোস্টারে, স্লোগানে দেখা গেছে তার প্রতিফলন। ককরোচ জনতা পার্টি আদতে অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে ভবিষ্যতের আশা হারিয়ে ফেলা, অনিশ্চয়তায় দোলা ও প্রত্যেকদিন পিষে যাওয়া এক বিরাট জনপিণ্ডের এই জেগে ওঠায়, পরবর্তীতে যা হয়ে উঠেছে তাদেরকে ছাপিয়ে আরও অনেক বড়ো। এই আন্দোলন শেষ অবধি প্রেশার কুকারের সিটি খুলে দেওয়ার মতো চাপমুক্তির প্রক্রিয়া হয়ে রয়ে গিয়ে সরকারকে স্বস্তি দেয় নাকি ভারতবর্ষে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার দাবিকে একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া করে তোলে, তা সময় বলবে। আপাতত এটুকু অন্তত বলা যায়, এই প্রজন্ম রাষ্ট্রের কাছে আর কেবল সুযোগের আবেদন রাখছে না, হিসেবও চাইছে। আর কোনো গণতন্ত্রে নাগরিকেরা যখন ক্ষমতার কাছে হিসেব চাইতে শুরু করে, তখন সেই প্রশ্নের আয়ু কোনো একক আন্দোলনের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হয়। আগামী দিনের ভারতবর্ষ সেই দীর্ঘ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

 


প্রকাশের তারিখ: ০১-আগস্ট-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২১২ টি নিবন্ধ
০১-আগস্ট-২০২৬

১৬-জুলাই-২০২৬

১৩-জুলাই-২০২৬

১৩-জুলাই-২০২৬

১২-জুলাই-২০২৬

২৯-জুন-২০২৬

২৮-জুন-২০২৬

২৭-জুন-২০২৬

১৭-জুন-২০২৬

১৭-জুন-২০২৬