সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আরাবল্লীতে জমি হাঙর আর খনি হায়েনাদের লোভী চোখ
অরুণাভ মিশ্র
কিন্তু আরাবল্লী ধ্বংস করে সেকাজ করলে লাভ কি? কারণ একদিকে মরু আর অন্যদিকে সিন্ধু গাঙ্গেয় উপত্যকা নিয়ে আরাবল্লী নিজেই এক প্রাকৃতিক সেতু বা ইকোটোন জোন হিসেবে কাজ করে। সে যেমন মরু বিস্তার রোধ করে তেমনি বৃষ্টির জলকে ধরে রেখে ভূগর্ভের জলস্তর বাড়ায়। রক্ষা করে জলচক্র। আরাবল্লীর বনাঞ্চল দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলের বায়ু দূষণ কমাতে বড় ভূমিকা নেয়। আরাবল্লী পাহাড় বৈচিত্র্যময় প্রাণী এবং উদ্ভিদ সম্পদে ভরা। এমন অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে এখানে যা গোটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এর শুষ্ক ও অর্ধ শুষ্ক প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্র, শুষ্ক পর্ণমোচী বন, কাঁটাযুক্ত ঝোপ ঝাড়, তৃণভূমি ও শীলাময় পাহাড়ি পরিবেশ মরুকরণ প্রতিরোধে প্রাকৃতিক বাধার কাজ করে।

বিচারালয়ে অভিযোগ ছিল। অভিযোগ ছিল অবৈধ খনি ও খননের মধ্য দিয়ে ক্ষয়িষ্ণু ভঙ্গিল আরাবল্লী পর্বতমালায় বাস্তুতন্ত্রের এমন ক্ষতি করা হচ্ছে যা আগামী দিনে মেরামতির অযোগ্য হয়ে যাবে। এর বিরুদ্ধে দুজন বিচারপ্রার্থী বিচার চেয়েছিলেন। টি এন গোদাভরমন এবং এম সি মেহতা ছিলেন বিচারপ্রার্থী। কোর্টের পরামর্শদাতা বা অ্যামিকাস কুরি ছিলেন কে পরমেশ্বর। অভিযোগকারীদের অভিযোগে ভুল ছিল না। বিগত সাত বছরে শুধু মাত্র রাজস্থানের ২০টি আরাবল্লী লাগোয়া জেলায় ৪০ হাজার ১৭৫টি অবৈধ খননের অভিযোগ আছে। মনে রাখা দরকার, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা ও দিল্লী মিলিয়ে চার রাজ্যের প্রায় ৩৯ টি জেলার ৬৯০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আরাবল্লী পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তৃতি। অভিযোগ সম্পর্কে সরকারের উদাসীনতা স্পষ্ট হয় মাত্র ৭ হাজার ১৭৩ টি এফ আই আর এর ঘটনা থেকে। অবশ্য এই এফ আই আর গুলোর সিংহভাগ, ৪১৮১ টি শুধুমাত্র আরাবল্লী জেলায়। এ তো গেল অবৈধ খননের কথা। রাজস্থানের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি তাদের এক সার্ভেতে দেখাচ্ছে আরাবল্লী এলাকার ১৮৫২ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে খনন চলছে। কতটা বৈধ আর কতটা অবৈধ তার হদিস দেননি। ২০২২ সালের সি এ জি রিপোর্ট দেখাচ্ছে রাজস্থানে ৩০১ টি বড় এবং ২২ হাজার ২৪২ টি ছোট খনি লিজে চলছে। এগুলো সবই আরাবল্লী এলাকায়। এই বিপুল খনন যজ্ঞ চলছে কর্পোরেট খনি মাফিয়াদের মুনাফার লালসা মেটাতে। তার বদলে ধ্বংস হচ্ছে সমগ্র উত্তর ভারতের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র। ক্ষয়িত সেই বাস্তুতন্ত্রে বাণিজ্যিক প্রকল্প নিয়ে হাজির হচ্ছে জমি হাঙররা। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উন্নত পরিবেশ রেখে যাওয়ার যে দায়বদ্ধতার কথা মার্কস বলেছিলেন, কর্পোরেট পুঁজির ভোগবাদী মানসিকতা তাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় সহজ করছে সে কাজ। ধারাবাহিক সংগ্রাম ও আন্দোলনেই কেবল তাদের উদ্ধত নখর ভেঙে দেওয়া সম্ভব। আজকের ‘সেভ আরাবল্লী‘ আন্দোলন সেই দিক নির্দেশক বার্তাই তুলে ধরছে।
এক ভঙ্গিল বুড়ো রত্নাকর পাহাড়
আরাবল্লী একটি ১৫০ কোটি বছরেরও বেশি পুরনো প্রাচীনতম ভূতাত্বিক গঠনের ভঙ্গিল পর্বত বলে ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন। আরাবল্লী ক্রেটন ও বুন্দেলখন্ড ক্রেটনের সংঘর্ষে আরাবল্লী পর্বত শ্রেনীর উদ্ভব। আগে এই পর্বতশ্রেণী অনেকটা উঁচু ছিল। এর নিচে থাকা পৃথিবীর ভূত্বকীয় পাতের চলাচল ও উর্ধ্বমুখী চাপ বন্ধ হয়েছে অনেকদিন। তারপর দীর্ঘ সময়জুড়ে আবহবিকারে আজ তার ভগ্ন দশা। ভূত্বকের উপরে থাকা পাললিক শিলা ক্ষয়ে গিয়ে আজ বেরিয়ে এসেছে নীচে থাকা আগ্নেয় শিলা। তাতে নজরে আসছে দামী গ্রানাইট, পিংক গ্রানাইট, বেরিল, কোয়ার্টজ পাথর, ফেল্ডস্পার। স্বল্প খননে মেলে এসব রত্ন। তাছাড়া আরাবল্লীর পাথুরে মাটির তলায় জমে রয়েছে ৭০ রকমেরও বেশি খনিজ পদার্থ। তার মধ্যে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ হলো দস্তা, সীসা, রুপো, ক্যাডমিয়াম, টাংস্টেন, মার্বেল পাথর, রক ফসফেট, সোপ স্টোন, জিপসাম, অ্যাসবেসটস এবং মাইকা। আর মাটির ওপরে জ্বলছে শাসক ও খনি মাফিয়া দের চকচকে চোখ! আরাবল্লীকে ধ্বংস করে হলেও তারা এইসব সম্পদ পেতে চায়। তাই আরাবল্লীকে বাঁচাতে হলে ওখানে অবাধ খনি ব্যবসা ও বাণিজ্যিক প্রকল্প সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
আরাবল্লীর বাঁচা দরকার নিজেরা বাঁচতে চাইলে
আরাবল্লীকে বাঁচানো বড় দরকার। এর ভৌগোলিক গঠনের বিশেষত্ব, বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণ, উদ্ভিদ ও প্রাণিসম্পদ, এবং অবস্থানগত সুবিধা, গোটা উত্তর ভারতের পরিবেশগত সুরক্ষা কবচ হিসেবে একে গড়ে তুলেছে। আরাবল্লীর কারণে থর মরুপ্রদেশ প্রসারিত হয়ে সিন্ধু গাঙ্গেয় সমতল ভূমি, হরিয়ানা ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশে বিস্তৃত হচ্ছে না। তা হলে হরিয়ানা এবং পাঞ্জাবের ব্যাপক শস্যক্ষেত্র অনুর্বরা ও উৎপাদনহীন হয়ে পড়তো। গোটা ভারতের খাদ্য সুরক্ষা সেক্ষেত্রে বিঘ্নিত হত। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মরুকরণ রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ভারত আরাবল্লী গ্রীন ওয়াল তৈরি করছে জার্মান ফেডারেল গভর্নমেন্টের সহায়তায়। লক্ষ্য তার মরুপ্রদেশের বিস্তৃতি কমানো। গুজরাটের পোরবন্দর থেকে হরিয়ানার পানিপথ পর্যন্ত বিস্তৃত ১৪০০ কিমি দীর্ঘ ও ৫ কিমি প্রশস্ত করে তৈরি হচ্ছে আরাবল্লী গ্রীন ওয়াল। এই গ্রীন ওয়ালের ফলে ২৬ মিলিয়ন হেক্টর অবনমিত জমি পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য ২০৩০ এর মধ্যে। আফ্রিকার গ্রেট গ্রীন ওয়াল এর অনুকরণে আরাবল্লীর এই পুনর্বনায়ন প্রকল্প। কিন্তু আরাবল্লী ধ্বংস করে সেকাজ করলে লাভ কি? কারণ একদিকে মরু আর অন্যদিকে সিন্ধু গাঙ্গেয় উপত্যকা নিয়ে আরাবল্লী নিজেই এক প্রাকৃতিক সেতু বা ইকোটোন জোন হিসেবে কাজ করে। সে যেমন মরু বিস্তার রোধ করে তেমনি বৃষ্টির জলকে ধরে রেখে ভূগর্ভের জলস্তর বাড়ায়। রক্ষা করে জলচক্র। আরাবল্লীর বনাঞ্চল দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলের বায়ু দূষণ কমাতে বড় ভূমিকা নেয়। আরাবল্লী পাহাড় বৈচিত্র্যময় প্রাণী এবং উদ্ভিদ সম্পদে ভরা। এমন অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে এখানে যা গোটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এর শুষ্ক ও অর্ধ শুষ্ক প্রকৃতির বাস্তুতন্ত্র, শুষ্ক পর্ণমোচী বন, কাঁটাযুক্ত ঝোপ ঝাড়, তৃণভূমি ও শীলাময় পাহাড়ি পরিবেশ মরুকরণ প্রতিরোধে প্রাকৃতিক বাধার কাজ করে। আরাবল্লীকে ধ্বংস করলে সে বাধা সরে যাবে। বালুঝড় তখন কড়া নাড়বে হরিয়ানা, দিল্লী, পাঞ্জাব আর পশ্চিম উত্তর প্রদেশে।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
আরাবল্লীর বিলয়ন বাঁচতে দেবে না সেখানে বসবাসকারী ভীল, মিনা, গরসিয়া, প্রভৃতি আদিবাসী জনজাতির মানুষদের। কৃষি পশুপালন ও বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার তাদের জীবনের মূল কথা। কর্পোরেট হাঙর আর তাদের দালাল কেন্দ্রের মোদি সরকারের হাত থেকে এই মানুষগুলোকে বাঁচানো আজ আমাদের এক সামাজিক দায়।
কে পাহাড় কে পাহাড় নয় তা কি ঠিক করবে কাগজ?
আরাবল্লীর বাঁচা না বাঁচা নিয়ে এত কথা উঠছে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া ২০ সে নভেম্বরের এক রায়ের কারণে। এই রায়ে কোর্ট ভূস্তর থেকে ১০০ মিটার উঁচু ভূমিকে পাহাড় এবং তার চৌহদ্দি থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে অনুরূপ পাহাড় থাকলে তবে তাকে পর্বতশ্রেণী বা পার্বত্য অঞ্চল বলা যাবে স্থির করে দিয়েছেন। এই নিয়ম ধরলে আরাবল্লীর মোট ১২০৮১ টি পাহাড়ের ১০৪৮টি কেই কেবল পাহাড় বলা যাবে, অন্য গুলিকে নয়। অর্থাৎ সমগ্র পাহাড়ের মাত্র ৮. ৭% পাহাড় বলে গণ্য হবে। ৯১.৩% আর পাহাড় থাকবে না। অনেকটা অঞ্চল হয়তো পর্বতশ্রেণী বা পার্বত্য অঞ্চলের তকমা হারাবে। ফলে খনি ও জমি মাফিয়াদের আগ্রাসী থাবা আরও তীব্র হবে। মাটির তলার সম্পদ যাবে। সেই সঙ্গে যাবে ধাও, পলাশ, খেজুর, দেশী বাবলা, খাইর, সালাই, ফলসা, অমলতাস, বেল, জামুন, আমলকী, তেঁতুল, গুলঞ্চ , অশ্বগন্ধা, সফেদ মুসলী। থাকবে না শ্লথ ভালুক, বাঘ, চৌশিঙ্গা, বুনো শুয়োর, প্যাঙ্গোলিন, গন্ধগোকুল, উড়ন্ত কাঠবেড়ালি, বেজী, নেকড়ে, সম্বর, চিতল হরিণ, নীলগাই, নানা ধরনের গিরগিটি , সাপ ও পাখিরা। শুকিয়ে যাবে লুনি, সবরমতি, বনগঙ্গা, বানাস, সাবি , ইন্দোরি, অর্জুনা প্রভৃতি নদী আর জলাধার। ভাঙন আসবে কৃষি, গ্রামীণ জীবিকা ও জীবন প্রবাহে। বিপর্যস্ত হবে প্রাকৃতিক জলধারণ। এলাকার বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। এলাকা থেকে হারিয়ে যাবে বন ও পরিবেশ আইন। পার্বত্য অঞ্চল আইন সুরক্ষা হারাবে। কর্পোরেট রাজ প্রতিষ্ঠিত হবে উন্নত পরিবেশ ভাবনার কবরের উপরে। সাময়িক স্থগিতাদেশ এসেছে এই ভাবনায় নাগরিক আন্দোলনের চাপে। কিন্তু লুটেরা পুঁজির সেবাদাসেরা কাল আবার সক্রিয় হয়ে উঠবেনা কে বললো?
তাই, আরাবল্লীর সংজ্ঞা কাগজ ঠিক করবে না, করবে তার পরিবেশগত বাস্তবতা ও বাস্তুতন্ত্র। করবে তার ঐতিহ্যগত ভূতাত্ত্বিক অবস্থা। তার বিন্দুমাত্র অন্যথা হবে আরাবল্লীর ‘ডেথ ওয়ারেন্ট’। সে ওয়ারেন্ট কেউ লিখতে গেলে জাগ্রত জনতা তাকে ছেড়ে কথা বলবে না। পরিবেশ রক্ষায় তাই আরাবল্লী হোক বা নিকোবর দ্বীপ, নিকোবর দ্বীপ হোক বা দেউচ-পচামী, একটাই বার্তা- জাগতে রহো!
প্রকাশের তারিখ: ০২-জানুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
