সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গণমানুষের জন্যে নিবেদিত একটি জীবন
পিনারাই বিজয়ন
কমরেড ভিএস অচ্যুতানন্দন সেই ৩২ জন মানুষের একজন যাঁরা অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গী হয়ে ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের সাথে জীবন্ত সংযোগের শেষ সূত্রটুকুও চলে গেল। তাঁর মৃত্যুতে আমরা জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম ও চলমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝখানে থাকা সেতুটিকেও হারালাম।

গত ২১ জুলাই, ২০২৫-এ ১০১ বছর বয়সে যিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে সেই কমরেড ভিএস অচ্যুতানন্দনের জীবনটি কেরলের সাধারণ ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় এবং এই কথাটি বিশেষ করে সত্য রাজ্যের বিপ্লবী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে।
সকলের কাছে যিনি ছিলেন কমরেড ভিএস, তাঁর জীবন ছিল তিতিক্ষার সংগ্রামী পরম্পরা, অনন্যসাধারণ প্রাণশক্তি এবং ন্যায় নীতির প্রতি অবিচল নিষ্ঠার প্রতীক। গণমানুষের স্বার্থে ক্লান্তিহীন কর্মতৎপরতা ও তাদের প্রতিটি প্রয়োজনের মুহূর্তে কুন্ঠাহীনভাবে পাশে দাঁড়ানোর তাঁর শতবর্ষী জীবন আধুনিক কেরলের ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশে আছে। কেরল সরকার, সিপিআইএম, বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট ও বিরোধী শক্তির নেতা হিসেবে বিভিন্ন সময়ে তাঁর অবদান প্রকৃত অর্থেই অতুলনীয়। কেরলের উজ্জ্বল রাজনৈতিক পরম্পরার অবিভাজ্য অংশ হিসেবেই ইতিহাস তাঁর অবদানকে অক্ষয় স্মৃতিতে ধারণ করে রাখবে।
ভিএস-এর চলে যাওয়া একটি যুগের অবসানকেই চিহ্নিত করে। পার্টি, বিপ্লবী আন্দোলন এবং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনের জন্যে এ এক বিরাট ক্ষতি। এই শূন্যতাকে পার্টি পূরণ করতে পারে একমাত্র যৌথ নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই। যারা তাঁর সাথে দশকের পর দশক ধরে কাজ করেছে, তাদের কাছে এই সময়ে অসংখ্য স্মৃতি ভিড় করে আসছে।
অফুরান জীবনীশক্তি এবং অপরিসীম কষ্টসহিষ্ণুতা দিয়ে গাঁথা ভিএস-এর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। লড়াই সংগ্রামের গভীরে প্রোথিত তাঁর জীবন কেরলের ইতিহাস ও সেখানকার কমিউনিস্ট আন্দোলন, এই দুইয়েরই একটি জীবন্ত অধ্যায়। শ্রমিক কৃষকের অভ্যুত্থান সংগঠিত করা থেকে সামন্ততন্ত্র ও বর্ণব্যবস্থার প্রতিভূদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর নির্ণায়ক ভূমিকা রাজ্যের রাজনৈতিক চালচিত্র নির্মাণে সহায়ক হয়েছে। সহায়সম্বলহীন অবস্থা থেকে যাত্রারম্ভ করে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অগ্রগতির প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গী হয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রাজ্যের উচ্চতম পদে আসীন হয়েছিলেন।
কমরেড ভিএস অচ্যুতানন্দন সেই ৩২ জন মানুষের একজন যাঁরা অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৬৪ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গী হয়ে ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের সাথে জীবন্ত সংযোগের শেষ সূত্রটুকুও চলে গেল। তাঁর মৃত্যুতে আমরা জাতীয় স্বাধীনতার সংগ্রাম ও চলমান সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝখানে থাকা সেতুটিকেও হারালাম।
কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে, বিধানসভার সদস্য হিসেবে, বিরোধী দলের নেতা হিসেবে এবং সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ভিএস গণনাতীত এবং দীর্ঘস্থায়ী অবদান রেখে গেছেন। পুন্নাপ্রা ভায়লার সংগ্রামের সাথে সমার্থক হয়ে থাকা এই মানুষটি উঠে এসেছেন অপরিসীম দুর্ভোগ, কষ্টসহিষ্ণুতা ও জনগনের প্রতি অবিচল আস্থার একটি জীবন অতিবাহিত করার মধ্য দিয়ে।
শ্রমিক হিসেবে জীবন শুরু করে ভিএস ক্রমে পরিণত হন শ্রমিক আন্দোলনের এক বিশাল নেতায়। পার্টি ভিএসকে গড়ে তুলেছে, আবার প্রতিদানে ভিএসও পার্টিকে গড়েছেন। ১৯৪০ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং পরবর্তী ৮৫ বছর ধরে তিনি ছিলেন একজন দায়বদ্ধ সভ্য। কুট্টানাডে তিনি কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি ও জাতিগত দাসত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। গ্রামের পর গ্রামে হেঁটে হেঁটে সভা সমিতি আয়োজন করে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করে তিনি নিপীড়িত মানুষকে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিবর্তিত করেছেন এবং প্রায়শই এটা করতে হয়েছে জমিদার ও পুলিশের দমনপীড়নকে অগ্রাহ্য করে।
ভিএস এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন ত্রিবাঙ্কুর কৃষি শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনে যা পরে রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠন কেরল রাজ্য কৃষি শ্রমিক ইউনিয়নে রূপান্তরিত হয়। অগণিত লড়াই গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তিনি কুট্টানাডের সামাজিক চালচিত্রের বদল ঘটিয়ে দিতে সমর্থ হন। বর্ধিত মজুরি, চাপ্পা প্রথার অবসান (চাপ্পা প্রথা তদানীন্তন কেরলের শ্রমিক নিযুক্তির একটি চরম অমানবিক ও পাশবিক প্রথা। চাপ্পা অর্থ ধাতুমুদ্রা যা ভোরে জমায়েত হওয়া কর্মপ্রার্থী শ্রমিকদের মধ্যে মুপ্পান বা ঠিকাদার ছুঁড়ে দিত, যে শ্রমিকরা ছুঁড়ে দেওয়া সেই মুদ্রাগুলি হস্তগত করতে পারতো তারাই নিযুক্ত পেতো। এই পদ্ধতিতে নিযুক্তির সময়ে কর্মপ্রার্থী শ্রমিকদের মধ্যে ভয়ঙ্কর কাড়াকাড়ি হয়ে হিংসাত্মক ঘটনাও ঘটতো। - অনুবাদক), কাজের নিরাপত্তা এবং উদ্বৃত্ত জমি পুনর্বন্টনের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন তিনি। মাইলের পর মাইল খেতের আলপথ ধরে হেঁটে হেঁটে শ্রমিকদের কুঁড়ে ঘরে পৌঁছে গিয়ে তাদের সাথে সরাসরি আলাপ আলোচনা করার অক্লান্ত পরিশ্রম সাপেক্ষ কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়ে তিনি হাজার হাজার শ্রমিককে আন্দোলনের অভ্যন্তরে টেনে আনতে সমর্থ হন।
১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পর, ভিএস কারারুদ্ধ হন। ১৯৫২ সাল নাগাদ তাঁকে পার্টির আলাপ্পুঝা ডিভিশন কমিটির সম্পাদক করা হয়। এই সময়পর্বে তিনি সংযুক্ত কেরল প্রদেশের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার পর তিনি পার্টির আলাপ্পুঝা জেলা কমিটির সম্পাদক মনোনীত হন এবং কিছুদিন পরই অন্তর্ভুক্ত হন রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে। ১৯৫৯ সালে তিনি পার্টির জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন। উদ্বৃত্ত জমির পুনর্বন্টন সহ আরো নানা দাবিতে তিনি অসংখ্য লড়াইয়ে সাহসী নেতৃত্ব প্রদান করেন।
একাধিকবার কারারুদ্ধ হন কমরেড ভিএস অচ্যুতানন্দন। তাঁর মোট কারাবাসের মেয়াদ সাড়ে পাঁচ বছর। ১৯৬৪ সালে সিপিআই(এম)-এর গঠনের সময় থেকেই তিনি ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ১৯৮৫ সালে তাঁকে পলিটব্যুরোতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ সিপিআই(এম)-র রাজ্য সম্পাদক এবং ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ অবধি তিনি বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে বিজয়ওয়াড়ায় অনুষ্ঠিত পার্টির ২১তম কংগ্রেসে তিনি বয়সজনিত কারণে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যপদ থেকে বিদায় নিলেও স্থায়ী আমন্ত্রিত হিসেবে থেকে যান।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল অবধি তিনি ছিলেন কেরলের বিরোধী দলের নেতা, পরবর্তীতে ২০০৬ থেকে ২০১১ অবধি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। যখন যে পদে দায়িত্ব নিয়েছেন, সর্বত্র ভিএস একটি সুস্পষ্ট ও সুস্থায়ী স্বাক্ষর রেখেছেন।
নিজের জীবনে কৃষি শ্রমিক ও কয়ার শ্রমিকের কষ্টকর অভিজ্ঞতা অর্জন করার পর ভিএস এই অভিজ্ঞতাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। শোষিত জনগনের পাশে অবিচলভাবে থাকা এক অগ্রণী নেতা হিসেবে তিনি কৃষি শ্রমিক আন্দোলন ও সামগ্রিকভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে পরিণত করেছেন এক সুদৃঢ় ও প্রাণবন্ত শক্তিতে। কমিউনিস্ট পার্টিতে বিভাজনের পরবর্তী সময়ে তিনি সংশোধনবাদ ও পরে বামপন্থী হঠকারিতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পার্টিকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে সঠিক রাস্থায় চালিত করার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
রাজনীতির বাইরের জগতেও তিনি তাঁর দৃষ্টিকে প্রসারিত করেছিলেন। পরিবেশ রক্ষা, মানবাধিকার, লিঙ্গসাম্যের মত বিষয়েও তিনি সক্রিয়ভাবে কর্মতৎপর থেকেছেন। এই বৃহত্তর সংযোগই তাঁকে জনগনের কাছে শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছে। সামজিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নানা বিষয়কে রাজনীতির মূলধারায় নিয়ে এসে তিনি কেরলের বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রকে প্রশস্ততা প্রদান করেছেন।
বিধায়ক হিসেবেও ভিএস অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। কেরল বিধানসভায় আম্বালাপুঝা থেকে তিনি নির্বাচিত হন ১৯৬৭ ও ১৯৭০ সালে, মারাকিকুলাম থেকে ১৯৯১-এ এবং পালাক্কাড জেলার মালামপুঝার বিধায়ক ছিলেন ২০০১ থেকে ২০২১ অবধি। কেরলের প্রশাসনিক সংস্কার আয়োগের অধ্যক্ষ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০১৬ থেকে ২০২১ সময়পর্বে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট প্রণীত কর্মসূচি রূপায়নে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সংকটের সময়েও তিনি সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন অনমনীয় দৃঢ়তায়। বিরোধী নেতা হিসেবে তিনি জনগনের সমস্যাবলী নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন এবং বিধানসভার অভ্যন্তরে সমস্ত বিতর্কে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছেন।
কমরেড ভিএস-এর মৃত্যু কেরল এবং সারা দেশের পার্টির জন্যে অপূরনীয় ক্ষতি। তবে ন্যায় সাম্য এবং গণমানুষের স্বার্থে সংগ্রামরত আগামী প্রজন্মকে তাঁর সংগ্রামী উত্তরাধিকার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।
ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ২৭-জুলাই-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
