Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ওপেনহাইমার রহস্য: বিজ্ঞানের শক্তি ও বিজ্ঞানীদের দুর্বলতা (২)

প্রবীর পুরকায়স্থ
স্বর্গ থেকে ওপেনহাইমারের পতন আরও একটা উদ্দেশ্য পূরণ করল। বিজ্ঞানী মহলকে এই শিক্ষা দেওয়া হল যে, তাঁরা যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার গণ্ডী পেরোনোর সাহস দেখান তাহলে কাউকেই রেয়াত করা হবে না, তা তিনি যত বড় বিজ্ঞানীই হোন না কেন। এটাই ছিল ম্যাকার্থি যুগের নির্যাস। সেই পর্বটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পীমহল, অ্যাকাডেমিক মহল এবং বিজ্ঞানী সমাজের বিরুদ্ধে একটা ঘোষিত যুদ্ধের পর্ব।
 The Oppenheimer Mystery: The Power of Science and the Weakness of Scientists-II

ছবিঃ আলবার্ট আইনস্টাইন অ জে রবার্ট ওপেনহাইমার, ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডি, ১৯৪৭
 

দ্বিতীয় পর্ব



মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন জাপানকে হারিয়ে উল্লাসে মশগুল। পরমাণু বোমার প্রভাব যে কতটা বীভৎস, সেই ছবি সামনে এনে যুদ্ধজয়ের আনন্দকে ম্লান করে দিতে চায়নি আমেরিকা। রহস্যময় কারণে লোকে মারা যাচ্ছে, এই খবর পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছিল আমেরিকা।  যদিও তারা জানত যে আসলে মানুষ মারা যাচ্ছেন তেজস্ক্রিয়তাজনিত অসুস্থতার কারণে। তেজস্ক্রিয়তার কারণে মৃত্যুকে স্রেফ জাপানের ভুয়ো প্রচার বলে দাগিয়ে দিয়েছিল আমেরিকা। ম্যানহাটান প্রজেক্টের শীর্ষকর্তা লেসলি গ্রোভের ভাষায়, তেজস্ক্রিয়তাজনিত অসুস্থতার কারণে মৃত্যু আসলে ‘‌টোকিওর বানানো কাহিনি’‌। বোমায় মানুষের কতখানি ক্ষতি হয়েছে তা জানতে সাত বছর সময় লেগেছিল, এবং তাও জানা গিয়েছিল আমেরিকা জাপানের দখলদারি ছাড়ার পরেই। এমনকী তখনও সামনে এসেছিল মাত্র কয়েকটা ছবি, কারণ তখনও জাপান পরমাণু বোমার আতঙ্ক ঢাকতে আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা করে চলেছিল। হিরোশিমায় বোমা ফেলার পর ঠিক কী ঘটেছিল তার সম্পূর্ণ ছবি পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৬০এর দশক পর্যন্ত। মানুষ বাষ্পীভূত হয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, শুধুমাত্র যে পাথরের ওপর তারা বসেছিল সেই পাথরে তাদের একটা ছাপমাত্র রয়ে যাচ্ছে, বেঁচে যাওয়া লোকেদের শরীর থেকে চামড়া ঝুলে পড়ে বেরিয়ে রয়েছে, তেজস্ক্রিয়তার কারণে অসুস্থ হয়ে লোকের মৃত্যু হচ্ছে — এই সব ছবি তখনই সামনে আসতে শুরু করে।‌

পরমাণু বোমার অন্যদিকটি হল বিজ্ঞানীদের ভূমিকা। তাঁদের সকলকে নায়কের আসনে বসানো হল কারণ তাঁরা যুদ্ধের মেয়াদ সংক্ষিপ্ত করে ১০ লক্ষ মার্কিন নাগরিকের জীবন রক্ষা করেছিলেন বলে দাবি করা হল।  এই অতিকথা রচনা করার সুযোগে পরমাণু বোমা যে তৈরি হয়েছিল একটা বড়সড় মাত্রার শিল্পোদ্যোগের ফলে সেই বিষয়টিকে ঢেকে রাখা হল এবং  বিষয়টিকে উপস্থাপিত করা হল অল্প কয়েকজন পদার্থবিদের আবিষ্কার করা গোপন ফর্মুলা হিসাবে যা যুদ্ধ–পরবর্তী দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এনে দিয়েছে বিপুল ক্ষমতা। ওপেনহাইমার যে মার্কিন নাগরিকদের কাছে নায়ক হয়ে উঠলেন সেটাও সেই একই কারণে। তিনি হয়ে উঠলেন বিজ্ঞানীমহল ও তাঁদের ঈশ্বরতুল্য ক্ষমতার প্রতীক। একইসঙ্গে ওপেনহাইমার হয়ে উঠলেন টেলারের মতো লোকেদের টার্গেট, যে টেলার পরে অন্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ওপেনহাইমারকে টেনে নীচে নামিয়েছিলেন। 

প্রশ্ন হল, কয়েক বছর আগে যে ওপেনহাইমার ছিলেন নায়ক, কীভাবে টেলারেরা তাঁকে এত‌টা নীচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হলেন?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী বাম আন্দোলনের অস্তিত্ব ছিল, এটা কল্পনা করা কঠিন। শ্রমিকদের আন্দোলনে কমিউনিষ্টরা ছিলেন। এছাড়া বুদ্ধিজীবীদের দুনিয়ায়—সাহিত্য  ও সিনেমা মহলে, পদার্থবিদদের মধ্যে— কমিউনিস্টদের জোরদার অস্তিত্ব ছিল। ইতিমধ্যে ব্রিটেনে বার্নাল যে কথাটা বলছিলেন তা হল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে পরিকল্পনার আওতায় আনা যায় এবং বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা উচিত সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করার কাজে। বার্নালের এই ভাবনাটা বিজ্ঞানীরা গ্রহণ করেছিলেন। ঠিক এই কারণেই সেই সময়ে পদার্থবিদেরা যেমন ছিলেন আপেক্ষিকতা, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মতো বিজ্ঞানের সবচেয়ে উন্নত শাখাগুলির একেবারে সামনের সারিতে, তেমনই তাঁরা ছিলেন বিজ্ঞানের এবং বিজ্ঞান সম্পর্কিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কগুলিরও সামনের সারিতে। 

বিজ্ঞানের এই জগতেই একটা সমালোচনামূলক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে সঙ্ঘাত শুরু হয়েছিল নতুন দুনিয়ার, যে দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হবে ব্যতিক্রমী দেশ এবং তারাই হবে গোটা বিশ্বে একমাত্র আধিপত্যকামী শক্তি। এই আধিপত্য তখনই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে যদি কিছু লোক দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, যদি তারা  ‘‌আমাদের’‌ দেশের গোপন তথ্য অন্য কাউকে দিয়ে দেয়। বিশ্বের কোথাও যদি এধরনের বোমা তৈরির কাজে বিন্দুমাত্রও অগ্রগতি ঘটে তবে সেটা সম্ভব হবে একমাত্র গোপন তথ্য চুরির কারণে। এক্ষেত্রে এছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না। আণবিক বোমা তৈরি করা গেছে কেবলমাত্র কয়েকটি সমীকরণের সাহায্যেই যা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন এবং তা সহজেই শত্রুদের কাছে ফাঁস করে দেওয়া যায় — এজাতীয় বিশ্বাসই গোপন তথ্য চুরি করে পাচার করার প্রচারের পালে হাওয়া জুগিয়েছিল। 

এটাই ছিল ম্যাকার্থি যুগের নির্যাস। এটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পীমহল, অ্যাকাডেমিক মহল এবং বিজ্ঞানী সমাজের বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ। এটা ছিল আতঙ্কিত হয়ে যত্রতত্র গুপ্তচরকে খুঁজে ফেরার একটা পর্ব। এই সময়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে উঠল সামরাস্ত্র উৎপাদনের জন্য শিল্পকারখানার (মিলিটারি-ইনডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স) দেশব্যাপী ছড়ানো একটা জাল এবং এই জালের কর্তারাই খুব দ্রুত বিজ্ঞান সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে ফেলেন। ফলে সামরিক খাতে এবং এনার্জি খাতে —মানে পরমাণু শক্তি খাতে — বরাদ্দ বাজেটই এখন থেকে বিজ্ঞানীদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে  এবং ঠিক করে দেবে গবেষণা খাতে তাঁরা  কত টাকা পাবেন। অন্যদের সবক শেখানোর জন্য ওপেনহাইমারকে শাস্তি দেওয়া দরকার ছিল। সামরিক অস্ত্র নির্মাণ শিল্প-কারখানার ছড়ানো জালের মাথায় বসে থাকা ঈশ্বরেরা এবং বিশ্বকে আমেরিকার অধীনে রাখার জন্য সেই সব ঈশ্বরদের যে দৃষ্টিভঙ্গী, তার কোনওরকম বিরোধিতা করতে পারবেন না বিজ্ঞানীরা — পৌঁছে দেওয়া হল সেই বার্তাই। 

স্বর্গ থেকে ওপেনহাইমারের পতন আরও একটা উদ্দেশ্য পূরণ করল। বিজ্ঞানী মহলকে এই শিক্ষা দেওয়া হল যে, তাঁরা যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার গণ্ডী পেরোনোর সাহস দেখান তাহলে কাউকেই রেয়াত করা হবে না, তা তিনি যত বড় বিজ্ঞানীই হোন না কেন। যদিও জুলিয়াস ও এথেন রোজেনবার্গকে হত্যা করা হয়েছিল, তবে তাঁদের ভূমিকা তুলনায় তত গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। জুলিয়াস আণবিক বোমা বিষয়ক কোনও তথ্য ফাঁস করে দেননি। শুধু এক্ষেত্রে কী কী ঘটছে তা জানিয়ে রাখছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নকে। এথেল কমিউনিস্ট ছিলেন। কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে তাঁর কোনও যোগ ছিল না। একমাত্র যে ব্যক্তি আণবিক বোমার ‘‌গোপন তথ্য’‌ পাচার করেছিলেন তিনি হলেন ক্লাউস ফুকস। ফুকস ছিলেন জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য । তিনি ব্রিটেনে পালিয়ে যান এবং প্রথমে ব্রিটেনেই আণবিক বোমা প্রকল্পে কাজ করেন এবং পরে ব্রিটিশ টিমের সদস্য হিসাবে ম্যানহাটান প্রকল্পে কাজ করেন। পরমাণু বোমার ট্রিগারিং মেকানিজম আবিষ্কারের কাজে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল এবং এই সব তথ্য তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। ফুকসের এই সহযোগিতার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু বোমা বানানোর সময় বড় জোর এক বছর এগিয়ে এসেছিল। সামগ্রিকভাবে এক গুচ্ছ দেশের উদাহরণ থেকে দেখা যাচ্ছে, পরমাণুর অনিয়ন্ত্রিত বিভাজন থেকেই বোমার জন্ম, একবার একথা জেনে ফেলার পর বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের পক্ষে এই প্রক্রিয়া নকল করা সম্ভব। পরে তো দেখা গেল এমনকী উত্তর কোরিয়ার মতো ছোট দেশও পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলেছে।

তিনি ম্যাকার্থি যুগের শিকার হয়েছিলেন এবং মার্কিন রাষ্ট্র তাঁর নিরাপত্তার ছাড়পত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, এটাই ওপেনহাইমারের ট্র্যাজেডি নয়। আইনস্টাইনকেও রাষ্ট্র কখনই নিরাপত্তার ছাড়পত্র দেয়নি। তবে সেটাও তাঁর পক্ষে বড় কোনও বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। শুনানির সময় যখন তিনি তাঁর নিরাপত্তা ছাড়পত্র প্রত্যাহারের বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ জানান তখন ওপেনহাইমারকে প্রকাশ্যে হেনস্থা ও অসম্মান করা হয়েছিল। এতেই ওপেনহাইমার ভেঙে পড়েছিলেন। পদার্থবিদেরা ছিলেন আণবিক যুগের সোনালি সন্তান। কিন্তু সামরিক অস্ত্র নির্মাণ শিল্পের ছড়ানো জালের ওপর ভিত্তি করে যে নতুন দুনিয়ার উদ্ভব ঘটছিল, সেখানে বিজ্ঞানের সোনালি সম্তানদের সত্যিকারের জায়গাটা কোথায় তা স্থির করে দিচ্ছিলেন সামরিক শিল্পকারখানার ঈশ্বরেরা। 

আইনস্টাইন, সিলার্ড, রোটব্ল্যাট এবং অন্যরা আসন্ন এই দুনিয়াকে আগাম দেখতে পেয়েছিলেন। ওপেনহাইমারের পথে না গিয়ে তাঁরা পরমাণু বোমার বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার পথে এগিয়েছিলেন। যে বিজ্ঞানীরা বোমা তৈরি করেছিলেন তাঁরা এবার বিশ্বের বিবেকের রক্ষাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। তারা বিরোধিতায় নামলেন সেই বোমা তৈরির বিরুদ্ধে যা গোটা মানবজাতিকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। সেই বোমা এখনও আমাদের মাথার ওপর ডেমোক্লিসের তরবারির মতো ঝুলে রয়েছে।

 

পিপলস ডেমোক্রেসি, জুলাই ২৪-৩০,২০২৩


অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ১০-আগস্ট-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

ওপেনহাইমারের বিষয়টিই তো পরিষ্কার হল না! সামগ্রিকতার আলোচনায় কেন্দ্রীয় চরিত্র থেকে সরে আসা হল। - (সম্পাদিত)
- সুশান্ত পাল , ১১-আগস্ট-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬