সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অরণ্য সংরক্ষণ আইনের পরিবর্তন কেন (দ্বিতীয় পর্ব)?
তপন মিশ্র
কার্ল মার্ক্স তাঁর সময়কালে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অরণ্য সম্পদের অধিকার রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রসঙ্গটি ছিল জার্মানির রাইন উপত্যকায় ব্ল্যাক-ফরেস্ট থেকে বনবাসীদের কাষ্ঠ সম্পদ (বড় গাছ নয়) সংগ্রহ। সে দেশে অরণ্য ব্যক্তি মালিকানায় থাকায় সেখান থেকে শীতের সময় অরণ্যের নীচে পড়ে থাকা ঝাড়িঝুটি সংগ্রহে বনবাসীদের অধিকার প্রসঙ্গে মার্ক্সের কিছু স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। অরণ্যে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া ডালপালা সংগ্রহকে বন মালিকদের সন্তুষ্ট করতে বেআইনি এবং বিচারযোগ্য অপরাধ বলে সরকার আইন করে। মার্কস এর সক্রিয় বিরোধিতা করে ১৮৪২ সালে রেইনাস-জাইতুং পত্রিকায় লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেন, "যেমন ধনীদের পক্ষে রাস্তায় বিতরণ করা ভিক্ষার দাবি করা উচিৎ নয়, তেমনই প্রকৃতির এই ভিক্ষার (বৃক্ষ থেকে পড়ে যাওয়া মৃত ডাল পালা) ক্ষেত্রেও দাবিদার হওয়া অপরাধ।"

১৯৮০ অরণ্য (সংরক্ষণ) আইনের সংশোধনীর মূল রূপরেখা প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে। এবারের আলোচনা এর প্রভাব সম্পর্কে। এর প্রভাব যে সুদূর প্রসারী তাতে সন্দেহ নেই। এখনই কিছু কিছু প্রভাব সামনে আসছে। কিন্তু সারা দেশে এর কি প্রভাব পড়তে চলেছে তা স্পষ্ট নয়। বনবিভাগের আধিকারিকরাও স্পষ্ট জানেন না যে কোন বনাঞ্চল তাদের রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় থাকবে এবং কোনটা নয়।
এই সংশোধনী বিলের দ্বিচারিতা হল, জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করার জন্য একদিকে যেমন অরণ্য-ভিত্তিক কার্বন সিঙ্ক (অরণ্যে কার্বন ভাণ্ডার) তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে এবং এই কারণে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন (compensatory afforestation)-এর ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে, অন্যদিকে কর্পোরেটদের স্বার্থে অরন্যভূমির সঙ্কোচন ঘটানো হচ্ছে। কখনোই প্রাকৃতিক অরণ্যের কার্বন শোষণের ক্ষমতা বৃক্ষ রোপণের মধ্য দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যায়না। প্রাকৃতিক অরণ্যের অনেক ধরণের বাস্তুতান্ত্রিক উপযোগিতা রয়েছে। এগুলিকে অস্বীকার করে কেবল কার্বন শোষণের উপর গুরুত্ব দেওয়া নির্বোধের কর্ম।
এই সংশোধনের মধ্য দিয়ে যে সমস্ত অরণ্য সংরক্ষণের আওতার বাইরে চলে যাবে সেগুলিতে অরণ্য অধিকার আইন (২০০৬)-এর হাল কী হবে সে বিষয়ে সরকার নীরব। ভারত সরকারের পরিবেশ ও অরণ্য মন্ত্রণালয় (MoEFCC) বলছে যে সংশোধনীটি পেশ করার আগে আদিবাসী মন্ত্রণালয় (MoTA)-এর কাছে পাঠান হয়। কিন্তু কেন আদিবাসী মন্ত্রণালয় এর বিরোধিতা করেনি সেটাই বোধগম্য হয়না। যদি অরণ্যই না থাকে তবে আদিবাসী-বনবাসীদের অরণ্য অধিকার খর্ব হতে বাধ্য।
আমাদের দেশের অরণ্য ও অন্যান্য জৈবিক সম্পদ বহুজাতিকদের সামনে উন্মুক্ত করার অর্থ হল, আমাদের দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অবাধ লুট। এর সঙ্গে যুক্ত আছে জৈবিক সম্পদের সাথে সম্পর্কিত জ্ঞান বা মেধা সম্পত্তির লুট। সম্প্রতি জাতিসংঘ স্পষ্টভাবে বলেছে যে জীববৈচিত্র্যের লুণ্ঠন আমাদের মূল্যবান জেনেটিক বৈচিত্র্যের সামনে এক চ্যালেঞ্জ এবং এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা না করতে পারলে আমাদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিপন্ন হবে।
এর প্রভাব
ইতি মধ্যে নাগাল্যান্ড বিধান সভায় এই আইনের বিরোধিতা করে প্রস্তাব পাস করা হয়েছে। সমস্ত উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলির মানুষ এই সংশোধনীর সর্বাত্মক বিরোধিতায় সরব। ওড়িশায় ডিমড ফরেস্ট কে সরকারি দেখভালের বাইরে রাখা হয়েছে যার পরিমাণ সে রাজ্যের বনভূমির প্রায় ৪০%। সারাদেশে আইনের এই সংশোধনীর পর সরকার অধিগৃহীত বনভূমির কত অংশ ব্যক্তিমালিকানা এবং কতটা বনবিভাগ দেখভাল করবে তার কোন হিসাব বনবিভাগের আধিকারিকরাও বলতে পারবেন না। লোকসভায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী একটি মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আইনের এই পরিবর্তনের ফলে যে বিশাল পরিমাণের অরণ্যভূমি ডি-নোটিফায়েড বা বিধিমুক্ত হয়ে যাবে তার সংরক্ষণ কীভাবে হবে তা ভাবা যাবে। আসলে সরকারি ব্যবস্থাপনায় না থাকলে কর্পোরেটদের এই জমি নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন অসুবিধাই থাকবে না।
ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গী নাগা পিপলস ফ্রন্টের সরকার আইনসভা দলের নেতা কুঝোলুজো নিনু বলেন, “The law comes into direct conflict with the constitutional safeguards guaranteed to Nagaland on land and its resources,”। তিনি আরও বলেন, “It will make precious forest land more vulnerable to damage and destruction.”
এই বিল পাস হওয়ার আগে লোক দেখানোর জন্য একটি যৌথ সংসদীয় কমিটি (JPC)-র গঠন করা হয়। এই কমিটির কাছে হাজার হাজার প্রস্তাব জমা পড়ে যার মধ্যে অন্তত চারটি উত্তর-পূর্বের রাজ্য - নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং সিকিম ১০০ কিলোমিটার বনাঞ্চলকে সরকারি অরণ্য পরিচালন থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিরোধিতা করে। এছাড়াও ডিমড ফরেস্ট হিসাবে নাগাল্যান্ডের ৯৭.৩% বন, মেঘালয়ের ৮৮.২%, মণিপুরের ৭৬%, অরুণাচল প্রদেশে ৫৩%, ত্রিপুরায় ৪৩%, আসামে ৩৩%, এবং মিজোরামের ১৫.৫% বন বিভাগের অধীনে রয়েছে। এগুলিও সরকারি অরণ্য পরিচালনার বাইরে চলে যাবে।
পশ্চিমবাংলার উত্তরের তরাই, ডুয়ার্স এবং দার্জিলিং পাহাড়ের সমস্ত বনাঞ্চল হয় ভুটান বা বাংলাদেশ বা নেপাল সীমান্তের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে। সমস্ত সুন্দরবন, মালদার হিজল বন বাংলাদেশের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে। ফলে এই বনাঞ্চল ও রাজ্য সরকারের ব্যবস্থাপনার আওতার বাইরে চলে যাবে। পড়ে থাকবে কেবল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের কিছু শাল বনাঞ্চল। বনবিভাগের বন রক্ষণাবেক্ষণের তেমন কোন দায় বা দায়িত্ব থাকবেনা।
উপেক্ষিত বনবাসী
এই সংশোধনীর মধ্য দিয়ে অরণ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহার সুনিশ্চিত করলেও দেশের ৪০ কোটি বনবাসীদের অরণ্যের অধিকারের স্বপক্ষে কোন শব্দ ব্যয় করা হয়নি বরং এর বিরুদ্ধে এক আইনী ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে যে কয়েক শত বছর ধরে অরণ্যের রক্ষাকর্তা হলেন অরণ্য নির্ভর বনবাসী-আদিবাসী মানুষ। বায়ু মণ্ডলে কার্বন শোষণ, দেশের জৈববৈচিত্র্য রক্ষা ইত্যাদির জন্য অরণ্য সংরক্ষণের কোন উল্লেখ এই সংশোধনীতে নেই।
আইনের যে সমস্ত ব্যবস্থা রয়েছে তা কার্জকর হলে বনবাসী-আদিবাসীদের প্রাপ্ত অধিকার লোপ পেতে চলেছে। অরণ্যই যদি না থাকে তা হলে অরণ্যের অধিকার থাকবে কি করে? ১৩ই মার্চ লোক সভায় সরকার যে বয়ান পেশ করেছে তাতে বলা হোয় যে দেশে ২০০৬ এর অরণ্য অধিকার আইন অনুযায়ী যারা জমির অধকারেরর আবেদন করেছেন তাঁদের প্রায় ৩৮ শতাংশ আবেদন খারিজ হয়েছে। বাকি গুলির মধ্যে প্রায় ৫০% এর মতো আবেদন এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। যদিও আইন অনুযায়ী একটি ছয় মাসের মধ্যে সমস্ত আবেদনের নিষ্পত্তি অনিবার্জ। এক দিকে আমলাতান্ত্রিক বাধা এবং অন্য দিকে সরকারের আদিবাসী-বনবাসী বিরোধী রাজনীতি অরণ্য অধিকার আইনের সফল প্রয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরণ্য সম্পদের উপর বনবাসীদের পরম্পরাগত অধিকার ঘুর পথে অর্থাৎ অরণ্য সংরক্ষণ আইনের সংশোধনীর মধ্য দিয়ে কেড়ে নিতে চাইছে।
কার্ল মার্ক্স তাঁর সময়কালে অর্থাৎ উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অরণ্য সম্পদের অধিকার রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রসঙ্গটি ছিল জার্মানির রাইন উপত্যকায় ব্ল্যাক-ফরেস্ট থেকে বনবাসীদের কাষ্ঠ সম্পদ (বড় গাছ নয়) সংগ্রহ। সে দেশে অরণ্য ব্যক্তি মালিকানায় থাকায় সেখান থেকে শীতের সময় অরণ্যের নীচে পড়ে থাকা ঝাড়িঝুটি সংগ্রহে বনবাসীদের অধিকার প্রসঙ্গে মার্ক্সের কিছু স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়। অরণ্যে গাছ থেকে পড়ে যাওয়া ডালপালা সংগ্রহকে বন মালিকদের সন্তুষ্ট করতে বেআইনি এবং বিচারযোগ্য অপরাধ বলে সরকার আইন করে। মার্কস এর সক্রিয় বিরোধিতা করে ১৮৪২ সালে রেইনাস-জাইতুং পত্রিকায় লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেন, "যেমন ধনীদের পক্ষে রাস্তায় বিতরণ করা ভিক্ষার দাবি করা উচিৎ নয়, তেমনই প্রকৃতির এই ভিক্ষার (বৃক্ষ থেকে পড়ে যাওয়া মৃত ডাল পালা) ক্ষেত্রেও দাবিদার হওয়া অপরাধ।" মার্ক্স আরও লেখেন অরণ্যের এই সম্পদ "দরিদ্রের প্রথাগত অধিকার"। পৃথিবীর সমস্ত দেশে আদিম যুগ থেকে দরিদ্র বনবাসীরা অরণ্যের রক্ষক, কারণ তারা বাস্তুতন্ত্র নির্ভর মানুষ, এবং তাদের দারিদ্র্য এখনও তাদের বাস্তুতন্ত্র নির্ভর থাকতে বাধ্য করছে। এই আইনের সমালোচনা করে মার্ক্সের আহ্বান ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের উপর দরিদ্র মানুষের পরম্পরাগত অধিকার (universal customary rights of the poor) প্রতিষ্ঠা করতে হবে (Rheinische Zeitung, No. 298, Supplement, October 25, 1842)।
মার্ক্সবাদী দর্শন চিরায়ত ভাবে প্রকৃতি সংরক্ষণের কথা বলে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্বকে অবৈর দ্বন্দ্ব হিসাবে বিবেচনা করে। মার্ক্সবাদীরা মনে করে যে প্রকৃতিকে আঘাত করলে তার প্রত্যাঘাত অবধারিত। অরণ্য ধ্বংস করে কৃষিকাজ, খনিজ উত্তোলন রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই সময়টা হল সংরক্ষণের সময় কারণ পৃথিবী অসুস্থ হয়েছে। এখন সেই অসুস্থতার পরিচর্যা এবং তত্ত্বাবধান চাই, যেমনটা আমাদের বৃদ্ধ, অসুস্থ বাবা মা'র জন্য করা বাঞ্ছনীয়। তাই অরণ্যে সংরক্ষণ বিরোধী কোন পদক্ষেপ বামপন্থীরা সমর্থন করেনা। এখানে কেবল রাজনীতি নয়, আছে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রাখার তাগিদ। এ কারণে এই সংশোধনীর সর্বাত্মক বিরোধিতা করা জরুরী।
প্রকাশের তারিখ: ০৭-সেপ্টেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
