সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভিয়েতনামের পুনর্মিলনের ৫০
টিম মার্কসবাদী পথ
সেদিন সায়গনে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রধান ফটক গুঁড়িয়ে ঢোকে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (পশ্চিমের মিডিয়া প্রায়শই যাকে বলত ভিয়েত-কঙ) সাঁজোয়া গাড়ি। অন্যদিকে, শহরের মার্কিন দূতাবাসের ছাদে মার্কিন হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য মার্কিনীদের তৎপরতা! ভেঙে পড়ে মার্কিন-মদতপুষ্ট জমানা। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় মার্কিন দর্প। ভেঙে খান-খান হয়ে যায় মার্কিন অপ্রতিরোধ্য অপরাজেয়তার কল্পকথা।

পুনর্মিলনের পঞ্চাশ বছর পরেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ভিয়েতনাম। ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ রেখে চলেছে এই বিশ্বের প্রবল পরাক্রান্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকেও পরাস্ত করা সম্ভব।
ভিয়েতনামই দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় প্রথম ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত দেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর মুক্ত হয় ফরাসী ঔপনিবেশিক শাসন থেকে। কিন্তু ফরাসী ঔপনিবেশিক জমানা দেশের দক্ষিণাংশের দখলদারি ছাড়েনি। কারন তাদের পিছনে ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। প্রথমে গোপনে, পরে প্রকাশ্যে। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে ভিয়েতনামের ওয়ার্কার্স পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস বিপ্লবের দু’দফা কর্তব্য চিহ্নিত করে– উত্তরাংশে সমাজতান্ত্রিক নির্মাণ এবং দক্ষিণাংশকে মুক্ত করা-সহ দেশের শান্তিপূর্ণ পুনর্মিলন। মার্কিন সেনাবাহিনী বর্বরতার নতুন নজির সৃষ্টি করে ভিয়েতনামের মাটিতে। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে পর্যন্ত তারা দ্বিধা করেনি। যার কুফল ভোগ করতে হচ্ছে ভিয়েতনামের আজকের প্রজন্মকেও।
মে, ১৯৬২। প্রথমবারের জন্য ভিয়েতনাম সফরে মার্কিন বিদেশসচিব রবার্ট ম্যাকনামারা। মাত্র ৪৮-ঘণ্টা থেকেই সদর্পে ঘোষণা করেছিলেন: ‘প্রতিটি পরিমাপেই স্পষ্ট... আমরা এই যুদ্ধে জিতছিই।’ সেসময় এই বিবৃতি ছিল মার্কিন সেনাবাহিনী এবং অভিজাতদের মধ্যে থাকা সহজাত অহংকার-ঔদ্ধত্ব্যের এক প্রতিধ্বনি। যারা নিছকই খড়কুটোর মতো একটি পলকা বাধা হিসেবে ভিয়েতনামকে দেখেছিল। কমিউনিস্ট-প্রভাবকে দমন এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষায় এই অভিযানকে মনে করেছিল একটি খুচরো সংঘাত।
৩০ এপ্রিল, ১৯৭৫। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান। সায়গনের পতন। ভিয়েতনামের জনগণের চূড়ান্ত বিজয়। মুক্ত হয় দক্ষিণ ভিয়েতনাম। যদিও, দু’বছর আগে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিলেও, সায়গনে তখনও ছিল ওয়াশিংটনের পুতুল সরকার। সেদিন সায়গনে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রধান ফটক গুঁড়িয়ে ঢোকে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের (পশ্চিমের মিডিয়া প্রায়শই যাকে বলত ভিয়েত-কঙ) সাঁজোয়া গাড়ি। অন্যদিকে, শহরের মার্কিন দূতাবাসের ছাদে মার্কিন হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য মার্কিনীদের তৎপরতা! ভেঙে পড়ে মার্কিন-মদতপুষ্ট জমানা। ভেঙে চুরমার হয়ে যায় মার্কিন দর্প। ভেঙে খান-খান হয়ে যায় মার্কিন অপ্রতিরোধ্য অপরাজেয়তার কল্পকথা।
২ জুলাই, ১৯৭৬। উত্তর ও দক্ষিণের পুনর্মিলনে আত্মপ্রকাশ করে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর সাম্রাজ্যবাদী দেশ মাথা নত করে হো চি মিনের উত্তরসূরীদের কাছে।
সেদিনের সায়গন আজ হো চি মিন নগরী। পঞ্চাশ বছর ভিয়েতনামের এই জয় শুধু ভিয়েতনামেই নয়, প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। একদিকে সাম্রাজ্যবাদের সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মুক্তিকামী মানুষের সম্মিলিত শক্তির একটি গভীর শিক্ষা হিসেবে আজও রয়ে গিয়েছে এই পৃথিবীর কাছে।
এই সময়ে অর্থনীতির ক্ষেত্রে, কৃষি ও শিল্পে অভাবনীয় উন্নতি করেছে ভিয়েতনাম।
১৯৮৬, ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেসে অর্থনীতি ও সমাজজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কিছু পরিবর্তন আনা হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘দই মই’, বা পুনর্নবীকরণ। ষষ্ঠ কংগ্রেসের রিপোর্টে বলা হয়, ‘অর্থনীতির নির্মাণ, বিশেষত উৎপাদন ও বিনিয়োগের নির্মাণ সংগঠিত করতে অনেক সময়ে আমরা খুব দ্রুত অগ্রসর হতে চেয়েছি, বাস্তব পরিস্থিতি এবং আমাদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করিনি।’ অন্তর্বর্তী পর্যায়ে যে নানা ধরনের সম্পত্তির উপস্থিতিকে মেনে নিতে হবে, এই প্রেক্ষিতে সেই বিশ্লেষণই রিপোর্টে পেশ করা হয়। ২০১১, পার্টির একাদশ কংগ্রেসে পঁচিশ বছরের পুনর্গঠন (১৯৮৬-২০১১) প্রক্রিয়ার অভিজ্ঞতা ও সাফল্য মূল্যায়ণ করে বলা হয় ‘এক নিরাপদ পরিস্থিতি এবং দেশ এক বিপুল শক্তি অর্জন করতে পেরেছে।’
২০২৪, পুরো বছরে বৃদ্ধির হার ছিল ৭.০৯ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতি ছিল নিয়ন্ত্রণে, ৪ শতাংশের নিচে। দেশের জিডিপি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭,৬৩০ কোটি ডলার (তেইশ সালে ছিল ৪৩,৩৭০ কোটি ডলার)। মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে হয়েছে ৪,৭০০ ডলার (তেইশ সালে ছিল ৪,৩২৩ ডলার)। বিশ্বে ৩২-তম বৃহত্তম অর্থনীতি। আমদানি-রপ্তানির লেনদেনের অঙ্ক ১৫.৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭৮,৬২৯ কোটি ডলার। বাণিজ্যে ঘাটতি না, বরং উদ্বৃত্ত। এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ২,৪৭৭ কোটি ডলার। তেইশ সালের তুলনায় আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ৩৯.৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লক্ষ।
এই সময়ে তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি হয়েছে মানুষের জীবনমানের। দারিদ্রের হার কমে হয়েছে মাত্র ১.৯৩ শতাংশ, যেখানে ১৯৮৬-তে ছিল ৬০ শতাংশ (শাইনিং ভিয়েতনাম, তো লাম, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাক, ফেব্রুয়ারি, ২০২৫)। যদিও অসমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পার্টি সজাগ। শেষ এয়োদশ কংগ্রেসেও স্বীকার করা হয়েছে: এতো সাফল্য সত্ত্বেও কিছু ত্রুটি ও দুর্বলতা রয়েই গিয়েছে।
এই মুহূর্তে ১৯৪টি দেশের সঙ্গে রয়েছে ভিয়েতনামের কূটনৈতিক সম্পর্ক। এরমধ্যে ৩টি দেশের সঙ্গে রয়েছে বিশেষ সম্পর্ক। লাওস, কাম্বোডিয়া এবং কিউবা। স্বাভাবিক। ভিয়েতনামবাসীর উদ্দেশ্যে কিউবার হোসে মার্তি সেই কবে বলেছিলেন, ‘যাঁরা মাছ, ভাতের ওপর বেঁচে থাকেন, রেশমের পোশাক পরেন, বহু দূরে এশিয়াতে যাঁরা বাস করেন চীনের নিচে, সমুদ্র সৈকতে, তাঁরা বরাবরই কিউবার বন্ধু।’ আর ভিয়েতনাম যখন ইয়াঙ্কি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, তখন (সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) অকুতোভয় ফিদেলই প্রথম কোনও রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সীমান্ত পেরিয়ে গিয়েছিলেন দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেই মুক্তাঞ্চল কুয়াঙ ত্রি সফরে।
আগামী বছর চতুর্দশ কংগ্রেসের পথে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টি। ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রস্তুতি।
পার্টির লক্ষ্য: পার্টি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভিয়েতনামকে একটি আধুনিক শিল্পোন্নত, উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করা। আর স্বাধীনতার ১০০-বছরে, ২০৪৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনামকে একটি উচ্চ-আয়ের উন্নত দেশে পরিণত করা।
প্রকাশের তারিখ: ৩০-এপ্রিল-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
