সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বন্দ্ব এবং পশ্চিমী বামদের চীন বিরোধিতা (শেষ পর্ব)
প্রভাত পট্টনায়েক
যখন পুঁজির কেন্দ্রীভবনের আরও উচ্চতর একটি পর্যায় দেখা দিল যা থেকে জন্ম নিল বিশ্বায়িত পুঁজি, এবং সর্বোপরি গড়ে উঠল বিশ্বায়িত ফিনান্স, এবং পতন হল সোভিয়েত ইউনিয়নের, তখনই স্রোতের মুখটা ঘুরে যায় সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে। পুঁজির এই বিশ্বায়নের সঙ্গে সোভিয়েতের পতনের কোনও সম্পর্কই ছিল না, এটাও মোটেই ঠিক কথা নয়।

এর ফলে আশু যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেকার দ্বন্দ্বটি যদি আন্তঃ–সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বের প্রতিফলন না হয়, তাহলে সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বন্দ্বের একেবারে তীব্র হয়ে ওঠাটা আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব? এই বিষয়টিকে বুঝতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পর্বে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে পুঁজিবাদকে দেখা গেল সেটা তখন খুব ভালভাবেই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অস্তিত্ব-সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে: তখন মেট্রোপলিটন দেশগুলির শ্রমিক শ্রেণি আর প্রাক–যুদ্ধকালীন পুঁজিবাদে ফিরে যেতে রাজি ছিল না। কারণ প্রাক–যুদ্ধকালীন পুঁজিবাদে দেখা গিয়েছিল গণহারে কর্মহীনতা এবং চরম দারিদ্র্য। অন্যদিকে তখন বিশ্বজুড়েই সমাজতন্ত্রের দারুণ অগ্রগতি হয়েছে। তখন ঔপনিবেশিক ও আধা–ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে দক্ষিণ গোলার্ধের মুক্তি সংগ্রামগুলি সত্যিসত্যিই একটা শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল। সুতরাং টিকে থাকার জন্যই পুঁজিবাদ তখন অনেকগুলি ছাড় দিতে বাধ্য হয়: সেই পর্বে চালু হয় প্রাপ্ত বয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকার, কল্যাণকর রাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা হয়, চাহিদার সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলি হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে এবং সর্বোপরি আনুষ্ঠানিক অর্থে রাজনৈতিক ভাবে উপনিবেশবাদের অবসান ঘটানোর বিষয়টা পুঁজিবাদকে মেনে নিতে হয়।
রাজনৈতিকভাবে উপনিবেশবাদের অবসানের মানে এই নয় যে অর্থনৈতিকভাবেও উপনিবেশবাদের অবসান ঘটল। অর্থাৎ তৃতীয় বিশ্বের সম্পদসমূহের ওপর নিয়ন্ত্রণের হাতবদল হয়ে গেল। বরং তখনও সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলির সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিল মেট্রোপলিটন পুঁজি। বস্তুতপক্ষে, এ ধরনের হাতবদল আটকাতে সাম্রাজ্যবাদ তিক্ত এবং দীর্ঘ লড়াই চালিয়ে গেছে, এবং এই লড়াইয়ের ছাপ রয়ে গেছে আরবেঞ্জ, মোসাদেগ, অ্যালেন্দে, চেদ্দি জগন, লুমুম্বা–সহ আরও অনেকগুলি সরকারকে উৎখাত করার ঘটনার মধ্যে। যদিও এরপরেও উপনিবেশবাদের অবসানে তৃতীয় বিশ্বের এই সব দেশগুলির অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মতো ক্ষমতাসম্পন্ন (dirigiste regimes) যে সরকারগুলি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ সেই সব সরকারের হাতে চলে যাওয়াটা আটকাতে পারেনি মেট্রোপলিটন পুঁজি।
যখন পুঁজির কেন্দ্রীভবনের আরও উচ্চতর একটি পর্যায় দেখা দিল যা থেকে জন্ম নিল বিশ্বায়িত পুঁজি, এবং সর্বোপরি গড়ে উঠল বিশ্বায়িত ফিনান্স, এবং পতন হল সোভিয়েত ইউনিয়নের, তখনই স্রোতের মুখটা ঘুরে যায় সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে। পুঁজির এই বিশ্বায়নের সঙ্গে সোভিয়েতের পতনের কোনও সম্পর্কই ছিল না, এটাও মোটেই ঠিক কথা নয়। বিশ্বায়নের ফাঁদে ফেলে দেশগুলিকে কব্জায় নিয়ে এল সাম্রাজ্যবাদ এবং তার ফলে বিশ্বায়িত ফিনান্সের স্রোতের ঘূর্ণিতে পড়ল দেশগুলি। তখনই পুঁজি দেশ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে — এই হুমকির সামনে ফেলে মেট্রোপলিটান পুঁজি দেশগুলিকে বাধ্য করল নয়া উদারবাদী নীতিসমূহ কার্যকর করতে। এর ফলে অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র (dirigiste regimes) গড়ার যুগের অবসান হল এবং তৃতীয় বিশ্বের অনেকটা সম্পদে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল মেট্রোপলিটন পুঁজি, এবং এমনকী তৃতীয় বিশ্বের জমির ব্যবহারও (land use) পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের নিয়ন্ত্রণের আওতায় এসে গেল।
সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এই পরিপ্রেক্ষিতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মতো অন্যান্য সাম্প্রতিক ঘটনাবলীকে বুঝতে হবে। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াসের দুটি বৈশিষ্ট্য মাথায় রাখা দরকার: প্রথমটি হল, চীনের মতো দেশগুলিতে উৎপাদিত পণ্য পাওয়ার জন্য নিজেদের দরজা খুলে দিয়েছিল মেট্রোপলিটন বাজার। একইসঙ্গে মেট্রোপলিটন পুঁজির আকাঙ্ক্ষা ছিল এই সব দেশগুলিতে তাদের কারখানাগুলি সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার, যাতে গোটা বিশ্বের পণ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য ওই দেশগুলির তুলনামূলকভাবে কম মজুরির সুযোগ কাজে লাগানো যায়। এর দরুন দক্ষিণ গোলার্ধের এই সব অর্থনীতিতে (এবং কেবলমাত্র এই সব অর্থনীতিতেই) বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত হয়েছিল। মেট্রোপলিটন পুঁজি চীনে এই প্রক্রিয়াটিকে এতদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্বদায়ী মেট্রোপলিটন শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনকে ভয়ের কারণ হিসাবে দেখতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হল, নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের সঙ্কট যা অত্যন্ত তীব্রতার সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন ‘বুদবুদ’ (হাইজিং বাবল) ফেটে যাওয়ার পর।
এই দুটি কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের অর্থনীতিকে আগল দিয়ে রাখতে চায় চীন এবং দক্ষিণ গোলার্ধে চীনের মতো একই রকম অবস্থানে থাকা দেশগুলি থেকে আমদানিতে বাধা তৈরি করে। যদিও এখনও হয়ত এই আমদানি করা হচ্ছে, অন্তত আংশিকভাবে, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজির পৃষ্ঠপোষকতার অধীনে, তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ঝুঁকি কখনই নিতে পারে না যে তাদের নিজেদের দেশটাই ‘বি–শিল্পকরণ’–এর মধ্যে গিয়ে পড়বে। একটা পর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই চীনের প্রশংসা করে আসছিল সেদেশের ‘আর্থিক সংস্কার’–এর জন্য। অথচ এখন তাদেরই আকাঙ্ক্ষা হল চীনকে খুব দ্রুত ‘কেটে ছেঁটে ছোট করে ফেলা’। চীনকে কেটে ছেঁটে ফেলার এই আকাঙ্ক্ষার শিকড় রয়েছে নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বসমূহের মধ্যে, অর্থাৎ এর মূলে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়াস থেকে উদ্ভূত সঙ্কটের মধ্যেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্ঘাত তাই মোটেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যেকার প্রতিযোগিতা নয়, বরং এই সঙ্ঘাত হল চীন এবং চীনের পথ অনুসরণকারী অন্যান্য দেশগুলির প্রতিরোধের প্রতিফলন, এ হল পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে চীন ও চীনের পথ অনুসরণকারী দেশগুলির প্রতিরোধের প্রতিফলন। এবং এই প্রতিরোধই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমশ বেড়ে চলা দ্বন্দ্বসমূহের ব্যাখ্যা দিতে পারে।
পুঁজিবাদী সঙ্কট যত জোরালো ও তীব্র হবে, ততই বৈদেশিক ঋণ শোধে অক্ষমতার কারণে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির ওপর নিপীড়ন নামিয়ে আনা হবে আইএমএফ ইত্যাদির মতো সাম্রাজ্যবাদী আর্থিক সংস্থাগুলি কর্তৃক ‘মিতব্যয়িতা’ বা ‘ব্যয়সঙ্কোচ’–এর নীতি চাপিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। এর দরুন নয়া উদারবাদী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির তরফে আরও বেশি প্রতিরোধ গড়ে তোলার তাগিদ তৈরি হচ্ছে এবং ঋণফাঁদ থেকে মুক্তির জন্য চীনের কাছ থেকে আরও বেশি সহযোগিতা পাওয়ার তাগিদ তৈরি হচ্ছে। এরকমটা যত বেশি ঘটবে ততই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বন্দ্বসমূহ ক্রমশ আরও তীব্রতর হবে এবং পশ্চিমী দুনিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে আক্রমণের সুর আরও তীক্ষ্ণ হবে।
সূত্র : দ্য পিপলস ডেমোক্রেসি, অক্টোবর ৩০– নভেম্বর ৫, ২০২৩
প্রকাশের তারিখ: ১১-নভেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
