Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

আক্রান্ত ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ

সাভেরা
ভারত দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সন্ধিক্ষণে... পরিস্থিতি অত্যন্ত ঘোরালো। আর সেকারণেই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সাধারণ ধর্মঘটের মতো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে আমরা তাই ছোট করে দেখতে পারি না। একইসঙ্গে, সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শগত হামলাকে মোকাবিলা করতে হবে বিকল্প মিডিয়ার মাধ্যমে– বিরোধিতা করতে হবে মানুষের সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা মঞ্চের মাধ্যমে। এই দুই সংগ্রামই পালন করবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
Attack on secularism and united resistance

৭৯তম স্বাধীনতা দিবস। এখন ভারত দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সন্ধিক্ষণে। একদিকে রয়েছে একটা প্রবল শক্তি, যারা সংবিধানকে ধ্বংস করতে চায়। অথচ সংবিধানই ধারণ করে রয়েছে স্বাধীনতার ঐতিহ্যকে। এই শক্তিগুলি হল আরএসএস, তাদের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি, এবং এদের সঙ্গে সংযুক্ত অসংখ্য সংগঠন– যাদের একসঙ্গে বলা হয় সঙ্ঘ পরিবার। 

গত ১১ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার এবং বেশ কয়েকটি রাজ্য সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে এই শক্তিগুলি সংবিধানের তিনটি স্তম্ভ– ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার ক্রমাগত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এবং তার বদলে চাপিয়ে দিতে চাইছে একটা ফ্যাসিস্ত ধরনের হিন্দু রাষ্ট্র– সমাজ সম্পর্কে যে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী হল অন্ধকারময় ও মধ্যযুগীয়। সরকারে থাকার ফলে যে ক্ষমতা তারা পাচ্ছে, তাকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি-আরএসএস আইন ও নীতিগুলিকে পুরোপুরি বদলে দিতে চাইছে। যার লক্ষ্য হল হিন্দু আধিপত্যবাদী কাঠামো গড়ে তোলা। এবং তার মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত করা হচ্ছে, নির্মম জাতিবর্ণ ব্যবস্থাকে জোরদার করে তোলা হচ্ছে এবং গণতন্ত্রকে অবদমিত করা হচ্ছে। সরকারের বাইরে থেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দলের মতো সঙ্ঘ পরিবারের সংগঠনগুলি এই অ্যাজেন্ডা কার্যকর করার জন্য নগ্ন হিংস্রতা ও ভীতি প্রদর্শনের রাস্তা নিচ্ছে। 

কিন্তু, এর বিপরীতে একটা প্রতিরোধের স্রোতও ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। এই প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অভিব্যক্তি সম্প্রতি দেখা গেল ৯ জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘটে। এই ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল ট্রেড ইউনিয়ন এবং কৃষক সংগঠনগুলি এবং সমর্থন করেছিল এক ডজনেরও বেশি গণসংগঠন ও আন্দোলন। এই ধর্মঘট শুধু নানা রকম অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এই ধর্মঘট ছিল ধর্মান্ধতা, জাতপাতের নিপীড়ণ এবং অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনতার ঐক্যের একটা জোরদার প্রকাশ। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও বিজেপি যখন চেয়েছিল ৪০০র বেশি আসনে জিততে (অব কি বার চারশো পার) এবং যাকে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করা হয়েছিল সংবিধান বদলে দেওয়ার রাস্তা তৈরি করার চেষ্টা বলে, সেই প্রয়াসকে রুখে দিয়েছিল বিরোধীদের ঢেউ। সেটাও ছিল এই লড়াইয়েরই প্রতিফলন। এর সঙ্গে মিলেছিল অর্থনীতিকে ধ্বংস করে এমন নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্রোধ। এই নীতির ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কম মজুরির বোঝা বইতে হচ্ছে। এবং বইতে হচ্ছে বেকারত্বের বোঝা। আর সেই সুযোগে ভারতের অতি ধনীরা হয়ে উঠছে আরও বেশি ধনী। এই সব নীতির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধের ফলে লোকসভায় বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য এখন তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে নানা ধরনের সুবিধাবাদী দলের ওপর।

এই লড়াইগুলি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যদি ঘৃণার বিদ্বেষের বিষ, ধর্মীয় অন্ধত্ব, উগ্র দেশপ্রমের কাঁটাকে উপড়ে ফেলতে হয়, যেগুলিতে এক বড় অংশের মানুষকে জারিত করে ফেলা হয়েছে, তাহলে আমাদের এক দীর্ঘ, কঠিন পথে পেরোতে হবে। যদি এই লড়াইটা ভালভাবে লড়তে হয়, তাহলে এই ক্ষয়ের গভীরতা কতদূর তা ভাল করে বুঝতে হবে। 

ধর্মনিরপেক্ষতাকে জলাঞ্জলি দিয়েছে মোদী সরকার

এবিষয়ে কোনও সন্দেহই ছিল না যে আরএসএসের একজন প্রচারক যে সরকারের প্রধান, সেই সরকার কখনই ধর্মনিরপেক্ষতাকে সমর্থন করবে না। মোদী সরকার এবং তাদের দলের রাজ্য সরকারগুলি এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতার  কোনও দুর্বল রূপকেও সমর্থন করার ভান পর্যন্ত দেখাচ্ছে না। সব ধর্মের মানুষের প্রতি সহনশীলতা ও সমতার মনোভাব তারা বিসর্জন দিয়েছে। একগুচ্ছ আইনি ব্যবস্থা এবং নীতি কার্যকর করার মধ্যে দিয়ে একেবারে পরিকল্পিতভাবে তারা মুসলিম সম্প্রদায়কে প্রান্তিক অবস্থায় নিয়ে গেছে, তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে এবং দেশের ওপর একটা হিন্দু আধিপত্যবাদী সমাজ জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। 

তিন তালাক কিংবা ওয়াকফ সম্পত্তির মতো ইস্যুতে বিজেপি এক ধরনের লোকদেখানো ভান করছে এবং এমন ভাব দেখাচ্ছে যে তারাই যেন মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। কিন্তু বাস্তবে এগুলো মুসলিম সম্প্রদায়ের আইনগুলিকে ধীরে ধীরে খর্ব করে দেওয়ার খুবই সুপরিকল্পিত কিছু পদক্ষেপ। তাদের পরিকল্পনা আরও বড়। তারা চায় সবার জন্য একটাই আইন থাকবে। এবং সেটা হিন্দু আইন।

শিক্ষার গেরুয়াকরণ: মোদী সরকার যে জাতীয় শিক্ষা নীতি চালু করেছে, তাতে এমন সব মূল্যবোধের কথা এবং এমন জাতীয়তাবাদের কথা রয়েছে যেগুলো সেই একই হিন্দু্ত্বের ধারণার পূতিগন্ধময় আবর্জনার সমান। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই সরকারকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি দেশের স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে ইতিহাস পড়ানো হয়, সেগুলিকে নতুন করে লেখানোর ব্যবস্থা করেছে। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে মোগল আমলের ইতিহাস বাদ দেওয়া হয়েছে, কিংবা সেই অংশগুলিকে কমিয়ে আনা হয়েছে। এবং সেই অংশগুলিকে এমনভাবে হাজির করা হয়েছে যা আরএসএসের কাল্পনিক দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে মিলে যায়। এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গী হল ভারতে মুসলিম শাসনের পুরো পর্বটা জুড়ে হিন্দুরা ছিল দাসেদের সমান। আরএসএস এর সবচেয়ে বড় কাজ হল নিজেদের মতো করে দেশের ইতিহাস নতুন করে লেখা। এবং মোদী ক্ষমতায় থাকার ফলে তারা একই কাজটা করছে আরও প্রতিহিংসার মনোভাব নিয়ে। শিক্ষার সমস্ত স্তরে বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক পদে এমনভাবে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে, যাতে সঙ্ঘ পরিবারের সমর্থকেরাই সেই সব পদে বসতে পারে। এ হল দীর্ঘস্থায়ী ভাবে প্রতিষ্ঠানগুলিকে করায়ত্ত করা, যার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে বিজেপি সরকার। এটা তারা নিজেদের সমর্থকদের তুষ্ট করার জন্য করছে না। বরং তাদের লক্ষ্য হল তাদের যে মতাদর্শ তা যেন প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে প্রচারতি হয়। 

কেড়ে নেওয়া হচ্ছে ভোটাধিকার: মোদী সরকার ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন (সিএএ) চালু করেছে। এর লক্ষ্য হল প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে আসা অ-মুসলিম অভিবাসীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়া যায়। এরই সঙ্গে তারা মিলিয়ে দিতে চেয়েছিল ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনশিপ (এনআরসি)-কে, যাতে মুসলিমরা নাগরিকত্ব হারান। এবং তাঁদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যায়। এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমত ফেটে পড়লে সরকার এনআরসি থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন বিহারে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ শুরু করেছে। তাতে সাধারণ মানুষদের কাছ থেকে সব ধরনের নথি চাওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে তাদের বৈধ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। এর নিশানা তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। মনে করা হচ্ছে এর পর বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন করা হবে বাংলায়। সঙ্ঘ পরিবারের  সাজানো সংগঠনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সারা দেশজুড়ে বাঙালি মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের টার্গেট করা হয়েছে অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর নামে। 

বদলে ফেলা হচ্ছে আইন: ২০২৪ সালে নির্বাচনী প্রচারের সময় বিজেপি তুলেছিল অভিন্ন দেওয়ানি বিধির ইস্যু। এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা এই বিধি কার্যকর করবে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারগুলিও ঘোষণা করেছিল এই বিধি কার্যকর করার প্রাথমিক পদক্ষেপ। এমনকী উত্তরাখণ্ড সরকার নিজেদের রাজ্যের জন্য এক ধরনের ইউসিসি আইন পাসও করিয়েছে। তাতে রয়েছে সব অস্বাভাবিক সব ধারা। এই আইনের কয়েকটি ধারায় আবার লিভ ইন করলেও শাস্তি পেতে হবে। ইউসিসি আরএসএসের দীর্ঘদিনের দাবি (সঙ্গে ছিল কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার বিলোপ এবং অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ)। এ হল মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকারের ওপর নিশানা করার হাতিয়ার। এতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণাকে উসকে দেওয়া যায়। উসকে দেওয়া যায় বিভিন্ন ভুল ধারণাকে যার মধ্যে পড়ে মুসলিমরা জনসংখ্যায় হিন্দুদের ছাপিয়ে যাচ্ছে এবং এই ধরনের আরও সব বিষয়। 

বিজেপির নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন রাজ্য সরকার নতুন আইন পাস করিয়েছে ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে। যদিও জোর করে ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে আইন ইতিমধ্যেই আছে। নতুন আইনের সংজ্ঞাগুলো সবই ঝাপসা এবং এতে যে কোনও লোকই ধর্মান্তরকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে সন্দেহে যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারে। এর ফলে ধর্মীয় জমায়েতে, এমনকি ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধেও সঙ্ঘ পরিবারের বিভিন্ন সংগঠনের হামলা বাড়ছে। এবং তারা স্থানীয় পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এই হামলা চালাচ্ছে। 

অবৈধ উচ্ছেদ ও ধ্বংস: উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার রাজ্যের মুসলিম গোষ্ঠীর ওপর খুঁজে খুঁজে হামলা চালানো ও তাদের সন্ত্রস্ত করে তোলার ব্যাপারে একেবার সামনের সারিতে রয়েছে। প্রতিবাদের সময় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস হলে এবং তাতে কেউ জড়িত প্রমাণিত হলে তাদের কাছ থেকে শাস্তিমূলক জরিমানা আদায়ের আইন জারি করেছে যোগী সরকার। বিশেষ করে সিএএ নিয়ে প্রতিবাদের পর মুসলিমদের নিশানা করার জন্য এই আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আরেকটি কাজও করছে যোগী সরকার। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে কিংবা অপরাধে জড়িত স্রেফ এই অভিযোগ অনেকের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। এব্যাপারেও মুসলিম পরিবারগুলিকে নিশানা করা হচ্ছে। পরে মধ্যপ্রদেশের মতো একাধিক বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই কায়দা রপ্ত করেছে। এই ভাবে কয়েক ডজন বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শেষে বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া বন্ধ করতে কড়া নির্দেশিকা জারি করতে হয়েছে সুপ্রিম কোর্টকে। সেজন্য আগাম নোটিশ দেওয়া, শুনানি ইত্যাদিরও ব্যবস্থা রয়েছে শীর্ষ আদালতের নির্দেশিকায়।

ধর্মাচরণ চলছে অবাধে: নানা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রকাশ্যে হিন্দু ধর্মীয় আচার আচরণ পালন করেছেন। সেই সময় সর্বদাই হাজির থেকেছে টিভি চ্যানেলের ক্যামেরা। এবং তিনি যা কিছু করেছেন তা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন, অযোধ্যায় রামমন্দিরের উদ্বোধন। দেশে এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন মন্দিরেও গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এবছরের গোড়ায় এলাহাবাদ/ প্রয়াগরাজে মহাকুম্ভের পুরো আয়োজন করেছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন উত্তরপ্রদেশ সরকার। পুরো এলাকা সাজিয়ে তোলা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপির তাবড় নেতাদের বিশাল বিশাল হোর্ডিং দিয়ে। 

ঘৃণা ভাষণ: প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা, এবং রাজ্যস্তরের মন্ত্রীরা পরের পর নির্বাচনী প্রচারে ঘৃণা ভাষণের স্রোত বইয়ে দিয়েছেন। তাঁরা প্রকাশ্যে মুসলিম সম্প্রদায়কে নিশানা করেছেন এবং হিন্দুত্বের জয়গান গেয়েছেন। এই সব ঘৃণা ভাষণে স্পষ্টতই আইন ভাঙা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কিংবা পুলিশ, কেউই এসবের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। এটা হাস্যকর যে এই দেশে যারা সর্বোচ্চ সরকারি পদাধিকারী তারা একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের প্রকাশ্যে গালি দিচ্ছেন এবং তাঁদের ভয় দেখাচ্ছেন। এবং লাভ জিহাদ, ল্যান্ড জিহাদ-এর মতো নানা ধরনের কাল্পনিক অপরাধের নাম করে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়কে উসকে দিচ্ছেন তাদের ওপর হামলা করার জন্য। 

আড়াল করছে অপরাধীদের: কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি খোলাখুলি অপরাধীদের আড়াল করছে। অথচ সাম্প্রাদায়িক হামলার সময় খুন, ধর্ষণ, লুঠপাটসহ, এমনকী বোমা বিস্ফোণের মতো জঘন্য অপরাধে সেই সব অপরাধীরা অভিযুক্ত এবং তাদের অনেকের সাজাও হয়েছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন গুজরাট সরকার ১১ জন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীকে ছেড়ে দিয়েছিল, যারা বিলকিস বানো মামলায় জড়িত ছিল। ২০০২ সালে মুসলিম বিরোধী গণহত্যার সময় একদল উন্মত্ত জনতা বিলকিস বানোর পরিবারের ওপর হামলা করে, তাঁকে ধর্ষণ করে এবং তাঁর তিন বছরের শিশুকন্যাকে হত্যা করে। এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এবং শীর্ষ আদালত আদেশ দেয় জেল থেকে ছাড়া পাওয়া সব অপরাধীকে জেলে ফিরে যেতে হবে। ওড়িশায় নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার গ্রাহাম স্টেইনস হত্যা মামলায় একজন অপরাধীর মামলা হালকা করে দেয়। এবং এই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত দারা সিংয়ের মুক্তির ব্যবস্থা প্রায় পাকা করে ফেলেছিল তারা। তবে জনমত সোচ্চার হওয়ায় তারা তা পারেনি। অসংখ্য ঘটনা রয়েছে যেখানে গোরক্ষকেরা জামিনে মুক্তি পেয়ে গেছে এবং অথবা বিচার প্রক্রিয়ায় ফাঁকফোঁকর থাকায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবারের নেতারা জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর এই সব অপরাধীদের গলায় মালা পরিয়ে ‘বীরের’ অভ্যর্থনা দিয়েছেন। অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়ে গেছে এমন সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হল মালেগাঁও বিস্ফোরণ কাণ্ড মামলা। সেই ঘটনায় অভিযুক্ত একদল হিন্দুত্ববাদী কর্মী, যাদের মধ্যে ছিলেন সাংসদ প্রজ্ঞা সিংও, তাঁরা ছাড়া পেয়ে গিয়েছেন কারণ বিচার প্রক্রিয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ হাজির করা যায়নি। এসব কিছুই সঙ্ঘ পরিবারের ঝটিকা বাহিনীকে বেপরোয়া হয়ে ওঠার মতো সুযোগ করে দিয়েছে। এই বাহিনীই গোরক্ষার নামে, উৎসবের সময় শোভাযাত্রা বের করে, মসজিদের ওপর হামলা চালিয়ে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটিয়েছে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্যান্য জঘন্য কার্যকলাপ চালিয়েছে। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলি খোলাখুলি হিন্দুত্ব ব্রিগেডের পক্ষ নিযেছে এবং আইনের চোখে সমানাধিকার সংক্রান্ত যে সাংবিধানিক নির্দেশিকা তার প্রতি সমস্ত অঙ্গীকারকে তারা জলাঞ্জলি দিয়েছে। 

সামাজিক ক্ষতি 

কীভাবে বিজেপি আইন ও সরকারি নীতি/ সিদ্ধান্তগুলিকে হাতিয়ার করে মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়কে নিশানা করেছে, ওপরে সংক্ষেপে একটা বিবরণ তুলে ধরা হল। এতে মদত দিচ্ছে, বস্তুত একে আরও বাড়িয়ে তুলছে সঙ্ঘ পরিবার এবং সামগ্রিকভাবে সমাজে একটা সাংঘাতিক পরিণামের জন্ম দিচ্ছে। সঙ্ঘ পরিবার যেসব কাল্পনিক স্লোগান তৈরি করেছে– লাভ জিহাদ, গোরক্ষা, হিজাব, ল্যান্ড জিহাদ, তথাকথিত বাংলাদেশি অভিবাসী ইত্যাদি– এবং এই সমস্ত মিথ্যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলিকে অসম্মানিত করছে। সেই মিথ্যাচার করে চলেছে সঙ্ঘ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সশস্ত্র পাহারাদার দল ও সংগঠনগুলি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সরাসরি হিংস্র আক্রমণ করা হচ্ছে, উস্কানি দেওয়া হচ্ছে, এবং সাম্প্রদায়িক হিংসার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে সারা দেশের অসংখ্য এলাকাজুড়ে। এনসিআরবি-র তথ্য বলছে মোদীর শাসনের প্রথম আট বছরে (২০১৪-২০২২) ৬০৬৭টি সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ হাজার মানুষ। এটা হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এই পর্বে মুসলিম ও দলিতদের পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে ৮০টির বেশি এবং সেগুলি ঘটানো হয়েছে গোরক্ষার নামে।

এছাড়াও, মুসলিম এবং অন্য সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে মিথ্যার জাল বোনা হচ্ছে, এবং নানা কল্পকথা ছড়ানো হচ্ছে। সঙ্ঘ পরিবারের সোশাল মিডিয়া সংগঠনের মাধ্যমে দিনরাত এই সব মিথ্যা প্রচার চলছে। ঘৃণা ও বিদ্বেষের এই ধারাবাহিক ঢেউ এমন এক সময় সরলমতি লোকেদের মধ্যে একটা প্রভাব তৈরি করছে যখন ভুয়ো খবর হয়ে দাঁড়িয়েছে একটা সর্বব্যাপী বিষয় এবং এমনকী মূল ধারার টিভি চ্যানেলগুলিও সেই মিথ্যা প্রচার করে চলেছে। 

পরিস্থিতি অত্যন্ত ঘোরালো। আর সেকারণেই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের গুরুত্ব অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সাধারণ ধর্মঘটের মতো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনকে আমরা তাই ছোট করে দেখতে পারি না। একইসঙ্গে, সঙ্ঘ পরিবারের মতাদর্শগত হামলাকে মোকাবিলা করতে হবে বিকল্প মিডিয়ার মাধ্যমে– বিরোধিতা করতে হবে মানুষের সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা মঞ্চের মাধ্যমে। এই দুই সংগ্রামই পালন করবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, ৪-১০ আগস্ট, ২০২৫

ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ১৫-আগস্ট-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬