সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
তীব্র বিদ্বেষে ভরা বাজেট
প্রভাত পট্টনায়েক
বরাদ্দ ছাঁটাই করে সামাজিক ক্ষেত্রকে আরও নিষ্পেষিত করা, খাদ্যে ভরতুকি কমানো, এমজিএনআরইজিএস এবং এ ধরনের অন্যান্য খাতে বরাদ্দ কমানো, বেতনভোগী হোয়াইট কালার অংশকে কর ছাড় দেওয়া , এসবের মানে হল এই সব সরকারি প্রকল্পের কিছুটা সুবিধা ভোগ করেন এমন বিপুল সংখ্যক গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের হাত থেকে ক্রয়ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া এবং সেই ক্রয়ক্ষমতা মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের হাতে তুলে দেওয়া। এটাই হল এনডিএ সরকারের ‘স্ট্র্যাটেজি’। এই স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য হল শ্রমজাবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে একটা বিভাজন রেখা তৈরি করা, যাতে করে কর্পোরেট-হিন্দুত্ব জোট আরও কিছুটা বেশি সমর্থন আদায় করতে পারে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের ভারতে এর আগে আর কোনও বাজেটে ভারতের বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে একেবারে খোলাখুলি এত বেশি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব দেখা যায়নি, যা গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে পেশ করা বাজেটে দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্ডিতেরা এবিষয়ে একমত যে, বাজেটের স্ট্র্যাটেজি হবে কর কমানোর মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভোগব্যয়ে উৎসাহ দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা। এই ধরনের স্ট্র্যাটেজি সত্যিসত্যিই একমাত্র কাজে দিতে পারে যদি কর কমানোর মাধ্যমে মধ্যবিত্তের ভোগব্যয় বাড়াতে গিয়ে, করহ্রাসের দরুন সরকারের কমে যাওয়া আয়কে সামাল দিতে অর্থনীতির অন্য কোনও ক্ষেত্রে খরচ ছাঁটাই করা না হয়। কেবলমাত্র তেমনটা হলেই মধ্যবিত্তের ভোগব্যয় বৃদ্ধি মোট (এগ্রিগেট) চাহিদার স্তরটিকেই বাড়িয়ে তুলবে এবং তার ফলে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। কিন্তু বাজেটে দেখা যাচ্ছে, এভাবে কর কমাতে গিয়ে যে সম্পদ হাতছাড়া হল, তা পূরণ করার জন্য সরকারি খরচ ছাঁটাই করা হচ্ছে: এতে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের (সংশোধিত বরাদ্দ) এর চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মোট ব্যয় চলতি দামে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাত্র ৭.৪ শতাংশ। এর মানে প্রকৃত অর্থে খরচ প্রায় বাড়ছেই না। বরং, দেশের জিডিপিতে মোট ব্যয়ের শতাংশ আসলে কমছে।
সরকারি ব্যয় যে কমছে তার বেশিরভাগটাই ঘটছে যেসব ক্ষেত্রে তার মধ্যে রয়েছে খাদ্যে ভরতুকির খাত (এই খাতে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের সংশোধিত বরাদ্দের চেয়ে এবার ব্যয় বরাদ্দ নামেমাত্র বৃদ্ধি হয়েছে ৩ শতাংশ, কিন্তু যদি ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের প্রকৃত খরচের হিসাব ধরা হয় তাহলে এবছর খাদ্যে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ চূড়ান্ত অর্থে কমেছে)। একইভাবে এমজিএনআরইজিএস খাতেও এবার ব্যয় বরাদ্দ কমেছে ( যদি ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের সংশোধিত বরাদ্দের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে এই খাতে ব্যয়বরাদ্দ পুরোপুরি থিতু হয়ে রয়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকায়। কিন্তু যদি ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের প্রকৃত খরচ ৮৯,১৫৪ কোটি টাকার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে দেখা যাচ্ছে এবারে এই খাতে সরকারি ব্যয় বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়েছে)। এবছরের জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত এমজিএনআরইজিএস খাতে মোট বকেয়া মজুরির পরিমাণ হল ৬৯৫০ কোটি টাকা। এই বকেয়ার হিসাব ধরলে এবছর বাজেটে এই খাতে আরও অনেক কম টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
বস্তুত, যদি সামগ্রিকভাবে সামাজিক ক্ষেত্রকে ধরা যায়, তাহলে এই ক্ষেত্রের সব খাতে বরাদ্দ কমেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে, আশা করা হচ্ছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের (সংশোধিত বরাদ্দের) তুলনায় ব্যয় বরাদ্দ বাড়বে চলতি দামের হিসাবে ৯.৫ শতাংশ। আসলে এর মানে দাঁড়াচ্ছে জিডিপির শতাংশের বিচারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের জন্য বরাদ্দ কমছে। স্কুলশিক্ষা খাতে বাজেটে ব্যয়বরাদ্দ বেড়েছে নামে মাত্র — গত অর্থবর্ষের (বাজেট বরাদ্দ) ৭৩,০০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে আগামী অর্থবর্ষে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এরও মানে জিডিপির শতাংশের বিচারে স্কুল শিক্ষা খাতেও এবছর বরাদ্দ কমেছে। ঠিক একই কথা বলা যায় আরও একগুচ্ছ অন্যান্য স্কিম সম্পর্কে। এগুলির মধ্যে পড়ে সক্ষম অঙ্গনওয়াড়ি ও পোষণ-২ (গত অর্থবর্ষের বাজেট বরাদ্দের তুলনায় চলতি দামে বৃদ্ধি মাত্র ৩.৬ শতাংশ) এবং পিএম-পোষণ প্রকল্প (গত অর্থবর্ষের বাজেট বরাদ্দের তুলনায় চলতি দামেও এবার চূড়ান্ত স্থবিরতা (stagnation) লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বরাদ্দ ছাঁটাই করে সামাজিক ক্ষেত্রকে আরও নিষ্পেষিত করা, খাদ্যে ভরতুকি কমানো, এমজিএনআরইজিএস এবং এ ধরনের অন্যান্য খাতে বরাদ্দ কমানো, বেতনভোগী হোয়াইট কালার অংশকে কর ছাড় দেওয়া, এসবের মানে হল এই সব সরকারি প্রকল্পের কিছুটা সুবিধা ভোগ করেন এমন বিপুল সংখ্যক গরিব ও শ্রমজীবী মানুষের হাত থেকে ক্রয়ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া এবং সেই ক্রয়ক্ষমতা মধ্যবিত্ত শ্রেণির একাংশের হাতে তুলে দেওয়া। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেট সামগ্রিক ভাবে অর্থনীতিতে কোনও উদ্দীপনা বা প্রণোদনা (stimulus) তো যোগ করেইনি, বরং আরও অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে (ইন্টার অ্যালিয়া) শ্রমিক শ্রেণির বিনিময়ে হোয়াইট কালার বেতনভোগীদের সুবিধা ও ছাড়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ধনীদের কেশাগ্রও স্পর্শ না করে, এবারের বাজেট ক্রয়ক্ষমতার পুর্নবণ্টন করেছে এবং তা গরিব শ্রমজীবী মানুষের হাত থেকে চলে গিয়েছে হোয়াইট কালার বেতনভোগী শ্রেণির হাতে। এবং বিশ্বায়িত ফিনান্সকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণ কমবেশি একই রেখে দেওয়া হয়েছে। এখানে একথা বলা হচ্ছে না যে, অর্থনীতিতে যে হারে মুদ্রাস্ফীতির বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে রকেটের গতিতে, সেখানে হোয়াইট কলার বেতনভোগী শ্রেণিকে কোনওরকম ফিসক্যাল সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আসল কথা হল, এই ধরনের সহায়তা অবশ্যই যেন গরিব, মেহনতী জনতার স্বার্থকে ক্ষুন্ন করে দেওয়া না হয়। অথচ ২০২৫-২৬এর বাজেটে ঠিক সেই স্ট্র্যাটেজিই গ্রহণ করা হয়েছে।
এই স্ট্র্যাটেজি বা নীতি, যা অর্থনীতির শ্লথগতিকে অতিক্রম করতে পারে না, তার তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সেকারণেই এনডিএ সরকারের কাছে এই স্ট্র্যাটেজি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। প্রথমত, গরিব শ্রমজীবীদের অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষণ করলে বহু ধরনের পণ্যের চাহিদা কমে যায় যা মূলত ক্ষুদ্র উৎপাদন ক্ষেত্রে তৈরি করা হয়। অন্যদিকে, এর বিনিময়ে ক্রয়ক্ষমতা হোয়াইট কালার বেতনভোগী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে চলে গেলে, এমন সব পণ্যের চাহিদা বাড়বে যেগুলির উৎপাদন হয় সংগঠিত ক্ষেত্রে, এবং মূলত এগুলি উৎপাদন করে একচেটিয়া পুঁজি। অতএব এই স্ট্র্যাটেজি একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থকেই সেবা করে এবং এর ফলে মার্কস যাকে বলেছিলেন ‘পুঁজির কেন্দ্রীভবন’ সেই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় ছোট পুঁজিকে গ্রাস করে ক্রমশ বেড়ে ওঠে বৃহৎ পুঁজি। যেহেতু বর্তমানে ভারতের রাজনৈতিক শাসকদের (Indian polity) বৈশিষ্ট্য হল কর্পোরেট-হিন্দুত্ব জোটের একাধিপত্য, তাই এখানে এনডিএ সরকারই এই বাজেটের মধ্যে দিয়ে তাদের সমর্থনের স্তম্ভ কর্পোরেট স্বার্থের সেবা করছে।
দ্বিতীয়ত, চাহিদা হ্রাস পাওয়ার দরুন অসংগঠিত ক্ষেত্রে উৎপাদনও হ্রাস পায়। কিন্তু আমাদের সরকারি সংখ্যাতত্ত্বে এই হ্রাস সংক্রান্ত বিষয়ের সঠিক হিসাব রাখা হয় না। এমনকী খুব তড়িঘড়ি উপায়ে এবং প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে জিডিপি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য স্বল্পকালীন বিচারে অসংগঠিত ক্ষেত্রের হিসাব আদৌ বিবেচনাই করা হয় না। এখানে সামগ্রিক অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে শুধুমাত্র কর্পোরেট সেক্টর থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায় সেগুলির হিসাবনিকাশ করার জন্য সংখ্যাতাত্ত্বিক চর্চাকে কাজে লাগানো হয়। ফলে এই স্ট্র্যাটেজি শুধুমাত্র অর্থনীতির পক্ষে যা ভাল সংখ্যাগুলিই দেখাবে। যদি আমরা আমাদের সংখ্যাতাত্ত্বিক পদ্ধতির মারপ্যাঁচগুলি কাজে লাগিয়ে শুধুমাত্র কর্পোরেট ক্ষেত্রের ভাল ফলাফল দেখাই, তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতির ফলাফলও ভাল দেখাবে, এবং তাতে সরকার কর্পোরেটের পৃষ্ঠপোষকদের খুশি রাখতে পারবে এবং অর্থনীতির হাল ফেরাতে পেরেছি বলে লাফাতে পারবে। যে সরকারের কাছে নিজের ভাবমূর্তিটাই শেষ কথা, তাদের কাছে সবার ওপরে এটাই তো সবকিছু।
তৃতীয়ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কর ছাড় দেওয়ার বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট এবং প্রতিভাত। এক্ষেত্রে ছাড়ের অন্য দিকটা, অর্থাৎ যারা এই ছাড়ের পরিণামে অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত হয়, তাদের বিষয়টি ঝাপসাই রয়ে যায়। সরকার তাই মনে করে যারা এই করছাড়ের সুবিধা ভোগ করবে সরকার তাদের ঢালাও সমর্থন পাবে। আবার শ্রমজীবি জনতাও সরকারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে না। কারণ সমাজের এই অংশের দুর্দশার মূল কারণ এতগুলি যে স্রেফ ফিসক্যাল স্ট্র্যাটেজির ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে দিয়ে রেহাই পেয়ে যাওয়া যাবে। এর ওপর যদি ফিসক্যাল স্ট্র্যাটেজির কারণে গরিব, শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এনডিএর প্রতি সমর্থন কমে, তাহলে হাতের কাছে হিন্দুত্বের ইস্যু তো রয়েইছে।
একথা কেউ ভাবতেই পারেন যে, ২০২৫-২৬ এর বাজেটের আড়ালে একটা ‘স্ট্র্যাটেজি’ আছে ধরে নিয়ে আমরা সরকারের কৌশল সম্পর্কে খুব বেশি আগাম ভাবনাচিন্তা করছি। কিন্তু এনডিএ সরকার যেভাবে বারম্বার মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নির্লজ্জভাবে তোষামোদ করে চলেছে সেটাও নজর কাড়ার মতো। প্রতিটি বাজেট অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতির ভাষণে প্রথাগতভাবে একাধিক সমসাময়িক বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়। তবে এবারের বাজেট অধিবেশনের শুরুতে রাষ্ট্রপতি মুর্মুর ভাষণে মধ্যবিত্ত শ্রেণির গৌরব গাথা গাওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট ভাষণে বার বার মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনে তাদের সম্ভাব্য ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। এসব থেকেই বোঝা যায় যে, এবারের বাজেট সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি কোনও পাঁচমিশেলি নীতির আকস্মিক দুর্ঘটনাজনিত ফলাফল নয়। বরং এ হল একটা ‘স্ট্র্যাটেজি’র অংশ। এই স্ট্র্যাটেজির লক্ষ্য হল শ্রমজাবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে একটা বিভাজন রেখা তৈরি করা, যাতে করে কর্পোরেট-হিন্দুত্ব জোট আরও কিছুটা বেশি সমর্থন আদায় করতে পারে। একই সঙ্গে এই ‘স্ট্র্যাটেজি’ আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজিকেও খুশি রাখতে চায় এবং তা করা হচ্ছে নিও লিবারাল কাঠামোকে কপিবুক হিসাবে মেনে চলে। এক্ষেত্রের ধনীদের ওপর কোনও কর বসানো হয়নি কিংবা জিডিপির শতাংশ হিসাবে রাজকোষ ঘাটতির অনুপাতও বাড়ানো হয়নি।
আর ঠিক এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় সরকারের বিদ্বেষমূলক চরিত্র। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে থেকে আরও বেশি সমর্থন পাওয়ার আশায় কেন্দ্রীয় সরকার গরিব শ্রমজীবী জনতার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে সাগ্রহে প্রস্তুত। নিজেদের পারফরমেন্স খারাপ হলেও জোর করে ব্যর্থতাকে সাফল্য হিসেবে সত্যি প্রমাণ করার জন্য সরকার গরিব, শ্রমজীবীদের স্বার্থে আঘাত দিতেও পিছপা নয়। পুঁজিবাদী সমাজে রুটিনমাফিক এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা একেবারে নতুন। ভারতে শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তিগুলি সর্বদাই দাবি করে যে, তারা যা করছে সবটাই গরিব শ্রমজীবী জনতার মঙ্গলের জন্য। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে এমন একটা সরকার ক্ষমতায় রয়েছে যারা খোলাখুলি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে গুরুত্ব দিতে চাইছে এবং তা করতে গিয়ে গরিব শ্রমজীবীদের শাস্তি দিচ্ছে।
এই ‘স্ট্র্যাটেজিক উদ্ভাবন’ ছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বাজেট এতদিনের চেনা পথেই হেঁটেছে। এবং এই বাজেট হল নয়া উদারবাদী বাজেট। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ মেনে চাষিদের জন্য ফসলের উপযুক্ত মূল্য ঘোষণার দাবি অগ্রাহ্য করা হয়েছে এই বাজেটে। বিদেশি কোম্পানিগুলির জন্য আরও বেশি লাল কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বিমা ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বিদেশি মালিকানার পথ উম্নুক্ত করে দিয়ে। দেশীয় একচেটিয়া পুঁজির কাছে তাদের ‘স্বাভাবিক প্রাণবন্ত ভাব’ (অ্যানিম্যাল স্পিরিট) দেখানোর জন্য বিনম্র উপদেশ শোনানো হয়েছে। এবং তাদের বলা হয়েছে তারা যেন আরও বৃহৎ আকারে উৎপাদনমূলক বিনিয়োগ করে। (যদিও অর্থনৈতিক সমীক্ষা স্পষ্ট দেখিয়ে দিয়েছে যে, ভোগ্যপণ্যের চাহিদার অভাবে বিনিয়োগের যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে তার মূলে রয়েছে আয়বণ্টনে ক্রমাগত বেড়ে চলা অসাম্য। এই অসাম্যের মূলে আবার রয়েছে এই ঘটনা যে, মজুরি আর বাড়ছে না (stagnation of wages) এবং মুনাফার অংশ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে চলেছে)।
সরকার হয়ত আশা করেছিল যে, এভাবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের খোশামোদ করলে ও তাদের তোফা উপহার দিলে আরও বেশি বিনিয়োগ আসবে এবং বিদেশি পুঁজিকে আরও আকৃষ্ট করে টাকার দামে পতন ঠেকিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে হায়! এই ধরনের তোষামোদ যে আদতে শূন্যগর্ভ ও ব্যর্থ একটা প্রয়াস, তা বাজেট পেশের দুদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। টাকার দামে পতন ঠেকানো দূরের কথা, বরং ৩ ফেব্রুয়ারি টাকার দামে একেবারে ধ্বস নেমেছে এবং ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম ৮৭ টাকারও নীচে নেমে গেছে। ফলত এই কাহিনির নীতিকথা হল, যদি বিদ্বেষমূলক মনোভাব কাজে লাগিয়ে জনগণের একটি অংশের বিরুদ্ধে আরেকটি অংশকে লেলিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে সরকারের ভাবমূর্তি নির্মাণের প্রয়াসে তা সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কোনও অর্থনৈতিক সঙ্কটের সমাধান করতে পারে না।
অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
প্রকাশের তারিখ: ০৯-ফেব্রুয়ারি-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
