সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আরএসএস: সন্দেহজনক অতীতের ১০০ বছর
সাভেরা
আরএসএস আসলে হিন্দুত্বের উৎস — উৎস সেই হিন্দুত্বের, যা ধর্মান্ধ ও পশ্চাদমুখী। এই হিন্দুত্ব সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধে বেলাগাম হিংসাকে উস্কে দিতে চায় যাতে বৈচিত্রসম্পন্ন ভারতকে পিটিয়ে সোজা করে একটা সমসত্ত্ব জনসমষ্টিতে পরিণত করা যায়। যে জনসমষ্টি মেনে চলবে সেই ধর্ম, যাকে আরএসএস বলে সনাতন ধর্ম। আরএসএস ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। সেই ভারত শাসিত হবে পশ্চাদপদ ভাবনার মনুস্মৃতি দ্বারা, যার লক্ষ্য হবে নিছক ধর্মীয় সাধনা এবং সেই ভারত টিঁকে থাকবে নীচু জাতি, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও নারীদের শ্রমের ওপরে।

১০০ বছর পূর্ণ করল আরএসএস। সে নিয়ে চারপাশে এখন ঘোরতর ধুমধাম ও হইচই হচ্ছে। ব্যাপারটা শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। দিল্লির লাল কেল্লা থেকে ১৫ আগস্টের ভাষণে তিনিই প্রথম বিষয়টির উল্লেখ করেন। খবরের কাগজের জন্য এ বিষয়ে একটি নিবন্ধও লেখেন। এবং এখন যেমন প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া বার্তাটা প্রথমে দ্রুত ও জোরেসোরে ধরে নেয় কর্পোরেট মিডিয়া। তারপর নিশ্চিতভাবেই আরএসএসের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, দেশসেবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে লেখা নিবন্ধ বিপুল পরিমাণে বেরোতে শুরু করে। সঙ্গে শুরু হয়ে যায় টিভিতে টকশো। এভাবে সংবাদপত্র ও টিভি আরএসএসের প্রশংসায় একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী এই উদযাপনের প্রশংসা করছেন, এটা তাঁর পক্ষে উপযুক্তও বটে। যদিও এটা নজিরবিহীন। কারণ তিনি প্রশংসা করছেন এমন একটি সংগঠনের যারা তাদের ইতিহাসের বেশিরভাগ সময় অবস্থান করেছে জাতীয় জীবনের একেবারে প্রান্তে। এটা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে উপযুক্ত কারণ মোদির শাসনের পর্বেই আরএসএস-এর এমন ভাবমূর্তি তৈরি করা হয়েছে যার সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। ২০১৪ সালে মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তখন দেশজুড়ে আরএসএস-এর শাখা ছিল ৪৪,৯৮২টি। তখন (দৈনিক ইউনিট সভা) হত ২৯,৬২৪টি জায়গায়। ২০২৫ সালে শাখার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৩,১২৯টি এবং সভা হচ্ছে ৫১,৭১০টি জায়গায়। দুটি সংখ্যাই জানিয়েছে অখিল ভারতীয় প্রতিনিধি সভা (সারা ভারতের প্রতিনিধিদের বৈঠক) যেটা আসলে আরএসএস-এর শীর্ষস্থানীয় সংস্থা। স্পষ্টতই প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৯০ বছরে আরএসএস শূন্য থেকে শুরু করে পৌঁছেছিল ৪৫ হাজার ইউনিটে। তারপর বন্ধুত্বপূর্ণ শাসনের আওতায়, এবং সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে মদতে, পরবর্তী মাত্র এক দশকে শাখার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৩৮ হাজার।
এখন আরএসএস-এর প্রচারক (সর্বক্ষণের কর্মী) এবং সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে রয়েছেন — রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা, রয়েছেন বেশ কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের মন্ত্রীরা এবং কয়েকশ’ নির্বাচিত প্রতিনিধি। ফলে এটা মোটেই আশ্চর্যের নয় যে, আরএসএস এখন সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করছে। আরএসএস-বিজেপির কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ দাবি ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে — যেমন জম্মু ও কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিলোপ, অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ যার বৈধতা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট, ধর্মান্তর-বিরোধী আইন চালু, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, ‘বিদেশিদের’ চিহ্নিত করে বিতাড়িত করার চেষ্টা ইত্যাদি। আরএসএস ও তাদের শীর্ষনেতা মোহন ভাগবতের ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসা করছেন মোদি ও তাঁর দলের শীর্ষ নেতারা। আরএসএস পরিচালিত কর্মসূচিতে টাকা যোগাচ্ছে বিভিন্ন সরকারি সংগঠন, এমনকী অনুষ্ঠানের আয়োজনও করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, নানা ধরনের সংগঠনে আরএসএস ক্যাডারদের নিয়োগ করা হচ্ছে। আরএসএস-এর স্বীকৃতি প্রাপ্ত সংস্থাগুলির প্রকাশিত বই স্কুলে পড়ানো হচ্ছে। তবে তার চেয়েও বড় কথা হল, আরএসএস-এর যে মতাদর্শ — অর্থাৎ ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’, যা আসলে সংখ্যালঘুদের প্রতি ঘৃণাকে আড়াল করে রাখে, যাতে মদত দেয় হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গী, এবং যে মতাদর্শে রয়েছে পুনরুদ্ধারবাদী ভাবনা যা রূপকথাসদৃশ সোনালি অতীতকে আদর্শ বলে মনে করে— মোদি সরকারের শাসনে এই মতাদর্শ নানা দিকে তার শিকড় চারিয়ে দিয়েছে।
সাফল্যের এই মাথা ঘুরে যাওয়ার মতো উচ্ছ্বাসের মধ্যে কার্পেটের তলায় যা ঢাকা পড়ে রয়েছে, তা হল আরএসএস-এর বিরাট ব্যর্থতা এবং সেই ব্যর্থতার কারণগুলি। এই সব কারণগুলিকে সামনে আনলেই স্পষ্ট হবে বহু দশক ধরে কেন আরএসএস ভারতের মানুষের জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এবং পেরেছে তখনই যখন তাদের সদস্যরা বিজেপির খোলসের আড়ালে থেকে ক্ষমতা দখল করতে পেরেছে। আরএসএস-এর বেশ কিছু নাটকীয় বিশ্বাসঘাতকতা গত কয়েক বছর ধরে আলোচনায় উঠে আসছে। এবং খুবই সঠিকভাবে এখন আবারও সামনে চলে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকার করা, এবং একাধিক উপায়ে ব্রিটিশের সহযোগিতা করা। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী হত্যায় জড়িত ছিল আরএসএস। গোড়ার দিকে ভারতীয় সংবিধানকে খারিজ করে দিয়েছিল এই সংগঠন। মুসলিম-বিরোধী হিংস্র দাঙ্গায় জড়িত থেকেছে আরএসএস। অযোধ্যায় আরএসএস-এর হিংস্র আন্দোলনের জেরে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়। জরুরি অবস্থার সময় এই সংগঠনের বহু নেতা আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
এইসব হিমালয়সদৃশ ব্যর্থতা ও বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়াও, আরএসএস সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে সমাজের ‘চরিত্র ও আস্থা’ গড়ে তুলতে – অথচ ১৯২৫ সালের শুরুতে তারা এটাকেই নিজেদের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেছিল। নিজেদের ‘শাখা’, ‘বর্গ’ ও ‘বৌধিকদের’ মাধ্যমে এরা কোনও দেশপ্রেমিক আবহও গড়ে তুলতে পারেনি। অথচ মুখে এরা এই কথাগুলোই আওড়ে যায়। এমনকী হিন্দুদেরও আরএসএস নিজেদের ছাতার তলায় ‘ঐক্যবদ্ধ’ করতে পারেনি। যদিও এ কাজের জন্য বারে বারে তারা মুসলিম এবং অন্যান্যদের তরফে কল্পিত ভীতির উদ্রেক করিয়েছে। আরএসএসের তত্ত্ব হল, (হিন্দু) সমাজকে এক ধরনের স্বর্গীয় দশায় পৌঁছতে হবে এবং হতে হবে বিশ্বের আলোকবর্তিকা (বিশ্বগুরু)। এই তত্ত্বটাও একেবারে জঘন্যভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আর এই সব ব্যর্থতার দায় আরএসএস চাপাচ্ছে পূর্বসূরিদের ওপর — সেটা হয় মুসলিম শাসকেরা, নয় কংগ্রেস সরকার। তবে আরএসএস-এর নিজস্ব যে সামাজিক সাংস্কৃতিক মতাদর্শ সেটার মধ্যে বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। এবং এগুলোর শিকড় রয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যযুগীয় মতাদর্শের পাঁকে। এর ফলে একদিকে আরএসএস অতিকথার মধ্যে দিয়ে প্রাচীনের ন্যায্যতা প্রমাণ করতে চাইছে। অন্যদিকে ভান করছে তারা যেন সামনের দিকেই এগোতে চায়। এখন সংক্ষেপে নজর দেওয়া যাক আরএসএস-এর এই সব ব্যর্থতাগুলির দিকে। এখানে এই সব ব্যর্থতাগুলির আলোচনার যতটা পরিসর রয়েছে আসলে তার চেয়েও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
অর্থনীতি নিয়ে কোনও দৃষ্টিভঙ্গী নেই
যে কোনও সংগঠন যারা সমাজকে বদলে দিতে চায়, অবশ্যই তাদের মৌলিক অর্থনৈতিক ইস্যুগুলির মোকাবিলা করতে হবে। তবে আরএসএস শুধুই বিশ্বাস করে ‘চরিত্র গঠনে’। শোষণ, গোলামি, বেকারত্ব, বঞ্চনা, দারিদ্র এবং এসবের মাত্রাতিরিক্ত পরিণাম হিসাবে অপুষ্টি, রোগ, শিক্ষার অভাব ইত্যাদি বিষয়গুলির মোকাবিলা করতে হবে কীভাবে, সে নিয়ে আরএসএস-এর কোনও ভাবনাচিন্তা নেই। অতীতে যারা আরএসএস-এর মতাদর্শের প্রবক্তা ছিলেন তাঁদের লেখাপত্র খুঁটিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে ‘গুরুজি’ এম এস গোলওয়ালকার, যিনি সবচেয়ে বেশিদিন সরসঙ্ঘচালক ছিলেন (শীর্ষ নেতা) তিনি লিখেছেন, ব্যবসা থেকে যে লাভ হবে তা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া উচিত মালিক ও কর্মচারীদের এবং পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস থাকলেই তা সম্ভব হবে। এটাই হল সংক্ষেপে আরএসএস-এর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, আরএসএস কৃষক, ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক, কারখানা শ্রমিক, কর্মচারী, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক এবং আধুনিক উন্নয়নশীল সমাজে যে বহু ধরনের শ্রমিকেরা রয়েছেন তাদের মধ্যে কোনও ভাবেই কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তাদের রুটি রুজির সমস্যার সমাধান করতে পারেনি আরএসএস। এই সংগঠনটি কখনই একথা বুঝতে চায়নি যে, বস্তুগত পরিস্থিতি না বদলাতে পারলে দেশের বেশিরভাগ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা অসম্ভব। বরং এভাবে আরএসএস পরিণত হয়েছে শাসকশ্রেণির একটি হাতিয়ারে, যে শাসকশ্রেণি চায় অর্থনৈতিক ইস্যু থেকে মানুষের নজর অন্যদিকে ঘুরে যাক। অর্থনৈতিক ইস্যুতে আরএসএস-এর এই চিন্তাভাবনার দৈন্যদশার কারণেই বিজেপি একেবারে আপাদমস্তক নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরেছে এবং মোদি সরকার সেই তত্ত্ব সর্বান্তকরণে কার্যকর করছে। এর মধ্যে পড়ে ধনীদের করভার থেকে রেহাই দেওয়া, সমাজকল্যাণ খাতে খরচ কমানো, বিদেশি পুঁজির জন্য দুয়ার উন্মুক্ত করে দেওয়া, অর্থনীতির ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ করা। এর ফলে দেশের জনগণ ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে পড়েছেন এবং অন্যদিকে এলিট কর্পোরেটদের কোষাগারে সর্বোচ্চ মুনাফা তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই যে ধনীদের খোলাখুলি মদত দেওয়ার নীতি, তাকে কীভাবে সমর্থন করতে পারেন সাধারণ মানুষ?
উচ্চবর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গী
একদিকে জাতপাতে বিভাজিত হিন্দু সমাজ এবং অন্যদিকে হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা, আরএসএস কখনই এই দ্বন্দ্বের সমাধান করে উঠতে পারেনি। অস্তিত্বের বেশিরভাগ সময় জুড়ে একেবারে প্রথার মতো করে এরা সামাজিক সমন্বয় ও সমাজের সব অংশের (সব জাতপাতের) ঐক্য নিয়ে হইচই করে এসেছে। কিন্তু জাতপাতের বিভাজনের বিরুদ্ধে কোনও লড়াই করেনি। অতীতের নেতা গোলওয়ালকার থেকে শুরু করে এখনকার দিনের মন্ত্রী, জাতপাতের বিভাজনের বিরুদ্ধে আরএসএস-এর লড়াইয়ের কায়দাটা হল ‘নীচু’ জাতির পরিবারে গিয়ে ভোজন করা কিংবা তপশিলি বর্ণের লোকেদের পা ধুইয়ে দেওয়া। আরএসএস-এর কাছে মনুস্মৃতি চিরকালই একটা পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। যদিও তাতে বিশদে লেখা আছে যদি নীচু জাতের লোকেরা এমনকী যদি বেদপাঠও শোনেন কিংবা এ ধরনের সীমালঙ্ঘন করেন তাহলে তাঁদের কীভাবে শাস্তি দিতে হবে। সবসময়ই চাকরিতে সংরক্ষণের বিরোধী আরএসএস এবং সংরক্ষণ তারা তুলে দিতেই চায়। মাঝে মাঝে সেকথা প্রকাশ্যে ঘোষণাও করে। আবার এধরনের ঘোষণার বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে তখন তারা পিছু হঠে। রণনীতিগত লক্ষ্য হিসাবে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার অবসানের কথা আরএসএস কখনই সক্রিয়ভাবে ঘোষণা করেনি। তারা মনে করে জাতপাত ব্যবস্থা সমাজের একটা ন্যায়সঙ্গত ও ‘স্বাভাবিক’ শ্রমবিভাজন। আর জাতপাতের নামে যে ভয়াবহ হিংসা পরিকল্পিত ভাবে নামিয়ে আনা হয় সেটা একটা ‘বিকৃতি’ মাত্র। কলঙ্কিত এই ইতিহাসের কারণেই যারা এদেশে তপশিলি জাতিভুক্ত তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই মেনে নেয়নি আরএসএস-কে। ওবিসি-ভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে আরএসএস অন্যান্য পশ্চাপদ শ্রেণি (ওবিসি)-দের মধ্যে সামান্য প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। এবং খুবই কষ্ট করে তারা নিজেদের মণ্ডল কমিশনের সমর্থক হিসাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে।
নারীদের সমানাধিকার
আরএসএস মনে করে তারাই হিন্দুদের স্বঘোষিত রক্ষাকর্তা। অথচ হিন্দু সমাজের জটিল ও বিচিত্র অবস্থানের মধ্যে তারা কোনও রকম সামাজিক সংস্কার আনতে কিংবা সেই ধরনের সংস্কারকে সমর্থন করার কাজে পুরোপুরি ব্যর্থ। এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হল, আরএসএস নারীদের ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করে এসেছে। আরএসএস মনে করে, আদর্শ নারীর কাজ হল শুধুমাত্র পরিবারের দেখাশোনা করা এবং স্বামীর সেবা করা। নারীদের সম্পর্কে আরএসএস-এর দৃষ্টিভঙ্গী কতদূর ক্ষতিকর তার প্রমাণ ব্যক্তিগত আইনে প্রথম সংস্কার আনার চেষ্টায় তাদের ভূমিকা। ১৯৪৮-৪৯ সালে ডক্টর আম্বেদকারই সর্বপ্রথম একটা হিন্দু কোড বিলের খসড়া করেছিলেন: তাতে তিনি পুত্রের মতো কন্যা ও স্বামীহারা নারীকেও সম্পত্তির সমান ভাগ দিয়েছিলেন। স্বামী নিষ্ঠুর হলে এবং স্ত্রীর দেখাশোনা না করলে স্ত্রীকে বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার দিয়েছিলেন। এক স্ত্রী বর্তমান থাকতে স্বামীর দ্বিতীয়বার বিয়ে করা নিষিদ্ধ করেছিলেন। ভিন্ন জাতের পুরুষ ও নারীর মধ্যে বিবাহ আইনসিদ্ধ করেছিলেন। অন্য জাতের শিশুকে দত্তক নেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। আরএসএস-এর নেতৃত্বে সব ধরনের রক্ষণশীল হিন্দু সংগঠনগুলি এই সব প্রতগিশীল ব্যবস্থাকে প্রাণপনে বাধা দিয়েছিল। আম্বেদকারের খসড়া বিলের প্রতিবাদে দিল্লিতে আরএসএস ৭৯টি সভা করেছিল, এবং নেহরু ও আম্বেদকারের কুশপুতুল পুড়িয়েছিল। তারা বলেছিল এই বিল হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ। শেষ পর্যন্ত বিলটি কার্যকর করা যায়নি। কারণ এ বিষয়ে নেহরুর ক্যাবিনেট দ্বিধাবিভক্ত ছিল। রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদও বিলটি পছন্দ করেননি। ১৯৫২-র সাধারণ নির্বাচনের পর নব নির্বাচিত নেহরু সরকার বিভিন্ন অংশে ভাগ করে এই বিলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থাগুলি পাস করিয়েছিল। পরে আরএসএস অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আওয়াজ তোলে। এর মানে ছিল একই ধরনের ব্যবস্থা অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। এই ভাবনাটা এখনও টিঁকে রয়েছে। পাশাপাশি আরএসএস তিন তালাকের বিরুদ্ধে আইন ইত্যাদিকে সমর্থন করে মুসলিম নারীদের প্রতি ভুয়ো সমবেদনা দেখাচ্ছে।
পণপ্রথা একটা সামাজিক অপরাধ। এ বিষয়ে আরএসএস-এর অবস্থান হল, এটা একটা ঐতিহ্য। অথচ বাস্তবে এই প্রথা চালু হয়েছিল মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে। কিন্তু বিষয়টা আমাদের সমাজে এত বেশি গেঁথে রয়েছে যে, এর বিরোধিতা করার মতো সাহস কিংবা মতাদর্শগত উপায় আরএসএস-এর জানা নেই। ২০১৭ থেকে ২০২২ এর মধ্যে (স্বামী ও পরিবারের পণের দাবির জেরে ) দেশে বধূমৃত্যুর সংখ্যা ছিল গড়ে বছরে ৭০০০। অথচ এবিষয়ে আরএসএস পুরোপুরি নীরব থেকেছে। বরং এই ধরনের পিছিয়ে পড়া ভাবনা তাদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি খাপ খেয়ে যায়। এ নিয়ে তারা সাময়িক কিছু হইচই করে মাত্র। একইভাবে আইপিসির ৪৯৮ক ধারা (বিএনএস ধারা ৮৫), যে ধারায় স্ত্রীর প্রতি স্বামী ও পরিবারের নিষ্ঠুরতা ব্যবহারের বিচার করা যায়, সেই ধারা সম্পর্কে আরএসএস-এর অবস্থান পুরোপরি অস্পষ্ট। কর্মস্থলে যৌন হেনস্থা বিষয়ে আরএসএস-এর কিছুই বলার নেই এবং এই ধরনের ঘটনাগুলির মোকাবিলা করে যে সব কমিটি আরএসএস-এর অধীনস্থ সংগঠনগুলি তাদের সমর্থন করে না। বস্তুত, আরএসএস-এর অধীনস্থ সংস্থাগুলির নেতারা প্রায়শই যৌন হেনস্থা এবং এমনকী ধর্ষণের ঘটনায় নির্যাতিতাদেরই সমালোচনা করেন এমন অপরাধে উস্কানি দেওয়ার জন্য এবং তোতাপাখির মতো বলতেই থাকেন নারীদের ঘরেই ভাল মানায়। হিন্দুত্ববাদের আচারসর্বস্ব ও গোঁড়া রূপের শিকলগুলি থেকে আরএসএস বেরিয়ে আসতে পারে না। হিন্দুত্ববাদের এই গোঁড়া রূপগুলি পরিবারে এবং দেশের নাগরিক হিসাবে মহিলাদের পুরুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস করে না।
ভাষা
আরএসএস মুখে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কথা বলে। আসলে তারা সংস্কৃত ও হিন্দি চাপিয়ে দিতে চায়। তারা বিশ্বাস করে যে সংস্কৃতই অন্য সব ভাষার উৎপত্তিস্থল। এবং এই ভাষা দেবভাষা। এই দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিজেপি সরকার গত এক দশকে সংস্কৃতি ভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ২৫৩২ কোটি টাকা খরচ করেছে। উল্টোদিকে অন্য সব চিরায়ত ভারতীয় ভাষা অনুদান পেয়েছে মাত্র ১৪৭ কোটি টাকা। সংস্কৃত সহ সব ভাষাকেই বাঁচিয়ে রাখা দরকার। তবে সংস্কৃতই হবে ভারতের সব মানুষের সাধারণ কথ্য ভাষা, এমন ভাবনাটা স্রেফ কল্পনার রাজ্যে বিচরণ। এমনকী অতীতে সংস্কৃতের সম্মান যখন সবচেয়ে বেশি ছিল, তখনও সংস্কৃত ভাষা সীমাবদ্ধ ছিল মুষ্টিমেয় কিছু অভিজাতদের মধ্যে। এরা সংস্কৃতে লেখা বেদ ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থের শ্লোকগুলি আওড়াতে পারত এবং এই বিষয়টার ওপর তাদের একচেটিয়া অধিকার বজায় রেখেছিল। অন্য কাউকেই তা শিখতে দিত না। সারা দেশে ‘সংযোগকারী ভাষা’ হিসাবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়াকেও সমর্থন করে আরএসএস। এই ঐতিহ্যের কারণে তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপিও তাদের নয়া শিক্ষানীতির প্রথম খসড়ায় হিন্দি ভাষা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। যেসব রাজ্য হিন্দিভাষী নয় তাদের প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয় বিজেপি। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে ভাষার প্রশ্নে আরএসএস-এর অবস্থান আদৌ গণতান্ত্রিক নয়। বরং আরএসএস-এর ভাষা সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গী হয়ে উঠেছে বিভাজনের আরও একটি হাতিয়ার এবং তার জেরে আরএসএস-এর বিরুদ্ধে প্রবল অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
ধর্মীয় গোঁড়ামি
আরএসএস আসলে হিন্দুত্বের উৎস — উৎস সেই হিন্দুত্বের, যা ধর্মান্ধ ও পশ্চাদমুখী। এই হিন্দুত্ব সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের বিরুদ্ধে বেলাগাম হিংসাকে উস্কে দিতে চায় যাতে বৈচিত্রসম্পন্ন ভারতকে পিটিয়ে সোজা করে একটা সমসত্ত্ব জনসমষ্টিতে পরিণত করা যায়। যে জনসমষ্টি মেনে চলবে সেই ধর্ম, যাকে আরএসএস বলে সনাতন ধর্ম। আরএসএস ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। সেই ভারত শাসিত হবে পশ্চাদপদ ভাবনার মনুস্মৃতি দ্বারা, যার লক্ষ্য হবে নিছক ধর্মীয় সাধনা এবং সেই ভারত টিঁকে থাকবে নীচু জাতি, আদিবাসী, সংখ্যালঘু ও নারীদের শ্রমের ওপরে। আরএসএস ভান করে যে তারা চরিত্র গঠনের মধ্যে দিয়ে দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে চায়। আসলে এ ব্যাপারে তারা হিংসাকে কাজে লাগাতে ইতস্তত করে না। চূড়ান্তভাবে বিভাজনকামী, বিষাক্ত এবং সংঘাত সৃষ্টিকারী এই মতাদর্শকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে আরএসএস এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি। এদের মধ্যে পড়ে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, হিন্দু সেনা, সরস্বতী শিশু মন্দির, বনবাসী কল্যাণ পরিষদ ইত্যাদি। সহানুভূতিসম্পন্ন একটা সরকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুগিয়ে দিয়ে এদের আড়াল করে রেখেছে এবং সব অভিযোগ থেকে মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করেছে। এর জেরে এখন উৎসবগুলো হয়ে উঠেছে হিংসার অনুষ্ঠান। এর জেরে অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের ধর্মস্থানের ওপর কিংবা তাদের বাড়িঘরের ওপর হামলা বাড়ছে, কাশী ও মথুরা সহ মোট ১৭টি মুসলিম ধর্মস্থান যাতে হিন্দুত্ববাদীরা দখল করতে পারে নতুন করে তার দাবি উঠছে। এসবের মানে হল আগামী দিনে ধারাবাহিক হিংসার ঘটনা ঘটবে, মানুষ পিটিয়ে খুন করা চলবে, বুলডোজার দিয়ে বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া চলবে, ভয়ঙ্কর সব আইনে মিথ্যা মামলা দায়ের করা চলবে, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আরও আক্রমণ নামিয়ে আনা হবে। এসব কিছুই ভারতকে ভাগ করে ধর্মের ভিত্তিতে, ধ্বংস করে এদেশের বৈচিত্র। এবং এসবই হল গোটা সমাজকে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাতের মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়ার পূর্বলক্ষ্মণ।
এই সব এবং এই ধরনের আরও সংশ্লিষ্ট চিন্তা ও কাজের জন্যই আরএসএস ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলির সঙ্ঘ পরিবার দেশের বেশিরভাগ লোকের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিজেপি জনপ্রিয়তাবাদী ইস্যুগুলিকে কাজে লাগিয়ে ভোটে জিতে কেন্দ্রে ও বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতায় আসার কৌশল রপ্ত করেছে। এ বিষয়ে তারা আগের সরকারগুলোর বিরুদ্ধে থাকা ক্ষোভগুলিকেও কাজে লাগিয়েছে। এখন লোকেরা ধীরে ধীরে একথা উপলব্ধি করছে যে, তারা না বুঝে যে সমর্থন দিয়েছে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আরএসএস নিঃশব্দে তাদের ক্যাডারদের ও তাদের ভাবনাচিন্তাগুলোকে সরকারের মধ্যে অনুপ্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। আর সেগুলোই এখন ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও আধুনিক ভারত এবং পশ্চাদপদ, বিভাজনমূলক, হিংসাপ্রবণ হিন্দুরাষ্ট্রের ধারণা — এ দুয়ের মধ্যে সত্যিকারের লড়াইটা এবার সামনে চলে আসছে।
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, ০৬-১২ অক্টোবর ২০২৫
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
এক ক্লিকেই ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটস্যাপ চ্যানেল
প্রকাশের তারিখ: ১৩-অক্টোবর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
