সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
রাষ্ট্র, দেশ ও নারীবিদ্বেষ
উর্বা চৌধুরী
রাজস্থানের সোজাত বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শোভা চৌহান দেওয়াসি সম্প্রদায়ের কাছে ভোট প্রচারে গিয়ে বললেন, তাঁকে ভোটে জেতালে তিনি অনায়াসে বাল্যবিবাহ ঘটতে দেবেন, কাউকে বাধা দিতে দেবেন না। এই মুহূর্তে অসভ্য নেতা প্রার্থীতে ঠাসা, নানা ঘৃণ্য বিশ্বাসবোধে ঠাসা ভারতীয় জনতা পার্টি নামে ভয়ানক শাসকদলটির কব্জায় এভাবেই গোটা ভারতবর্ষের সভ্যতা আটকা পড়ে রয়েছে।

কেবল সূক্ষ্ম রাজনৈতিক তত্ত্বের বিচার নয়, চরম পরিশোধিত কোনও অধিকার আদায়ের উদ্যোগ নয় – নারীমুক্তির লড়াইয়ের জমিতে বারবার লড়ে চলতে হয় ভ্রূণগুলিকে স্রেফ বাঁচিয়ে রেখে – জানি না, সেই লড়াইয়ের জমি আবাদী, না কি অফলা – সেই দুর্ভাবনা মাথায় নিয়েই লড়ে চলতে হয়। ভারতে লিঙ্গবৈষম্যের ঘরানা, নারীবিদ্বেষের ঘরানা এ হেনই – এ দেশের বাতাবরণে চিন্তার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, বুদ্ধিগত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, সামাজিক, নৈতিক বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে, টক্কর দিয়ে বাড়ার অপার সুযোগ আছে নারীবিদ্বেষের স্পৃহার।
এই জমিতে দাঁড়িয়েই ভারতের মেয়ে মহিলাদের লড়াই – তারা জানে জন্মভূমিতে তাদের জন্মটুকুকেও ফেলনা ভাবার বাস্তবতা প্রকট; তারা জানে, তাদের জন্মের ঘটনাখানা ঘটে যাওয়া মাত্র শুরু হবে কোণঠাসা হওয়ার অবিশ্রাম বন্দোবস্ত। সব জেনেও তারা এই জমিতেই বাঁচে শতকের পর শতক লড়ে।
জনগণনা বলছে, ১৯০১ সালে ভারতে পুরুষ ও নারীর অনুপাত ছিল ১০০০: ৯৭২, ১৯৫১ সালে ১০০০: ৯৪৬, ২০০১ সালে ১০০০: ৯৩৩, ২০১১ সালে ১০০০: ৯৪৩, এবং ২০২০ সালে তা দাঁড়িয়েছে ১০০০: ৯২৪ (https://statisticstimes.com/demographics/country/india-sex-ratio.php)।
২০২০ সাল। অতিমারির প্রকোপ শুরু হয়েছে ভারত মায় গোটা বিশ্বে। লকডাউনের দিন দশেকের মাথায় ৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে কেন্দ্রের এনডিএ সরকারের একটি নোটিশে উল্লেখ করা হল – এদেশে ভ্রূণের লিঙ্গনির্ধারণের বিধি তিন মাসের জন্য, অর্থাৎ জুন, ২০২০ অবধি শিথিল করা হবে। কারণ হিসাবে বলা হল, অতিমারির কারণে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বিপুল চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা কমানোর জন্য কিছু কিছু কাজে শৈথিল্য জরুরি, যার মধ্যে ভ্রূণের লিঙ্গনির্ধারণের বিধি সম্পূর্ণরূপে মেনে চলার কাজটিও শৈথিল্যের তালিকায় পড়ল। এমনই ভয়ানক বোঝাপড়া বিজেপি পরিচালিত এনডিএ সরকারের! তবে, এই নোটিশের বিরোধিতায় সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির সক্রিয়তা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে লেখা সমিতির নেতা বৃন্দা কারাতের প্রতিবাদপত্র কেন্দ্রীয় সরকারের এই দুরভিসন্ধিকে শেষতক ফলপ্রসূ হতে দেয়নি। আমাদের প্রত্যয়ের উৎসমুখ এই ছবিতেই - মনুবাদক্লিষ্ট বিজেপি-র কুকীর্তির বাস্তবতা যেমন রয়েছে – তেমনই রয়েছে তাকে নিরস্ত করতে পারার মতো প্রগতিশীল, বামপন্থী, প্রতিবাদী শক্তিও।
২০১৮ সাল, বিজেপি–র মধ্যপ্রদেশের বিধায়ক গোপাল পারমারের একটি প্রস্তাব ও পরামর্শের বাণী উল্লেখ করি – ওঁর মতে লাভ জিহাদের মতো ঘটনা রুখতে নাবালিকাদের ধরে ধরে বিয়ে দিয়ে দেওয়া খুবই কার্যকরী উপায়। আবার সেই একই বছরে রাজস্থানের সোজাত বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী শোভা চৌহান দেওয়াসি সম্প্রদায়ের কাছে ভোট প্রচারে গিয়ে বললেন, তাঁকে ভোটে জেতালে তিনি অনায়াসে বাল্যবিবাহ ঘটতে দেবেন, কাউকে বাধা দিতে দেবেন না। এই মুহূর্তে “অসভ্য” নেতা প্রার্থীতে ঠাসা, নানা ঘৃণ্য বিশ্বাসবোধে ঠাসা ভারতীয় জনতা পার্টি নামে ভয়ানক শাসকদলটির কব্জায় এভাবেই গোটা ভারতবর্ষের সভ্যতা আটকা পড়ে রয়েছে।
একই সূত্রে উঠে আসে ধর্ষণের প্রসঙ্গ। শরীরে, বুদ্ধিতে, চেতনায়, সমাজবোধে, প্রাক্ষোভিকবোধে, নৈতিকবোধে, দক্ষতায়, সামর্থ্যে বিকশিত হতে থাকা মেয়েরা যখন নিজেদের দমে, এবং প্রকৃতির ব্যাকরণে স্ব–ক্ষমতার প্রশ্নে সমান সমান হয়ে উঠতে চেষ্টা করে, ঠিক তখনই তাদের ঠেকাতে হয় নির্যাতন করে, ধর্ষণ করে, খুন করে। ধর্ষণ কোনো নৈর্ব্যক্তিক উৎপীড়ন নয়, উদ্দেশ্যহীন বিকৃতিচর্চা নয়, বিরাজনৈতিক নির্যাতন নয়, ছিলও না কোনও দিন – ধর্ষণ স্পষ্টত ক্ষমতার আস্ফালন, বিকাশমান কোনো “অধঃস্তন” লিঙ্গকে সমান সমান হতে না দেওয়ার অন্যতম উপায়। নারীকে যৌনতার সমাজনির্মিত লজ্জার ফাঁদে জড়িয়ে, শারীরিকভাবে পর্যুদস্ত করে, মনের দিক দিয়ে খতম করে, কুণ্ঠায় শেষ করে ফেলার চেষ্টার নাম ধর্ষণ। কিন্তু মজার কথা হল, বারবার যে উৎপীড়ন ঘটে, কখনও কখনও তার ধার কমে, ভার কমে। তাই যত অত্যাচার হয়, মেয়েদের বুঝি তত বাড় বাড়ে, আবার যত বাড় বাড়ে, তত ধর্ষণ হয়। কুণ্ঠা সরিয়ে এগিয়েছিল উন্নাও-এর ধর্ষণের শিকার ষোল বছরের মেয়েটি ও তার পরিবার। ধর্ষকের নাম কুলদীপ সেঙ্গার, বিজেপি-র নেতা, বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার। প্রথম ধর্ষক সে নিজে – তারপর সে মেয়েটিকে অপহরণ ও গণধর্ষণ করায় দুই যুবককে দিয়ে – চলতে থাকে পুলিশি গাফিলতি – আটক করা হয় মেয়েটির বাবাকে – তাঁর মৃত্যু হয় হাজতে – মেয়েটি ও তাঁর পরিবার সংগ্রাম চালাতে থাকে – চরম পথ দুর্ঘটনায় মেয়েটি ও তাঁর আইনজীবী আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়, মেয়েটির বোন ও কাকিমা মারা যান – বিচার প্রক্রিয়া চলতে থাকে – এবং শেষতক মেয়েটিকে গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয় – এরপর সেঙ্গার–সহ বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বহু বহুচর্চিত এই ঘটনাক্রমের উল্লেখ করা দরকার কেবল এটুকু জানানোর জন্য নয় যে, ভারতীয় জনতা পার্টির জনপ্রিতিনিধিদের মতো নিকৃষ্ট শাসক এদেশে আছে, উল্লেখ করা দরকার এও জানাতে যে, এদেশেই উন্নাও-এর মেয়েটির মতো নাছোড় মেয়েরাও আছে, যারা বারবার হোঁচট খায়, কিন্তু বাঁচে পাখির চোখ তাক করে। লড়ে। নইলে কি আর যোগী আদিত্যনাথের সরকারের রাজ্যে হাথরসের দলিত খেতমজুর মেয়েটিকে ধর্ষণ করে, মাজা ভেঙে, জিভ কেটে খুন করতে হয়! এই নাছোড় মেয়েদের জন্যই বোধ করি এত নারীর নিধন সত্ত্বেও এই পৃথিবী এখনও নারীশূন্য হয়ে যায়নি। নইলে “দ্বিতীয় লিঙ্গকে” কেবল উপেক্ষা নয়, অমর্যাদা নয়, বারবার প্রাণে মারার পরিশ্রম কেন! “দ্বিতীয় লিঙ্গের” বিরুদ্ধে এত দামি, একগুঁয়ে ষড় করে কেন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয় মনুবাদকে, পিতৃতন্ত্রকে! প্রকৃতি কোনও গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে “ক্ষমতা” ভাগাভাগি করার ফিকির করেনি কোনও দিনই, ফিকিরটা চালায় ক্ষমতার রাজনীতি। তাই যে রাষ্ট্র ভারতীয় জনতা পার্টির মতো দাঙ্গাবাজ শাসকদলের হাতে, সে রাষ্ট্র তত ভয়ানক ষড়যন্ত্রী। তবে অবশ্যই সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অনড় ঠায় দাঁড়িয়েও থাকে উন্নাও-এর পোড়া শরীর, ধিক্কার দিতে থাকে হাথরসের ধর্ষিতা ও খুন হওয়া দলিত মেয়ের কাটা জিভ।
জানা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে মহিলাদের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনায় ভারতে রিপোর্টেড হয়েছে ৩,৭৮,২৩৬ টি এবং ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪,০৫,৮৬১ টি, ২০২১ সালে আরও বেড়ে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ৪,২৮, ২৭৮। যাতে রয়েছে সম্মানহানি, অপহরণ, ধর্ষণের মতো অপরাধ। উত্তরপ্রদেশ এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ স্থানাঙ্কে।
আবার, এই পৃথিবীর মেয়েমহিলারা জীবনের পাঠ থেকে জানে যে, বেঁচে থাকতে হলে কেবল ভ্রূণহত্যা, বাল্যবিবাহ, আর ধর্ষণের বিরুদ্ধে লড়লে চলে না। ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তো কোনওমতেই না। যে দেশের শ্রমজীবীকে হাঁটতে হয় পুঁজিপতির তৈরি করা শাঁখের করাতের উপর দিয়ে, সে দেশের মেয়েমহিলারা জানেন যে, দুর্গম যে পথ তাঁদের পেরোতে হয়, তার একটি হল তাঁদের শ্রমিকসত্তার পথ। যে পথচলায় শুরু থেকেই লিঙ্গায়নের বোঝা আছে, সাধারণভাবে শ্রমচুরির বাধা আছে, শ্রেণিমিত্রের সঙ্গে সংহতি ও সংঘাতের দ্বন্দ্ব আছে, মালিকের তরফের সাধারণ শোষণ আছে, উপরন্তু মালিক মায় সহযোদ্ধা শ্রমিকটিরও পৌরুষের বাড়তি শোষণ আছে, গৃহশ্রমের, সন্তান লালনের জটপাকানো অসহায় বাস্তবতা আছে – এই এত দুর্বিপাকের সঙ্গে টক্কর দিতে রাজি থাকলে, তবে গিয়ে একজন নারী হয়ে উঠতে পারেন “সংগ্রামী শ্রমজীবী”।
অসংগঠিত ক্ষেত্রে এখনো মহিলাদের সম–মজুরির অধিকার কার্যকরভাবে সুনিশ্চিত হল না। ২০২০–র শ্রমকোডে বাড়তি সময় কাজের সুযোগ হল মহিলা শ্রমিকদের জন্য, কিন্তু বাড়তি সময়ের মজুরি নির্ধারিত হল না। এত প্রতিকূলতার পরও নিরন্তর মহিলা শ্রমজীবীরা লড়ে যাচ্ছেন নিজের পেশাগত অধিকার, সুরক্ষা, নিরাপত্তা, মর্যাদার অধিকার সুনিশ্চিত করার দাবি তুলে। ২৮ অগাস্ট ২০২০, সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি সহ মোট ছয়টি জাতীয় স্তরের বামপন্থী মহিলা সংগঠনের নেতৃত্বে দেশের ২৩টি রাজ্যের লক্ষাধিক শ্রমজীবী মহিলা পথে নেমেছেন জীবন–জীবিকার অধিকার আর গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার স্লোগান তুলে।
নারীর ওপর বিচিত্র সব জুলুমবাজির কথা লিখতে গেলে মনে পড়ে - ২০১৮ সালে বিহারের ১১টি জেলা থেকে ১৫০ জনেরও বেশি মহিলা প্রতিনিধি নিয়ে সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি একটি কনভেনশন সংগঠিত করেছিল – কনভেনশনের নাম ছিল “এনডিএ সরকার সে বেটি বাঁচাও” – এই মুহূর্তে এদেশের ফ্যাসিবাদী শাসকের দৌরাত্ম্যের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলির অন্যতম হল, নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা। আশার কথা হল, সে লক্ষ্যে পৌঁছতে বামপন্থা ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মহিলারা নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে আছেন, কারণ এই সংগ্রাম নারীর মর্যাদা অটুট রেখে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তার অস্তিত্বকে সংকটে ফেললে তা রক্ষার জন্য অবিরাম লড়াই চলবে।
লিঙ্গবৈষম্যকে সারজল দিয়ে জিইয়ে রাখা বিজেপি চালিত এনডিএ সরকারের নীতিকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল বললে, তা আংশিক দর্শন মায় আংশিক প্রদর্শনও হয় – সাম্প্রদায়িক, যথেচ্ছাচারী, ধনতন্ত্রের ফড়িয়ার কাজে নিযুক্ত এই রাজনৈতিক শক্তি তার বুনিয়াদি বৈশিষ্ট্যে মানুষবিরোধী এবং অপরাধপ্রবণ। নীতিতে অন্যায়, অপরাধ, বিদ্বেষ, শোষণের উপাদান না রাখলে বিশ্ব রাজনীতিতে ধনতন্ত্রের উগ্রতম দালানে সে ঠাঁই পাবে না। অতএব সংসদীয় গণতন্ত্রকে ব্যবহার করার কণামাত্র সুযোগ পেলেই এই শক্তি এ দেশের যাবতীয় প্রান্তিক আর্থ–সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে শত্রুতায় লিপ্ত হবেই; কিন্তু মনুবাদী সংস্কৃতি হোক বা নারীবিদ্বেষ হোক, সূচ হয়ে ঢুকে তা ফাল হয়ে বেরোনোর মতো সুবিধাখানা কেমন করে করতে পারছে – সে বাস্তবতাও প্রণিধানযোগ্য – নইলে এ বিষয়ে চর্চা কেবল অসম্পূর্ণ হয়ে থেকে যায় না, অবান্তরও হয়ে দাঁড়ায়। গোড়ায় লিখেছি – ‘এই জমিতে দাঁড়িয়েই ভারতের মেয়ে মহিলাদের লড়াই – তারা জানে জন্মভূমিতে তাদের জন্মটুকুও ফেলনা ভাবার বাস্তবতা প্রকট; তারা জানে তাদের জন্মের ঘটনাখানা ঘটে যাওয়া মাত্র শুরু হবে কোণঠাসা হওয়ার অবিশ্রাম বন্দোবস্ত। সব জেনেও তারা এই জমিতেই বাঁচে শতকের পর শতক। লড়ে।’ – অতএব বোঝাই যায়, গোটা সমাজের কাছে তাদের নিজেদের পরিচিতি বা স্বীকৃতি ভিক্ষা করে চললে কিছু হওয়ার নয়। ফলে নারীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে যা কিছু অবান্তর, তা তাদের কাছে অবান্তরই। নারীবিদ্বেষী আরএসএস–বিজেপি–র চারণক্ষেত্র, ভারতের জমিকে কেবল পর্যবেক্ষণ করলেই চলছে না। নিরীক্ষণ করে দেখে নিতে হচ্ছে – এই সমাজের কোন্ কোন্ প্রবণতা, কোন্ কোন্ উপাদান এই মনুবাদী সংস্কৃতির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে না, বিরুদ্ধতার সাধ থাকলেও কার্যকর বৈরিতার সম্পর্ক তৈরিতে ব্যর্থ হচ্ছে কোন্ দৃষ্টিভঙ্গী। কারণ নারীবিদ্বেষ একটি সূচক মাত্র – বৃহৎ রাজনীতির, ধনতন্ত্রের চলনের, সার্বিক শোষণের এবং ধনতন্ত্রের বুনিয়াদের, অর্থাৎ কি না ‘পিতৃতন্ত্র’-এর। নিরীক্ষণ করে, সত্বর চিহ্নিত ও প্রতিবিধানের দীক্ষা আমাদের অর্জন করতেই হয় – পিতৃতন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রগতিশীল রাজনীতিকে মামুলি, বিচ্ছিন্নতাপ্রবণ, বিভেদপ্রবণ পরিচিতি সত্তার রাজনীতি বানিয়ে ফেলছে কোন্ বোঝাপড়া? খুঁজতে হয় – নারীমুক্তি পুরুষের একান্ত অ্যাজেন্ডা নয় – এমন গোলমেলে বোঝাপড়ার উৎস মুখটিকে; পিতৃতন্ত্রের বিরোধিতায় কেন বেশিরভাগ সময়েই পুরুষকে সংকোচক্লিষ্ট অবান্তর কৌশল করে সময় নষ্ট করতে হচ্ছে। এবং এ কাজের জন্য যে তত্ত্বে আমাদের ন্যস্ত হতে হয়, তা চরিত্রে বস্তুনিষ্ঠ, এবং দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়াধর্মী। আর দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যায় সামগ্রিকভাবে শোষণের শেকল ভাঙার মতো ধারাবাহিক, নিরবচ্ছিন্ন, সার্বিক প্রকৃতির কোনো কাজে গোষ্ঠীভিত্তিক স্বার্থরক্ষার পরিকল্পনা, তার বিচ্ছিন্নতাবাদী চরিত্রের কারণে, কেবল ব্যর্থতাকেই নিশ্চিত করে - যে ব্যর্থতার ফোকর দিয়ে ফাল হয়ে বেরোতে পারে মনুবাদী সংস্কৃতি।
নারীবিদ্বেষ বিরোধী, শোষণ বিরোধী, প্রগতিশীল প্রত্যেকটি মানুষকে সুযোগ দেন বিলকিস বানো। চুপ করে দেখেন, ন্যায্য মূল্যবোধের ছাতির উপর দাঁড়িয়ে গুজরাটের বিজেপি সরকারের মর্জিতে ছুটি হয়ে যাচ্ছে তার ধর্ষকদের। সমাজ তাদের মালা পরিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে বরণ করে গ্রহণ করছে। এরপরের সিদ্ধান্ত আমাদের – এই নৃশংস, বিদ্বেষী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে, নারীবিদ্বেষের বিরুদ্ধে, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়বে কারা, লিখবে কারা, প্রতিরোধ করবে কারা – বিজেপি–র সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিচিতি সত্তার রাজনীতিকে ঠেকাতে হলে কেবল নারীদের প্রতিবর্তী প্রতিরোধের বোধ থাকলে চলে না। দরকার সবার, সমমানের তাগিদ।
প্রকাশের তারিখ: ০৬-নভেম্বর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
