সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও নয়া জাতীয়তাবাদীগণ
মালিনী ভট্টাচার্য
আরও একদল ‘নয়া জাতীয়তাবাদী’ বিশ্ববিদ্যালয়কে সাফ করার কাজে ‘ড্রেন ইন্সপেক্টরে’র ভূমিকা নিয়েছেন। তাঁরা ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড়ে গাঁজার কলকে ও মদের বোতল এবং নর্দমায় ব্যবহৃত কনডম খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এব্যাপারে ছাত্রীদের দিকে নিন্দার আঙুল তোলা হয়েছে বিশেষভাবে। অভিধান ঘেঁটে অনুপ্রাসে সেই ‘বিকৃতকামা বিকৃতমনা বিকটদর্শনা বিপথগামী’দের জর্জরিত করে দেওয়া হচ্ছে প্রকাশ্য পোস্টারে এবং তাঁদের ‘মেধাবী ছাত্রের ছদ্মবেশ’ ত্যাগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাতে মনে হচ্ছে যাদবপুরের পুরো ক্যাম্পাসটাই হয় গাঁজার আড্ডা, নয়তো এক ঘোর দণ্ডকারণ্য। যেখানে কামরূপিণী রাক্ষসীরা শিকারের লোভে জিভ লকলক করে ঘুরে বেড়ায়। জনবিদ্বেষের নিশানা করে তোলা হচ্ছে কমবয়সী মেয়েদের… নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন মহিলা বিধায়ক, অল্পদিন আগেই যিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এখনও এলাকা থেকে তিনি ততখানি জনসমর্থন আদায় করতে পারেননি। নইলে ১৯-২০ আগস্টের ঘটনা আরো অনেকদূর গড়াত। ‘বিকটদর্শন’ পোস্টারগুলিও তাঁরই উদ্ভাবন।

মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, তিনি শীঘ্রই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয়তাবাদের শিক্ষা দিতে সেখানে যাবেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু মনীষী ইতিপূর্বে শিক্ষকতা করে গেছেন, কিন্তু এমন একজন শিক্ষক ইতিপূর্বে পাওয়া যায়নি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। সম্ভবত এই শিক্ষাক্রমের প্রথম পাঠ হিসাবে গত ১৯ আগস্ট গভীর রাতে একদল লাঠিসোঁটাধারী ‘শিক্ষক’ ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ঐতিহ্যপূর্ণ অরবিন্দ ভবনের সামনে হামলা চালায় এবং ঐ ভবনে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। চার নম্বর গেটের গায়ে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর উদ্ভাবিত নকশায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রতীকটি ছিল, সেটি ভেঙে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয়তাবাদের শিক্ষা দেবার হঠাৎ এমন প্রয়োজন পড়ল কেন? কারণ মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের মতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় 'দিমাগী নকশাল’ ছাত্র ও 'সিপেম’ অধ্যাপকদের দখলে গোল্লায় গেছে; তাঁদের দেশবিরোধী কার্যকলাপে শিক্ষার পবিত্র ভূমি কলুষিত হচ্ছে। এদের এখান থেকে দূর করে ক্যাম্পাসের শুদ্ধিকরণ বিশেষ প্রয়োজন। 'দিমাগী নকশাল’ কথাটি নতুন চালু হয়েছে ১৫ আগস্ট লাল কেল্লার মঞ্চ থেকে এই নয়া জাতীয়তাবাদীদের দেবাদিদেব গুরুদেবের ভাষণে। তার অর্থ বিশদে বলা হয়নি। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে, পড়ুয়ারা এই নয়া জাতীয়তাবাদ নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুললেই তারা 'দিমাগী নকশাল’ আর যে অধ্যাপকেরা তা করে তারা সবাই 'সিপেম’।
আরও একদল 'নয়া জাতীয়তাবাদী’ বিশ্ববিদ্যালয়কে সাফ করার কাজে 'ড্রেন ইন্সপেক্টরে'র ভূমিকা নিয়েছেন। তাঁরা ক্যাম্পাসের ঝোপঝাড়ে গাঁজার কলকে ও মদের বোতল এবং নর্দমায় ব্যবহৃত কনডম খুঁজে বেড়াচ্ছেন। এ ব্যাপারে ছাত্রীদের দিকে নিন্দার আঙুল তোলা হয়েছে বিশেষভাবে। অভিধান ঘেঁটে অনুপ্রাসে সেই ‘বিকৃতকামা বিকৃতমনা বিকটদর্শনা বিপথগামী'দের জর্জরিত করে দেওয়া হচ্ছে প্রকাশ্য পোস্টারে এবং তাদের ‘মেধাবী ছাত্রের ছদ্মবেশ’ ত্যাগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাতে মনে হচ্ছে যাদবপুরের পুরো ক্যাম্পাসটাই হয় গাঁজার আড্ডা, নয়তো এক ঘোর দন্ডকারণ্য। যেখানে কামরূপিণী রাক্ষসীরা শিকারের লোভে জিভ লকলক করে ঘুরে বেড়ায়। জনবিদ্বেষের নিশানা করে তোলা হচ্ছে কমবয়সী মেয়েদের।
এ জাতীয় গল্পগাছা অনেকদিন ধরেই চলে আসছিল, কিন্তু ১৯ আগস্টের ঘটনার পরে এটা আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে তামাশা থাকছে না। জনমানসে ক্রমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম করলেই এক ভয়ঙ্কর নরকের ছবি উঠে আসার সম্ভবনা তৈরি হচ্ছে। এই নরকের কীটদের শিক্ষা দেওয়াটা পবিত্র জাতীয়তাবাদী কর্তব্য। এই ধুয়ো তুলে তাদের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরির উশকানি দেওয়া হচ্ছে। তাঁতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একজন মহিলা বিধায়ক অল্পদিন আগেই যিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এখনও এলাকা থেকে তিনি ততখানি জনসমর্থন আদায় করতে পারেননি। নইলে ১৯-২০ আগস্টের ঘটনা আরো অনেকদূর গড়াত। 'বিকটদর্শন’ পোস্টারগুলিও তাঁরই উদ্ভাবন।

ইতিপূর্বে জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়, জামিয়া মিলিয়া প্রভৃতি নামকরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও দেখা গেছে, দেশদ্রোহিতার অপপ্রচার, উচ্ছৃঙ্খলতার অপবাদের জুড়ি হয়েই এসেছে ক্যাম্পাসের ভিতর ঢুকে শারীরিক আক্রমণও। আবার একই সঙ্গে 'টুকরে টুকরে গ্যাং’দের শায়েস্তা করতে প্রতিষ্ঠানগুলির শীর্ষে এমনসব লোককে বসানো হয়েছে, যাতে তারা বহুবছর ধরে যে স্বাধিকার অর্জন করেছিল তা বিপন্ন হয় আর নয়া শিক্ষানীতি চালু করার ফতোয়া দিয়ে সফল ভর্তি, পরীক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থাগুলি পঙ্গু করে দেওয়া যায়। তৃণমূলের আমলেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে একই ধরনের বিপজ্জনক বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। তবে নতুন সরকার বহুদিন পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর বহিরাগতদের তাণ্ডবের স্মৃতি পুনরায় ফিরিয়ে আনল।
যাদবপুর সহ উপরোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সবই সরকার-পোষিত। এরা বিপন্ন হলে লাভ হবে পরে গজিয়ে-ওঠা মুনাফালোভী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিরই। এতে সাধারন অবস্থার পরিবার থেকে আসা পড়ুয়াদেরই সঙ্কট বাড়বে। কিন্তু নয়া জাতীয়তাবাদ শুধু এতেই মদত দিতে চায় না। যাদবপুরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতে নৈতিক দখলদারি কায়েম করাও তাদের উদ্দেশ্য।
যদি যাদবপুরের বাইরে অভিভাবকসমাজ এটা বিশ্বাস করে থাকেন, যে এসব আক্রমণ সত্ত্বেও সাধারণভাবে অন্যান্য সরকার-পোষিত বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের অবস্থা একই রকম থাকবে, বরং যাদবপুরের অতিরিক্ত স্বাধীনতা কিছুটা খর্ব হলেই ভালো, তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সিসিটিভি, পুলিস ও সরকারের অনেক বেশী হস্তক্ষেপ প্রয়োজন তাহলে তাঁরা ভুল করছেন। নিজেদের সন্তানদের স্বার্থেই আজ তাঁদের যাদবপুরের নিজস্বতা বজায় রাখার লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াতে হবে। আর অন্যদিকে যাদবপুরের ছাত্র-শিক্ষক-গবেষক-শিক্ষাকর্মী সমাজ যদি ভাবেন তাঁরা একমেবাদ্বিতীয়ম্, স্বাধিকার যাদবপুরের বরাবরের জন্মগত অধিকার, তাহলে তাঁরাও ভুল করবেন। যাদবপুর একদিনে যাদবপুর হয়নি। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান, অনেক মানুষের সঙ্গে তার স্বার্থ একই সূত্রে বাঁধা। মুক্তচিন্তার অধিকার সে পেয়েছে গণতান্ত্রিক শর্তেই।
আজ যদি এই প্রতিষ্ঠানের কোনো পড়ুয়া বলে, মুখ্যমন্ত্রীর কাছে সে জাতীয়তাবাদ শিখবে না, তাহলে তার মানে এই নয় যে নিজেকে সে মুখ্যমন্ত্রীর চাইতে বড় মনে করে । তার মানে, সে দেখতে পাচ্ছে যাদবপুর নিয়ে মুখ খুললেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জাতীয়তাবাদের সারাৎসার যে সাংবিধানিকতা তাকে লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন, নিজের সাংবিধানিক পদের মর্যাদা নিজেই খাটো করছেন। সে দেখছে, যাদের জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, যারা সংবিধানকে স্বীকার করেনি, জাতীয় পতাকাকে মর্যাদা দেয়নি, তারাই আজ জাতীয়তাবাদের বড় প্রবক্তা হয়ে উঠেছে।
জাতীয় শিক্ষা পরিষদ ১৯০৫ সালে অনেক দেশপ্রেমিক মানুষের প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসকের প্রচলিত একপেশে উচ্চশিক্ষার প্রতিবাদে। জাতিধর্মলিঙ্গ নির্বিশেষে সব সাধারণ পড়ুয়া যাতে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ পায় সেই লক্ষ্য নিয়ে। তার থেকে জন্ম নেয় যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম থেকেই মানবসেবার লক্ষ্য নিয়ে এই ছোটো মফঃস্বলি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্রমেই জাতীয় শিক্ষার মানচিত্রে জায়গা করে নেয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকারের মূল্য বুঝতে শেখে। অনেক শ্রম, অনেক প্রতিভার অবদান, অনেক মানুষের উদ্যোগে যে ব্যবস্থা তৈরি হয় সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদার ছাত্র- শিক্ষক- শিক্ষাকর্মী- গবেষক এবং তারা যে সামাজিক স্তরগুলির প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনে তাঁদের অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃতি পায়। তার জ্ঞানচর্চায়, তার পঠনপাঠনে বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে গণতান্ত্রিক যোগ থাকে। তার অধ্যয়নে মানবকল্যাণ ও দেশগঠনের বিষয় কখনো অবহেলিত হয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনেক ঘাটতি আছে। বহুমতের জায়গা থাকার ফলে মতভেদ হয়, ঝগড়াঝাঁটিও হয়, কখনও কখনও গুরুতর বিশৃঙ্খলা ও বেনিয়মের পরিস্থিতিও তৈরি হয়। আবার সকলের মতামত নিয়ে তার মধ্যে সামঞ্জস্য করে কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও কার্যকরী করার অভিজ্ঞতা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে। এটা ততক্ষণই হতে পারে যতক্ষণ প্রশাসনের শীর্ষে যারা আছেন তাঁরা জানেন যে তাঁদের সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে এবং সরকারি স্তরে উপযুক্ত সম্মান পাবে। তৃণমূল আমলে অবিরাম সরকারি ফতোয়া প্রশাসনের মর্যাদাকে অনেকটাই ক্ষুণ্ণ করেছিল। আর সেই প্রশাসনের দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীন শরিকদের প্রতিনিধিত্ব না থাকার কারণে ১৯৭০-৭১ এর পরে এই প্রথম বহিরাগতরা পারছে ক্যাম্পাসের ভিতরে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানোর উদ্দেশ্যে ঢুকতে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী তাতে মদত জোগাচ্ছেন জাতীয়তাবাদের নামে।
দুঃখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে তৎপর হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরেই এক নয়া জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী। ইতিমধ্যেই খেলার মাঠে কুচকাওয়াজ করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূত তাড়ানোর জন্য অরবিন্দ ভবনের সামনে যজ্ঞানুষ্ঠান সাফল্যের সাথে অনুষ্ঠিত। বহিরাগতদের ১৯ আগস্ট রাতে গেট খুলে ভিতরে ঢোকানোতে তাদের মদত ছিল এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এটা একটা ভয়ংকর ব্যাপার। প্রশাসনের কাছ থেকে এখনও তাদের প্রতি এই বার্তা যায়নি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বহুমতের স্থান আছে, কিন্তু যারা বহুমতের কন্ঠরোধ করে একক মতকেই জাতীয়তাবাদী নীতি বলে ওপর থেকে চাপিয়ে দিতে চায় তাদের স্থান এই ক্যাম্পাসে নেই। কিন্তু এই বার্তা যাওয়া দরকার এখনই। প্রশাসনকে সেই চাপ দেবার জন্য ‘জাতীয়তাবাদের নামে ফ্যাসিবাদ’-কে যারা প্রতিহত করতে চায়— ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষাকর্মী শুধু নয়— যাদবপুর এলাকায় যারা বাস করেন বা কাজকর্ম করেন— তাঁদের সবার ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো, পরীক্ষা, প্রশাসন ইত্যাদি সব চালু রেখেই এখন এই ঐক্যই আমাদের অগ্রাধিকার।
প্রকাশের তারিখ: ২৬-আগস্ট-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
