Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ত্রিপুরায় অব্যাহত প্রতিবিপ্লব

নন্দন রায়
প্রশ্ন হল ত্রিপুরা ভারত ভূখণ্ডে যুক্ত হওয়ার আগে থেকেই ত্রিপুরার উপজাতিদের অধিকার নিয়ে এবং রাজন্যতন্ত্রের শোষণের বিরুদ্ধে দশরথ দেববর্মণ সহ অন্যান্য বিপ্লবী বামপন্থীরা উপজাতিদের সংগঠিত করে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ উপজাতীয় এলাকা থেকে বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। এই সেদিন পর্যন্ত উপজাতি এলাকায় বামপন্থীদের বেশ ভাল প্রভাব ছিল। (কিছুদিন আগে মার্কসবাদী পথ অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত ত্রিপুরা নির্বাচন নিয়ে শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদারের রচনায় এই বিষয়টি নিয়ে তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা রয়েছে)। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে কী এমন ঘটে গেল যে গোটা উপজাতি এলাকায় বামপন্থীরা একেবারে মুছে গেল? শুধু তাই নয়, অন্যান্য সাধারণ আসনে যেখানে যেখানে তিপ্রা মথা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সেখানেই বামপন্থীদের পরাজয় ঘটেছে।
Counter-revolution continues in Tripura

বিলম্বে হলেও ত্রিপুরাসহ উত্তর-পুর্বের আরও দুই রাজ্য, মেঘালয় ও নাগাল্যান্ডে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ জরুরি হয়ে উঠেছে। এই বিশ্লেষণ এই মুহূর্তে আরও জরুরি, কারণ নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের রাত থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত যে হিসেব পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে এক পক্ষকাল সময়ের মধ্যেই বামপন্থী ও কংগ্রেসের সদস্য সমর্থকদের ওপরে বিজেপির দুষ্কৃতীরা ২০০০টির বেশি হামলা চালিয়ে তাদের বাড়ি-ঘর অথবা জীবন ধারণের যেসব উপায়ের ওপর নির্ভর করে এইসব গরিব মানুষের সংসার নির্বাহ হত, সেসব জ্বালিয়ে খাক করে দিয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরেও বামপন্থীদের ওপর এমনই আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়েছিল যার ফলে ২৫ জন বামপন্থী মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। এবারে হামলার পদ্ধতিটি একটু আলাদা। কিন্তু অনেক বেশি সুপরিকল্পিত। এই ফ্যসিবাদী হামলার লক্ষ্য হত্যা নয়। বরং জীবন ধারণের উপায়গুলির ধ্বংস সাধন, যাতে পরিবার সহ এইসব মানুষ আর কোনওদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। ফ্যসিবাদ এমনই জিঘাংসাপূর্ণ। 

এমনিতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতি জাতীয় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। তার একটা কারণ যদি হয় এই রাজ্যগুলির ক্ষুদ্রতা, তাহলে অন্য কারণটি হল মূল ভারত ভূখণ্ডের সঙ্গে এই রাজ্যগুলির আপাত বিচ্ছিন্নতা। তবু তারই মধ্যে ত্রিপুরার নির্বাচনী ফলাফল এবারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। কারণ সারা দেশের মধ্যে একমাত্র এই রাজ্যেই দুই প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল মতাদর্শগত ভাবে পরস্পরের একেবারে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা দুটি পক্ষ—  বামপন্থীরা এবং বিজেপি। অন্যভাবে বললে, গণতান্ত্রিক বিপ্লবের শক্তি বনাম প্রতিবিপ্লবী নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রটি এবারের মতো এতটা স্পষ্ট ছিল না। প্রসঙ্গত, চীনের গৃহযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্তালিন বলেছিলেন, চীনে সশস্ত্র বিপ্লবকে লড়াই করতে হচ্ছে সশস্ত্র প্রতিবিপ্লবের সঙ্গে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, পশ্চিমবঙ্গেও কি বিপ্লবী শক্তির সঙ্গে প্রতিবিপ্লবী শক্তির সংঘাত হচ্ছে না? কথাটা একদিক দিয়ে ঠিক, আবার ঠিক নয়ও। একথা ঠিক যে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় মমতা ব্যানার্জির অধিষ্ঠান রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিবিপ্লবের এক সফল উদাহরণ। বামপন্থী তথা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথসন্ধানের ত্রুটির এ এক দুঃখজনক অধ্যায় হিসেবে এই ঘটনা চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই ত্রুটির কারণেই রাজ্যের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি একজোট হয়ে শ্রেণি-ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটাতে পেরেছিল এবং ইতিহাসের গতিকে পশ্চাদগামী করে তুলতে পেরেছিল। কিন্তু ত্রিপুরায় যা ঘটেছে তা হল নয়া ফ্যাসিবাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে বামপন্থীদের পরাজয়। তৃণমূল ও বিজেপি উভয়ই স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কের নেতৃত্বে প্রতিবিপ্লব সম্পন্ন করেছে বটে। কিন্তু উভয়ের মধ্যেকার তফাৎ হচ্ছে যে অবাধ লুন্ঠন ছাড়া তৃণমূলের মতাদর্শ বলে কিছু নেই—  এক বিপুল লুম্পেন বাহিনীর নেতৃত্বে সরকারি ক্ষমতা করায়ত্ত করার সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে টাকা রোজগারের এমন এক সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যে তাদের খাঁই মেটাতে না পারলে জনসাধারণের জন্য সরকারের দরজা বন্ধ।

বিপরীত পক্ষে বিজেপির মতাদর্শের মূল কথা হল হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। আর এর জন্য টাকা যোগান দেবে কর্পোরেট ফিনান্সিয়াল অলিগার্কি। বিনিময়ে বিজেপি তাদের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করবে সরকারি যন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলিকে ধ্বংস করে এবং হিন্দুত্ববাদী আবেগকে কাজে লাগিয়ে কর্পোরেট লুন্ঠনকে সামাজিক বৈধতা দিয়ে। এইরূপে কর্পোরেট-হিন্দুত্ব নেক্সাস নয়া ফ্যাসিবাদের চালিকা শক্তি হয়ে উঠেছে। এটা শুধু স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কত্ব নয় (তাহলে তৃণমূলের সঙ্গে তাদের কোন তফাৎই থাকতো না), এ হল ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন আজকের দিনের ফ্যাসিবাদ। তাকে নয়া ফ্যাসিবাদ বলা হচ্ছে এই কারণে যে ১৯৩০-এর দশকের মতো পুঁজি আর জাতিরাষ্ট্রের সীমানায় আবদ্ধ নয়। সে এখন আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির চেহারা নিয়েছে। যারা দুনিয়াজোড়া বাজারের কোনও ভাগ-বাঁটোয়ারা চায় না। এবং ফ্যাসিবাদকে এই আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনের সামগ্রিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই তার কর্মকাণ্ড চালাতে হয়। অতএব নয়া ফ্যাসিবাদ। নয়া ফ্যাসিবাদ আদতে দুর্বল ফ্যাসিবাদ। কারণ ১৯৩০-এর দশকের মত জাপানি সমরবাদ অথবা জার্মানির নাৎসি ফ্যাসিবাদ বিপুল সামরিকীকরণের মধ্য দিয়ে যেভাবে বেকার সমস্যার সমাধান করতে পেরেছিল, বিজেপির নয়া ফ্যাসিবাদ সেরকম কিছু করতে পারে না। বস্তুত, জনসাধারণের প্রতিদিনের কোনো সমস্যারই সমাধান করতে তারা পারে না। প্রতি পদক্ষেপেই তাদের আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির স্বার্থের কথাটা মাথায় রাখতে হয়। তাই প্রতিদিন মোদীকে বিশ্বগুরু বলে হাজারবার গুণকীর্তন করতে হয়। যে কথা সবাই জানে সেই মোদী-আদানির অশুভ সখ্যের কথা সংসদে যাতে আলোচিত হতে না পারে সেজন্য বিরোধীদের কণ্ঠ রুদ্ধ করতে হয়। নিরন্তর হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের নতুন নতুন কৌশলের উদ্ভাবন করতে হয় ইত্যাদি।

আঞ্চলিক স্বৈরতন্ত্রীর সঙ্গে নয়া ফ্যাসিবাদের সম্পর্ক যুগপৎ সমঝোতা ও সংঘাতের। কিন্তু শেষ বিচারে সংঘাতের উপাদানটিই প্রাধান্য লাভ করে। সুতরাং এই শক্তি আরও ভয়ঙ্কর। ফলত আরও বড় শত্রু—  সারা দেশের জন্য তো বটেই এমনকি পশ্চিমবঙ্গের জন্যও বটে। এই রাজ্যে মুখোমুখি লড়ায়ে তৃণমূল সর্বাগ্রে থাকলেও, তারই সঙ্গে যদি বিজেপিকেও পরাজিত করা না যায় তবে পশ্চিমবঙ্গও ত্রিপুরার ভাগ্যলিপি বরণ করে নেবে।

আরও একটি কথা এখানে বলে রাখা  দরকার। বিজেপি ও তৃণমূলের সম্পর্কের মধ্যে সমঝোতার উপাদানটি ততক্ষণ পর্যন্ত ক্রিয়াশীল থাকে, যতক্ষণ বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের  ওপরে লুম্পেন বাহিনী তাদের আক্রমণ জারি রাখে। এবং এহেন স্বৈরাচার নিশ্চেষ্ট জনতার উদাসীনতার মধ্যে এক ধরণের সামাজিক বৈধতার নীরব আশ্বাস বহন করে। কিন্তু নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময়ে অথবা বর্তমান সময়ের মতো অবস্থায় যখন চাকরি কেলেঙ্কারি ও পঞ্চায়েত সহ সর্বত্র অবাধ চৌর্যবৃত্তির ঘটনাবলির উন্মোচনের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্তসহ আপামর জনসাধারণের ধৈর্যের বাঁধ যখন ভেঙে পড়ছে, অর্থাৎ যখন সামাজিক শক্তিগুলির ভারসাম্য তৃণমূলের বিরুদ্ধে চলে যেতে শুরু করেছে (বিরোধীদের পক্ষ থেকে কোনও জোরালো আন্দোলন ছাড়াই বস্তুগত পরিস্থিতির এরূপ পরিবর্তন ঘটছে), তখন তৃণমূল-বিজেপির মধ্যেকার সংঘাতের উপাদান প্রাধান্য বিস্তার করে, বিশেষ করে যখন পঞ্চায়েত নির্বাচন সন্নিকটে।  

।দুই।

অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে যেসব রাজ্যে বামপন্থীরা প্রতিবিপ্লবী শক্তির কাছে পরাজিত হচ্ছে, সেইসব রাজ্যে বামপন্থীদের জনসমর্থন ক্রমাগত ক্ষয় পাচ্ছে। এর সাম্প্রতিক নিদর্শন ত্রিপুরা। পঁচিশ বছর একনাগাড়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার পরে ২০১৮ সালের বিধানসভার নির্বাচনে বামপন্থীরা যখন প্রথম পরাজিত হল, তখনও তারা ৪৪ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছিল। কিন্তু একদিকে গত পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারের সার্বিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অন্যদিকে মূলত বামপন্থীদের ওপরে নামিয়ে আনা হত্যাসহ যাবতীয় অত্যাচার সত্ত্বেও ২০২৩-এর নির্বাচনের আগে বামপন্থীদের নিজেদের পর্যবেক্ষণ ছিল যে বাম ও কংগ্রেসের মধ্যে সমঝোতার ফলে নির্বাচনী  ফলাফল উলটে যেতে পারে। কিন্তু দেখা গেল যে বামপন্থীরা এককভাবে ২৭ শতাংশ এবং বাম-কংগ্রেস যৌথভাবে ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ, ২০১৮ সালের তুলনায় বাম-কংগ্রেস ভোট বিভাজন রুখেও ২০২৩ সালে ৯ শতাংশ ভোট কম পেয়েছে। বামেরা তিপ্রা মথার কাছেও যৌথভাবে বিজেপির বিরোধিতা করার আবেদন জানিয়ে ছিল, কিন্তু এটা ছিল কষ্ট কল্পনা মাত্র। তিপ্রা মথার মতাদর্শগত ঝোঁক বিজেপির দিকেই। কারণ রাজ্যভাগের সম্ভাবনা নেই জেনেও তিপ্রা মথা পৃথক তিপ্রাল্যান্ডের দাবি জানিয়েছিল। বিজেপিও রাজ্যভাগের দাবি শেষ পর্যন্ত মেনে নেবে না জেনেও ইদানিং প্রদ্যোৎকিশোর দেববর্মণ ক্রমশ সুর নরম করছেন। বিজেপি যে শেষ পর্যন্ত জোটসঙ্গী আইপিএফটি-র মতো তিপ্রা মথাকেও গিলে খাবে, একথা বোঝে না এমন রাজনৈতিক মুর্খ ত্রিপুরাতে নেই।

কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে নয়। প্রশ্ন হল ত্রিপুরা ভারত ভূখণ্ডে যুক্ত হওয়ার আগে থেকেই ত্রিপুরার উপজাতিদের অধিকার নিয়ে এবং রাজন্যতন্ত্রের শোষণের বিরুদ্ধে দশরথ দেববর্মণ সহ অন্যান্য বিপ্লবী বামপন্থীরা উপজাতিদের সংগঠিত করে দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়েছিলেন। ফলস্বরূপ উপজাতীয় এলাকা থেকে বামপন্থীরা দীর্ঘদিন ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। এই সেদিন পর্যন্ত উপজাতি এলাকায় বামপন্থীদের বেশ ভাল প্রভাব ছিল। (কিছুদিন আগে মার্কসবাদী পথ অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত ত্রিপুরা নির্বাচন নিয়ে শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদারের রচনায় এই বিষয়টি নিয়ে তথ্য সমৃদ্ধ আলোচনা রয়েছে)। কিন্তু গত পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে কী এমন ঘটে গেল যে গোটা উপজাতি এলাকায় বামপন্থীরা একেবারে মুছে গেল? শুধু তাই নয়, অন্যান্য সাধারণ আসনে যেখানে যেখানে তিপ্রা মথা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে সেখানেই বামপন্থীদের পরাজয় ঘটেছে।

উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত ২০ আসনের মধ্যে তিপ্রা মথা পেয়েছে ১৩ আসন, বিজেপি-৬ এবং আইপিএফটি-১। উপজাতি এলাকার বাইরেও তিপ্রা মথা ৭টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। এই ৭ আসনের সবগুলিই ২০১৮ সালে বামপন্থীদের করতলগত হয়েছিল, এবারে সবগুলিতেই বামেরা হেরেছে। গণশক্তি পত্রিকার হিসেব মত ২৪টি আসনে তিপ্রা মথা ভোট কেটে বিজেপির জয়ের পথ সুগম করে দিয়েছে (গণশক্তি, ৩ মার্চ)। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তিপ্রা মথা আদতে বিজেপির দোসর, একথা যদি বামপন্থীরা না বোঝেন তবে তাদের শিশুসুলভ সারল্যে আশ্চর্য হতে হয়। কিন্তু আশ্চর্য হওয়ার ঘটনা হল উপজাতি সংরক্ষিত আসনের ৬টি বিজেপি দখল করতে পারলো, কিন্তু বামেরা সেখানে শূণ্য। উপজাতিদের সাথে বামপন্থীদের এতটাই বিচ্ছিন্নতা! এই ঘটনা ঘটে চলেছে অনেকদিন থেকেই—  প্রথমে ত্রিপুরা উপজাতি যুব সমিতি, তারপরে আইপিএফটি এবং এখন তিপ্রা মথার মধ্য দিয়ে উপজাতিরা বারে বারেই বামপন্থীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানিয়েছে। অথচ এই বামেরাই তাদের জন্য তাদের সঙ্গে নিয়েই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার  লড়াই করেছে। 

।তিন।

এটা শুধু ত্রিপুরার বিষয় নয়, পশ্চিমবঙ্গেও এই সমস্যা প্রবল ভাবে বর্তমান—  আদিবাসী এলাকা, তফশিলী জাতি অধ্যুষিত এলাকা, সংখ্যালঘু নিবিড় এলাকা যা দীর্ঘকাল বামপন্থীদের একদা দুর্গ ছিল, যেখানে জমির লড়াইয়ে বামপন্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছিল, সেসব এলাকায় তৃণমূলের দখল কায়েম হয়েছে। ইদানিং বিজেপিও হাত বাড়িয়েছে। এই বিষয়টা বামপন্থীদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত। নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে পরিচিতি সত্তার প্রশ্নটি কি শ্রেণিসংগ্রামের বিপরীতে অবস্থান করে, নাকি তা শ্রেণি পরিচিতির অনুপূরক? দীর্ঘদিন ক্ষমতায় কারণে কি অবসাদজনিত ক্লান্তি কি জনতার সঙ্গে পার্টি নেতৃত্বের জীবন্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে? বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে ব্যবহার করে সার্বিক শোষণ-মুক্তির লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি মাধ্যম অথবা কৌশল হিসেবে। কিন্তু সেই পথে এগোতে গিয়ে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন না করার ফলে নিজেরাই ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রভাত পট্টনায়েক বলেছেন,‘বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও তার প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে  শ্রমজীবী শ্রেণি ভুল করে যেন কখনো ভেবে না বসেন যে এই পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলি শিলীভূত এবং অপরিবর্তনীয় সত্তা হিসেবে বিরাজ করছে। বুর্জোয়া গণ কোনো স্থাণু বিষয় নয়। কীভাবে একে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপরে তার পশ্চাদ্গতি অথবা সম্মুখগতি নির্ভর করে। সুতরাং  গণতন্ত্রকে গভীরতর করার লক্ষ্যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলিকে সঠিক ভাবে ব্যবহার করতে হলে তাদেরকে দেখা উচিৎ নিরবচ্ছিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে তাকে জয় করার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে। কিন্তু উল্লিখিত ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে শ্রমজিবী শ্রেণি যদি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করে, তবে বুর্জোয়া ব্যবস্থার উৎখাতের লক্ষ্যে চালিত প্রতিরোধী সংগ্রামের শপথের শব্দগুলি ক্রমশ শিথিল হয়ে আসে। ভারতের মত পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রতিরোধী সংগ্রামের বিকাশের অসমতার দরুণ শ্রমজীবী সংগঠনের রাজনৈতিক প্রতিনিধিরা কিছু কিছু রাজ্যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির সার্বিক নজরদারির মধ্যে থেকেও সরকার গঠন করতে পারে বটে কিন্তু কিন্তু নিরন্তর সতর্কতা বাজায় নয়া রাখলে সেই সব রাজ্যে প্রতিরোধী সংগ্রামের দুর্বল হয়ে পড়ার বিপদ বেড়ে যায়।

‘সেখানে শ্রমজীবী শ্রেণির পার্টির নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হল তাদের কাজ করতে হয় বুর্জোয়া রাষ্ট্রের দ্বারা নিযুক্ত পুরনো আমলা বাহিনীর সাথে, তাদের ‘উপদেশের’ ওপরে নির্ভর করে। সেই  ‘উপদেশের’ ওপরে বিশ্বাস ন্যস্ত করে মন্ত্রীরা অনেক সিদ্ধান্ত নেন। অবশ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পার্টির কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয় এবং পার্টি সরল বিশ্বাসে অনুমোদন দিয়ে দেয়। ফলে  সিদ্ধান্তের ওপরে শ্রেণির স্বার্থের বদলে বুর্জোয়া আমলাদের ‘উপদেশের’ প্রভাব থেকে যায়, অথচ সিদ্ধান্তটি পার্টির সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হয়। পার্টি-শৃঙ্খলার দরুণ ‘পার্টির সিদ্ধান্ত’কে রক্ষা করতে হয় নিচের তলার পার্টি কর্মীদের। অন্য কথায় বললে, যে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পার্টি কর্মী অথবা শ্রেণির অনুমোদন তেমন স্পষ্ট নয় অথচ বুর্জোয়া রাষ্ট্র এবং তার আমলা বাহিনীর অনুমোদন স্পষ্ট, গোটা পার্টিকে সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। কিন্তু পরিহাসের বিষয়, এটাই সব নয়।

‘বুর্জোয়া গণতন্ত্রে সরকার গঠনের তীব্র প্রতিযোগিতার পরিবেশে শ্রমজীবী শ্রেণির পার্টি যদি নিজেদের সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের  অথবা কাজকর্মের বিরুদ্ধে সমালোচনা করে, তাহলে সরকারের বিরুদ্ধবাদীরা সুযোগ পেয়ে যাবে সরকারকে হতমান করার। তাই পার্টিকে সরকারের  বিরুদ্ধে কোনোরূপ সমালোচনার দৃষ্টিভঙ্গীকে পরিহার করে চলতে হয়। এমনকি সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের অথবা এমনকি বন্ধুদের ন্যায় সঙ্গত সমালোচনাকে সরকারকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা পার্টির মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই সরকারের কর্মকাণ্ড ভুল বা ঠিক যা-ই হোক না কেন, ‘যে কোনও মূল্যে’ সরকারকে সমর্থন জানিয়ে যেতে হয়। এতে  ড্যামেজ কন্ট্রোল হয় না, বরং বেড়ে যায়। যতই সরকার হতমান হতে থাকে, ততই পার্টির পক্ষে সরকার ‘রক্ষার দায়’ বেড়ে চলে এবং একদিকে পার্টি যেমন শৃঙ্খলা রক্ষার নামে আভ্যন্তরীণ ক্ষোভকে গণতান্ত্রিকভাবে প্রশমিত করতে চায়, অন্যদিকে তেমনি সরকারও আমলা বাহিনীর উপদেশের প্রতি আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে  ক্রমাগত অগণতান্ত্রিক ও ভুল পদক্ষেপ নিতে থাকে। এর ফলে সরকার পরিচালনায় শ্রেণি স্বার্থের ভূমিকা অবহেলিত হতে থাকে এবং সরকার রক্ষার তাগিদে পার্টির কাছে শ্রেণি সংগ্রামের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি অপ্রধান হয়ে ওঠে।

‘এসব ঘটনার অভিঘাতে মার্কসবাদ হেটমুণ্ড-উর্ধ্বপদ (inversion of Marxism) হয়ে পড়ে, পার্টির অসচেতন অসতর্কতার কারণে। কোথায় পার্টির নেতৃত্বে গঠিত সরকার বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্রের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শ্রেণি সংগ্রাম বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তা নয়, বরং বাস্তবে যা হয় তা হল এই ধরণের সরকার বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্রের পোষিত আমলাতান্ত্রিক প্রভাবের দ্বারা প্রকৃতই অসচেতনভাবে বুর্জোয়া লজিকের অন্তর্নিহিত প্রবণতার দ্বারা বুর্জোয়া রাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে assimilatedহয়ে যায়। এই সরকারের কর্মকাণ্ডে communist imprintঅদৃশ্য হয়ে যায়।’ (‘Concerning  Bourgeois Democracy and Socialism’ , Essay contained in the book titled “Re-Envisioning Socialism”; Authored by Pravat Patnaik, Tulika Books; 2011)

যে সরকার যত দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকে, সে তত বেশি অকেজো হয়ে পড়ে। বাঙলা ও ত্রিপুরায় সম্ভবত এটাই হয়েছে। কেরালায় যেহেতু প্রধান বিরোধী পক্ষ একটি গণতান্ত্রিক দল এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা অন্তর সরকারের বদল ঘটে, তাই পার্টি সেখানে এখনও সজীব রয়েছে।

মতামত লেখকের নিজস্ব


প্রকাশের তারিখ: ০৬-এপ্রিল-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫৭ টি নিবন্ধ
১৩-জুন-২০২৬

০৭-জুন-২০২৬

০৬-জুন-২০২৬

০৪-জুন-২০২৬

২৯-মে-২০২৬

২৮-মে-২০২৬

২৪-মে-২০২৬

০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬