সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ফ্রান্স: উগ্র দক্ষিণপন্থাকে রুখে বামপন্থীদের সাফল্য
ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
নয়া পপুলার ফ্রন্ট মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধতার সদিচ্ছার কারণে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিছু কল্যাণকামী সামাজিক পদক্ষেপ টিকিয়ে রাখা হবে। নয়া উদারবাদী পদক্ষেপ কিয়দাংশে প্রত্যাহৃত হবে। বিশেষ করে ব্যয়সঙ্কোচের নীতি। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অবসরের বয়স কমানোর, পেনশনের পুরানো নিয়ম পুনর্বহাল করার এবং বড়লোকদের উপর কর চাপানোর।

ফ্রান্সের জনগণ পার্লামেন্ট নির্বাচনে উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। অনেকগুলো জনমত সমীক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে, লি পেনের ন্যাশনাল রালি মোটে ১৪৩টি আসন লাভ করেছে। এবং নেমে এসেছে তৃতীয় স্থানে। জয়ী হয়েছে নতুন তৈরি হওয়া বামপন্থী জোট নয়া পপুলার ফ্রন্ট। এবং একক বৃহত্তম ব্লক হিসাবে ১৮২টি আসন জিতেছে। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ম্যাক্রোঁর জোট জিতেছে ১৬৩টি আসন। এরকম ত্রিশঙ্কু ফলাফলের কারণে কোনও একটি দল বা জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হলে সংসদে ৫৭৭টি আসনের মধ্যে অন্তত ২৮৯টি আসন জিততে হয়। নয়া পপুলার ফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১০০টি আসন কম পেয়েছে। জুন মাসে ইউরোপীয় সংসদের নির্বাচনে নিজের দল ধাক্কা খাওয়ার পর এই নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ।
ইউরোপীয় সংসদের নির্বাচনের পরেই উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থানের আশঙ্কায় ত্রস্ত ফরাসি জনগণ সারাদেশে বিশাল সংখ্যায় মিছিল-সমাবেশ করেছেন। তাঁরা খুব স্পষ্টভাবে উগ্র দক্ষিণপন্থার বিভাজনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধতা করেছেন। বামপন্থী দলগুলো সঠিকভাবেই জনগণের আবেগকে মূল্যায়ন করতে পেরেছিল। এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা জোট তৈরি করেন– নয়া পপুলার ফ্রন্ট। এই ফ্রন্টে জ্যাঁ-লুক মেলেশোঁর ফ্রান্স আনবোড যেমন ছিল, তেমনই ছিল সোশ্যালিস্টরা, গ্রিন পার্টি, এবং কমিউনিস্টরা। তাঁরা ক্ষমতায় এলে বাস্তবায়ন করবেন এমন ১৫০-দফা করণীয় ঘোষণা করেন। যদিও এই ফ্রন্ট নির্বাচনের কয়েকদিন আগেই তৈরি হয়, তবু তাঁরা খুবই শক্তিশালী ফলাফল করেছে। এবং এমন এক শক্তি হিসাবে উত্থিত হয়েছেন যাঁরা উগ্র দক্ষিণপন্থাকে রুখতে পারে।
প্রথম দফায়, লি পেনের দলই ৩৩.১ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে গিয়েছিল। ২৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল নয়া পপুলার ফ্রন্ট। আর ম্যাক্রোঁর দল পায় ২১ শতাংশ সমর্থন। যেহেতু কোনও দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি, তাই দ্বিতীয় দফার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ১২.৫ শতাংশ বা তার বেশি সমর্থন পেলে তবেই দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারা যাবে। এর ফলশ্রুতিতে সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্তির নিরিখে তিনজন করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থেকেছেন। মানুষের মধ্যে উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ সমস্ত বিরোধী দলকে তাদের পরাজয় নিশ্চিত করার যাবতীয় পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। সেই মাফিক প্রায় দুশোর বেশি প্রার্থী, যাঁরা প্রথম দফায় তৃতীয় হন, তাঁরা প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নেন। নয়া পপুলার ফ্রন্ট সঙ্গে সঙ্গেই তাদের এমন প্রার্থীদের প্রত্যাহার করে নেয়। ম্যাক্রোঁর দলের সকলে এই সৌজন্যের প্রতিদান দিয়েছেন এমন নয়। অনেকেই প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করেন যেহেতু মেলেশোঁর বামপন্থী ফ্রান্স আনবোড ও লি পেনের উগ্র দক্ষিণপন্থী ন্যাশনল রালিকে তাঁরা অভিন্ন বলে মনে করেন। এসব বাধা সত্ত্বেও, ফলাফল প্রমাণ করে দিয়েছে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। এবং আরো একবার জনগণ তাদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখলেন। উগ্র দক্ষিণপন্থার প্রতি ক্ষোভ ও তাদের পরাজিত করতে পারে এমন বিশ্বাসযোগ্য দলের উপস্থিতি, দুই’ই তাঁদের পরাজিত হওয়ার কারণ।
সংসদে ম্যাক্রোঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার সময় নয়া উদার নীতি-নির্দেশিত ব্যয়সঙ্কোচের নীতি রূপায়ণ করেছিলেন। সরকার ধনীদের উপর কর চাপাতে অস্বীকার করে। কিন্তু সমস্ত বোঝা চাপিয়ে দেয় শ্রমজীবী মানুষের উপর। কর্মচারীদের অবসরের বয়স বাড়িয়ে দেওয়া হয়। গৃহীত হয় অবসর সংক্রান্ত আইনের সংস্কার। শ্রমিক ও কৃষকরা এই সব পদক্ষেপের বিপক্ষে প্রতিবাদ করছিলেন। সংগঠিত করেছিলেন শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন সংগ্রাম। শ্রমিকদের মাসাধিক কাল ব্যাপী আন্দোলন এবং কৃষকদের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন ম্যাক্রোঁর সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের দু’টি জাজ্জ্বল্যমান উদাহরণ।
উগ্র দক্ষিণপন্থীরা সরকার-বিরোধী ক্ষোভের ফসল তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁরা সমস্ত সমস্যার জন্য উদ্বাস্তুদের প্রবেশকে দায়ী করেন। তাঁরা সমাজে বর্ণবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিষ ছড়াতে শুরু করেন। এবং সমাজকে ভাগ করেন। রক্ষণশীল এবং সোশ্যালিস্টদের মতো চিরায়ত প্রতিষ্ঠানপন্থী দলগুলির সার্বিক ব্যর্থতা, সেইসঙ্গে কমিউনিস্ট এবং গ্রিন পার্টি’র পার্টির দুর্বলতাজনিত কারণে উগ্র দক্ষিণপন্থার উত্থান সম্ভব হচ্ছিল। লি পেন বা তার দল কখনোই পেনশন সংস্কারের বা অবসরের বয়স বাড়িয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেনি। শোষক শ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী বড় কর্পোরেট কোম্পানিগুলো লি পেনের পার্টিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছে। তারা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল যাতে বামপন্থীরা কিছুতেই জনগণের ক্ষোভ থেকে লাভবান না হতে পারেন।
লি পেনের নয়া উদারবাদের সমর্থন ও বিভাজনের রাজনীতি মানুষকে ভীত ও সচকিত করে তুলেছিল। তাঁরা একথা বুঝতে পারেন যে ক্ষমতায় এলে এই পার্টি তাঁদের মূল সমস্যাগুলো সমাধান করবে না। বরং সমাজে বিভাজনের মাধ্যমে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করবে। আসলে, মানুষ ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের ভয়াবহতা ভুলে যাননি। এবং তাঁরা ওই অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি চাননি।
নয়া পপুলার ফ্রন্ট মানুষের গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে তাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচি ও উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধতার সদিচ্ছার কারণে। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কিছু কল্যাণকামী সামাজিক পদক্ষেপ টিকিয়ে রাখা হবে। নয়া উদারবাদী পদক্ষেপ কিয়দাংশে প্রত্যাহৃত হবে। বিশেষ করে ব্যয়সঙ্কোচের নীতি। তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অবসরের বয়স কমানোর, পেনশনের পুরানো নিয়ম পুনর্বহাল করার এবং বড়লোকদের উপর কর চাপানোর।
ফ্রান্সের এই নির্বাচন দেখিয়ে দিচ্ছে সমাজ কিভাবে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। যদিও লি পেনের ন্যাশনাল রালি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তবু তাঁরা সংসদে আসনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলেছে। এই ঘটনা ঠাণ্ডা ভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে কিভাবে উগ্র দক্ষিণপন্থার মতাদর্শ সমাজের গভীরে ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে।
এই বিভাজন এখন নতুন সরকার গঠনেও ভূমিকা পালন করবে। ম্যাক্রোঁ ক্ষমতা থেকে সরে আসতে রাজি নন। যদিও তাঁর হঠাৎ নির্বাচন ঘোষণার পাশা এখন উল্টে গিয়েছে। তিনি সম্ভবত বামপন্থী জোট গঠন এবং তাদের শক্তিশালী হওয়া আগে থেকে আন্দাজ করতে পারেননি। তাঁর কাছে উগ্র দক্ষিণপন্থা ততটা ভয়ের কারণ নয়। কারণ তাঁর নীতি প্রণয়ন উগ্র দক্ষিণপন্থী মতাদর্শের গ্রহণীয়তা সৃষ্টি করায় ভূমিকা পালন করেছে। ফরাসি শাসক শ্রেণিও চায় রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থী ও উগ্র দক্ষিণপন্থীরা মিলিতভাবে বামপন্থীদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখুক। এরকম জোট তাঁদের সুবিধার্থে নয়া উদারবাদী নীতি প্রণয়ন করতে সাহায্য করবে।
নয়া পপুলার ফ্রন্টের মধ্যেও ক্ষমতার ভাগাভাগি সম্পর্কে ঐক্যবদ্ধ মতামত নেই। সোশ্যালিস্ট ও গ্রিন পার্টি মেলেশোঁকে নেতা হিসেবে স্বীকার করতে রাজি নয়। যদিও মেলেশোঁর দলই সর্বোচ্চ আসনে জিতেছে। অর্থনৈতিক নীতি বিষয়ে তীব্র মতপার্থক্য আছে এবং মেলেশোঁ ‘অতি বাম’ এবং পুঁজিবাদ-বিরোধী বলে পরিচিত। এইসব বিরোধকে ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। এবং তাদেরকে ভাঙিয়ে নিয়ে মধ্য-বামপন্থী সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে বিনাশ করার চেষ্টা চলছে।
তবে এই ধরনের সকল পদক্ষেপই আসলে জনাদেশের প্রতি অসম্মান প্রকাশ করে। মানুষ ম্যাক্রোঁ এবং লি পেনের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তাঁরা মতামত দিয়েছেন উগ্র দক্ষিণপন্থা ও নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে। যে সরকারই আসুক না কেন এই বাস্তবতা স্বীকার করে জনগণের মতামতকে মর্যাদা দেওয়া উচিত। একমাত্র তখনই জনগণের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আর অন্য যে কোনও পদক্ষেপ হবে ধ্বংসাত্মক। এবং তাতে শুধু উগ্র দক্ষিণপন্থীরাই শক্তিশালী হবে। উগ্র দক্ষিণপন্থার লক্ষণ কিন্তু এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি, এখনকার মতো থেমেছে মাত্র।
সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি
ভাষান্তর: নবারুণ চক্রবর্তী
প্রকাশের তারিখ: ১৮-জুলাই-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
