সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মার্কিন দেশের সাম্যবাদী মেয়েরা – পর্ব ১
এঞ্জেলা ডেভিস
লুসি পারসনস্ হলেন সেই সীমিত সংখ্যক কালো-চামড়ার নারীদের একজন, যাঁর নাম কখনো-কখনো যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনের ধারাবিবরণীতে প্রকাশিত হয়েছে। ‘হে-মার্কেট শহিদ’ অ্যালবার্ট পারসনস্-এর একনিষ্ঠ পত্নী হিসাবে প্রায় সর্বজনীনভাবে তিনি পরিচিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবেই, লুসি পারসনস্ ছিলেন তাঁর স্বামীর অন্যতম সহযোদ্ধা এবং সমর্থক। কিন্তু কেবলমাত্র একজন একনিষ্ঠ, শোকস্তব্ধ এবং ক্ষুব্ধ বিধবা নারী যিনি স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত ছিলেন— এইটুকু বললে তাঁর সম্পর্কে অতি সামান্যই বলা হয়।

লেখক পরিচিতি
[এঞ্জেলা ডেভিস-এর জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-মধ্য ভূখণ্ডে, আলাবামা প্রদেশের বার্মিংহাম শহরে। পড়াশোনা করেছেন ফ্রাঙ্কফর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানেই মাস্টারমশায় হারবার্ট মার্কুইজ-এর সঙ্গে সখ্য হয়। বাকি সময়ে জড়িয়ে পড়েন অতিবাম রাজনীতিতে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ হন। শিক্ষক জীবনের সূচনা ১৯৬৯-এ। সে-বছর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপকের চাকরি পান বটে, কিন্তু শেষ অবধি ‘মুখ খারাপ’ ক’রে বহিষ্কৃত হতে হয় । এঞ্জেলা ডেভিসের রাজনৈতিক জীবন নিস্তরঙ্গ তো নয়ই, বরং অজস্র রোমাঞ্চের তরঙ্গ-ভঙ্গে আন্দোলিত।অস্ত্র-মামলায় ফেঁসে জেল খেটেছেন বৎসরাধিক কাল। যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্যে কমিউনিস্ট পার্টির তরফে ক্যান্ডিডেট হন, তখন আবার তিনি সান ফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ‘এথনিক স্টাডিজ়’-এর অধ্যাপকও। পরে অবশ্য ফিরেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, ‘ফেমিনিস্ট স্টাডিজ’ বিভাগের ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০৮ সাল অবধি। বর্ণ-বৈষম্য ও বর্ণ-হিংসার বিরুদ্ধে লড়াই, নারী-সাম্যের আন্দোলন এবং শ্রেণি-সংগ্রাম — এই তিনটি পরিপূরক সংগ্রামের পারস্পরিক ঘাত-প্রতিঘাত ও সংশ্লেষের কথা উঠে এসেছে তাঁর একাধিক রচনায়।
১৯৮১ সনে ডেভিস-এর ‘উইমেন, রেস অ্যান্ড ক্লাস’ শীর্ষক প্রবন্ধ-সংকলনটি প্রকাশিত হয়। এই সংকলনে আমেরিকার দাস-বাণিজ্য অবলুপ্তির আন্দোলন থেকে শুরু করে সূচিত ছয় দশকের নারীমুক্তি আন্দোলন পর্যন্ত ধারাবাহিক ইতিহাসের একটা রূপরেখা লিপিবদ্ধ করে রাখতে চেয়েছিলেন এঞ্জেলা ডেভিস। তবু এই বই মুখ্যত মার্কিন দেশের নারীমুক্তি আন্দোলনেরই ভাষ্য ও তত্ত্বায়ন। তেরোটি প্রবন্ধের এই সংকলন থেকেই আমরা নিচের প্রবন্ধটি অনুবাদের জন্যে বেছে নিয়েছি। ]
১৮৪৮ সালে, অর্থাৎ যে বছর কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস্ তাঁদের যৌথ উদ্যোগে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করলেন, সেই বছরেই ইওরোপ বহু বিপ্লবী আন্দোলন এবং উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়। ‘৪৮-এর এই বিপ্লবীদের মধ্যে সেনাবাহিনীর উচ্চপদাধিকারী একজন আর্টিলারি অফিসারও ছিলেন। তিনি মার্কস, এঙ্গেলস-এর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী এবং বন্ধু ছিলেন, নাম জোসেফ ওয়েডামেয়ার। একদা তিনি পরিযায়ী অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান, এবং সেই দেশের সর্বপ্রথম মার্কসবাদী সংগঠন তৈরি করেন। ১৮৫২ সালে ওয়েডামেয়ার যখন সর্বহারাদের এই সংগঠন ('প্রোলেটারিয়ান লিগ') তৈরি করেন, সেই দলের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে একজনও মহিলা-কর্মী ছিলেন না। অথবা সেখানে কোনও মহিলা থাকলেও নামহারা ইতিহাসের স্রোতে সেই নাম হারিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী কয়েকটি দশকে মহিলারা তাঁদের নিজস্ব শ্রমিক সংগঠনগুলিতে দাসত্বমুক্তি এবং স্বাধিকার অর্জনের লড়াইয়ে সরব হতে আরম্ভ করেন। কিন্তু মার্কসবাদী-সমাজবাদী আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপ, উদ্যোগেই যে তাঁদের উপস্থিতি টের পাওয়া গিয়েছিল, এমন নয়। ওয়ার্কিং মেন'স ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন, কমিউনিস্ট ক্লাব ইত্যাদি সর্বহারা সংগঠনগুলি গভীরভাবে পুরুষ-অধ্যুষিত এবং পুরুষ কর্তৃক পরিচালিত ছিল - চারিদিকে এমন অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে। এমনকি সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক সংগঠনও মূলত পুরুষ-সদস্য দ্বারাই পরিচালিত হত।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর সূত্রপাত পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসে। ১৯০০ সালে সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের জন্মলগ্ন থেকেই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবর্তন সূচিত হতে আরম্ভ করে। মহিলাদের সমানাধিকারের দাবিতে আন্দোলন জোরালো হয়। সামাজিক পরিবর্তনের লড়াইয়ে মহিলারা সামিল হতে আগ্রহী হন দ্রুত। যে সমাজ ক্রমাগত বহু মানুষের উপরে অন্যায় দমন, শাসন নামিয়ে আনছে, সেই সমাজ-কাঠামোর পরিবর্তনের লড়াইয়ে তাঁরাও যে সমান অধিকারী, সেই বিষয়ে সচেতনতা বাড়তে থাকে। মোটামুটিভাবে, ১৯০০ সাল থেকেই বাম-মার্কসবাদী সংগঠন নিজের দলের মধ্যে মহিলা অনুগামীদের বিশেষ প্রভাব অনুভব করেছিল।
দুই দশক ধরে মার্কসবাদের প্রধান মুখপত্র সোশ্যালিস্ট পার্টি মহিলাদের সমানাধিকারের লড়াইকে সমর্থন করে। কার্যত, বহু দশক ধরে এটিই ছিল একমাত্র রাজনৈতিক দল, যারা মহিলাদের ভোটাধিকারের পক্ষে কথা বলে গেছে। ভোটাধিকার সংক্রান্ত দাবির যে একচেটিয়া আধিপত্য দশক-কাল জুড়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মহিলাদেরই করায়ত্ত ছিল, তাকে শ্রমিক-শ্রেণির মধ্যে সঞ্চারিত ও রূপায়িত করার জন্য পওলিন নিউম্যান অথবা রোজ স্নাইডারম্যানের মতন সমাজতান্ত্রিক, লড়াকু মহিলাদের কথা বারেবারে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে হয়। ১৯০৮ সালে সোশ্যালিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে জাতীয় মহিলা কমিশন তৈরি হয়। সেই বছরেরই মার্চ মাসে ৮ তারিখে এই দলের মহিলা-কর্মীরা নিউ ইয়র্ক শহরের লোয়ার ইস্ট সাইডে সমান ভোটাধিকারের দাবিতে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এই দিনটিই পরবর্তীকালে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়। ১৯১৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টি যখন গঠিত হল (আসলে দুইটি কমিউনিস্ট পার্টি, পরবর্তীতে যুক্ত হয়ে যখন একটিই সংগঠনের জন্ম নিল), পূর্ববর্তী সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের মহিলা-কর্মীরা এর প্রথম যুগের নেতা এবং সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। ‘মাতা’ এলা রীভার ব্লর, আনিটা হুইটনি, মার্গারেট প্রেভে, কেট সাডলার গ্রিনহালগ, রোজ পাস্টর স্টোকস এবং জেনেট পার্ল প্রমুখ কমিউনিস্ট নেত্রীই পূর্ববর্তী সমাজতান্ত্রিক দলের বাম সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
যদিও, 'ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড' কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না — এমনকি, তারা রাজনৈতিক সংগঠনগুলির বিরোধিতা করত, তথাপি তারাই কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সমগ্র পৃথিবীর শিল্প শ্রমিকদের সংগঠন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড (IWW), ১৯০৫ সালের জুন মাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। যা সমগ্র পৃথিবীতে মূলত 'উওবলিজ়' ('Wobblies') নামে পরিচিত। নিজেদের একটি শ্রমিক সংগঠন হিসাবে দৃঢ়ভাবে সংজ্ঞায়িত ক'রে IWW একথা স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করে যে, পুঁজিবাদী মালিক শ্রেণি এবং তাদের অধীনে কাজ করা শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে কখনো সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক থাকা সম্ভব নয়। উওবলিজ়-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল সমাজতন্ত্র এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছোনোর প্রধান হাতিয়ার হিসাবে তারা বেছে নিয়েছিল নিরলস শ্রেণি-সংগ্রামের পথ। যখন ‘বিগ বিল’ হেউড উওবলিজ়-এর প্রথম সভা আহ্বান করেন, সেখানে শ্রমিক সংগঠনের অগ্রণী নেতৃত্ব হিসাবে যে দুজন মানুষ মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন তাঁরা দুজনেই মহিলা— মেরি জোনস্ এবং লুসি পারসনস্।
যদিও সোশ্যালিস্ট পার্টি এবং আই ডব্লু ডবলু, উভয় সংগঠনই মহিলাদের এই পদাধিকার মেনে নিয়ে নেতৃত্ব দেওয়ায় এবং আন্দোলনের পথে উৎসাহিত করেছে, সেই সময়ে কিন্তু কেবল আই ডবলু-ই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সরাসরি, সুস্পষ্ট লড়াইয়ের পরিপূরক নীতিকে সম্ভাষণ জানায়। কালো মানুষদের উপরে দীর্ঘকাল ধরে ঘটে চলা অমানুষিক নিপীড়নকে ড্যানিয়েল ডিলিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক দল সে সময় স্বীকৃতি দেয়নি। এই সমস্ত কালো মানুষরা মূলত ছিলেন কৃষি-শ্রমিক, ভাগচাষী, সামান্য মজুরিতে ভাড়া করা কৃষক এবং ক্ষেতমজুর। সমাজতান্ত্রিকরা এই সময়ে বলতেন, কেবলমাত্র সর্বহারারাই তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি ইউজিন ডেবস্-এর মতন অসামান্য সংগঠকও বলতেন কালো মানুষদের স্বাধীনতা এবং সমানাধিকারের জন্য কোনও সামগ্রিক প্রতিরোধ প্রয়োজন নেই। যেহেতু সমাজতান্ত্রিকদের প্রধানতম গুরুত্বের বিষয়টি ছিল মালিক এবং শ্রমিকের দ্বন্দ্ব, সেহেতু ডেবস্ বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে নিগ্রোদের জন্য আলাদা করে কিছুই দেওয়ার নেই।” পৃথিবীর সমস্ত শ্রমিকদের হয়ে, তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এই শ্রমিকদের সংগঠিত করে বিপ্লবী, সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক পার্টির মতো করে আই ডবলু ডবলু বিষয়টিকে উপেক্ষা করতে পারেনি। তাঁরা কালো মানুষদের ভয়াবহ, স্পষ্ট সমস্যার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করেন।
মেরি হোয়াইট ওভিংটনের মতে, এই দেশের দুটি সংগঠন আছে যারা নিগ্রোদের সম্পূর্ণ অধিকারের প্রসঙ্গে সমানুভূতিশীল এবং এই ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগী। তাদের মধ্যে প্রথমটি হল কালো মানুষদের উন্নতিকল্পে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সমিতি, এবং দ্বিতীয় সংস্থাটি হল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড, যারা অশ্বেতকায় মানুষদের পৃথকীকরণের বিরুদ্ধতা করে। এই আই ডবলু ডবলু নিগ্রোদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল।
হেলেন হোলম্যান ছিলেন একজন সমাজতান্ত্রিক কালো নারী, জেলবন্দি নেত্রী, সংগঠক কেট রিচার্ড ও’হেয়ার-এর মুক্তির দাবিতে যাঁর কন্ঠস্বরই প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। সমাজতান্ত্রিক দলে তাঁর মতন অশ্বেতকায় নারী সংগঠক বিরল ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে, কারখানায় কর্মরতা কালো চামড়ার নারীর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য রকমের কম। এর ফলস্বরূপ, তাদের উপস্থিতি সত্ত্বেও তারা বারেবারেই সমাজতান্ত্রিক পার্টির নিয়োগকারীদের দ্বারা উপেক্ষিত হয়েছে। অশ্বেতকায় নারীদের প্রতি সমাজতান্ত্রিক শিবিরের উপেক্ষার যে দুর্ভাগ্যজনক উত্তরাধিকার, তার থেকে বেরিয়ে আসতে যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টিকে।
কমিউনিস্ট নেতৃত্ব এবং ইতিহাসবিদ, উইলিয়ম জেড ফস্টারের মতে, “বিংশ শতাব্দীর দুয়ের দশকের শুরুর দিকে, পার্টি, বিশেষ করে, উৎপাদন ক্ষেত্রে নিগ্রো-মহিলাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়টিতে উল্লেখযোগ্য রকমের উদাসীন ছিল।” যাইহোক, পরবর্তী দশক জুড়ে কমিউনিস্টরা যুক্ত-রাষ্ট্রের সমাজব্যবস্থায় বর্ণবিদ্বেষের কেন্দ্রটিকে চিহ্নিত করতে পারেন। তাঁরা কালো মানুষদের মুক্তি-কেন্দ্রিক একটি গুরুত্বপুর্ণ তত্ত্ব তৈরি করেন এবং বর্ণবিদ্বেষের বিরূদ্ধে একটি ধারাবাহিক সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলেন।
লুসি পারসনস্
লুসি পারসনস্ হলেন সেই সীমিত সংখ্যক কালো-চামড়ার নারীদের একজন, যাঁর নাম কখনো-কখনো যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলনের ধারাবিবরণীতে প্রকাশিত হয়েছে। ‘হে-মার্কেট শহিদ’ অ্যালবার্ট পারসনস্-এর একনিষ্ঠ পত্নী হিসাবে প্রায় সর্বজনীনভাবে তিনি পরিচিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবেই, লুসি পারসনস্ ছিলেন তাঁর স্বামীর অন্যতম সহযোদ্ধা এবং সমর্থক। কিন্তু কেবলমাত্র একজন একনিষ্ঠ, শোকস্তব্ধ এবং ক্ষুব্ধ বিধবা নারী যিনি স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত ছিলেন— এইটুকু বললে তাঁর সম্পর্কে অতি সামান্যই বলা হয়। ক্যারোলিন অ্যাশব-র সদ্য-প্রকাশিত জীবনীগ্রন্থ থেকে তাঁর ষাট বছরের অধিক সময় ধরে অতিবাহিত শ্রমিক আন্দোলনের সময়কালকে জানতে পারা যায়। হে-মার্কেটে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডেরও প্রায় এক দশক আগে থেকে তিনি শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তী পঞ্চান্ন বছর সেই আন্দোলনে তিনি সক্রিয় থাকেন। যৌবনে নানান সাহসী কর্মকাণ্ডের পথ পেরিয়ে পরবর্তীতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির উল্লেখযোগ্য সদস্যে পরিণত হন, তাঁর এই যাত্রাপথই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নির্ণায়ক।
১৮৫৩ সালে লুসি জন্মগ্রহণ করেন এবং সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দলের গুরুত্বপূর্ণ কর্মী-সদস্যে পরিণত হন ১৮৭৭ সালের শুরুর দিকে। পরবর্তী বছরগুলিতে এই বিপ্লবী সংগঠনের মুখপত্র, দ্য সোশ্যালিস্ট-এ তাঁর নানান প্রবন্ধ, কবিতা প্রকাশিত হয়। এবং পারসনস্ ক্রমে শিকাগো মহিলা শ্রমিক সংগঠন-এর সক্রিয় সংগঠকে পরিণত হন।
এই সময়েই, ১৮৮৬ সালের ১ মে, পুলিশ-প্ররোচিত দাঙ্গায় হে-মার্কেট স্কোয়্যারে আটজন প্রতিবাদী শ্রমিক-নেতার সঙ্গে তাঁর স্বামীও কর্তৃপক্ষের দ্বারা গ্রেপ্তার হন। লুসি পারসনস্ সেই মুহূর্ত থেকে হে-মার্কেট প্রতিবাদীদের মুক্তির দাবিতে প্রচার-আন্দোলন শুরু করেন। সারা দেশজুড়ে ভ্রমণের সুবাদে, তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক নেতা এবং বিপ্লবপন্থী কন্ঠস্বরে পরিণত হন। তাঁর এই পরিচিতির জন্য তাঁকে বহু বিঘ্নের মুখোমুখিও হতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ওহায়ো-র কলম্বাসে মার্চ মাসে তাঁর পূর্ব-নির্ধারিত একটি বক্তৃতা মেয়র নিষিদ্ধ করেন। এবং লুসি যখন এই নিষেধ উপেক্ষা করে তাঁর কর্মকাণ্ড চালাতে থাকেন, পুলিশ তাঁকে কারারুদ্ধ করে। একের পর এক শহরে তাঁকে নিষিদ্ধ করা হয়, তাঁর সভা চলাকালে গোয়েন্দা-দপ্তর সেখানে উপস্থিত থাকে, পুলিশ তাঁকে ক্রমান্বয়ে নজরদারিতে রাখে। এমনকি যখন তাঁর স্বামীর মৃত্যুদন্ডাজ্ঞা কার্যকরী হতে চলেছিল, সে সময়ে শিকাগো পুলিশ তাঁকে দুই সন্তান সহ গ্রেপ্তার করে। এবং গ্রেপ্তারকারীদের মধ্যে একজন মন্তব্য করেছিল, “হাজারটা দাঙ্গাবাজের থেকে এই মহিলাকে নিয়ে বেশি ভয়।”
যদিও তিনি কৃষ্ণাঙ্গ ছিলেন, ভিন্ন গাত্রবর্ণের মানুষদের মধ্যে বিবাহ বা সহবাস সংক্রান্ত আইনী বিধিনিষেধের কারণে এ তথ্য তিনি অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই গোপন করতেন— এবং তিনি নিজে নারী হওয়া সত্ত্বেও শ্রমিকশ্রেণীর প্রতি পুঁজিবাদীদের সামগ্রিক নিপীড়নের কাছে জাতিবিদ্বেষ বা লিঙ্গবৈষম্যও ম্লান হয়ে গিয়েছিল বলেই লুসি পারসনস্ মত প্রকাশ করেছেন। পারসনস্ বলেছেন, যেহেতু তাঁরা পুঁজিবাদী শোষণের দ্বারা বিপন্ন সুতরাং শ্বেতাঙ্গ এবং পুরুষদের মতোই কৃষ্ণাঙ্গ এবং মহিলাদেরও শ্রেণিসংগ্রামের উদ্দেশ্যে নিজেদের সর্বশক্তি উৎসর্গ করতে হবে। তাঁর চোখে কৃষ্ণাঙ্গরা বা মহিলারা কোনও বিশেষ ধরনের বঞ্চনা বা পীড়নের শিকার হন এমনটা নয় সুতরাং জাতিবিদ্বেষ বা লিঙ্গবৈষম্য নিয়ে স্পষ্টতই পৃথকভাবে কোনও গণআন্দোলনের প্রয়োজন নেই। লুসি পারসনস্-এর তত্ত্বানুসারে, নিজেদের বৃহত্তর শোষণকার্যকে বিধিসঙ্গত করে তোলার প্রয়াসে মালিকপক্ষই জাতি এবং লিঙ্গ সংক্রান্ত প্রসঙ্গগুলির উদ্ভাবন করে তুলেছে এবং সেগুলিকে কায়েম রেখেছে। নীতিহীন বিচারের নিষ্ঠুরতায় যদি কৃষ্ণাঙ্গ মানুষেরা নিষ্পিষ্ট হন, তার কারণ হল তাদের দারিদ্র, যা তাদের একটি দল হিসাবে চিহ্নিত করেছে— যে দলটি শ্রমিকরূপে সবচেয়ে বেশি অসহায়। ১৮৮৬ সালে পারসনস্ প্রশ্ন তুলেছিলেন, “যে নির্মম অত্যাচারের বোঝা নিগ্রোদের উপর স্তূপীকৃত হয়ে চলেছে, তার কারণ কেবলমাত্র তাদের গাত্রবর্ণ— এ কথা বিশ্বাস করার মতন নির্বোধ কেউ আছে নাকি!”
মোটেই তা নয়। এর কারণ হল, তারা দরিদ্র। এর কারণ হল তারা নির্ভরশীল। কারণ হল, শ্রেণি হিসাবে উত্তরাঞ্চলে, তাদের শ্বেতাঙ্গ মজুরি-শ্রমিক ভাইদের তুলনায় তারা দরিদ্রতর— এইটুকুই।
ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কার্স অফ দ্য ওয়ার্ল্ড নামক যে শ্রমিক সংগঠন, তার প্রথম দুজন নারী সদস্য হিসাবে যোগদান করেছিলেন লুসি পারসনস্ এবং ’মাদার’ মেরী জোনস। ১৯০৫ সালে আই ডবলু ডবলু-র প্রতিষ্ঠালগ্নে, শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে সমুচ্চ শ্রদ্ধার আসনে থাকা এই দু’জনকে আমন্ত্রণ করা হয় এবং তাঁদের পরিচালন সমিতিতে ইয়ুজেন ডেবস ও বিগ বিল হেউড-এর সঙ্গে একাসনে বসানো হয়। উপস্থিত প্রতিনিধিবর্গের সম্মুখে প্রদত্ত ভাষণে লুসি পারসনস্, শ্রমিক নারীদের প্রতি নিজের বিশেষ সংবেদনশীলতার কথা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে পুঁজিবাদীরা শ্রমের সামগ্রিক মূল্য হ্রাসের অভিসন্ধিতেই এই নারীশ্রমিক বিষয়টিকে উদ্ভাবন করেছে।
আমরা, এ দেশের মেয়েরা, চাইলেও আমাদের হাতে ভোটপ্রয়োগের অধিকার নেই… আছে কেবল আমাদের শ্রমশক্তি… যখনই মজুরি হ্রাসের প্রসঙ্গ উঠেছে, এই পুঁজিবাদী শ্রেণি সবসময় নারীদেরকেই ব্যবহার করেছে।
এছাড়া, সেই যুগে যখন দেহোপজীবিনীদের কথা আক্ষরিক ভাবে একেবারেই উপেক্ষা করা হত, পারসনস্ সেই সময়ে IWW-র সমাবেশে বলেছেন, “আমার যে বোনেদের আমি দেখতে পাই, যখন রাত্রিকালে আমি শিকাগোর পথে বেরোই— তাদেরও আমি প্রতিনিধি।”
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে লুসি পারসনস্ নিজেকে নবগঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে নেন। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত বহু মানুষের একজন হিসাবে তিনি এ বিষয়ে আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিলেন যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রেও শ্রমিকশ্রেণি জয়যুক্ত হতে পারে। যখন কমিউনিস্ট এবং অন্যান্য প্রগতিশীল শক্তিগুলি ১৯২৫ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সুরক্ষা সংগঠন স্থাপন করল, তখন পারসনস্ এই নবগঠিত গোষ্ঠীর সক্রিয় কর্মী হয়ে ওঠেন। তিনি ক্যালিফোর্নিয়া এবং আলবামায় যথাক্রমে টম মুনি এবং স্কটসবরো নাইন-এর মুক্তির জন্য লড়াই করেন। এছাড়া তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ কমিউনিস্ট অ্যাঞ্জেলো হার্নডন, যাঁকে জর্জিয়ার কর্তৃপক্ষ বন্দী করেছিল, তাঁর জন্যও লড়েছিলেন। লুসি পারসনসের জীবনীকারের গবেষানুসারে, তিনি ১৯৩৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৪২ সালে তাঁর প্রয়াণের পরে ডেইলি ওয়ার্কার-এ তাঁর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করে লেখা হয়— তিনি ছিলেন বর্তমান শ্রমিক আন্দোলন এবং ১৮৮০ সালের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঘটনাবলির মধ্যে যোগসূত্রের মতো। আমেরিকার মহিয়সী নারীদের মধ্যে তিনি অন্যতম, নির্ভীক এবং শ্রমিক শ্রেণির প্রতি উৎসর্গীকৃত প্রাণ।
এলা রিভ ব্লার
উল্লেখযোগ্য শ্রমিক নেতৃত্ব, নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আন্দোলন এবং শান্তি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী এলা রিভ ব্লার-এর জন্ম ১৮৬২ সালে। তিনি পরিচিত হয়েছিলেন ‘মাদার ব্লার’ হিসেবে। এলা রিভ ব্লার স্যোসালিস্ট পার্টি তৈরি হওয়ার পরেই তার সদস্য হন, কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন মার্কিন দেশের একজন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক নেতৃত্ব হিসেবে। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি হয়ে ওঠেন অসংখ্য ধর্মঘটের প্রাণভোমরা। ফিলাডেলফিয়ার স্ট্রিটকার চালকেরা ধর্মঘটে তাঁর প্রথম বক্তৃতার সাক্ষী ছিলেন। দেশের অন্যান্য প্রান্তে খনি শ্রমিক, সুতোকলের শ্রমিকেরা এবং ভাগচাষীরা উপকৃত হয়েছিলেন তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতায়। ৬২ বছর বয়সেও মাদার ব্লার জারি রেখেছিলেন এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে তাঁর যাতায়াত।
আটাত্তর বছর বয়সে মাদার ব্লার তাঁর জীবনের গল্প লিখে যান দুই মলাটের মধ্যে। প্রথমে একজন সমাজতন্ত্রী হয়ে জীবন শুরু ক'রে, পরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার মাধ্যমে তিনি আস্তে আস্তে কীভাবে শ্রমিক আন্দোলনের একজন সংগঠক হয়ে উঠেছিলেন, তাই জানাতে চেয়েছেন মাদার ব্লার। যখন সমাজতন্ত্রী ছিলেন, আলাদা করে কালো মানুষের বঞ্চনার কথা তাঁর শ্রেণিচেতনায় চেতনায় খুব গভীর রেখাপাত করেনি। তবে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ পাওয়ার পর থেকেই তিনি নিজে তো বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকেনই, তার পাশাপাশি বাকিদেরও এই লড়াই চালানোর সাহস জোগান। যেমন আমরা দেখব ১৯২৯ সালে পেন্সিলভানিয়ার পিটসবার্গে ইন্টারন্যাশনাল লেবার ডিফেন্সের কনভেনশন নিয়ে মাদার ব্লার লিখছেন —
“মোনোগাহালা হোটেলে আমাদের সব প্রতিনিধিদের জন্যই ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অথচ সেদিন রাতে হোটেলে পৌঁছানোর পর আমাদের সঙ্গে পঁচিশ জন নিগ্রোকে দেখে হোটেল ম্যানেজার জানান আজকের রাতটা ওরা এখানে থাকলেও কালকে সকালেই ওদের চলে যেতে হবে।
পরদিন সকালেই আমরা ঠিক করি যে কনভেনশনের বাকি কাজ হবে ওই হোটেলেই। হোটেলের লবিতে তখন সাংবাদিক, পুলিশ এবং উৎসুক জনতার ভিড়। তাদের উপেক্ষা করেই মিছিল ঢুকে পরে লবিতে। আমাদের ব্যানারে লেখা— নো ডিসক্রিমিনেশন…”
তিনের দশকের শুরুর দিকে নেব্রাস্কার লুপ সিটিতে একটি সভায় মাদার ব্লার বক্তব্য রাখেন। পোল্ট্রি মালিকদের বিরুদ্ধে মহিলাদের আন্দোলনের সংহতিতে সভাটির আয়োজন করা হয়েছিল। সভায় কালো চামড়ার মানুষদের উপস্থিতি দেখে বর্ণবিদ্বেষীরা আক্রমণ করে। সভাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে এক নিগ্রো দম্পতির সাথে মাদার ব্লারও গ্রেপ্তার হন। ওই দম্পতি হলেন মিস্টার ও মিসেস ফ্লয়েড বুথ। মিসেস ফ্লয়েড বুথ স্থানীয় যুদ্ধবিরোধী কমিটির নেতৃস্থানীয় সদস্য ছিলেন। অন্যদিকে তাঁর স্বামী সক্রিয় ছিলেন আনএমপ্লয়েড কাউন্সিলে। পরে স্থানীয় কৃষকরা মাদার ব্লারের জামিনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে আনলে তিনি তা অস্বীকার করেন; তিনি বুথেদের ফেলে রেখে আসতে চাননি—
“আমার কেবলই মনে হচ্ছিল কালো চামড়ার মানুষদের প্রতি এই তীব্র ঘৃণার পরিবেশে, দুজন নিগ্রো সহযোদ্ধাকে পেছনে ফেলে রেখে, আমি জামিন নিয়ে কিছুতেই জেল থেকে বেরিয়ে আসতে পারব না।”
এই সময়কালেই প্যারিসে আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মেলনের জন্য মাদার ব্লারের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল গঠিত হয় যার চারজন সদস্য ছিলেন কালো চামড়ার - ক্যাপিটোলা টাস্কার, আলাবামার ভাগচাষী, গোটা প্রতিনিধি দলের প্রাণ— লাবণ্যে ভরপুর এক দীর্ঘাঙ্গী, পেন্সিলভানিয়ার খনি শ্রমিকদের দ্বারা নির্বাচিত লুলিয়া জ্যাকসন, 'স্টকসবরো বয়েজ’-এর মায়েদের প্রতিনিধি; এবং ম্যেবল্ বার্ড, ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে পাঠরত এক কৃতী ছাত্রী যিনি ওই বয়সেই ইন্ট্যারন্যাশানাল লেবার অফিসের সদস্য ছিলেন।
১৯৩৪-এর প্যারিস সম্মেলনে মাদার ব্লার এবং সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব করতে আসা এক মহিলার সঙ্গে ক্যাপিটোলা টাস্কারও অ্যাসেম্বলির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন৷ অন্যদিকে ম্যেবল্ বার্ড কনফারেন্স সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন।
লুলিয়া জ্যাকসন, পেন্সিলভেনিয়ার খনি শ্রমিকদের কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিনিধি, প্যারিসের মহিলাদের সম্মেলনে অন্যতম নেতৃত্ব হয়ে ওঠেন। সম্মেলনে উপস্থিত শান্তিকামী ও হিংসা বিরোধী (প্যাসিফিস্ট) অংশের যুক্তিকে ভেঙে তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই, দীর্ঘমেয়াদি শান্তির একমাত্র পথ।” সম্মেলনে উপস্থিত এক প্যাসিফিস্ট (হিংসা ও যুদ্ধ-বিরোধী) অভিযোগ করেন—
“যুদ্ধবিরোধী ইস্তেহারে কেবলই লড়াইয়ের কথা। যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়াই, শান্তির পক্ষে লড়াই— লড়াই, লড়াই আর লড়াই... আমরা স্ত্রী, আমরা মা— লড়াই করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের সন্তান যদি অপরাধ করে, আমরা তাদের মতো খারাপ আচরণ করি না। ভালোবাসা দিয়ে আমরা তাদের জয় করি, লড়াই করতে যাই না কখনো।”
লুলিয়া জ্যাকসনের উত্তর ছিলো স্পষ্ট ও তীক্ষ্ণ :
“এই সম্মেলনের মঞ্চে বলা হয়েছে লড়াই করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের শত্রু যারা যুদ্ধ বাধায় তাদের সঙ্গেও আমাদের ভদ্র এবং দয়ালু আচরণ করতে হবে। আমি এই প্রস্তাবে সহমত নই। সবাই জানে যুদ্ধের অন্যতম কারণ পুঁজিবাদ। আমরা কি তাদের রাতে খাবার বেড়ে দেবো, বিছানা করে দেবো, যেমন আমাদের সন্তানের জন্য করি! না, আমাদের লড়াই করতেই হবে।”
মাদার ব্লার তার আত্মজীবনীতে জানান যে, জ্যাকসনের কথায় সম্মেলনে হাসির রোল ওঠে। উপস্থিত সকলেই হাততালি দিয়ে জ্যাকসনকে অভিবাদন জানান। এমনকি প্যাসিফিস্টরাও এই বক্তব্যে হেসে ফেলেছিলেন। সর্বসম্মতিক্রমে যুদ্ধবিরোধী ইস্তেহার গৃহীত হয়।
ক্যাপিটোলা টাস্কার, আমেরিকার নিগ্রো ভাগচাষী, সম্মেলনে নিজের ভাষণে ইউরোপের ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আমেরিকার বর্ণবিদ্বেষের তুলনা করেন। আলাবামার ভাগচাষীরা সংগঠিত হতে চাইলে তাদের ওপর নেমে আসা আক্রমণের কথা তিনি প্রতিনিধিদের জানান। ক্যাপিটোলা নিজে তীব্র ফ্যাসিবিরোধী ছিলেন। কারণ তিনি নিজেও ফ্যাসিবাদীদের হাতে বহুবার অত্যাচারিত হয়েছিলেন।
তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন ভাগচাষীদের মধ্যে প্রচলিত একটি গান গেয়ে—
নদীর তীরে নড়বড়ে এক গাছের মতো
জলের তোড়ে আমরা মোটেই ভাসব না তো
যুদ্ধ এবং ফ্যাসিবাদের সঙ্গে লড়াই
সেই লড়াইয়ে আমরা পিছু হটব না তো
আমেরিকা ফেরার পথে জাহাজে ক্যাপিটোলা তাঁর প্যারিসের অভিজ্ঞতা নিয়ে যা যা বলেছিলেন, মাদার ব্লার তার সমস্তটাই লিখে রাখেন—
“মাদার, আমি এবার আলাবামায় আমার একটুকরো জমির মাঝে দাঁড়িয়ে ভাবব, আমি কি সত্যিই গিয়েছিলাম প্যারিস! আমি কি সত্যিই ওই মহিয়সী মহিলাদের দেখেছি, শুনেছি ওদের কথা! নাকি সবই স্বপ্ন ছিল? আর যদি এসব স্বপ্ন না হয় তাহলে আমি গোটা আলাবামা জুড়ে বলে বেড়াবো, কেমন করে গোটা পৃথিবীর মহিলারা লড়াই করছেন, ঠিক আমাদেরই মতো।”
এইসব অভিজ্ঞতা থেকেই মাদার ব্লার এবং তার কমিউনিস্ট পার্টির সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নেন যে, শ্রমিক শ্রেণী একটি বৈপ্লবিক শক্তি হিসেবে তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারবে না, যদি না তারা বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধেও ক্লান্তিহীন লড়াই চালিয়ে যায়। আর এভাবেই কালো মানুষের লড়াইয়ে সহজেই মিশে যায় সাদা চামড়ার কমিউনিস্ট মহিলারা। এটাই এলা রিভ ব্লারের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি।
অ্যানিটা হুইটনি
অ্যানিটা হুইটনি ১৮৬৭ সালে সানফ্রান্সিসকোর একটি ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কেউ আন্দাজই করতে পারেননি যে তিনি একদিন ক্যালিফোর্নিয়া কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারপার্সন হবেন এবং একজন রাজনৈতিক কর্মী হয়ে উঠবেন। ওয়েলেসলির নামজাদা নিউ ইংল্যাণ্ড উইমেন্স কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে তিনি বিভিন্ন জনহিতকর সেবামূলক কাজ করতেন এবং অচিরেই নারীদের ভোট দানের অধিকার-আন্দোলনের কর্মী হয়ে ওঠেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে অ্যানিটা হুইটনি ইক্যুয়াল সাফরেজ লীগে যোগ দেন এবং নিজের প্রদেশের সভাপতি নির্বাচিত হন, তাঁর প্রদেশ গোটা যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ প্রদেশ হিসেবে উঠে আসে নারীদের ভোটদানের বিষয়ে।
১৯১৪ সালে অ্যানিটা হুইটনি স্যোসালিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কৃষ্ণাঙ্গদের শোষনের প্রতি তাঁর পার্টির নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও তিনি বর্ণভেদ প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইকে সমর্থন করতেন পুরোমাত্রায়। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অফ কালারড পিপল-এর সানফ্রান্সিসকো বে এরিয়া শাখা তৈরি হলে তিনি তার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন। স্যোসালিস্ট পার্টির বামপন্থী সদস্য হিসেবে তিনি ১৯১৯ সালে যাঁরা কমিউনিস্ট লেবার পার্টি তৈরি করেছিল, তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন। কিছুদিন পরেই এটি যুক্তরাষ্ট্রের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে এক হয়ে যায়।
১৯১৯ সাল ছিল এটর্নি জেনারেল এ মিশেল পামারের নেতৃত্বে কুখ্যাত কমিউনিস্ট-বিরোধী অভিযানের বছর। অ্যানিটা ছিলেন এই পামার অভিযানের অন্যতম শিকার। তিনি খোঁজ পেলেন ওকল্যাণ্ড সেন্টার অফ ক্যালিফোর্নিয়া সিভিক লিগের সাথে জড়িত মহিলাদের সামনে তাঁর যে বক্তৃতা করার কথা ছিল সেটির ওপর কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কর্তৃপক্ষের বারণ সত্ত্বেও তিনি ১৯১৯-এর ২৮ নভেম্বর বক্তৃতা করেন “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিগ্রো সমস্যা” নিয়ে। তাঁর বক্তৃতায় তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন গণপিটুনি ও গণহেনস্থার বিরুদ্ধে।
“১৮৯০, যখন থেকে আমরা পরিসংখ্যান পাচ্ছি; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৩২২৮টি গণপিটুনির ঘটনার মধ্যে ২৫০০ জন কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ ও ৫০০ জন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা গণপিটুনির শিকার হয়েছেন। শুধুমাত্র পরিসংখ্যান দিয়েই নিপীড়নের চরিত্রটা বুঝিয়ে দেওয়া যায়, তবে বোঝা শুধু নয়, আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত আমাদের দেশের এই লজ্জাজনক পরিসংখ্যান যাতে মুছে ফেলা যায় তা সুনিশ্চিত করা।”
তিনি ক্লাবের শ্বেতাঙ্গ মহিলা সদস্যদের বলেন, আপনারা জানেন একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ একবার বলেছিলেন যদি তিনি নরক এবং টেক্সাসের মালিক হন তাহলে টেক্সাসকে ভাড়া দিয়ে নরকে থাকবেন। তিনি এই ভদ্রলোকের কথাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেন। গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের প্রদেশগুলির মধ্যে টেক্সাস ছিল জর্জিয়া ও মিসিসিপির পরেই।
১৯১৯ সালে দাঁড়িয়েও একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষকে অন্য শেতাঙ্গদের কাছে আবেদন করতে হয় গণপিটুনির বিরুদ্ধে মতামত জানানোর জন্য। এই অবস্থার জন্য দায়ী একধরণের বর্ণবৈষম্যমূলক প্রোপাগাণ্ডা। কল্পিত কৃষ্ণাঙ্গ ধর্ষকের কল্প-কাহিনি ছড়িয়ে এই বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা হয়েছে। এমনকি বিভিন্ন প্রগতিশীল মানুষরাও নিজেদের গণ্ডির মধ্যে গণপিটুনির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে সংকোচবোধ করেন। বরং কোনো দক্ষিণের প্রদেশে একজন কৃষ্ণাঙ্গের, শ্বেতাঙ্গ মহিলার উদ্দেশে কুরুচিকর মন্তব্যকে টেনে আনা হয় এই ঘটনাগুলিকে ন্যায্যতা দিতে। এই প্রোপাগাণ্ডার পরেও বর্ণবৈষম্য নিয়ে যাঁদের নিজেদের অবস্থান খুবই স্পষ্ট ছিল অ্যানিটা হুইটনি তাঁদের অন্যতম। তিনি তাঁর অবস্থানের ফল স্বরূপ যেকোনো পরিণতির জন্য তৈরি ছিলেন। তাঁর গ্রেফতারি প্রায় অবশ্যম্ভাবী হলেও তিনি ওকল্যাণ্ড ক্লাব হাউসে গণপিটুনি নিয়ে কথা বলতে কোনো দ্বিধা বোধ করেননি। তাঁর বক্তৃতার শেষেই তাঁকে আটক করা হয় এবং বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়। এরপর হুইটনিকে দোষী সাব্যস্ত করে সান ক্যুয়েন্টিন জেলে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি তাঁর আপিল বন্ডে বেল হওয়ার আগের কয়েক সপ্তাহ কাটান। ১৯২৭-এ ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর মার্জনা করলে তিনি ধারাগুলি থেকে মুক্ত হন।
কুড়ি শতকের শ্বেতাঙ্গ মহিলা হিসেবে অ্যানিটা হুইটনি অবশ্যই বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক উজ্জ্বল যোদ্ধা। কৃষ্ণাঙ্গ কমরেডদের সঙ্গে মিলে তিনি এবং তাঁর মতো আরও অনেকে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির স্বার্থে কমিউনিস্ট পার্টির নীতি নির্ধারণ করেন, তাতে কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তির দাবি ছিল অন্যতম মূল দাবি। ১৯৩৬ সালে অ্যানিটা হুইটনি ক্যালিফোর্নিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির চেয়ারপার্সন হন এবং একই সঙ্গে পার্টির জাতীয় কমিটিতে কাজ করার জন্যে নির্বাচিত হন।
একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “অ্যানিটা, তুমি কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে কী ভাবো? এটা তোমার কাছে কী?”
“কেন?” বিস্ময়ে আলতো হেসে তিনি জবাব দেন — “কেন… এই পার্টি আমার জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি দুনিয়ার আশা, ভরসা।”
ক্রমশ…
ভাষান্তর: যশোধরা গুপ্ত, কৌশিকী ভট্টাচার্য, তর্পণ সরকার, সায়ন্তন সেন, সৃজনী গঙ্গোপাধ্যায়
প্রকাশের তারিখ: ১৭-এপ্রিল-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
