সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সিসিলিয়ার স্মৃতিকথা
সিসিলিয়া ববরোভস্কায়া
কোনোরকম অ্যাডভেঞ্চার ছাড়াই সীমান্ত পেরোলাম এমনটা নয়। কোনো কারণে সেই সময়ে সীমান্তের প্রহরীরা ঠিক করল অস্ট্রিয়ান অভিনেত্রী হেডউইগ নাভোতনিকে তল্লাশি করবে। এই বিষয়টা আমার খুব একটা পছন্দ হচ্ছিল না। আমার কোটটি যতটা নিরীহ দেখতে লাগছে বাইরে থেকে, আসলে তো ততটা নয়। যাই হোক, আমাকে ভিতরের একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে একজন মহিলা পুলিশকর্মী দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে জামাকাপড় এমনকি পরচুলাটি পর্যন্ত খুলে ফেলতে বলা হল। পুলিশ অফিসার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব পরীক্ষা করলেন কিন্তু পিছনের চেয়ারে খুলে রাখা আমার কোটটির দিকে বিশেষ নজর দিলেন না। ফলত তিনি সন্দেহজনক কিছুই পেলেন না।

ভূমিকা: বিজয় প্রসাদ
নভেম্বর বিপ্লব বিষয়ে কথা উঠলেই লেনিন, ট্রটস্কি, স্তালিন বা ভেরলভের মতো নেতাদের কথা আমাদের মনে পড়ে। কিন্তু ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবে এই নেতৃত্বরা যতই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকুন না কেন, শুধুমাত্র এঁদের নিয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়া উচিত নয়। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক নারী শ্রমিক দিবসের প্রতিবাদ আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই বিপ্লবের ঢেউয়ের শুরুয়াৎ হয়নি, বিপ্লবের সূত্রপাত তারও আগে থেকে। উনিশ শতকের গোড়া থেকেই সাধারণ মানুষেরা জারকে শাসনক্ষমতা থেকে টেনে নামাবার জন্য বিভিন্নরকম প্রচেষ্টা শুরু করেছিল। যদিও তার বেশিরভাগই সফলতা পায়নি।
একটি বিদ্রোহ থেকে অন্য অভ্যুত্থানের মধ্যে নেমে এসেছে বিভিন্নরকম নিপীড়ন, মোহভঙ্গ হয়েছে। সেইসময়েই দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনের নিচুতলার কর্মীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। রাগ ও জেদ মনের মধ্যে জড়ো করে তাঁরা বিশ্বাস করেছেন এই শোষণমূলক ব্যবস্থা কোনোমতেই চলতে পারে না। এমনকি তাঁরা এই তাত্ত্বিক ধারণাতেও একমত হয়েছেন যে, স্বৈরতন্ত্র বা উদারনীতি—কোনোটাই এই পুঁজিবাদের সংকটকে মেটাতে সক্ষম নয়।
ববরোভস্কায়ার এই স্মৃতিকথার গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ হচ্ছে আখ্যানে মহিলাদের উপস্থিতি—এই মহিলারা হয় বিপ্লবের কর্মী অথবা বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষজন। এঁরাই বিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জিইয়ে রেখেছিলেন। ববরোভস্কায়া জেল থেকে প্রাসকোভয়া কুদেল্লি ও মারিয়া নিকোলায়েভার মত কমরেডদের সঙ্গে এবং কনকরডিয়া সামোইলোভার (যাঁকে ববরোভস্কায়া নাতাশা নামে ডাকতেন) মত মস্কো রিজিওনাল কমিটির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন নিয়মিত। নিজের লেখাতেও তিনি নিজের বন্ধুর কথা লিখেছেন-
‘উৎসাহী কমরেড নাতাশা একদিন মিতিশির এক জঙ্গলের ভিতরে জনসভায় খুবই উত্তেজক, জঙ্গী ভাষণ দিলেন। তারপরেই তিনি একটি সাংগঠনিক সভা ডাকলেন গোলুটভিনোতে। তারপরের দিনই তিনি কোলোম্না শহরের কিছু প্রতিনিধির সাথে একটি বৈঠক সারলেন। এরপর একে একে শ্চেলকোভো, কুন্টসেভো, পুশকিনো— এইসব জায়গায় গেলেন, সভা করলেন, সবজায়গায় তিনি বিপ্লবের যে অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা, তাকে জাগিয়ে তুললেন, ক্লান্ত-ক্লিষ্ট মানুষের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটালেন এবং মস্কো সংলগ্ন শহরতলির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সর্বহারা মানুষ, যারা ১৯০৫-এর পরাজয়ের প্রভাব কাটিয়ে উঠছিলেন, তাঁদের একজোট করা শুরু করলেন। এ এক দীর্ঘ সাংগঠনিক কাজ।‘
শ্রমিক পরিবারের যে মহিলারা মূলত শ্রমিকদের জন্য রান্না করা, শিশুদের যত্ন নেওয়ার মত ঘরোয়া কাজ করেন, ববরোভস্কায়া তাঁদের অবজ্ঞা করেই লিখতে পারতেন। কিন্তু তা তিনি করেননি। তিনি বুঝেছিলেন বিপ্লবের সাফল্যের জন্য তাকে প্রতিটি গেরস্থালির মধ্যে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। তিনি লিখেছেন, 'সমস্ত কাজকর্মের পরে মহিলাদের পক্ষে আন্দোলনের কাজের জন্য সময় বের করা ও মানিয়ে নেওয়াই কঠিন।' পরে তাঁর স্মৃতিকথায় তিনি লেখেন ‘অনেক বছর ধরে বিভিন্ন অবৈধ বেআইনি কাজকর্ম করার সময়ে দেখেছি বহু বিপ্লবীর স্ত্রী’রা মূলত তাঁদের সন্তানদের জন্য বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এবং গেরস্থালির বিভিন্ন কাজ করতে গিয়ে সেভাবে বিপ্লবী কাজকর্মে যোগ দিয়ে উঠতে পারেন না। যদিও তাঁদের মধ্যে একজন পার্টি কর্মী হয়ে ওঠার সমস্ত গুণ রয়েছে। এই মহিলাদেরও পরিবার ববরোভস্কায়া বা নাতাশার মতই। কিন্তু তাঁরা সামাজিক বিভিন্ন আচার, নিয়মের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। সেই সময়ে পারিবারিক ও সামাজিক এই ক্ষেত্রটি ততটা রাজনৈতিক পরিসর হিসেবে ধরাও হত না। এই বিষয়টি নিয়েই পরবর্তীতে আরেক বলশেভিক, কোলোনতাই তাঁর ১৯০৯ সালের প্রচারপত্র The Social Basis of the Woman’s Question-এ এবং এলিয়ানর মার্ক্স ও এডওয়ার্ড আভেলিং তাঁদের ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ The Woman’s Question: from a Socialist Point of View -এ আলোচনা করেছেন।
শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে আসা বিপ্লবীদের প্রয়োজনীয়তা ববরোভস্কায়ার কাছে স্পষ্ট হয়েছিল ১৯০৫-এর পরাজয়ের পর থেকে। পার্টির সমর্থক ও দরদীরা আর তেমন কোনো সাহায্য করা বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং পার্টি খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল বুদ্ধিজীবী মহলের দ্বারা ‘পরিত্যক্ত’ হয়ে যাওয়ার ফলে। ‘আমরা একেবারেই সেকেলে', ববরোভস্কায়া লিখেছিলেন তাঁর স্মৃতিকথায়। কিন্তু এই কঠিন সময়েও যাঁরা পার্টিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বিপ্লবের দিকে, সেইসব পেশাদার বিপ্লবীরা বেশিরভাগই ছিলেন শ্রমিক শ্রেণি থেকে উঠে আসা কিংবা শ্রমিকদের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করা কমরেডরা। এঁরাই ছিলেন নভেম্বর বিপ্লবের শিরদাঁড়া, মূল চালিকাশক্তি। গোটা দেশ জুড়ে যে-সমস্ত পার্টি ইউনিট সচল ছিল, সেসবই এঁদের জন্যই।
ববরোভস্কায়া নির্বাসনে থাকার সময়ের একটি ঘটনা তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন। ১৯০২ সাল নাগাদ আরও কয়েকজন নির্বাসনে থাকা বলশেভিক কমরেডদের সঙ্গে তিনি একটি জঙ্গলে ঘুরতে গেছিলেন। সেখানে একটি রেস্তোঁরাতে কফি খেতে খেতে গল্পগুজব করবার সময় একজন কমরেড বলেন জারের শাসন শেষ হলে তাঁরা ছুটি নিয়ে সুইজারল্যাণ্ডের পাহাড়ে যাবেন। এইসব নিয়ে তাঁরা হাসিঠাট্টা করছিলেন। ববরোভস্কায়া লিখছেন- 'কিন্তু আমরা তখনও বুঝিইনি যে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এটা আমাদের ভুল অনুমান। রাশিয়ার স্বৈরাচারী শাসককে হটানোর পরেই আদতে আসল কাজ শুরু হবে, বিশ্রামের কোনো সময়ই থাকবে না। তাছাড়াও রাশিয়া জারের শাসন থেকে মুক্ত হলে বিপ্লবী সরকার কেনই বা নিজেদের দেশের সুন্দর, মনোরম জায়গাগুলি বাদ রেখে ছুটি কাটাবার জন্য সুইজারল্যাণ্ডে নিজের দেশের মানুষদের পাঠাবে?’
ববরোভস্কায়ার এই বইয়ের আখ্যান শেষ হয় বিপ্লবের দিন সন্ধ্যায়। জারের শাসন শেষ এবং নতুন সময় শুরু নিয়ে তেমন কিছুই নেই। তাঁর স্মৃতিকথা শেষ হচ্ছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষ লগ্নের সময়ে। লেনিনকে নিয়ে তাঁর লেখা বইয়ে যদিও লেনিনের কাউন্সিল অফ পিপল-এর কমিসার হওয়া পর্যন্ত বর্ণনা রয়েছে।
ববরোভস্কায়া নভেম্বর বিপ্লবে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। বলশেভিক পার্টির মস্কো শাখার হয়ে ১৯১৯-২০ পর্যন্ত সেনাসংক্রান্ত দপ্তরের কাজ চালিয়েছেন, কমিন্টার্নের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন ১৯১৮-৪০ পর্যন্ত। তিনি জানতেন বিপ্লবের সময়ে যা যা ঘটছে সেগুলো নথিভুক্ত করার জন্য প্রচুর লোক থাকবে, কিন্তু সেগুলো ঘটবার পিছনের মূল কারণগুলি বলার কেউ থাকবে না। ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পশ্চাৎপটে আসলে যে ছোট বড় ঘটনাগুলি রয়েছে, সেইগুলি দেখানোর দিকেই তাই তাঁর নজর ছিল। এখানেই তিনি অনন্য।
ভাষান্তর: তর্পণ সরকার
সিসিলিয়া সাময়লোভ্না ববরোভস্কায়া (১৮৭৩-১৯৬০) ছিলেন একজন শুরুর দিকের বলশেভিক কর্মী, বিপ্লবী ও স্মৃতিকথা রচয়িতা। তিনি বলশেভিক পার্টির বিভিন্ন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন যার ফলে তাঁকে রুশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিগ্রহ ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে বারবার। তিনি ১৯১৮ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত কমিন্টার্নের হয়েও কাজ করেছেন। পরবর্তীতে যুক্ত ছিলেন পার্টির প্রধান তত্ত্বচর্চা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান Institute of Marxism-Leninism-এর সাথে।
১৯৩৪ সালে নিউ ইয়র্কে ইংরেজি ভাষায় তর্জমা করে প্রকাশিত হয় তাঁর স্মৃতিকথার সংকলন ‘Twenty Years in Underground Russia. Memoirs of a Rank-and-File Bolshevik’ (রাশিয়ায় কুড়ি বছরের আত্মগোপন পর্ব: একজন সাধারণ বলশেভিক কর্মীর স্মৃতিকথা)। ১৯৩৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা আরেকটি বইয়ের ইংরেজি তর্জমা, ‘Lenin’s Road to the October Revolution’। ২০১৭ সালে লেফট ওয়ার্ড প্রকাশনা দুটি রচনা অল্প কিছু পরিমার্জন করে একত্রে ‘Rank-and-File Bolshevik: A Memoir’ নামে দিল্লি থেকে প্রকাশ করে। বইটির ভূমিকা লিখেছেন বিজয় প্রসাদ। মূল ভূমিকার কিছু নির্বাচিত অংশসহ সিসিলিয়ার স্মৃতিকথার একটি ছোট অংশ বাংলায় তর্জমা করে পুনরুদ্ধৃত করা হল।
প্রথমেই গভর্নরের কাছে আবেদন করলাম ভেইলজে তেমন কোনো ভালো ডাক্তার না থাকায় ভিটেব্সক-তে ডাক্তার দেখাতে যাওয়ায় অনুমতি দেওয়ার জন্য। প্রায় তিনমাস অপেক্ষা করতে হল গভর্নরের অনুমতির জন্য। ওখানে পৌঁছেই বিদেশ যাওয়ার রাস্তা খুঁজতে শুরু করলাম। বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা পয়সাও প্রয়োজন। টাকাপয়সার বিষয় বাদেও আরেকটি দিক আছে, যে-কোনো দিন রাশিয়ার কোনো দূরতম প্রান্তে আমার নির্বাসন হতে পারে; সেখান থেকে পালানো আরও কঠিন হবে। অবশেষে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে আমার সফর নির্ধারিত হল। ভিটেব্সকের একদল ইহুদি শ্রমিক বাইলস্টক পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। তারপর সেখান থেকে সীমান্ত পেরোনোর বন্দোবস্তও তারা করল।
ভিনস্ক হয়ে বাইলস্টক পৌঁছই, যেখানে সেই শ্রমিকের দলের লোকেরা তাদেরই একজনকে আমার সাহায্যের জন্য রেখে দেয়। তিনি ছিলেন একজন কাপলিনস্কি (পোল্যাণ্ডের একধরণের ইহুদি সম্প্রদায়, হিব্রু ‘কাপান’ শব্দ থেকে ‘কাপালিনস্কি’ শব্দটি প্রথমে পোলিশ ভাষায় ও পরবর্তীতে রুশ ভাষায় এসেছে, হিব্রুতে এর অর্থ পুরোহিত হলেও এই সম্প্রদায়ের মানুষরা মূলত শ্রমিকের কাজই করতেন)। তিনি অন্যদেশে চলে যাওয়ার সময় কমরেডদের সীমান্ত পেরোনো, বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি এই ধরণের কাজে সাহায্য করতেন।
ভিনস্ক পৌঁছে জানতে পারি কিছুদিনের জন্য বাইলস্টক পৌঁছনো খুব ঝুঁকিপূর্ণ হবে কারণ সেখানে এক সম্মেলন থেকে প্রতিনিধিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই কাপলিনস্কি সোসনভিটস্কির একটি কারখানার ডিরেক্টরের মেয়েকে লেখা একটা রেকমেণ্ডেশনের চিঠি দিলেন। সোসনভিটস্কি থেকে কাট্টভিটসে যাওয়ার ব্যবস্থা সে করে দেবে। সেই বেচারা মেয়েটি আমাদের পার্টির দরদী ছিল কিন্তু তার বয়স এতটাই কম ও সে এতটাই অনভিজ্ঞ যে এই ধরণের একটা কাজে সে খানিক ফ্যাসাদেই পড়ল। তাছাড়া সোসনভিটস্কির প্রায় সবাই তাকে চেনে। সমস্যা আরও বাড়ল। কাট্টভিটসে যাওয়ার জন্য তার পাসপোর্টটি ব্যবহার করা ছাড়া আর কোনো সাহায্যই প্রায় সে করতে পারল না।
সেই ডিরেক্টরের বাড়িতে তার মেয়ের কয়েকজন অবাঞ্ছিত বন্ধুর সঙ্গে কয়েকটি দুর্ভোগে ভরা দিন কাটল। শেষ পর্যন্ত ডিরেক্টরের মেয়ের পাসপোর্ট নিয়ে রওনা দিলাম। দুজন অল্পবয়সী কমরেড কাট্টভিটস অবধি আমার সঙ্গে গিয়ে আবার সোসনভিট্টসে ফিরে এল। আর সেই ডিরেক্টরের মেয়ে পুলিশের কাছে জানাল যে তার পাসপোর্টটি খোয়া গেছে। ঠিকঠাকভাবেই জুরিখে পৌঁছলাম। অ্যাক্সেলরডের (পাভেল বরিসভিচ অ্যাক্সেলরড ছিলেন রাশিয়ার প্রথমদিকের একজন মার্ক্সবাদী নেতৃত্ব। ১৮৮৩ সালে জেনেভায় রাশিয়ার মার্ক্সবাদীদের তৈরি প্রথম সংগঠন শ্রমিক মুক্তি সঙ্ঘের অন্যতম সদস্য) সঙ্গে আগে থেকেই আমার একধরণের সখ্যতা ছিল। জুরিখে আবার ওঁনার সাথে খানিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হল।
প্রথমদিকে, আমার জেনেভায় আসার পরবর্তী সময়ের থেকে ১৯০২ সালে আমাদের রুশ পার্টির বিদেশে থাকা অংশ একটি আলাদা আঙ্গিক নিয়ে এল। ১৮৯৮ থেকে ১৮৯৯, এই সময়কালের থেকে ১৯০২-এর সময়ের মূল তফাৎটা হয়ে দাঁড়াল রুশদের ওপর যে আদর্শগত প্রভাব Emancipation of Labor বা শ্রমিক মুক্তি সঙ্ঘের থাকার কথা ছিল সেটি ও তাদের সংগঠন তৈরির কাজের বিচ্ছিন্নতার ফারাক। এটা সত্যি যে, কিছু রুশ ছাত্র জুরিখে অ্যাক্সেলরডের নেতৃত্বে ও জেনেভায় প্লেখানভের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল কিন্তু কোনো ধরণের সাংগঠনিক যোগাযোগ রাশিয়ার কারোর সঙ্গে ছিল না। অল্পবয়েসি যেসব প্রবাসী রুশ মানুষজন আসত, তাদের কাছে সংগঠনের ভাবমূর্তি খুব একটা ভালো ছিল না। রাশিয়ার জেলখানায় কিছুদিন কাটিয়ে ফেরৎ আসায় তাদের মনে হত পার্টির সঙ্গে যে-কোনো ধরণের যোগাযোগ তারা নিজেদের দেশেই ছেড়ে এসেছে।
বিদেশে পার্টি সংগঠনের সাথে রাশিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের প্রতিদিনের কাজকর্মের মধ্যে পাকাপাকিভাবে একটি ঠিকঠাক যোগাসূত্র তৈরি হয় ১৯০০ সালে ইসক্রা দলের তৈরি হওয়ায়। লেনিন ও মরো এই দলের নেতা ছিলেন। এই পত্রিকার চতুর্থ সংখ্যায় লেনিনের বিখ্যাত লেখা কোথা থেকে শুরু করতে হবে -তে পার্টির কাঠামো ও গঠনতন্ত্র নিয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়। এটি আসলে লেনিনের বিখ্যাত বই কী করিতে হইবে-র ভূমিকা ছিল। এই বইটি ১৯০২ সালে প্রকাশিত হয় যা একটি বিপ্লবী পার্টির সংবিধান তৈরির পথ দেখিয়েছিল।
সেই সময়ে ইসক্রা শুধুমাত্র বিদেশ থেকে প্রকাশিত একটা পত্রিকা ছিল না, এটি রাশিয়াতেও ব্যপকভাবে জনপ্রিয় ছিল। তাছাড়াও সংগঠন গড়ে তোলার একটি ভূমিকাও এই পত্রিকা পালন করত। এই সাংগঠনিক দিকটি লেনিনের মস্তিষ্কপ্রসূত ও নিজের হাতে তৈরি। প্রথমে পার্টির ক্যাডারদের ইসক্রার সম্পাদকমণ্ডলীর থেকে রাশিয়ার বিভিন্ন গ্রামে ও জনপদে পাঠানো হত। সেখানে তাঁরা ইসক্রার হয়ে বিভিন্ন খবর সংগ্রহ করতেন। গোপনে বিদেশে ইসক্রার দপ্তরে সেইসব খবর পাঠানোর ও সামগ্রিকভাবে রাশিয়ার পরিস্থিতি জানানোর বন্দোবস্ত করতেন। এর সাথে আরও অনেক এমন দক্ষ ও পেশাদার বিপ্লবীদের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হত যাঁরা ইসক্রার এইসব কাজ তো সামলাতেনই পাশাপাশি পার্টির বিভিন্ন পুস্তিকা, পত্রপত্রিকার প্রচার ও বিলি করার কাজ করতেন। এমনকি তাঁরা প্রয়োজন অনুযায়ী কমরেডদের সীমান্ত পারাপার করে দেওয়া, পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়ার মত বিভিন্ন কাজ খুবই দক্ষতার সাথে সামলাতেন।
ইসক্রার খবর দাবালনের মত সাইবেরিয়ার দূরতম প্রান্তেও পৌঁছে গেছিল। ১৯০২ সালে বেশ কয়েকজন কমরেড সাইবেরিয়ার জেলখানা থেকে পালিয়েছিলেন। একসাথে বেশ অনেকজন তরতাজা নতুন কমরেডরা সাইবেরিয়ার নির্বাসনের কারাগার ভেঙে সুইজারল্যাণ্ড বা লণ্ডনের এই ইসক্রার ঘাঁটিগুলিতে চলে আসেন। লেনিনও তখন বিদেশেই ছিলেন। এদের সবার সাথে আমার খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় সহজেই। আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করতাম, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম, আমাদের আগের বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে কথাবার্তা হত। এমনকি জেলের ভিতরের অভিজ্ঞতা, পুলিশের আচরণ নিয়েও কথা হত সেইসময়ে। কিন্তু এই সবকিছুর মূল কথা যা ছিল সেটা হচ্ছে রাশিয়ার বিপ্লব।
একবার আমরা সবাই মিলে একটা জঙ্গলে হাঁটতে গেছি। ফিরতি পথে একটি পাহাড়ি রেস্তোঁরাতে কফি খেতে ঢোকা হয়েছে। সেদিনের বিকেলটা ছিল খুবই সুন্দর, আনন্দে ভরা। আমাদের একজন কমরেড খুবই আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন। তিনি সুইজারল্যাণ্ডের মানুষদের নিজেদের দেশে স্বাধীন, সুখের জীবনের সাথে রাশিয়ার খেটে খাওয়া মজুর আর কৃষকদের জীবনের তুলনা করতে শুরু করলেন। অন্য আরেকজন বললেন ‘শুনুন কমরেড, আমরা যখন রাশিয়ার স্বৈরাচারী শাসককে হটাতে পারব, তখন নতুন বিপ্লবী সরকার আমাদের ছুটি কাটাতে জুরিখে পাঠাবে। এই পাহাড়ে, এই জঙ্গলে অনেক সময় হাতে নিয়ে অলসভাবে আমরা মিল্ক পুডিং খাব।‘ আমরা সবাই হেসে উঠলাম। কিন্তু তখনও আমরা বুঝিইনি যে, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভুল অনুমান। রাশিয়ার স্বৈরাচারী শাসককে হটানোর পরেই আদতে আসল কাজ শুরু হবে, বিশ্রামের কোনো সময়ই থাকবে না। তাছাড়াও রাশিয়া জারের শাসন থেকে মুক্ত হলে বিপ্লবী সরকার কেনই বা নিজেদের দেশের সুন্দর, মনোরম জায়গাগুলি বাদ রেখে ছুটি কাটাবার জন্য সুইজারল্যাণ্ডে নিজের দেশের মানুষদের পাঠাবে?
এরপর আমি জেলের অফিসের ভিতরে গেলাম কে কে জেল থেকে পালিয়ে গেল, তা বুঝতে। বিষয়টা গভর্নরকে জানিয়ে সরেজমিনে ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে গেলাম আমরা।
জেলের অফিসার লুচিনস্কির দিকে তাকালাম... কেউ জানে না কতজন মোট পালিয়েছে। রাজনৈতিক বন্দীদের নাম ডাকা শুরু হল। চৌষট্টিজনের মধ্যে (একান্নজন পুরুষ, তেরোজন মহিলা) বাহান্ন জনের উপস্থিতি পাওয়া গেল আঠেরো তারিখের হিসেব অনুযায়ী। বাকি সবাই, মানে- জোসেফ বাসভস্কি, নিকোলাই ব্যোম্যান, জোসেফ ব্লুমেনফেল্ড, ভ্লাদিমির বব্রোভস্কি, ম্যাক্স লিটভিনভ, মারিয়ান গুরস্কি, ভিক্টর ক্রোখমাল, বরিস মাল্টসম্যান, লেভিক হালপেরিন, বমলেভ, প্লেসকি আর জোসেফ প্যাটনিটস্কি’রা পালিয়ে গেছে।‘
কিয়েভ থেকে আসা কমরেডরা ও আমরা যারা আগে থেকেই জুরিখে ছিলাম তারা অ্যাক্সেলরডের কাছে জড়ো হলাম। প্লেখানভের স্থায়ী বাসস্থান ছিল জেনেভায়। তবে প্রায়শই তিনি জুরিখে আসতেন রাশিয়ার Practical Worker-দের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে (রাশিয়ার বাইরে থাকা কমরেডদের Practical Worker বলা হত)। তিনি রাশিয়ার প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে আমাদের প্রশ্ন করতেন। যেমন একদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ-ই জিজ্ঞেস করলেন আগের দিনের লিফলেটটা ঠিক কীভাবে বিলি করেছিলাম। প্লেখানভ পরামর্শ দিলেন বিভিন্ন পাবলিক বাথহাউসে (এটি রাশিয়ার বহু পুরনো এক সংস্কৃতি, একসঙ্গে অনেকজন মিলে স্নান করবার একটি জায়গা) আমরা লিফলেট বিলি করতে পারি কিনা। যে-কোনো শনিবার কোনো বাথ হাউসে সঙ্গোপনে ঢুকে যারা স্নান করছে, তাদের জামা কাপড়ের ফাঁকে লিফলেট রেখে বেরিয়ে আসা যায় কিনা। এই পরিকল্পনাটা আমার খুব একটা ভালো লাগেনি। কোনোভাবে কেউ যদি তাদের জামাকাপড়ের মধ্যে লিফলেট রাখার সময় দেখে ফেলে তাহলে একটা বড়ো গোলমাল বাধবে আর আমরা সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার হব। কিন্তু প্লেখানভের মত এমন একজন বড় মাপের নেতা, যিনি সারাদিন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তিনি পার্টির দৈনন্দিন কাজের এমন খুঁটিনাটি নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছেন, এই বিষয়টা আমার নজর কাড়ল।
গ্রীষ্মের শেষের দিকে আমাদের জুরিখে জড়ো হওয়া লোকজনদের শহর ছেড়ে অন্য জায়গায় যাওয়ার একটা প্রবণতা শুরু হয়। প্রথম জুরিখ ছাড়েন নসভক ওরফে বরিস। দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসের অভ্যর্থনা সমিতির একজন সদস্য ছিলেন বরিস। তাঁকে ইসক্রার লণ্ডনের অফিস থেকে ডেকে পাঠানো হল। যে কমরেডরা লণ্ডনে যেতেন তাদের ওপর আমাদের একধরণের ঈর্ষা হত। কারণ, লণ্ডন যাওয়ার অর্থ কমরেড লেনিনের সঙ্গে দেখা হওয়া। আমাদের দলের অনেকে এবং আমিও খুব করে চাইতাম লেনিনের সঙ্গে অন্তত একবার সামনাসামনি দেখা করতে। যদিও বরিসের জন্য আমাদের ভালো লাগছিল, কারণ তিনি পার্টির ইতিহাস রচনা করার কাজে যাচ্ছেন আর পার্টি কংগ্রেস আয়োজনের একটা বড় দায়িত্বও তাঁর ওপর। এই পার্টি কংগ্রেস নিয়ে আমাদের উৎসাহ ছিল অনেক বেশি কারণ ইসক্রার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবরকমের সুবিধাবাদী ঝোঁক নির্মূল করে এই পার্টি কংগ্রেস থেকেই ধ্রুপদী মার্ক্সবাদী একটি সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা ছিল।
ইসক্রার এই পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহই নেই কারণ ইতিমধ্যে রাশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এই পদ্ধতিতে সংগঠন পরিচালনা করে হাতেকলমে ভালো ফলাফল মিলেছে। মাত্র কয়েকটি সংগঠনে অর্থনীতিবাদীদের প্রভাব ছিল (অর্থনীতিবাদী অর্থাৎ, একদল মানুষ, যারা বিশ্বাস করত শ্রমিকদের কাজ হবে শুধু মালিকের সঙ্গে লড়াই করে মজুরি বৃদ্ধি করা। রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিবর্তনের কাজে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। এই মতবাদে বিশ্বাসীরা আসলে আপোষকামী ও মার্ক্সবাদের সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণির পার্টি তৈরির বাস্তবতা থেকে উঠে আসা দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তিকে অস্বীকার করে)। এই অর্থনীতিবাদীদের অন্যতম ছিল ভরোনেজহ কমিটি। কানাঘুষো শোনা যেত এই কমিটির সদস্য আসলে একজন, শ্রমিক স্বার্থ আন্দোলনের নেতা আকিনভ মাকোনভের বোন। তখনও তামরা ভাবতেই পারিনি ইসক্রা-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পার্টিও বলশেভিক ও মেনশেভিক- এই দুইভাগে ভাগ হয়ে যাবে। যদিও আমাদের কাছে খবর আসছিল যে ইসক্রার অফিসে সব কাজকর্ম খুব ভালোভাবে চলছে না। মাঝেমাঝে খবর পাওয়া যেত, লেনিন আর প্লেখানভের মধ্যে নাকি বিভিন্ন গোলমাল হচ্ছে। কিন্তু আমরা তেমন মনোযোগ দিতাম না। কারণ, অ্যাক্সেলরড বলতেন প্লেখানভ তাঁর বয়সের কারণে একটু খামখেয়ালি হয়ে যাচ্ছেন আর লেনিন সেইসব খামখেয়ালিপনা মেনে নিতে পারছেন না।
বরিস চলে গেলে আমাকে আর কজহেভনিকভ নামের আরেকজন কমরেডকে অন্যত্র পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। কজহেভনিকভ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন মস্কো যাওয়ার জন্য। আর আমি বরিসের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করে ইয়ারোস্লাভল, কস্ট্রোমা, ভসনেসেন্সকদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করা যায় কিনা সেটা ভাবতে থাকলাম। আমরা দুজনেই প্রস্তুতি শুরু করে দিলাম। আমাদের দুজনের কাছেই ছোট খাতায় অনেকের ঠিকানা আর সেখানে গিয়ে বলার পাসওয়ার্ড লেখা ছিল। সেটা মুখস্থ করতে হচ্ছিল। কারণ আমাদের সঙ্গে এমন একটিও কাগজ নিয়ে যাওয়া যাবে না যা থেকে আমরা ধরা পড়লে বাকি কমরেডদের পরিচয় প্রকাশ হয়ে যেতে পারে।
আমি কোনোদিন ভুলব না কীভাবে আমরা দুজন স্কুলের বাচ্চাদের মত ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে নাম, ঠিকানা, পাসওয়ার্ড মুখস্ত করছিলাম। “কাস্ত্রামা, নিজহনায়া ডেবরায়া, ফিলথবস হাউস, মারিয়া স্টেলপানোভা; পাসওয়ার্ড- ‘আমরা সামনের বসন্তের পরিযায়ী পাখির দল’, মস্কো, জিভোদেরকা, ভ্লাদিমির ডল্গরুভস্কায়া, ফার্মাসি, ফার্মাসিস্ট; পাসওয়ার্ড- ‘আমাকে গান গাওয়া পাখিরা পাঠিয়েছে’, উত্তর- ‘স্বাগত তোমাকে’।” এইগুলো খুব ভালো করে মন দিয়ে মুখস্থ করতে হত যাতে আমরা নিজহনায়া ডেবরায়াকে কাস্ত্রামা শহরেই খুঁজি, অন্য কোথাও না।
এই ধরণের কাজের পাশাপাশি আমাদের চুল রং করতে হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এটা খুব সফল হয়নি। কজহেভনিকভ ওর চুল পুরোপুরি কালো করে নিল যদিও ওর মুখের বাকি অংশ পুরোপুরি সাদাই থাকল। এতে খুব করে বোঝা যাচ্ছিল চুলটা রঙ করা। তাই চুলের রঙ ধুয়ে ফেলতে পারলেই বরং ভালো হত। এরপর আমি ঠিক করলাম চুল রঙ করব না।
সীমান্ত পার করতে আমি হেডউইগ নাভোতনি নামের জনৈক অস্ট্রিয়ান অভিনেত্রীর পাসপোর্ট পেলাম। তাই একটা ধোপদুরস্ত হালকা কোট, টুপি আর রেশমের ছাতা কিনতে হল। কোটের ধারে একটুকরো লিনেন সেলাই করলাম। সেই লিনেনের ভিতরে ইসক্রা অফিস থেকে পাঠানো একটা লিফলেটের বয়ান লিখে নিলাম। সেই লিফলেটটি ছিল লেনিনের নিজের লেখা, সেন্ট পিটার্সবুর্গ থেকে ছাপা আর সেটা পুরো রাশিয়ায় বিলি করা হয়েছিল। জুরিখ ছাড়ার আগে লিফলেটটা দেখে দেখে লিনেনের মধ্যে সেই সময়ে নিজের হাতে লিখলেও এখন আর কিছুতেই ওটায় কী লেখা ছিল তা মনে করতে পারছি না।
কোনোরকম অ্যাডভেঞ্চার ছাড়াই সীমান্ত পেরোলাম এমনটা নয়। কোনো কারণে সেই সময়ে সীমান্তের প্রহরীরা ঠিক করল অস্ট্রিয়ান অভিনেত্রী হেডউইগ নাভোতনিকে তল্লাশি করবে। এই বিষয়টা আমার খুব একটা পছন্দ হচ্ছিল না। আমার কোটটি যতটা নিরীহ দেখতে লাগছে বাইরে থেকে, আসলে তো ততটা নয়। যাই হোক, আমাকে ভিতরের একটি ঘরে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে একজন মহিলা পুলিশকর্মী দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে জামাকাপড় এমনকি পরচুলাটি পর্যন্ত খুলে ফেলতে বলা হল। পুলিশ অফিসার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব পরীক্ষা করলেন কিন্তু পিছনের চেয়ারে খুলে রাখা আমার কোটটির দিকে বিশেষ নজর দিলেন না। ফলত তিনি সন্দেহজনক কিছুই পেলেন না।
কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছিল যখন খেয়াল হল আনন্দের চোটে সদ্য কেনা সুন্দর বিদেশি ছাতাটি মনের ভুলে ফেলে এসেছি। ওটা যেন আমার এই সুন্দর হালফ্যাশানের পোশাকের ওপর একটা শেষ অলংকার ছিল। ছাতাটা হারিয়ে এতটাই খারাপ লাগছিল যে, পুলিশ অফিসে ফিরে গিয়ে ছাতাটা নিয়ে আসার কথাও ভাবছিলাম। কিন্তু সরকারের খাতায় লেখা আমার আগের সমস্ত ‘অন্যায়’-এর কথা ভেবে আবার সেখানে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি নিলাম না। খুব কষ্ট করেই আমার কেতাদুরস্ত সাজগোজের সব থেকে জমকালো জিনিসটা ওদের কাছে ফেলে রেখে এলাম।
মূল রচনা I go underground-এর বাংলা তর্জমা করেছেন তর্পণ সরকার।
প্রকাশের তারিখ: ২৬-নভেম্বর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
