Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

চূর্ণ অহমিকা 

রঞ্জন গুপ্ত
বিজেপি সাধারণত আইটি সেলকে দিয়ে গালিগালাজ করিয়ে বিরোধীদের চুপ করিয়ে রাখে। তা ছাড়া যাঁরা সাধারণত মুক্তমনা বা লিবারাল, নীতি-নৈতিকতা নিয়ে রাজনীতি করেন, তাঁরা খুব একটা এই সব গোলামালে ঢুকতে চান না। গালাগালি থেকে নিজেদের দূরে রাখেন। তাই বিজেপির আইটি সেলের আধিপত্য চলছিল। কিন্তু জেন-জ়িরা এ সবের পরোয়া করেন না। গালাগালিতে তাঁদের কিছু যায় আসে না। যন্তর মন্তরের স্লোগান-পোস্টারগুলি দেখলে একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো। রাগ আছে, ক্ষোভ আছে কিন্তু সে গুলির প্রকাশ ঘটছে চরম বিদ্রুপের মাধ্যমে। এটা দেখেই সঙ্ঘীদের মাথায় হাত! 
Shattered Ego

এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদীর অপরাজেয় ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে বিজেপির আইটি সেল এবং মোদীর বশংবদ মিডিয়াকুল। দিল্লির যন্তর মন্তরের মাসাধিককালের জেন-জ়ি আন্দোলন সেই ভাবমূর্তিতে ফাটল ধরিয়েছে। এ ফাটলের গভীরতা অনেকটাই।

বিরোধীদের তো বটেই, এমনকি সংসদকেও তোয়াক্কা না করা নিজের ইচ্ছে মতো সিদ্ধান্ত কার্যকর করাকে অভ্যাসে পরিণত করেছিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। সেই দর্পচূর্ণ করে দিয়েছে এই জেন-জ়ি আন্দোলন। কার্যত নতজানু হয়ে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র দাবিগুলির কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছে এই সরকারকে। 

মোদীর জন্য উদ্বেগের বিষয় হল, আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ কেবল জাতীয় স্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সরকারের প্রতি এই অসন্তোষ, অনাস্থা তা ছড়িয়ে পড়েছে আরও বিস্তৃত আকারে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষিত যুবকদের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং বিশ্বের বৃহত্তম ৩৭ কোটি তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভাল বেতনের চাকরির অভাব। আন্দোলনকারীদের মধ্যে অনেকেই মোদীকে ভোট দিয়েছিলেন। কারণ, ভোটের বাজারে মোদীর প্রতিশ্রুতি তাঁদের গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের অভিজ্ঞতায় তাঁরা নিজেদের প্রতারিত মনে করেছেন। তাই আন্দোলনকারীদের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।

চলতি বছরে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সি স্নাতকদের প্রায় ৪০ শতাংশই বেকার। আর যাঁদের চাকরি রয়েছে, তাঁদেরও খুব অল্প অংশ নিয়মিত বেতনের চাকরিতে যুক্ত এবং তার থেকেও কম সংখ্যক সামাজিক সুরক্ষার মতো সুযোগ-সুবিধা পান।

কোনও কিছুকে তোয়াক্কা না করা বিজেপি নেতৃত্ব সম্ভবত বুঝতেই পারেননি এই তরুণ সমাজকে। যন্তর মন্তরের আন্দোলন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট করে দিয়েছে এই প্রজন্ম বিজেপিকে চরম অবজ্ঞার চোখে দেখে। ১৬, ১৭, ১৮ কিংবা ১৯ বছরের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এই প্রথম কোনও সরকারের প্রতি এত তীব্র ঘৃণা দেখা গেল। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ ও ভাষা নজিরবিহীন। নরেন্দ্র মোদীকে এই আন্দোলন থেকে যে ভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ(অশালীন ভাষা প্রয়োগেও আন্দোলনকারীরা দ্বিধা করেননি)করা হয়েছে তা ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রীকে করা হয়নি। যন্তর মন্তর থেকে দিল্লির রাজপথে স্লোগান উঠেছে, ‘ছাপ্পান ইঞ্চ্ কা ছোটা বান্দর, বাল নরেন্দর, বাল নরেন্দর’। ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, মোদী শালা চোর হ্যায়’। বহু ক্ষেত্রে তো মোদীর বিরুদ্ধে স্লোগান, পাোস্টার শালীনতার সীমাকে পার করে গিয়েছে। জেন-জ়িদের এই চপেটাঘাত বহু দিন মনে রাখবেন নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর দল। নরেন্দ্র মোদীকে এই ধরনের আক্রমণের মুখোমুখি হতেই হতো। কারণ এত দিন দল ও সরকারের প্রতিটি সাফল্যকে নিজের জয় বলে দাবি করেছেন তিনি, তা হলে সমালোচনাও তো ওঁনাকেই শুনতে হবে। 

'প্রতিদিন আমাকে দুই-আড়াই-তিন কেজি গাল খেতে হয়।'— মাঝে মধ্যেই এ কথা বলে আত্মতৃপ্তি অনুভব করনে নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু গালি খাওয়া আর বিদ্রুপের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠার মধ্যে ফারাক আছে। বিরোধীরা যখন মোদীকে আক্রমণ করেন, তখন তাঁর কিছু যায় আসে না। তাঁর পারিষদবর্গ এবং তাঁর ভাবমূর্তি গড়তে ও তা উজ্জ্বল রাখতে বিজেপির আইটি সেল এবং পদ্মশিবিরের অনুগত মিডিয়া রে রে করে নেমে পড়ে। তাতে মোদী আরও শক্তিশালী হন। কিন্তু জেন-জ়িরা মোদীকে শুধু গালাগালি করেননি, তাঁকে হাসির খোরাক বানিয়ে ছেড়েছেন। মোদীর যে বিশালাকার রাষ্ট্রনেতার তথা বিশ্বনেতার ভাবমূর্তি গড়া হয়েছে, তা কার্যত খান খান করে দিয়েছে এই জেন-জ়িরা। রাস্তা হোক, সমাজমাধ্যম হোক বা স্লোগান— মোদীকে নিয়ে এমন সব বিদ্রুপ করা হয়েছে, যা কয়েক মাস আগেও চিন্তা করা যেত না।

এই বিদ্রুপ মোদীর প্রাপ্যই ছিল। বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের লাগাতার ব্যক্তিগত আক্রমণ করেছেন তিনি। ‘কংগ্রেস বিধবা’, ‘জার্সি গরু’, ‘৫০ কোটির গার্লফ্রেন্ড’ কোনও কিছুই বলতে বাকি রাখেননি তিনি। কে জানে— জেন-জ়ির হয়তো তাঁকে দেখেই এই সংস্কৃতি শিখেছে!

২০১৪ সালের আগে লাগাতার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহকে বিদ্রুপ-উপহাসে বিদ্ধ করতেন মোদী। ‘মৌন মোহন’ থেকে শুরু করে কী না বলেছেন তাঁকে। ‘মনমোহন সিংহ বাথরুমে রেনকোট পরে স্নান করেন’ বলেও প্রকাশ্যে মস্করা করতে ছাড়েননি নরেন্দ্র মোদী। বিরোধী দলের নেতাদের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করতে দলের আইটি সেলকেও বেলাগাম ছাড় দিয়েছিলেন তিনি। যাঁরা সমাজমাধ্যমে বিরোধী দল ও তার নেতানেত্রীদের সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করতেন, তাঁদের দিনের পর দিন ফলো করেছেন নরেন্দ্র মোদী। অনেককে তো পুরস্কৃতও করা হয়েছে। ২০১৪ সালে দিল্লির মসনদে বিজেপি আসীন হওয়ার পরে রাহুল গান্ধীকে লাগাতার নিশানা করে গিয়েছেন। কখন পাপ্পু, কখন শাহজ়াদা বলা হয়েছে। আজ নরেন্দ্র মোদী যে অপমানের আগুনে জ্বলছেন, এক দিন তো এই আগুন তিনিই লাগিয়েছিলেন।

বিজেপি সাধারণত আইটি সেলকে দিয়ে গালিগালাজ করিয়ে বিরোধীদের চুপ করিয়ে রাখে। তা ছাড়া যাঁরা সাধারণত মুক্তমনা বা লিবারাল, নীতি-নৈতিকতা নিয়ে রাজনীতি করেন, তাঁরা খুব একটা এই সব গোলামালে ঢুকতে চান না। গালাগালি থেকে নিজেদের দূরে রাখেন। তাই বিজেপির আইটি সেলের আধিপত্য চলছিল। কিন্তু জেন-জ়িরা এ সবের পরোয়া করেন না। গালাগালিতে তাঁদের কিছু যায় আসে না। যন্তর মন্তরের স্লোগান-পোস্টারগুলি দেখলে একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো। রাগ আছে, ক্ষোভ আছে কিন্তু সে গুলির প্রকাশ ঘটছে চরম বিদ্রুপের মাধ্যমে। এটা দেখেই সঙ্ঘীদের মাথায় হাত! 

নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে সমীহ বা ভয়টাই ভেঙে দিয়েছেন জেন-জ়িরা। সমাজমাধ্যমে কেউ তাঁকে ক্যামেরা ধরা শেখাচ্ছেন, কেউ তাঁর স্কিন কেয়ার সম্পর্কে জানতে চাইছেন। এত দিন ধরে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নরেন্দ্র মোদীর যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছিল, তা জেন-জ়ি আন্দোলন ধূলিসাৎ। যে প্রজন্মকে বিজেপি ধর্তব্যের মধ্যেই ধরেনি, তারা এখন পদ্মশিবিরের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিজেপি নেতৃত্ব হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছেন এই জেন-জ়িদের নির্দেশ দিলে, তারা মানবে না। চুপ থাকতে বললে আরও কথা বলবে। প্রশ্ন করতে বারণ করলে, আরও প্রশ্ন করবে। বড়দের তাঁরা সম্মান করবে, যখন তারা সম্মানের যোগ্য মনে করবেন। এদের ভয়ডর তেমন নেই। ২০ জুলাই লাঠিচার্জ, পেলেট বুটেল চালানোর পরে সরকার ভেবেছিল, আন্দোলনের কোমর ভেঙে দেওয়া গিয়েছে, কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। লাঠিচার্জের পরেই তারা দলে দলে যন্তর মন্তরের সামনে হাজির হয়েছে। দ্বিগুণ উল্লাসে। আন্দোলনস্থলকে তারা যে কার্নিভাল প্লেস বানিয়ে দিয়েছে। 

বিকাশ, হিন্দুত্ব, শক্তিশালী নেতৃত্ব— হিসেবে এত দিন তুলে ধরা হয়েছে নরেন্দ্র মোদীকে। তাঁর ভাবমূর্তি তৈরিই করা হয়েছিল এ ভাবে— তিনি বিদ্রুপ, মস্করার ঊর্ধ্বে রাখা হচ্ছিল। যেন ঈশ্বর তুল্য ভাবমূর্তি। কিন্তু জেন জি আন্দোলন এর কোনও তোয়াক্কাই করেনি। এত দিন কংগ্রেস-সহ বিরোধীদের খোরাক বানাতো বিজেপি। এ বার ফারাকটা হল আগে আইটি সেল তৈরি করে উপর থেকে ছড়িয়ে দিত। এখন জেন-জ়িরা সরাসরি নরেন্দ্র মোদীকে হাস্যস্পদে পরিণত করছে। আর এটা হচ্ছে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে। এই জন্য একে আটকানো মুশকিল। 

এই আন্দোলন কোনও রাজনৈতিক দলের বা রাজনীতিবিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়নি। এই ছাত্রদের আন্দোলন, ছাত্রদের জন্য এবং ছাত্রদের দ্বারা পরিচালিত। এক অর্থে এই আন্দোলন অনন্য।


প্রকাশের তারিখ: ১১-আগস্ট-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২১৬ টি নিবন্ধ
১১-আগস্ট-২০২৬

০৯-আগস্ট-২০২৬

০২-আগস্ট-২০২৬

০২-আগস্ট-২০২৬

০১-আগস্ট-২০২৬

১৬-জুলাই-২০২৬

১৩-জুলাই-২০২৬

১৩-জুলাই-২০২৬

১২-জুলাই-২০২৬

২৯-জুন-২০২৬