Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ভারতে জনবিন্যাস, বিদ্বেষের নতুন চক্রান্ত

সুচিক্কণ দাস
 নির্বাচন চলাকালীন সময়েই হঠাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের অধীনে থাকা অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদ। একে গণতন্ত্রের জন্যে গৌরবের বলেছে নীতি আয়োগের মুখপাত্র। যদিও দেশের মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার হিন্দুদের চেয়ে বেশি এই তথ্যটি দিয়ে নীতি আয়োগ বোঝাতে চেয়েছে ভারতে গণতন্ত্র কতটা সুপ্রতিষ্ঠিত। সরকারি প্রতিবেদনে যাকে দেশের গণতন্ত্রের গৌরব বলে তুলে ধরা হয়েছে, সেটাকেই নির্বাচনী প্রচারে তুলে ধরা হচ্ছে  দেশের জন্যে আতঙ্কের বিষয় বলে। অথচ এটা স্পষ্ট যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের হ্রাস বৃদ্ধির সাথে ধর্ম বা জাতির কোনো সম্পর্ক নেই। নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে শিক্ষার। সেজন্যেই উন্নত শিক্ষার হার থাকা কেরলের মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা বিহারের হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কেন কেন্দ্র ও বিজেপির এই দ্বিচারিতা? দিগন্তে পরাজয়ের কালো মেঘ ক্রমে ঘনাচ্ছে। সেটাই কি?    
Demography in India new conspiracy of hatred

পরিপ্রেক্ষিত

ভারতভূমিতে তাঁর নির্বাচনী জয়রথের চাকা যে বসে যাচ্ছে, তা দু’দফা ভোটের পরেই টের পেয়ে গিয়েছে বিজেপি-আরএসএস-এর জোট। তাই দ্বিতীয় দফা ভোটের পরদিনই রাত জেগে আরএসএসের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করলেন নরেন্দ্র মোদী। আর পরদিন থেকেই ঘুরে গেল তাঁর প্রচারের অভিমুখ। চারশো পারের আওয়াজ ছেড়ে তিনি ফিরলেন হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের সেই চেনা রণধ্বনিতে। লক্ষ্য, বিভাজনের বিষকুম্ভের উৎসমুখ উন্মোচিত করে ঘৃণা ও বিভেদের ক্লেদাক্ত স্রোতের টানে ধীরে ধীরে বসে যেতে থাকা তাঁর নির্বাচনী রথের চাকাকে টেনে তুলে আবার সচল করা।

‘লক্ষ অশ্বখুরে খর শব্দ উঠিছে বাজিয়া’

অতএব গোটা ভারতখণ্ড জুড়ে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বীজ ছড়িয়ে দিতে নেমে পড়ল মোদীর শত শত ভগ্নদূত। নানা ভাবে নরেন্দ্র মোদী প্রচার করতে থাকলেন, বিরোধীরা সংখ্যালঘু তোষণ করছে শুধু নয়। তারা হিন্দুদের সব সম্পদ কেড়ে নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। বিলিয়ে দেবে সোনা, দানা, জমি, বাড়ি, এমনকী মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত। এতসব প্রচারের পর এল তৃতীয় দফার ভোট। দেখা গেল, ভোটদানের হার বাড়ল না। ফলে শঙ্কা আরও ঘনীভূত হল। চারপাশের খবর পেয়ে মোদী, অমিত শাহের কপালে ভাঁজ আরো গভীর হল। এখনও বাকি কয়েক দফা। অতএব চলল ব্রহ্মাস্ত্রের সন্ধান। সেই অস্ত্র যুগিয়ে দিল প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা পরিষদের একটি রিপোর্ট। রিপোর্টে বলা হল, ১৯৫০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সমীক্ষায় দেখা গেছে, এদেশে হিন্দু জনসংখ্যা এই সময়পর্বে ৮৪.৬৮ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৭৮.০৬ শতাংশ। অর্থাৎ হিন্দু জনসংখ্যা কমেছে ৭.৮২ শতাংশ। উল্টোদিকে মুসলিম জনসংখ্যা ১৯৫০ সালে যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৯.৮৪ শতাংশ, তা ২০১৫ সালের মধ্যে বেড়ে হয়েছে ১৪.০৯ শতাংশ। অর্থাৎ মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৪৩.১৫ শতাংশ। ভেতরের কথাটা হল, হিন্দু জনসংখ্যা যদি ৭.৮২ শতাংশ কমে থাকে এবং মুসলিম জনসংখ্যা যদি ৪৩.১৫ শতাংশ বেড়ে গিয়ে থাকে তাহলে তো সর্বনাশ! সর্বনাশ কার? ভারতবাসীর? নাকি নরেন্দ্র মোদী ও আরএসএসের? সেটাই আসল প্রশ্ন।

মোদী প্রথম থেকেই প্রচার শুরু করেছিলেন যে তাঁদের এবার চারশোর বেশি আসন চাই। কেন না, এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তাঁরা সংবিধান বদলে দিতে পারবেন। মোদীর সাঙ্গোপাঙ্গরা ঘোষণাই করে দিল, সংবিধান বদলে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করা হবে। আর, শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণ তুলে দেওয়া হবে। মানে, মণ্ডল রাজনীতির সামাজিক ন্যায়ের কর্মসূচিকে একেবারে নির্মূল করা হবে। ঠিক এখানেই মোদী ও আরএসএস-এর ছকটাকে ভেস্তে দিলেন বিরোধীরা। 

মনে রাখা দরকার, এদেশে যাঁরা দরিদ্র তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটিই হচ্ছে তপশিলি জাতি, উপজাতি, দলিত ও ওবিসি, এবং যাঁরা মূলত দরিদ্র ও ভূমিহীন। মাঠেঘাটে খেটে খাওয়া ছাড়া তাঁদের টিকে থাকার অন্য কোনও উপায় নেই। ব্যবসা, বাণিজ্য, দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ তাঁরা করতে পারবেন না। কারণ উঁচু জাতের লোকেরা তাঁদের ছোঁয়া এড়িয়ে চলে। ভারতীয় সমাজের এই অংশটির কাছে সংবিধান নির্দেশিত শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থাটি তাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে ওপরে ওঠার জন্য এটাই তাঁদের প্রায় একমাত্র হাতিয়ার। ফলে যখন দরিদ্র মানুষদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশে থাকা তপশিলি জাতি, উপজাতি, দলিত ও ওবিসি সমাজের মানুষ বুঝলেন যে, সংবিধান বদল করে মোদী ও আরএসএস তাদের সংরক্ষণের সুযোগ কেড়ে নেওয়ার ফন্দি আঁটছে, তখনই তাঁরা বেঁকে বসলেন এবং গোটা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতজুড়ে ভোটদানে তার প্রভাব পড়তে শুরু করল।

একে তো অর্থনীতির দফারফা করেছেন মোদী। নোটবন্দি, জিএসটি এবং কোভিডের লকডাউন দেশের লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র, লঘু ও মাঝারি উদ্যোগগুলির অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলেছে। কোটি কোটি লোকের আয়ের উৎস শুকিয়ে গেছে। বহু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে মোদি শুকিয়ে মেরেছেন। নয়ত ধান্দার পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় স্থায়ী নিয়োগ বন্ধ করেছেন। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার চাকরিগুলো স্রেফ উবে গেছে। তার চেয়েও বড় কথা, এই সব সংস্থায় সংরক্ষণের আওতায় থাকা শূন্যপদও বিলুপ্ত। নীট ফল, গত ৪৫ বছরের মধ্যে দেশে বেকারির হার সর্বোচ্চ। দেশে গার্হস্থ্য সঞ্চয় যত কমেছে তা গত ৪৭ বছরে কমেনি। লোকের ঘরের জমানো সোনা এখন মহাজনের ঘরে বাঁধা। সাধারণ জিনিসপত্র, বিশেষত খাদ্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। রোজগারের টানে কোটি কোটি মানুষ ঘরছাড়া, গ্রামছাড়া। গত ৭৫ বছরে এমন ছিন্নভিন্ন, দিশাহীন ভারত কেউ দেখেনি। এই শ্রীহীন মহাভারত তৈরি করেছে বিজেপি ও আরএসএস, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে।

ভোটের মুখে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে অর্থনৈতিক এই প্রশ্নগুলিকেই মানুষের সামনে এনে ফেলেছেন বিরোধীরা এবং সে নিয়ে সোচ্চার হতে শুরু করেছেন মানুষ। তাই মোদী প্রাণপণ চেষ্টা করছেন মানুষের নজর ঘোরাতে। সেকাজে এখন তাঁর একমাত্র হাতিয়ার, তাঁদের ফিক্সড ডিপোজিট, হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি। এটাই যখন বিজেপির ভোট প্রচারের বর্শামুখ, তখন একথা তো প্রমাণ করতে হবে যে বিরোধীরা হিন্দুদের সব সুবিধা কেড়ে নিয়ে মুসলিমদের বিলিয়ে দেবে। সেই প্রমাণেরই হাতিয়ার হল প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা পরিষদের রিপোর্ট, যেখানে নির্যাস হিসাবে দেখানো হচ্ছে দেশে মুসলিম জনসংখ্যা  বৃদ্ধির হার ৪৩.১৫ শতাংশ। বিরোধীরা যা চাইছে এই সব সংখ্যাতত্ত্বই কি তার প্রমাণ নয়? একথাই চিৎকার করে বলতে চাইছেন মোদী।  অর্থাৎ, মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই সব ভিত্তিহীন তথ্য সামনে আনা হচ্ছে মোদীর নির্বাচনী জয়রথের বসে যাওয়া চাকাকে টেনে তোলার জন্য। এনিয়ে আর কোনও  সংশয় থাকতে পারে না। আগামী কয়েক সপ্তাহ তাই এদেশের মাটিতে শোনা যাবে মোদীর অনুগামীদের লক্ষ অশ্বক্ষুরের ধ্বনি। শোনা যাবে বিভেদের ও বিদ্বেষের রণধ্বনি।

মারি অরি পারি যে কৌশলে

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা পরিষদের রিপোর্ট যা বলছে তা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য তথ্য?

জনসংখ্যা বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় সেন্সাস রিপোর্ট থেকে। এই রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পপুলেশন ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়া জানিয়েেছ, সেন্সাসের তথ্য অনুযায়ী ১৯৮১ থেকে ১৯৯১ সালের মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৩২.৯ শতাংশ। ২০০১-২০১১র দশকে এসে দেখা যাচ্ছে সেই বৃদ্ধির হার কমে হয়েছে ২৪.৬ শতাংশ। এর মানে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তিন দশকে কমেছে ৮.৩ শতাংশ। একই সময়পর্বে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২২.৭ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ১৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ বৃদ্ধির হার কমেছে ৫.৯ শতাংশ। এককথায় হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে আরও বেশি এবং এব্যাপারে সেন্সাসের তথ্যই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য। অথচ ওপরে উল্লেখিত রিপোর্টে এই সব তথ্যের কোনও উল্লেখ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, ২০২১ সাল থেকে পরবর্তী সেন্সাসের কাজ শুরু করার কথা থাকলেও মোদী সরকার তা বন্ধ রেখেছে। কেন বন্ধ রেখেছে তারও কোনও উত্তর নেই। সেকারণে সেন্সাসের বাইরে গিয়ে নিজেদের মতো জনসংখ্যার তথ্য প্রকাশ না করলে বিজেপির নির্বাচনী আসরটা তেমন জমছে না।

আসলে এদেশের জনসংখ্যা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের কুযুক্তি জাল ২০১৫ সালেই ছিন্নভিন্ন করেছিলেন গবেষক শোয়াইব ড্যানিয়েল। ‘ফাইভ চার্টস দ্যাট পাংচার দ্য বুগি অফ মুসলিম পপুলেশন গ্রোথ’ শীর্ষক গবেষণামূলক নিবন্ধে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্য কতদূর অন্তঃসারশূন্য। অথচ প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা পরিষদ সম্ভবত তাঁদের রিপোর্টটি তৈরি করতে তথ্য নিয়েছে ২০১৭ সালে টেক্সাসের বেলর ইউনিভার্সিটির গবেষক ডেভিড ব্রাউনের গবেষণা পত্র থেকে, যেখানে তিনি বেশ কয়েকটি দেশের ধর্মভিত্তিক জনবিন্যাস নিয়ে কাজ করেছেন। একাজে তাঁর সঙ্গী ছিলেন সাদার্ন ক্যালিফোরনিয়া ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক প্যাট্রিক জেমস। তবে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁরা নতুন কোনও তথ্য দিতে পারেননি। এবং তাঁরা একথাও বলেননি যে ভারতের জনবিন্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাচ্ছে। সেই তথ্যই নিজেদের পছন্দমাফিক কাজে লাগিয়ে বিকৃত ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে ব্যস্ত বিজেপি নেতারা। কিন্তু সেন্সাস রিপোর্টে যে অন্য কথা বলছে?  তাতে কি? মারি অরি পারি যে কৌশলে।

সীতারামন বনাম সীতারামন

এবছরের বাজেট বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছিলেন, দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জনবিন্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় সরকার একটি কমিটি গড়বে। অর্থাৎ নির্মলা বলছেন যে, দেশের জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ ২০১৮-১৯ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে, আগামী দু’দশকের মধ্যে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব দ্রুত কমবে। জাতীয় ও রাজ্যস্তরে ২০৪১ সাল পর্যন্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে অনুমান করা হচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে জনসংখ্যাগত রূপান্তরের একটি নতুন পর্বে প্রবেশ করতে ভারত।

একদিকে নিজের পেশ করা অর্থনৈতিক সমীক্ষায় নির্মলা বলছেন, আগামী দু’দশকের মধ্যে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ভালরকম কমবে। অথচ ২০২৪ সালে এসে সেই নির্মলাই বাজেট ভাষণে বলছেন, দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অথচ এর সমর্থনে কোনও তথ্য দিচ্ছেন না তিনি। প্রশ্ন হল, নির্মলার কোন বক্তব্য সত্যি?

আরও একটা হিসাব দেখা যাক।

একজন মহিলা যতজন সন্তানের জন্ম দেন তাকে বলা হয় টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর। যদি একজন মহিলা গড়ে ২.১ জন সন্তানের জন্ম দেন তাকে বলা হয় রিপ্লেসমেন্ট লেভেল বা রিপ্লেসমেন্ট ফার্টিলিটি রেট। আন্তর্জাতিক ভাবে এটা স্বীকৃত যে, কোনও দেশ যদি রিপ্লেসমেন্ট ফার্টিলিটি রেটে পৌঁছে যায় তাহলে বুঝতে হবে সেদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার থিতু হয়েছে, আর আগের মতো বাড়ছে না। ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে ৫ অনুযায়ী, ভারতের টিএফআর এখন ২.০। এর মানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে হারে পৌঁছলে থিতু হয়, ভারত রয়েছে তার চেয়েও নীচে। রিপ্লেসমেন্ট ফার্টিলিটি রেটের ওপর ভিত্তি করেই ২০২২ সালের ১৯ জুলাই সংসদে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রয়াস সফল হয়েছে। একই কথা বলছে ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ডও। ২০২২ এর নভেম্বরে এই সংস্থা জানিয়েছিল, ‘সুখবর হল ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার থিতু হচ্ছে। দেশের ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত এলাকা (দেশের জনসংখ্যার ৬৯ শতাংশের) টিএফআর রিপ্লেসমেন্ট ফার্টিলিটি রেটে ২.১ এর চেয়েও কম।’ এবছরের মার্চ মাসে দ্য ল্যানসেট পত্রিকা জানিয়েছে, ভারতের টিএফআর আরও কমে ২০২৭ সাল নাগাদ দাঁড়াবে ১.৭৫।

যখন ইউনাইটেড নেশনস পপুলেশন ফান্ড, কিংবা দ্য ল্যানসেটের মতো পত্রিকা, কিংবা এদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে আসার কথা বলা হচ্ছে, তখন নির্মলা সীতারামন কীভাবে বলছেন যে দেশে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে? কিংবা প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা পরিষদ কীসের ভিত্তিতে মুসলিম জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধির হারের সংখ্যা সামনে নিয়ে আসছে?

আসলে এর পিছনে শুধু বিরোধীদের সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনাই নয়, রয়েছে আরও গূঢ় উদ্দেশ্য।

‘ছকপাতা খেলা চলেছি খেলতে খেলতে’

বিজেপি সাংসদ রাকেশ সিনহা রাজ্যসভায় এনেছিলেন পপুলেশন রেগুলেশন বিল ২০১৯। তাতে বলা ছিল, এই বিল আইন হলে যাদের দু’টির বেশি সন্তান হবে তাদের সরকারের তরফে দেওয়া সব ধরনের সামাজিক ও আর্থিক সুবিধা কেড়ে নেওয়া হবে। রেশন দেওয়া হবে না। সরকারি চাকরিতে তাঁরা আবেদন করতে পারবেন না। তাঁরা নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। দুইয়ের বেশি সন্তান বলে কাদের বোঝাতে চাওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট। একইভাবে যোগী আদিত্যনাথও ২০২১ এর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে বলেছিলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধিই যত নষ্টের গোড়া। সেই সময় উত্তরপ্রদেশের রাজ্য আইন কমিশন একটা বিলের খসড়া হাজির করেছিল। তাতে বলা ছিল, যাদের দু’টির বেশি সন্তান হবে তাঁরা রেশন পাবেন না, পঞ্চায়েতে দাঁড়াতে পারবেন না। এখানেও বিলের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট। এখন এটা আরও স্পষ্ট যে, মোদী সরকার একবার সংবিধান বদলের সুযোগ পেয়ে গেলে সংখ্যালঘু মুসলিমদের কী অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে চাইবে। তবে দক্ষ ফ্যাশিস্তদের মতোই তারা আসলে  নিজেরা যা করতে চায়, ভোট প্রচারে  সেটাই চাপিয়ে দিতে চাইছে বিরোধীদের ওপর ।

বিজেপি যে আসলে সংরক্ষণ সহ সবরকম সুযোগ সুবিধা থেকে মুসলিমদের বঞ্চিত করতে চায় সেকথা স্পষ্ট হয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রাজীব চন্দ্রশেখরের কথাতেও। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা পরিষদের রিপোর্ট প্রকাশের পরপরই তিনি বলেছেন, ভারতে জনসংখ্যার বিন্যাস বদলে যাচ্ছে একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। তিনি আরও বলেছেন, নতুন যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে সেখানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে  শিক্ষা ও চাকরিতে সরকারি সুযোগ সুবিধার পুনর্বিন্যাস করা হবে। এর মানে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিন্দুদের বার্তা দিতে চাইছেন যে, বিজেপি ক্ষমতায় ফিরলে সংরক্ষণের সব সুবিধা হিন্দুরাই পাবে। মুসলিমদের বঞ্চিত করা হবে। অতএব বিজেপিকেই ভোট দিন। এর চেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক বার্তা আর কি হতে পারে?

‘হে ভারত ভুলিও না’

কতকাল আগে স্বামী বিবেকানন্দ দেশের লোককে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, এদেশের মুচি, মেথর, চণ্ডাল, শূদ্রদের ভুললে চলবে না। কারণ, তারাই আসল ভারতবর্ষ। এখনকার রাজনীতির পরিভাষায় সেদিনের সেই নিম্নবর্গই আজ তপশিলি জাতি, উপজাতি, দলিত, ওবিসি এবং সংখ্যালঘু। সেই নিম্নবর্গকে বিভ্রান্ত ও বিভাজিত করেই এদেশে নিজেদের রাজ কায়েম করেছে বিজেপি। তবে এক দশক পর বিজেপির বিভেদ ও বিদ্বেষের রাজনীতির স্বরূপ ক্রমশ চিনে ফেলছেন দেশের মানুষ। আশা করা যায়, মহাভারতের সেই নিম্নবর্গের মানুষজন এবারের নির্বাচনে বিভেদের বিষ মুছে ফেলে হাতে হাত রেখে পার হয়ে যাবেন বিষের বিষাদসিন্ধু।

আরও পড়ুন: সংরক্ষণ ও সঙ্ঘের রঙবদল 
জনগণনার সাথে কেন জাতগণনাও চাই?


প্রকাশের তারিখ: ১৩-মে-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

এমন লেখা সত্যিই শিক্ষণীয় এবং এমন বিকল্প পথের কথা এবং সঠিক তথ্য বামপন্থীরাই বলার ক্ষমতা রাখে। ধন্যবাদ ও সংগ্রামী অভিনন্দন মার্ক্সবাদী পথ কে...
- মহম্মদ মাসুদ, ১৪-মে-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬