সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ডিলিমিটেশনকে বাদ দিতে হবে মহিলা সংরক্ষণ থেকে
বৃন্দা কারাত
মোদীর সংবিধান সংশোধনী বিল পরাস্ত সংসদে। আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণে সায় দেয়নি লোকসভা। সরকার ব্যর্থ হয়েছে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন পেতে। দু’দিনের বিতর্কপর্ব শেষে শুক্রবার বিকেলে বিলটি নিয়ে হয় ভোটাভুটি। পক্ষে পড়ে ২৯৮ ভোট। বিপক্ষে ২৩০। ভোটাভুটিতে অংশ নেন ৫২৮ জন। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিল পাশের জন্য প্রয়োজন ছিল দুই-তৃতীয়াংশের গরিষ্ঠতা। বৃন্দা কারাতের এই নিবন্ধটি দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিতর্ক শুরুর দিনে।

সংসদ ও বিধানসভার তিনভাগের একভাগ আসন মহিলাদের জন্যে সংরক্ষণের লক্ষ্যে দু’টি সুদূরপ্রসারী বিল নিয়ে সংসদ আলোচনা করতে চলছে। এই দু’টির একটি হল সংবিধানের সংশোধনী (১৩১তম সংশোধনী) বিল। যার উদ্দেশ্য লোকসভার আসনকে বাড়িয়ে ৮৫০ করে এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা। এবং এটি করা হবে ‘এই বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে আসন পুনর্বিন্যাসের পর’। আসন পুনর্বিন্যাস বিল, ২০২৬, এই বিলের বিজ্ঞপ্তির সময়ে প্রাপ্ত ‘সর্বশেষ জনগণনার পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে’, অর্থাৎ ২০১১-র জনগণনার ভিত্তিতে থাকা আসনগুলির সীমা পুনর্নিধারণের লক্ষ্য সামনে রেখে একটি পুনর্বিন্যাস আয়োগ বা ডিলিমিটেশন কমিশন গঠন করবে। সরকার চাইছে বিরোধী দলগুলি নিজেদেরকে সরকারের রাবার স্টাম্পে পরিণত হয়ে এই চরম ত্রুটিপূর্ণ বিলকে সম্মতি জানাবে। নতুবা নিজেরাই নিজেদের ওপর মহিলা-বিরোধীর অপবাদ চাপাবে।
অনাবশ্যক সংযুক্তি
মহিলা সংরক্ষণ বাস্তবায়নের ব্যর্থতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে সরকার তড়িঘড়ি সংসদের তথাকথিত বিশেষ অধিবেশন ডেকে মহিলা শক্তি বন্দন অধিনিয়ম (এনএসভিএ) পাশ করিয়েছিল। বিলটি এ বিষয়ে ২০১০-এ রাজ্যসভায় পাশ হওয়া বিল থেকে তাৎপর্যপূর্ণভাবেই আলাদা ছিল। সাধারণ নিয়ম মেনে ২০১০ সালে একাধিক সংসদীয় ঝাড়াই বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে তৈরি হওয়া ওই বিলটিই যদি সরকার পেশ করত, তবে তার বাস্তবায়ন ২০২৪-এর নির্বাচনেই হয়ে যেতে পারত। পরিবর্তে, এনএসভিএ-এর মাধ্যমে মোদী সরকার মহিলা সংরক্ষণের বিষয়টিকে জুড়ে দিল প্রস্তাবিত জনগণনা ও আসন পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে। নতুন এই বিলটি নিয়ে সংসদে বিতর্কে যোগ দিয়ে বিরোধী সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এই অনাবশ্যক সংযুক্তির কারণে শুধু যে ২০২৪ সালের লোকসভা এবং পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য মহিলা সংরক্ষণের বিষয়টিই বাতিল হয়ে যাবে তাই নয়, সঙ্গে একাধিক বিষয়কে জুড়ে দেওয়ার ফলে এর ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নও স্থবির হয়ে যাবে। সরকার তার জবাবে তখন দাবি করেছিল, বিরোধীদের আশঙ্কা সম্পূর্ণ অমূলক। কারণ ২০২৪-এর নির্বাচন শেষ হলেই পুনর্বিন্যাস কমিশন গঠন হবে। এবং জনগণনার কাজও যথাসময়েই শেষ হবে। যথারীতি এর একটিও ঘটেনি।
আদতে যা দাঁড়ালো, সেটি হল, ২০২৪-এর নির্বাচনের পর লোকসভায় মহিলা সদস্যের সংখ্যা ৭৮ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪-এ। অর্থাৎ মোট সদস্যের মাত্র ১৩.৬ শতাংশ। এছাড়াও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ১০টি রাজ্যের মোট ১,২৭৬টি আসনের জন্যে যে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে মহিলা নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ১২৩ জন! অর্থাৎ, মোট আসনের ১০ শতাংশেরও কম। যে অনাবশ্যক সংযুক্তি সরকার করেছে এটিই তার অবধারিত পরিণতি।
১৩১-তম সংশোধনী এনএসভিএ-এর এই ত্রুটিপূর্ণ সংযুক্তিকেই শুধু বহাল রাখেনি, এটি বর্ধিত আসনের সঙ্গে তৃতীয় একটি সংযোগ যুক্ত করেছে। এভাবেই মহিলা সংরক্ষণের নাম করে সরকার একসঙ্গে তিনটি লক্ষ্যপূরণকে নিশানা করেছে। এক, আসন পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে বর্তমান জনসংখ্যার নিরিখকে তামাদি হয়ে যাওয়া ২০১১-র জনগণনাকে ভিত্তি হিসেবে মান্যতা দেওয়া। দুই, ২০১১-র জনগণনাকে ভিত্তি হিসেবে মেনে নিয়ে জাতপাত-গণনার চাপ থেকে মুক্ত থাকা। পরিশেষে, মহিলা সংরক্ষণ বাস্তবায়নকে ক্ষমতাসীন শাসকের স্বার্থপূরণের লক্ষ্যে পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আইনসভার আসনগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। এর অর্থ মহিলা সংরক্ষণকে আরও একবার অন্য লক্ষ্যপূরণের হাতে পণবন্দি করা দেওয়া।
জনগণনার পরিসংখ্যানের গুরুত্ব
এ যাবৎ হওয়া ভারতে আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাসের চারটি কর্মকাণ্ড হয়েছে সর্বশেষ জনগণনার পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে। তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত আসন নির্ধারণ হয়েছে দেশের মোট জনসংখ্যায় তফসিলি জাতি/ তফসিলি উপজাতির অনুপাতে। ১৯৭১-এর জনগণনা অনুযায়ী তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের জন্য মোট সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭৯ ও ৪১। আরও ১১টি আসন বেড়েছিল ২০০১-এর সালের জনগণনার পর। এবং পরবর্তী পুনর্বিন্যাসের পর তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের আসন সংখ্যা হয় যথাক্রমে ৮৪ ও ৪৭। জনসংখ্যায় তাদের মিলিত অংশ দাঁড়ায় ২৪.৪ শতাংশ। ২০০১ থেকে ২০২৬ নিশ্চিতভাবেই জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটেছে আরও বেশি হারে। দ্রুত মহিলা সংরক্ষণের তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের সাম্প্রতিকতম জনসংখ্যাকে উপেক্ষা করে আসন পুনর্বিন্যাস করা নিশ্চিতভাবেই অবদমিত জনগোষ্ঠীর উপর একটি মনুবাদী অবিচার। যার দ্বারা আসলে সংরক্ষিত আসনের ন্যায়সঙ্গত বৃদ্ধি-ই অস্বীকৃত হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এই জনগোষ্ঠীগুলির মহিলাদের ওপর। যেহেতু তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের সংরক্ষিত আসনের এক তৃতীয়াংশও তখন ন্যায়সঙ্গত ভাগের চেয়ে কম হবে।
পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া একটি অত্যন্ত রাজনৈতিক ও স্পর্শকাতর বিষয়। সর্বশেষ জাতীয় পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া শেষ করতে ২০০২-’০৮, প্রায় ছ’বছর সময় লেগেছিল। এর বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০০৯ সালে। এরপর নির্বাচন কমিশনের সরাসরি তত্ত্বাবধানে রাজ্যভিত্তিক দু’টি পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে আসাম ও জম্মু ও কাশ্মীরে। অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক ও সংকীর্ণতার দোষে দুষ্ট এই দু’টি প্রক্রিয়ারই তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। যেখানে ২০০২ সালের পুনর্বিন্যাস আইনের নির্দেশিকাকে লঙ্ঘন করে আসনসমূহের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। সহজ কথায় বললে, দু’টি রাজ্যেই কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থপূরণ করা হয়েছিল— নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভোটের প্রভাবকে সীমিত করার জন্য আসনগুলিকে হেরফের করে। ফলে এটা সহজেই বোধগম্য যে আসন্ন পুনর্বিন্যাসও একইরকম বিতর্কিত হবে। কেন মহিলা সংরক্ষণকে পুনর্বিন্যাসের সঙ্গে যুক্ত করা হবে? বর্তমান অনুপাত যদি অপরিবর্তিত রেখেই বিভিন্ন রাজ্যে সরকারের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়, সেক্ষেত্রেও যে রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম, সেখানে সেই রাজ্যগুলির স্বার্থহানির প্রশ্ন থেকেই যাবে। এই সমস্ত বিষয়গুলি নিয়ে আরও আলাপ-আলোচনা প্রয়োজন। একে চাপিয়ে দিলে চলবে না।
মহিলা সংরক্ষণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা
মহিলা সংরক্ষণ একটি স্বতন্ত্র বিষয়— যার জন্য প্রয়োজন একটি স্বতন্ত্র আইন। ২০১০-এ বিজেপির সমর্থন-সহ রাজ্যসভায় পাশ হওয়া বিলের সঙ্গে অন্য কোনও বিষয়কে জোড়া হয়নি। আমার বেশ মনে পড়ে, সেই ঐতিহাসিক বিলটি গৃহীত হওয়ার জন্য লোকসভার তৎকালীন বিরোধী নেত্রী সুষমা স্বরাজ রাজ্যসভায় ছুটে এসে আমাদেরকে অভিনন্দিত করেছিলেন। যদিও তিনি বিলক্ষণ জানতেন তাঁর দল এর জন্য কোনও কৃতিত্বই দাবি করতে পারে না। আজকের বিজেপিতে এমন কোনও মহিলা নেত্রী নেই, যিনি মহিলা সংরক্ষণের প্রশ্নে দ্বিতীয়বারের এই বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে সাহসের সঙ্গে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবেন। একটি কারণেই সরকার এই সংযুক্তি চাইছে, তা হল মহিলা সংরক্ষণের নামে তড়িঘড়ি করে আসন পুনর্বিন্যাস সেরে নেওয়া। এই প্রক্রিয়ার বিলম্বের সব দায় তাহলে সহজেই চাপিয়ে দেওয়া যাবে তাদের ঘাড়ে, যারা পুনর্বিন্যাস কমিশনের প্রস্তাবিত আসনসমূহের সীমানা নির্ধারণের বিরেধিতা করবে। আর এটাই হল এই বিলের মর্মকথা।
মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে চলা এই কারসাজির বিরোধিতার এটাই প্রকৃত সময়। দশকের পর দশক ধরে লক্ষ লক্ষ মহিলা সংরক্ষণের জন্যে লড়াই করেছেন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার স্বার্থে। সেই লড়াইয়ের লক্ষ্য কখনোই ছিল না তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতিদের অধিকারকে অস্বীকৃতি, বা গণতান্ত্রিক ধারাকে ক্ষুণ্ণ করা। যাঁরা মহিলা সংরক্ষণের স্বপক্ষে রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের উচিত এই বিলটির বিরোধিতা করা।
এর সমাধান নিহিত রয়েছে— আসন পুনর্বিন্যাস বা জনগণনাকে যুক্ত না করে ২০১০ সালের বিলে ফিরে যাওয়া। ২০২৩-এ পাশ হওয়া ১০৬-তম সংবিধান সংশোধনীতে একটি সাধারণ সংশোধনীই যথেষ্ট। ৩৩৪-ক ধারায় বাদ দিতে হবে। মহিলাদের জন্যে এক তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ বলবৎ হবে, ‘সংবিধানের (১২৮তম) সংশোধনী আইন, ২০২৩ গৃহীত হওয়ার পর সংগঠিত প্রথম জনগণনায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্বিন্যাসের পর’— এই পংক্তিটি। এর মাধ্যমেই ওই বিতর্কিত সংযুক্তি ছিন্ন হবে।
সংসদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি ও আসন পুনর্বিন্যাস সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দু’টি বিষয়— যা নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা প্রয়োজন। সংসদে সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি যখনই আলোচনায় উঠবে, তখন মহিলা সংরক্ষণের কাঠামোটিও স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হবে। সরকারের প্রতি আমাদের বার্তা সুস্পষ্ট: অবিলম্বে এই কারসাজি বন্ধ করো। কোনও ধরনের সংযুক্তি ছাড়া মহিলার জন্যে এক তৃতীয়াংশ সংরক্ষণ বলবৎ কর।
ভাষান্তর: শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ১৮-এপ্রিল-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
