Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বহুমেরু দুনিয়া গড়ার লড়াই ও ব্রিকস

সুচিক্কণ দাস
এইভাবেই এখনকার বিশ্ব হয়ে উঠছে বহুমেরু বিশ্ব। যা মার্কিন-সহ পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে কমবেশি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ফলে সোভিয়েতের পতনের পর বিশ্ব একতরফা একমেরু হয়ে উঠবে বলে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার ছায়া এখন সরছে। বদলে ক্রমশ স্পষ্ট চেহারা নিচ্ছে এক বহুমেরু বিশ্ব। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমী পুঁজিবাদকে সমঝে চলতে হচ্ছে। কারণ বহুমেরু বিশ্ব– ডলার, সুইফট ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাঙ্কের আধিপত্যকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছে। এগুলির বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এবং সেখানে শামিল হচ্ছে বহু দেশ। কোনও সন্দেহ নেই এইসব বহুমেরু মঞ্চের প্রথম সারিতে রয়েছে ব্রিকস।
Struggle to build anti-imperialist multipolar world and BRICS

সংঘাতের পটভূমি

বর্তমান বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদ দু’ভাবে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।

এক, আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির নেতৃত্বে নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলির সম্পদ লুট করে চলেছে। এই লুটেরাদের মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যে বি-উপনিবেশীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তাকে অকেজো করে দিয়ে সেই দেশগুলির প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদের ওপর একাধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। এবং সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন নতুন আক্রমণের মধ্যে দিয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য সোভিয়েত-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো– এটাই এই পর্বে সাম্রাজ্যবাদের প্রধান কর্মসূচি। এবং এটা মূলত অর্থনৈতিক কর্মসূচি, যার সঙ্গী হিসাবে থাকে সঙ্ঘাত বাধানোর নানা হাতিয়ার ও সামরিকবাদ।

দুই, সাম্রাজ্যবাদের দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হল নিখাদ সামরিক। ইজরায়েলকে মদত দিয়ে গাজা দখল, লেবাননের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইরানকে মাথানত করতে বাধ্য করা, ইরাক ও সিরিয়াকে আগের মতো কুক্ষিগত করার চেষ্টা–এগুলোই সাম্রাজ্যবাদের সামরিক মুখ। এই সামরিক স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য হল, পশ্চিম এশিয়ার তেল সম্পদের ওপর সাম্রাজ্যবাদের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। আর একটা স্ট্র্যাটেজি দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনে। সেখানে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে ও ছদ্মবেশে ন্যাটোর সেনা পাঠিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ দীর্ঘতর করা হচ্ছে। আসল লক্ষ্য টানা যুদ্ধ চালিয়ে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলা ও শেষে পদানত করে সেদেশের বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ও উন্নত বাজার লুট করা, যা একসময়ে হিটলারেরও স্বপ্ন ছিল। আবার, একইসঙ্গে পৃথিবীর বহু দেশে সেনা ঘাঁটি তৈরি করে ও সেখানে সৈন্য, যুদ্ধের সরঞ্জাম জড়ো করেও আমেরিকা তার সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখছে। সব মিলিয়ে এটা হল সাম্রাজ্যবাদের সামরিক মুখ।

তবে একথা মানতে হবে যে, সমসাময়িক দুনিয়ায় সামরিক আগ্রাসনের তুলনায়, বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির নিরন্তর অর্থনৈতিক ও অর্থনীতি বহির্ভূত হামলাই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রধান দিক। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সাম্রাজ্যবাদী হামলা জারি রয়েছে প্রধানত অর্থনৈতিক ফ্রন্টে। অর্থাৎ, এই পর্বে সামরিক হামলার স্ট্র্যাটেজি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের অপ্রধান দিক। যতই সোভিয়েতের পতন হোক না কেন, বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের শিকল এখনও অতটা সবল নয় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী উপনিবেশের যুগে সাম্রাজ্যবাদ ফিরে যেতে পারে। এমনকী আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির কারণে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এড়িয়েও তা সম্ভব হচ্ছে না।

এই দুটি বিষয় থেকে আমরা তৃতীয় একটা বিষয়ে পৌঁছতে পারি। সোভিয়েতের পতনের পর বিশ্ব কিছুদিনের জন্য একমেরু হয়ে উঠলেও, গত তিনদশকের প্রবণতা হলো ক্রমশ তা পরিণত হচ্ছে বহুমেরু বা বহুমেরু বিশ্বে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের জোটের বিরুদ্ধে বিগত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে নানান বহুমেরু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট ও মঞ্চ। যেগুলি আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির বিশ্বজোড়া অভিযানের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী পর্বে ঔপনিবেশিকতার যে অবসানের সূচনা হয়েছিল, বহুমেরু এই প্রতিরোধগুলি তারই ধারাবাহিকতা। বহুমেরু এই বিশ্বকে এড়িয়ে চলতে পারছে না আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি। বিশেষত সোভিয়েতের পতনের পরেও রাশিয়ার বাজারে অবাধ লুটপাট করতে না পারা, আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে চীনের উত্থান, কিউবা, ভিয়েতনাম, গণতান্ত্রিক কোরিয়ার দৃঢ় সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি বিরোধী শক্তির উত্থান– এসবই মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী জোটের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রতিরোধের প্রাচীর তুলেছে। ফলে বিশ্ব এখন হয়ে উঠেছে বহুমেরু।  মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ বনাম বহুমেরু বিশ্বের অসামরিক এই সংঘাতই বর্তমান বিশ্বে প্রধান ধারা। সামরিক সংঘাত অপ্রধান ধারা। সামগ্রিক এই পটভূমিতেই দেখতে হবে ব্রিকসের মঞ্চকে।

নয়া উদারবাদের তিন হাতিয়ার

সোভিয়েত-পরবর্তী বিশ্বে যে তিনটি হাতিয়ারকে ব্যবহার করে চীন, রাশিয়া সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে মার্কিনি তথা পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ, সেগুলি হল: ১) ডলার। ২) আর্থিক লেনদেনের আন্তর্জাতিক পরিকাঠামো। এবং ৩) আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো ঋণদানকারী সংস্থা।

আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত ডলারই স্বীকৃত মাধ্যম। এটা শুধু অর্থনৈতিক শক্তির জোরে নয়, সামরিক শক্তির জোরেও এই স্বীকৃতি চাপিয়ে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ভাল বিনিয়োগের রাস্তা হিসাবে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই মার্কিন সরকারের ঋণপত্র কেনে ডলারে। এটা লাভজনক বিনিয়োগ। ঋণপত্রের বিনিময়ে যে ডলার পাওয়া যায়, তার একটা বড় অংশই নগদে জমা থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান ফেডারাল রিজার্ভ ব্যাঙ্কে। ২০২০ সাল থেকে এই জমে থাকা ডলারকেই বিভিন্ন দেশকে বাগে আনার জন্য হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের পরামর্শ মতো চলতে যদি নারাজ হয় কোনও দেশ, সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সরকারি প্রশাসন ওই ডলার ফ্রিজ করে দিচ্ছে, যাতে নিজেদের সঞ্চিত সম্পদ ওই দেশ আর ব্যবহার করতে না পারে। প্রথমে এই ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হত ছোটখাটো দেশের বিরুদ্ধে। ক্রমশ তা ব্যবহার করা হল রাশিয়ার মতো শক্তিধর দেশের বিরুদ্ধেও। যেহেতু ইউক্রেন নিয়ে আমেরিকার খবরদারি রাশিয়া মানতে রাজি হয়নি, তাই ফেডারাল রিজার্ভ ব্যাঙ্কে জমা রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ নগদ ডলার ফ্রিজ করে দিয়েছে আমেরিকা-সহ পশ্চিমী শক্তিগুলি।

এর মানে দাঁড়াচ্ছে, আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে সব দেশ ফেডারাল রিজার্ভ ব্যাঙ্কে তাদের নগদ ডলার জমা রাখতে রাজি। এটা ভদ্রলোকের ও পারস্পরিক আস্থার ওপর দাঁড়ানো একটা চুক্তি। অথচ ইচ্ছে করলেই আমেরিকা সেই বোঝাপড়া ভেঙে নিজেদের মতো করে যে কোনও দেশের নগদে জমে থাকা ডলার ফ্রিজ করে দিচ্ছে। একদিন সকালে উঠে কোনও দেশ হয়ত দেখল, তাদের ডলার আর তাদের নেই। কিছু মার্কিন রাজনীতিকের ষড়যন্ত্রে তাদের নগদ ডলার ফ্রিজ হয়ে গেছে। তখন এই সঙ্কট মেটাতে আমেরিকারই দ্বারস্থ হতে হয় এবং আমেরিকা সহ পশ্চিমী শক্তগুলি নিজেদের শর্তগুলি চাপিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশটিকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করে।

সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে রাশিয়াকে শায়েস্তা করতে যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়ার জমা রাখা নগদ এবং আমেরিকায় কেনা রাশিয়ার সম্পদ মিলিয়ে মোট ৩০০ বিলিয়ন ডলার ফ্রিজ করে দিয়েছে আমেরিকা। এর ফলে এখন নিজেদের টাকা নিজেরাই খরচ করতে পারছে না রাশিয়া। উলটে এবার সেই টাকায় অস্ত্র কিনে ইউক্রেনকে পাঠাবে আমেরিকা। মানে, রাশিয়ার টাকায় কেনা অস্ত্র আছড়ে পড়বে রাশিয়ারই মাটিতে, ধ্বংস হবে রুশ সম্পত্তি, মৃত্যু হবে রুশ নাগরিকদের। একটি সূত্র অনুযায়ী, এপর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ দেশকে এভাবে শাস্তি দিয়েছে যার মধ্যে ৬০ শতাংশ দেশই কম আয়সম্প্ন্ন। ওয়াশিংটন এবং তার সহযোগী পশ্চিমী শক্তিগুলি এভাবে অন্যদের কয়েকশ কোটি ডলার বাজেয়াপ্ত করেছে। রাশিয়া ছাড়াও এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ভেনেজু্য়েলা, ইরান, সিরিয়া, লিবিয়া, আফগানিস্তান এবং উত্তর কোরিয়া। এভাবে ডলার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নিয়ম নিজেদের ইচ্ছেমতো না মানায়, শঙ্কিত বিশ্বের সব দেশই। যে চীনের সঙ্গে আমেরিকার সঙ্ঘাত বাড়ছে। তাদেরও বিপুল পরিমাণ নগদ ডলার জমা রয়েছে ফেডারাল রিজার্ভে। ভবিষ্যতে চীনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার মতো একই অস্ত্র যে ব্যবহার করবে না আমেরিকা, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। আন্তর্জাতিক পরিসরে এই পদ্ধতির নাম ওয়েপনাইজেসন অফ ডলার। আমেরিকা খুশিমতো চুক্তি ভেঙে ডলারকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করায় ডলারের ওপর অনাস্থা বেড়েছে। এর মানে যত বেশি ডলারকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে আমেরিকা, তত বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে ডলারকে। এর জেরে শুরু হয়ে গেছে ডলারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়া, যার নাম ডি-ডলারাইজেসন।

প্রতিপক্ষকে শাস্তি দেওয়ার দ্বিতীয় মার্কিন পদ্ধতিটি হল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেনর যে ব্যবস্থা সেই সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থা থেকে কোনও দেশকে বহিষ্কার করা। সুইফট হল Society for Worldwide Interbank Financial Telecommunication। ১৯৭৩ সালে বেলজিয়ামে তৈরি হওয়া এই সংস্থার সঙ্গে যুক্ত বিশ্বের ২০০টিরও বেশি দেশের ১১ হাজার ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এখানে রয়েছে ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং ব্যবস্থা। যার সাহায্যে দ্রুত এবং বিপুল পরিমাণে বাণিজ্যিক লেনদেন অনলাইনে করা যায়। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দৈনিক ৪০ মিলিয়ন বার্তা প্রদান মারফৎ কয়েক হাজার কোটি ডলারের লেনদেন হয়। এর মধ্যে রাশিয়ার লেনেদেনের অংশ দৈনিক আনুমানিক ১ শতাংশ। ইউরোপিয়ান কমিশন রাশিয়া ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পরেই ২০২২ সালের মে মাসে সাতটি বহৎ রুশ ব্যাঙ্ককে Swift থেকে বের করে দেয়। পরে আরও ব্যাঙ্ককে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক পেমেন্টের যে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা তা থেকে রাশিয়াকে বঞ্চিত করেছে ইউরোপিয় কমিশন।

এভাবে সঞ্চিত ডলার ফ্রিজ করে এবং পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের তৈরি করা সুইফট থেকে বের করে দিয়ে রাশিয়ার ওপর যৌথ চাপ তৈরি করেছে আমেরিকা ও পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ। বোঝাই যায়, অর্থনৈতিকভাবে রাশিয়াকে ভাতে মারাই এই দুই সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের লক্ষ্য। আগেই বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক কালের রাশিয়াই নয়, সেই ২০০০ সাল থেকেই ছোট-বড় বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে এই দুই হাতিয়ারকে ব্যবহার করে আসছে মার্কিন ও তার দোসর পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ। আন্তর্জাতিক চুক্তি একতরফা ভাবে ভাঙার কারণে আশঙ্কিত বিশ্বের সব দেশই। এখানেই ডলারের আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এবং ডলার রাজত্বের বাইরে বিকল্প কোনও মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় কিনা বিশ্বজুড়ে তার প্রয়াস শুরু হয়েছে।

মার্কিন-সহ পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের তৃতীয় হাতিয়ারটি হল আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এখন সবাই জানে, এই সংস্থাগুলি পশ্চিমী শক্তিগুলির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন দেশে এরা সহজ কিস্তিতে ঋণ দেয়। তবে সঙ্গে চাপায় কঠোর শর্ত। সরকারি ক্ষেত্রকে ব্যাপক হারে বেসরকারিকরণ করা, দেশের সম্পদ ও কৃষিক্ষেত্র যাতে বিদেশি শক্তি লুট করতে পারে সেই লক্ষ্যে অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করা, বাজেটে জনকল্যাণখাতে বরাদ্দ কমানো এবং সেজন্য রাজকোষ ঘাটতিকে নির্দিষ্ট সীমায় বেঁধে রাখা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিবহণ ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ, মজুরি হ্রাস– এই ধরনের যাবতীয় শর্ত ব্যয়সঙ্কোচের নামে ঋণদানের সময় চাপিয়ে দেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠান। এদের ঋণফাঁদে পড়ে গ্রিস সহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলি, দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার মতো দেশ, কিংবা আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশের কী দুর্বিষহ পরিণতি হয়েছে তা আমরা দেখছি। অথচ এই সব সংস্থার ম্যানেজমেন্ট বোর্ড দখল করে রেখেছে পশ্চিমী দুনিয়ার উন্নত দেশগুলি। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা বোঝা যাবে। আইএমএফে রয়েছে ৩৫টি অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ। তাদের প্রতিনিধত্ব করেন ১২ জন ডিরেক্টর। অন্যদিকে বাকি ১৫৫টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন মাত্র ১২ জন ডিরেক্টর। বিশ্বের মোট জিডিপ-তে উচ্চ আয়ের দেশগুলির অনুপাত ৪৪ শতাংশ। অথচ আইএমএফে উচ্চ আয়ের দেশগুলির ডিরেক্টরদের ভোট রয়েছে ৬৬ শতাংশ। এ থেকেই বোঝা যায় আইএমএফ আসলে কারা নিয়ন্ত্রণ করে এবং কাদের হয়ে শর্ত চাপায়।

ওপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, অস্ত্র হিসাবে ডলার, সুইফট ব্যবস্থা এবং আইএমএফ-বিশ্বব্যাঙ্কের মতো ঋণদানকারী সংস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন সহ পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদ তৈরি করেছে এক চক্রবূহ্য। এই বূহ্যে কোনও দেশ গিয়ে পড়লে তার নিস্তার নেই। কোনও না কোনও সময় আর্থিক দৈন্যের কারণে সেই দেশকে পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের কাছে হাঁটু গেড়ে বসতে হবে। এটাই নয়া উদারবাদী অর্থনীতি। আজকের দিনে এটাই সাম্রাজ্যবাদের নির্দিষ্ট চেহারা যা সামনে আসে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি হিসাবে।

মনে রাখতে হবে, এটা সাম্রাজ্যবাদের প্রসারিত অর্থনৈতিক ফাঁদ। সরাসরি সৈন্য পাঠিয়ে পদানত না করেও, ওপরের তিন হাতিয়ার প্রয়োগ করে বিভিন্ন দেশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে বাগে আনা যায়।

সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায় বহুমেরু বিশ্ব

সুতরাং, সাম্রাজ্যবাদের রচনা করা চক্রবূহ্য থেকে যদি বেরোতে হয়, তাহলে দরকার–  আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মুদ্রা ডলারের বিকল্প তৈরি করা। সুইফট থেকে বেরিয়ে পালটা লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এবং এমন ঋণদান সংস্থা তৈরি করা– যারা ঋণ দেওয়ার সময় আইএমএফ-বিশ্বব্যাঙ্কের মতো জনবিরোধী শর্ত চাপিয়ে দেবে না। বরং, সহজ শর্তে ঋণ দেবে। যাতে দক্ষিণ গোলার্ধের গরিব দেশগুলিতে উন্নয়নে গতি আনা যায়। অবশ্যই এই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হতে হবে মানব সম্পদ উন্নয়ন।

অর্থাৎ, সাম্রাজ্যবাদের তিন হাতিয়ারকে ভোঁতা করে দিতে হলে বিশ্বজুড়ে বিকল্প গড়ার পথে এগোতে হবে। এমন বিকল্প গড়তে পারে সাম্রাজ্যবাদের জোয়াল থেকে বেরিয়ে আসা শক্তিগুলিই। ইতিমধ্যে চীন, রাশিয়া-সহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশ গড়ে তুলেছে এই ধরনের নানান প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে উল্লোখযোগ্য হল ব্রিকস, শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেনের মতো সংগঠন। একইভাবে লাতিন আমেরিকায় মার্কিন বিরোধী শক্তিগুলিকে নিয়ে গড়ে উঠেছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। এই মঞ্চগুলিই হয়ে উঠছে এক একটি বহুমেরু প্রতিষ্ঠান, যারা বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী বিকল্প দিশা দেখাতে চাইছে। যেহেতু বহুমেরু এই সংগঠনগুলির পিছনে রয়েছে বহু দেশ, তাই এগুলি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বহুমেরু বিশ্বেরই প্রতিফলন।

এইভাবেই এখনকার বিশ্ব হয়ে উঠছে বহুমেরু বিশ্ব। যা মার্কিন-সহ পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে কমবেশি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ফলে সোভিয়েতের পতনের পর বিশ্ব একতরফা একমেরু হয়ে উঠবে বলে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার ছায়া এখন সরছে। বদলে ক্রমশ স্পষ্ট চেহারা নিচ্ছে এক বহুমেরু বিশ্ব। যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমী পুঁজিবাদকে সমঝে চলতে হচ্ছে। কারণ বহুমেরু বিশ্বডলার, সুইফট ও আইএমএফ-বিশ্বব্যাঙ্কের আধিপত্যকেই চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছে। এগুলির বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে। এবং সেখানে শামিল হচ্ছে বহু দেশ। কোনও সন্দেহ নেই এইসব বহুমেরু মঞ্চের প্রথম সারিতে রয়েছে ব্রিকস

ব্রিকস কীভাবে সাম্রাজ্যবাদকে দুর্বল করার বিকল্প মঞ্চ গড়ে তুলতে চাইছে, সেই প্রক্রিয়া অনুধাবন করাটাও খুবই চিত্তাকর্ষক।

আরও পড়ুন: ভারত, চীন চুক্তির প্রেক্ষিত 
৭ অক্টোবর, একবছর পর পশ্চিম এশিয়া


প্রকাশের তারিখ: ৩১-অক্টোবর-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫১ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬