সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নরকের প্রহরীরা
নন্দন রায়
ফ্যাসিস্টদের সমর্থন জুগিয়ে এভাবে সব একচেটিয়া বৃহৎ বাণিজ্য সংস্থাগুলি সুবিধা পায় বটে, কিন্তু সকলে সমান এবং অতিরিক্ত সুবিধা পায় না। তাদের মধ্যে তুলনায় নতুন সংস্থাগুলি, যাদের নৈতিকতার বাহুল্য নেই, যারা কাজ হাসিলের জন্য যা খুশি তা-ই করতে প্রস্তুত, যারা সরকারি কর্মকাণ্ডের সুলুক সন্ধান জানে, কোন সাহেব কী ধরণের উপঢৌকনে তুষ্ট হয় সেসব খোঁজ খবর রাখে, তারাই বিশেষ আনুকুল্য পায়। ফরাসী বামপন্থী ড্যানিয়েল গুয়েরিন তাঁর বই Fascism and Big Business-এ লিখেছেন, প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া সংস্থাগুলি, যারা বস্ত্র শিল্পের মত ট্র্যাডিশনাল শিল্পে জড়িত, ইওরোপের ফ্যাসিস্ট জমানাগুলি, তাদের থেকে বেশি পছন্দ করে তুলনায় নতুন একচেটিয়াগুলিকে যারা ভারী শিল্পে ও অস্ত্র নির্মাণ শিল্পে জড়িত।

১। অথ আদানি কথা
একথা আজ সবাই জানে যে গত প্রায় দশ বছরে, যতদিন নরেন্দ্র মোদি দিল্লিতে রাজত্ব করছেন, ততদিনেই গৌতম আদানি দুনিয়ার ধনীদের তালিকায় ৬২৯ নম্বর থেকে ৩ নম্বরে উঠে এসেছিলেন। এ কথাও আজ সকলে জানেন যে আমেরিকার হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ গোষ্ঠীর রিপোর্টে যখন বিভিন্ন জালিয়াতি ও কারচুপির মাধ্যমে আদানি কীভাবে তাদের শেয়ার ও বন্ডের দাম কৃত্রিমভাবে ফাঁপিয়ে তুলে উত্থানের এই উল্কা-গতি হাসিল করেছে, সেই ঘটনা ফাঁস হয়ে গিয়েছে, তখন মাত্র দু’দিনের মধ্যের মধ্যেই ধনী-তালিকায় আদানির অবস্থান ৩ থেকে ২৯-এ নেমে এসেছে। হিন্ডেনবার্গের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ামাত্র আদানি (একেবারে মোদির স্টাইলেই) ‘পবিত্র ক্রোধে’ জ্বলে উঠে জানাল এই মিথ্যা রিপোর্ট কেবল তার সংস্থার বিরুদ্ধেই নয়, দেশের বিরুদ্ধেও। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতির অভূতপূর্ব উন্নতির বিরুদ্ধে এ এক গভীর ষড়যন্ত্র। তার পরেও অবশ্য আদানির শেয়ার ও বন্ডের দামের পতনে বিন্দুমাত্র ছেদ পড়েনি।
আদানি-আম্বানিদের এই বিপুল উত্থানের পেছনে পর্দার আড়ালে কার করকমলস্পর্শ রয়েছে, সেকথাও সকলে অবগত আছেন। এমনকি হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার ঠিক পরপরই যখন আদানিদের শেয়ারে ধ্বস নামতে শুরু করেছে, সেই ধ্বস রুখতে এলআইসি ও স্টেট ব্যাঙ্ক আদানির শেয়ার কিনতে ২৫০ কোটি ও ৩০০ কোটি টাকা ফের ঢালতে উদ্যোগী হয়েছিল। এর আগেই অবশ্য ফাঁপিয়ে তোলা শেয়ার বন্ধক রেখে এলআইসি প্রায় ৮০,০০০ কোটি টাকা এবং স্টেট ব্যাঙ্কের নেতৃত্বে আরও কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রায় ৬৫০০০ কোটি টাকা লগ্নি করে বসে আছে। সেইসব শেয়ার ও বন্ড এখন খোলামকুচিতে পরিণত হওয়ায় এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির লক্ষ লক্ষ সাধারণ গ্রাহকের কষ্টার্জিত টাকা খোয়া যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সংসদ উত্তাল হয়েছে তদন্তের ও প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতির দাবিতে। সরকার অবশ্য, বলা বাহুল্য, সে দাবি মানেনি, আর স্বয়ং মোদি প্রস্তরবৎ নীরব। অথচ মোদি-আদানি সম্পর্কের মাধুর্যের কথা শিশুরা পর্যন্ত জানে। দেশের প্রায় যাবতীয় বিমান ও নৌ বন্দর ইত্যাদি আরও নানাবিধ বরাত যেভাবে আদানি হস্তগত করেছে সে কথা আর নাই-বা বলা হ’ল, এমনকি যখনই মোদি বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ইজরায়েল, মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে গেছেন, পিছু পিছু আদানিও সে-দেশে হাজির। মোদি দেশে ফিরে আসার পরে আদানিও ফিরে এসেছে, অবশ্য খালি হাতে নয়, বন্দর নির্মাণ অথবা খনির ইজারা বাগিয়ে।
সরকারী অর্থ সংস্থাগুলির টাকা কোথায় লগ্নি করা হবে সেই সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের তো বটেই, এমনকি লগ্নির পরিমাণ একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক ছাড়িয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীরও অনুমোদন লাগে। ফলে আদানিদের বিভিন্ন সংস্থায় এলআইসি ও ব্যাঙ্কের যে বিপুল পরিমাণ লগ্নি আছে, সেকথা মোদির অজানা থাকার কথা নয়। আরও চমকপ্রদ ঘটনাও রয়েছে। এই দুর্দিনের বাজারে আদানিরা খুব সাহসী মুখ করে পূর্ব নির্ধারিত ২০,০০০ কোটি টাকার এফপিও বাজারে ছেড়েছিল। ইস্যু বন্ধ হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত এফপিও-র মোট মূল্যের মাত্র ৩ শতাংশ কেনার আবেদন জমা পড়েছিল, কিন্তু না জানি কার ইঙ্গিতে শেষ দিনে গোপন non institutional investor-রা ঝাঁপিয়ে পড়ে পুরো ২০,০০০ কোটি টাকার এফপিও কেনার আবেদনপত্র জমা দিয়ে দিল। কার ইঙ্গিতে কর্পোরেট বেরাদরির এমন আশ্চর্য ঘটনা ঘটল সেকথাও সকলে বুঝতে পারছেন। শুধু তা-ই নয়, এখন আদানিকে নিয়ে এমন হইচই হচ্ছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে আদানির বিদ্যুৎ বিক্রি করার যে চুক্তি কিছুদিন আগে হয়েছে, সেই চুক্তি সংশোধনের দাবি তুলে বাংলাদেশ জানিয়েছে যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে কয়লা লাগবে, আদানিরা তার দাম যত ধরেছে তার এক-তৃতীয়াংশ দামে বাংলাদেশে কয়লা পাওয়া যায়। এমনকি বেগতিক বুঝে খোদ উত্তরপ্রদেশ সরকার আদানিকে দেওয়া স্মার্ট মিটার সরবরাহের বরাত কোনও কারণ উল্লেখ না করে বাতিল করে দিয়েছে। অথচ গত বছর রাজ্যে রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগমগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে এবার থেকে দেশি কয়লার সঙ্গে অন্তত ১০ শতাংশ আদানির আমদানি করা কয়লা মেশাতে হবে। সেই কয়লার দাম পড়বে টন প্রতি প্রায় ২০,০০০ হাজার টাকা। অথচ এই ঘটনা নিয়ে কংগ্রেস, টিআরএস প্রভৃতি দল সংসদে আপত্তি জানালেও বিশেষ শোরগোল হয়নি।
২। মোদির বন্ধুরা
আদানিকে নিয়ে এত কথা বলা হ’ল এই কারণে যে সম্প্রতি পতনোন্মুখ আদানি আমাদের মধ্যে অনেকেরই বেশ উল্লাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন আদানির বেকায়দায় পড়ার মধ্যে মোদির পতনের প্রতিচ্ছায়া যেন দেখা যাচ্ছে। এটা দৃষ্টিভ্রম। কারণ প্রথমত, এদেশের কর্পোরেট-ফিনান্সিয়াল অভিজাততন্ত্রের নিজেদের মধ্যে স্বার্থের বন্ধনটি একদিকে যেমন নেহাত ঠুনকো নয়, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির সঙ্গে এদের গাঁটছড়াও বেশ মজবুত। এর প্রমাণ হিসেবে দেখা গেল যে আদানির এফপিও-র জন্য আবেদন এক রাতের মধ্যেই পূরণ হয়ে গেল, যা তার আগে পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়বে বলে মনে হচ্ছিল। কারণ মোদির গদি রক্ষা করা কর্পোরেটের সাধারণ স্বার্থ। শুধু দেশি কর্পোরেটরা নয়, আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজিও আদানির পেছনে সক্রিয়। তাকে বাঁচাতে আবু ধাবি থেকে পেট্রো ডলারও হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যাতে ফিনান্স পুঁজির শক্তির ওপর মানুষের কনফিডেন্সে কোনও চিড় না ধরে। দ্বিতীয়ত, কেবল আদানি একা মোদির ‘বন্ধু’ নয়, আম্বানি, বেদান্ত গোষ্ঠীর অনিল আগরওয়াল প্রভৃতি অনেকেই রয়েছে। মোদি নীরব থাকলেও নীরব-ভাই, মেহুল-ভাইদের কথা আর না-ই বা তুললাম। এসব সখ্য মোদি যে খুব বেশি গোপন করে তা-ও নয়। পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পরে আহমেদাবাদ থেকে আম্বানিদের বিমানে চেপে দিল্লিতে শপথ নিতে এসে মোদি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছিল যে এবার থেকে তার সরকার কাদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে। গরিবদের নিয়ে তার যা কিছু ‘বেদনাশ্রু’, তা যে নেহাতই জুমলা সে কথা তো অমিত শাহ প্রথম দিনেই বুঝিয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতারোহণের ঠিক পরেই আম্বানির জিও মোবাইল পরিষেবা উদ্ঘাটনের বিজ্ঞাপনে দেশের সমস্ত পত্রিকায় পাতা-জোড়া বিজ্ঞাপনে শুধুই মোদির মুখ—যেন দেখে মনে হয় এটা একটা সরকারি প্রকল্প! এছাড়া বিমান নির্মাণে ষাট বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হ্যাল (Hindustan Aeronautics Ltd)কে তাচ্ছিল্য করে দেউলিয়া হয়ে যাওয়া অনিল আম্বানিকে রাফায়েল যুদ্ধ বিমানের কনট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়ার খবর নিয়ে রাহুল গান্ধী অনেক মাতামাতি করলেও খোদ সুপ্রিম কোর্ট মোদিকে ক্লিন চিট দিয়েছে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির বদান্যতায়।
গত দশ বছরে নিপুণ পরিকল্পনায় প্রায় প্রতিটি সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে নয়া ফ্যাসিবাদি শাসকরা এমন কব্জা করে ফেলেছে যে একটা আদানি থাকল নাকি গেল তাতে খুব বেশি কিছু যায় আসে না। তবে বিজেপির তহবিলের ব্যাপারটা দেখতে হবে বইকি। ইলেক্টোরাল বন্ডের যে ৮০-৮৫ শতাংশ বিজেপির তহবিলে ঢুকেছে, তাতে আদানির ভাল রকম যোগদান রয়েছে। এই টাকাতেই জনপ্রতিনিধি কেনা-বেচা হয়, সরকার ভাঙা-গড়ার খেলা চলে, ভোটের সময় প্রতিদ্বন্দ্বীদের ম্রিয়মান করে দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির এমন চমকপ্রদ প্রচারে দেশ ছেয়ে দেওয়া হয় যে বিজেপি ছাড়া আর কেউ ভোটে লড়ছে কিনা মানুষ সেই ধন্ধে পড়ে যান। তাছাড়া সারা বছর ধরে অক্লান্ত ভাবে চলে ফেক নিউজের ও ট্রোল-আর্মির কারখানা, ঘৃণা ছড়ানোর ষড়যন্ত্র, যাতে গোটা সমাজটারই ফ্যসিবাদিকরণের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলে। তাই আদানির স্বার্থও দেখতে হয়, আবার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে আদানির সঙ্গে লোকদেখানো দূরত্বও বজায় রাখতে হয়। সংসদে এনিয়ে তাই আলোচনা চলতে পারে না।
৩। মোদির বন্ধু-প্রীতি কি ফ্যাসিবাদের নতুন প্রবণতা?
মার্কসবাদ আমাদের শিখিয়েছে যে কোন সমগ্র খণ্ড খণ্ড সত্তা দিয়ে তৈরি এবং খণ্ডগুলি পৃথক অস্তিত্বশীল। যেহেতু এরা পৃথক, তাই তাদের মধ্যেকার পারস্পারিক সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। তাই আমরা যখন কোনও সমগ্রকে সমগ্র হিসেবে বিচার করব, বিশেষত কোনও ফ্যসিবাদী জমানার রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিচার করব, তখন আমাদের সমগ্রের অভ্যন্তরে এই দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় রাখা দরকার। তাই কর্পোরেট অলিগার্কি সাধারণ ভাবে একট ‘সমগ্র সত্তা’ হলেও এর অভ্যন্তরে খণ্ড খণ্ড সত্তা বিরাজ করে এবং তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বও রয়েছে। প্রভাত পট্টনায়েক একে বলেছেন Layers of Corporate Financial Oligarchy।
ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে তৃতীয় কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের মূল্যায়নের সময় থেকে মার্কসবাদীরা এই জমানার চরিত্রায়ণ করে বলেছিলেন যে একচেটিয়া পুঁজির নিরঙ্কুশ সমর্থনই ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করে। বস্তুত, ফ্যসিবাদি শাসনের প্রতিষ্ঠার পেছনে একচেটিয়া পুঁজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। তাই ১৯৩০ দশকের ফ্যাসিবাদী উত্থান সম্পর্কে মাইকেল কালেচকি বলেছিলেন, ‘বৃহৎ বাণিজ্যের সঙ্গে ফ্যাসিস্ট ভুঁইফোড়দের অংশীদারী’। ফ্যাসিস্টদের সমর্থনের বিনিময়ে একচেটিয়া পুঁজি নিজেদের ‘পাউন্ড অফ ফ্লেশ’ আদায় করে নেয় বিপুল পরিমাণে সরকারি বরাত বাগিয়ে, সরকারকে দেয় করের পরিমাণ হ্রাস করিয়ে, অন্যান্য অনায্য সুযোগ-সুবিধা চাপ দিয়ে আদায় করে এবং এসবের ফলে বিপুল মুনাফা লাভ করে।
ফ্যাসিস্টদের সমর্থন জুগিয়ে এভাবে সব একচেটিয়া বৃহৎ বাণিজ্য সংস্থাগুলি সুবিধা পায় বটে, কিন্তু সকলে সমান এবং অতিরিক্ত সুবিধা পায় না। তাদের মধ্যে তুলনায় নতুন সংস্থাগুলি, যাদের নৈতিকতার বাহুল্য নেই, যারা কাজ হাসিলের জন্য যা খুশি তা-ই করতে প্রস্তুত, যারা সরকারি কর্মকাণ্ডের সুলুক সন্ধান জানে, কোন সাহেব কী ধরণের উপঢৌকনে তুষ্ট হয় সেসব খোঁজ খবর রাখে, তারাই বিশেষ আনুকুল্য পায়। ফরাসী বামপন্থী ড্যানিয়েল গুয়েরিন তাঁর বই Fascism and Big Business-এ লিখেছেন, প্রাচীন ও প্রতিষ্ঠিত একচেটিয়া সংস্থাগুলি, যারা বস্ত্র শিল্পের মত ট্র্যাডিশনাল শিল্পে জড়িত, ইওরোপের ফ্যাসিস্ট জমানাগুলি, তাদের থেকে বেশি পছন্দ করে তুলনায় নতুন একচেটিয়াগুলিকে যারা ভারী শিল্পে ও অস্ত্র নির্মাণ শিল্পে জড়িত।
অনুরূপ ভাবে জাপানেও সেই সময়ে একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। সেখানে একচেটিয়া শিল্প-বাণিজ্য সংস্থাগুলিকে ‘জাইবাতসু’ বলা হয়। পুরনো জাইবাতসুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মিতসুই, মিতসুবিশি, সুমিতোমোএবং ইয়াসুদা সংস্থাগুলি। এরা নানা ধরণের ট্র্যাডিশনাল শিল্পে বেশ বিখ্যাত ছিল। তুলনায় নবীন একচেটিয়া সংস্থাগুলি, যাদের বলা হ’ত ‘শিনকো জাইবাতসু’, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম নিসান, তারা ছিল বেশি আগ্রাসী এবং তাদের ক্ষেত্র ছিল ভারী শিল্প, অস্ত্র নির্মাণ, প্রায় খনিজহীন জাপানে যা সবচেয়ে বেশি দরকার, বিদেশের মাটিতে খনিজ উত্তোলন। নিসান কোম্পানি কোরিয়ায় গিয়ে সেখানকার শ্রমিকদের নির্মম শোষণ ক’রে খনিজ আহরণের জন্য কুখ্যাত ছিল। ১৯৩০-এর দশকে জাপানের সমরবাদীদের কাছে এই শিনকো জাইবাতসুরা অনেক বেশি প্রিয় ছিল।
হিটলার ক্ষমতায় আসার মাত্র এক বছর আগে, ১৯৩২ সালে জার্মানির নাৎসি পার্টি নিদারুণ অর্থকষ্টে ভুগছিল। ক্ষমতায় এসেই ১৯৩৩-এর ২০ ফেব্রুয়ারি তারিখে দেশের বড় বড় শিল্পপতিদের এক সভায় ডেকে তাদের দেশপ্রেমের প্রমাণ দাবি করলো। রূঢ় অঞ্চলের স্টিল ব্যারন গুস্তাভ ক্রুপ তৎক্ষণাৎ নাৎসি পার্টির ফান্ডে ১০ লক্ষ মার্ক দান করে ‘দেশপ্রেমের’ পরিচয় দিল। অন্যরাও হাজার হাজার মার্ক দান করে হিটলারকে সন্তুষ্ট করল। ক্রুপ হিটলার প্রীতির প্রমাণ দিতে শিল্পপতিদের একজোট করার কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। তার সঙ্গী হল অন্যান্য শিল্পপতিরা যেমন আই জি ফারবেন, বশ, ডিমলার-বেঞ্জ, হেনশে্ল, য়ুঙ্কার, মেসারমিট, সিমেন্স, ফোক্সভাগেন এবং ডাচ কর্পোরেশন ফিলিপ্স। গুস্তাভ ক্রুপকে ১৯৩৩ সালের শেষের দিকে হিটলার ‘ফুয়েরার অফ ইন্ডাস্ট্রি’ উপাধি দেন। এসব বিবরণ দিয়ে জার্মান লেখক ডেয়ারমুট জেফ্রি তার গ্রন্থ Hell’s Cartel-এ বলেছেন, ‘যখন রাজনৈতিক লক্ষ্য ও মুনাফার উগ্র বাসনা বিপজ্জনকভাবে পরস্পরের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে, তখন কোনো কিছুই আর অসম্ভব মনে হয় না’।
অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে মোদির ‘বন্ধু-প্রীতি’ একুশ শতকের ভারতীয় নয়া ফ্যসিবাদের নতুন কিছু প্রবণতা নয়, ১৯৩০-এর দশকের ফ্যাসিস্ট সর্দারদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই মোদি চলেছে।
৪। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে মার্কসবাদীদের মূল্যায়ন
তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে উপস্থিত প্রতিনিধিরা ১১ দিন ধরে আলোচনা করেন। আলোচনা শেষে ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে মার্কসবাদীদের মূল্যায়নের সারসংকলন করে জর্জি দিমিত্রভ বলেছিলেন, “শাসন ক্ষমতায় আসীন ফ্যাসিবাদ হচ্ছে লগ্নি পুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে সংকীর্ণ এবং উৎকট জাতীয়তাবাদী এবং সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী অংশের প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কতন্ত্র।“ অর্থাৎ সামগ্রিক ভাবে পুঁজিবাদী শ্রেণি নয়, সেই শ্রেণির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল অংশের সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্বের অভিধা হচ্ছে ফ্যসিবাদ। ফ্যাসিবাদের এইরূপ সংজ্ঞা ছাড়া আর পাঁচটা বুর্জোয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের থেকে ফ্যসিবাদকে আলাদা করা যেত না। ফ্যসিবাদ সরকারের প্রকৃতিটাই পালটে দেয়। যেহেতু বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সমাজ ও রাজনীতির প্রাঙ্গনে আগে থেকেই প্রান্তিক অবস্থানে বিদ্যমান ফ্যসিবাদি শক্তি মানুষের হতাশাকে হাতিয়ার করে ক্ষমতায় আসীন হয়, তাই একা বামপন্থীদের পক্ষে ফ্যাসিবাদকে হঠানো সম্ভব নয়। বামপন্থীদের সঙ্গে দেশের অন্যান্য গণতান্ত্রিক ও আমাদের দেশে বিশেষ করে ধর্মনিপেক্ষ শক্তিগুলির সম্মিলনই পারবে ফ্যাসিবাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। তাই বামপন্থীদের আশু লক্ষ্য হ’ল নয়া ফ্যাসিবাদকে শাসন ক্ষমতা থেকে হঠিয়ে একটি গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণকামী সরকারের প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু সেই নতুন সরকারের আমলেও মোদি ও তার দলবলের দ্বারা এতদিন ধরে গড়ে তোলা সামাজিক ফ্যাসিবাদিকরণের প্রভাব তো থেকে যাবে, থেকে যাবে আদানি-আম্বানিদের মত নরকের প্রহরীরা, যাদের টিকে থাকার আসল জোরের জায়গাটি হচ্ছে অর্থনীতির নয়া উদারবাদী কর্মসূচি। নতুন সরকারের সামনে তখন দুটি বিকল্প থাকবে—হয় নয়া উদারবাদী কর্মসূচির কাছে আত্মসমর্পণ করা অথবা তার অন্তর্ঘাত করা। নতুন সরকার কোন পথ অবলম্বন করবে, সেটা নির্ভর করবে বামপন্থীদের নিজস্ব শক্তির ওপরে। সেই মধ্যমেয়াদী পথটি কুসুমাস্তীর্ণ নয়,বলাই বাহুল্য।
ঋণঃ Layers within the Corporate Financial Oligarchy, Prabhat Patnaik. People’s Democracy Jan27-Feb02,2020.
— মতামত লেখকের নিজস্ব
প্রকাশের তারিখ: ১২-ফেব্রুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
