সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
গ্রামীণ উন্নয়নে পঞ্চায়েত – পর্ব ২
জ্যোতি বসু
কিন্তু, তারপর রাজ্য স্তর থেকে বিশেষ সাংগঠনিক প্রয়াস নেওয়ার ফলে পঞ্চায়েত, ব্যাঙ্ক ও সরকারী প্রশাসনের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় আনা সম্ভব হয়েছে এবং রূপায়ণের ক্ষেত্রে বিশেষ উন্নতি লক্ষ করা গেছে। গোড়ার বছরগুলি নিয়ে সমগ্র ষষ্ঠ পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের হিসাব নিলে হয়তো এই সামগ্রিক উন্নতির চিত্র পরিষ্কার হবে না। কিন্তু প্রথম কিছু বছর বাদ দিলে গত তিন বছরে এই প্রকল্পের এক বিশেষ উন্নতি চোখে পড়ে। এই উন্নতির হার এত বেশি যে...

ভূমিসংস্কারের পর পঞ্চায়েতগুলিকে দায়িত্ব দেওয়া হলো— 'কাজের বিনিময়ে খাদ্য' এবং ‘গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচী’-র রচনা ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে। এই প্রকল্পগুলির উদ্দেশ্য হলো, গ্রামের গরিব মানুষকে মজুরি ও খাদ্যসামগ্রীর বিনিময়ে শ্রমে নিযুক্ত করে সামাজিক সম্পদ তৈরি করা - যথা, পুষ্করিণী খনন ও উন্নয়ন, ভূমিসংরক্ষণ, রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদি। ১৯৮০-৮১ থেকে এই প্রকল্পগুলিকে একটি কর্মসূচীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নাম দেওয়া হয়েছে 'জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প' (National Rural Employment Programme) |
পশ্চিমবঙ্গে এই সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা পরিষদ এবং গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির ওপর। এর ফলে গত চার বছরে যে পরিমাণ সম্পদ (অর্থ এবং খাদ্যশস্যের মূল্য সমেত) ব্যয় করা হয়েছে এবং তার ফলে যত শ্রম দিবস সৃষ্টি হয়েছে তার হিসাব সারণি ১-এ দেখানো হলো।
লক্ষণীয় যে, ১৯৮২-৮৩ সাল একটি অভূতপূর্ব খরার বছর ছিল। তাই যে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় সরকার থেকে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়া গিয়েছিল তার ফলে সে বছরে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় ও শ্রমদিবস সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিল। পরের বছর দু'টিতে সম্পদ ব্যয় ও শ্রমদিবস সৃষ্টি লক্ষ্যমাত্রাও কমিয়ে দেওয়া হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৮৪-৮৫ সালে এই প্রকল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের মজুরির হার বৃদ্ধি করা হয়। ফলে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল তার থেকে শ্রম দিবস সৃষ্টি কিছুটা হ্রাস পায়।
এই ধরনের প্রকল্পের মূল্যায়নে যা বিশেষভাবে দেখা প্রয়োজন তা হলো, যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তা সঠিকভাবে সাধারণ মানুষের শ্রমদিবস সৃষ্টিতে নিয়োজিত হয়েছে কি না, এবং প্রকল্প নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করা হয়েছে কি না। এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্যেই ভারতবর্ষের যোজনা কমিশন একটি সমীক্ষা করেন। এই সমীক্ষাতে বলা হয়েছে, মুষ্টিমেয় যে কয়েকটি রাজ্যে এই ধরনের প্রকল্প সাফল্যের সঙ্গে রূপায়িত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ তাদের মধ্যে অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অন্যান্য রাজ্যের পরিস্থিতির পার্থক্য উল্লেখ করে সমীক্ষাটিতে বলা হয়েছে, একমাত্র “পশ্চিমবঙ্গে জেলা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বরাদ্দ খাদ্যশস্য এবং অর্থ পাওয়ার পর গ্রামের জন্য প্রকল্প প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলি জনসাধারণের সভা ডাকে। এইসব সভাতেই প্রকল্পগুলির অগ্রাধিকারও স্থির হয়।" বিবরণীতে জোরের সঙ্গে বলা হয়েছে যে, পঞ্চায়েতের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে পশ্চিমবঙ্গে কর্মসূচীর রূপায়ণে সুষ্ঠু সমন্বয় সম্ভব হয়েছে।
রাজ্য সরকারের উন্নয়ন বিভাগের পূর্বোল্লিখিত সমীক্ষাতে এই কর্মসূচী রূপায়ণের বিষয়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায়। সমীক্ষার মতে, যে প্রকল্পগুলি রূপান্তরিত হয়েছে সেগুলি অধিকতর শ্রম-নিবিড় এবং এদের একক প্রতি নির্মাণ খরচও প্রচলিত মানের তুলনায় অনেক কম। এই ব্যয় সংক্ষেপের কারণ হিসাবে বলা হয়েছে যে, সাধারণভাবে এই প্রকল্পগুলি রূপায়ণে কন্ট্রাক্টর নিযুক্ত হয়নি। তত্ত্বাবধানের কাজ প্রায় শতকরা ৭৩ ভাগ করেছেন স্থানীয় জনসাধারণ ও পঞ্চায়েত সদস্যরা নিজে এবং বিনা পারিশ্রমিকে।
সম্প্রতি গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচীর পাশাপাশি প্রায় একই ধরনের একটি কর্মসূচী 'গ্রামের ভূমিহীনের কর্মস্থান গ্যারান্টি প্রকল্প' (Rural Landless Employment Guarantee Programme) নামে চালু করা হয়েছে। জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই নতুন প্রকল্পটির রচনা ও রূপায়ণের মূল দায়িত্ব এরাজ্যে আমরা দিয়েছি পঞ্চায়েতগুলিকে। প্রথম বছর, ১৯৮৪-৮৫ সালে এই প্রকল্পটির রূপায়ণের শুরুতে একটু শ্লথতা ছিল। কিন্তু ১৯৮৫-৮৬ সালে সাংগঠনিক প্রয়াস সঠিকভাবে নেওয়ায় রূপায়ণের গতি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সার্বিক গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পটির (Integration Rural Development Programme) ভিত্তিতে গ্রামাঞ্চলের গরিব মানুষকে জমি ছাড়া অন্যান্য উপকরণের ক্ষেত্রে সাহায্য করা সম্ভব। এই সাহায্যের ধরন হলো, উপকরণটির খরচের কিছু অংশ ভর্তুকি এবং বাকি অংশ ব্যাঙ্কের ঋণ হিসাবে দেওয়া হয়। মোট ভর্তুকি বাবদ খরচের অর্ধেক বহন করেন রাজ্য সরকার এবং অর্ধেক কেন্দ্রীয় সরকার। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির রচনা ও রূপায়ণেরও মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পঞ্চায়েতের ওপর এবং নির্দিষ্টভাবে পঞ্চায়েত সমিতির ওপর। ১৯৭০ দশকের শেষে যখন এই প্রকল্পটি শুরু হয় তখন এবং পরেও কিছুদিন পর্যন্ত পঞ্চায়েতকে এই দায়িত্ব দেওয়ার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের আপত্তি ছিল। এছাড়া, ব্যাঙ্কের দিক থেকেও শুরুতে শ্লথতা দেখা গিয়েছিল। তাই ১৯৮০-৮১ এবং ১৯৮১-৮২ সালে এই প্রকল্পের রূপায়ণ দ্রুততার সঙ্গে করা সম্ভব হয়নি (সারণি ২ দ্রষ্টব্য)।

কিন্তু, তারপর রাজ্য স্তর থেকে বিশেষ সাংগঠনিক প্রয়াস নেওয়ার ফলে পঞ্চায়েত, ব্যাঙ্ক ও সরকারী প্রশাসনের মধ্যে সুষ্ঠু সমন্বয় আনা সম্ভব হয়েছে এবং রূপায়ণের ক্ষেত্রে বিশেষ উন্নতি লক্ষ করা গেছে। গোড়ার বছরগুলি নিয়ে সমগ্র ষষ্ঠ পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের হিসাব নিলে হয়তো এই সামগ্রিক উন্নতির চিত্র পরিষ্কার হবে না। কিন্তু প্রথম কিছু বছর বাদ দিলে গত তিন বছরে এই প্রকল্পের এক বিশেষ উন্নতি চোখে পড়ে। এই উন্নতির হার এত বেশি যে, সারা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ন্যাবার্ড-র (NABARD) সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, একমাত্র পাঞ্জাবের কথা বাদ দিলে সাহায্যপ্রাপ্ত পরিবারগুলি সর্বাধিক শতকরা হারে দারিদ্র্য সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। শুধু তাই নয়, সমীক্ষার মতে পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রকল্প রূপায়ণে যুক্ত করায় গরিব পরিবারকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা গেছে এবং সামাজিক অপচয় বাদ দিয়ে যাতে বিনিয়োগের পুরো অংশ দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছায় তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই প্রকল্পগুলি ছাড়াও, খরাপ্রবণ এলাকার প্রকল্প, চাষের মিনিকিট বিতরণ, ছোটো সেচ প্রকল্প, সামাজিক বনসৃজন, গ্রামীণ জলসরবরাহ, তফসিলী জাতি ও সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ প্রকল্প— এই সমস্ত প্রকল্পের রচনা ও রূপায়ণের দায়িত্বও পঞ্চায়েতকে দেওয়া হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, ১৯৮৪-৮৫ সালে কোনো জেলাতে মোট পরিকল্পনা খাতে যত ব্যয় বরাদ্দ ধরা আছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচ হয়েছে পঞ্চায়েত রচিত ও রূপায়িত প্রকল্পগুলির মাধ্যমে। এই সরাসরি দায়িত্ব ছাড়াও অন্যান্য দপ্তরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও পঞ্চায়েতকে আংশিকভাবে যুক্ত করে রাখা হয়েছে।
যে সকল প্রকল্প পঞ্চায়েত দ্বারা সরাসরি রচিত ও রূপায়িত সেখানে ভূমিসংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব পেয়েছে সেচ প্রকল্প এবং আরও নির্দিষ্টভাবে ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প। এই প্রকল্পগুলি সাধারণভাবে শ্রম-নিবিড় ও স্থানীয় সম্পদ নির্ভর (যথা পুষ্করিণী খনন, পাতকুয়া খনন, জোড় বাঁধ নির্মাণ ইত্যাদি)। এগুলির মাধ্যমে এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রকল্পের মাধ্যমে গত আট বছরে গড়ে প্রতি বছর প্রায় দেড় লক্ষ থেকে দু'লক্ষ একর চাষের জমি সেচের আওতায় এসেছে। ভূমিসংস্কার, এই সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য উপকরণের ভিত্তিতে গত আট বছরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বামফ্রন্ট সরকারের আট বছরের সঙ্গে পরের আট বছর তুলনা করলে দেখা যায়, প্রথম আট বছরে যে গড় কৃষি উৎপাদন সূচক ছিল ১০৩, পরের আট বছরে তা ১২৫-কে অতিক্রম করে গেছে। কৃষি উৎপাদনে এতটা বৃদ্ধি ইদানীংকালে পশ্চিমবঙ্গে হয়নি। এই মোট উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভূমিহীন ক্ষেতমজুরের মজুরিও বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৭৬-৭৭ সালে যে দৈনিক গড় মজুরির তার ছিল ৫.৬৫ টাকা, ১৯৮৪-৮৫ সালে এসে সেই মজুরির হার কোনো কোনো জেলায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। আমরা আগে উল্লেখ করেছি যে, ১৯৬১ এবং ১৯৭১ সালের মধ্যে দরিদ্র কৃষক এত বেশি হারে জমি হারিয়েছেন যে ভূমিহীন ক্ষেত মজুরের সংখ্যা এই সময় ১৮ লক্ষ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৩২ লক্ষে এসে পৌঁছায়। ১৯৮১ সালে এই সংখ্যা হয়েছে ৩৮ লক্ষ অর্থাৎ, ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে বৃদ্ধির হার হয়েছে ১৯ শতাংশ, যা আগেকার বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক কম।
একটু আগে, পঞ্চায়েত দিয়ে রূপায়িত ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পগুলির কথা বলেছি। কিছুদিন হলো এই সেচ প্রকল্পগুলির মালিকানার ক্ষেত্রে একটি নতুন সম্ভাবনার সংবাদ খুব অল্প হলেও কোনো কোনো জেলা থেকে আসছে। এইসব ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পটির স্থান নির্বাচন এমনভাবে করা হয়েছে যেখানে অধিকাংশ জমি গরিব চাষীর মালিকানায় এবং একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকেই প্রস্তাব এসেছে যে, সেচ প্রকল্পটি যেন গোষ্ঠী মালিকানার হয়। যদিও এই সম্ভাবনার খবর সীমিত সংখ্যাতেই এসেছে, তবুও এই সম্ভাবনার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গুরুত্ব যথেষ্ট।
ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, গত প্রায় সাত-আট বছর ধরে জেলাগুলির গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ গ্রামবাসীকে সমবেত করে বেশ কিছু প্রকল্প রূপায়িত হয়েছে— ভূমিসংস্কার, গ্রামীণ কর্মসংস্কার, গ্রামীণ কর্মসংস্থান, সার্বিক গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মসূচীকে কেন্দ্র করে। এর ফলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই বৃদ্ধির সুফল গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ পেয়েছেন। কিন্তু এই সঙ্গে বলা প্রয়োজন যে, এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর আছে যেখানে প্রকল্প রচনা ও রূপায়ণে পঞ্চায়েত বা তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার কাজে অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে এবং পরিকল্পনা রচনা করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত প্রবণতা সম্পূর্ণ দূর হয়নি। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পঞ্চায়েত পরিচালিত প্রকল্পগুলির সঙ্গে দপ্তর পরিচালিত প্রকল্পগুলির মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে অনেক উন্নতির সুযোগ আছে। সেরকম উন্নতির সুযোগ আছে বিভিন্ন দপ্তরের প্রকল্পগুলির নিজেদের মধ্যেও।
এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে চিন্তা করা হয়েছে, কীভাবে পঞ্চায়েত পরিচালিত প্রকল্প এবং দপ্তর পরিচালিত প্রকল্প— এই প্রকল্পগুলির মধ্যে আরও সমন্বয় করা যায় এবং কীভাবে প্রকল্পগুলির সঙ্গে সাধারণ মানুষকে আরও বিস্তৃতভাবে যুক্ত করা যায়। এই সমন্বয়ের একটি প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে রাজ্যস্তরে এবং আগামী দিনে সেই প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে জেলা ও ব্লক স্তরে এই সমন্বয় সাধনের জন্য এক ধরনের সাংগঠনিক কাঠামোর কথা চিন্তা করা হয়েছে— যার মাধ্যমে পঞ্চায়েত প্রতিনিধি ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা এবং জেলা ও ব্লক স্তরে বিভিন্ন দপ্তরে সরকারী কর্মচারীরা পরিকল্পনা রচনা করার ক্ষেত্রে একত্রিত হতে পারেন।
এই সাধারণ ধারণা সামনে রেখে প্রতি জেলাতে একটি জেলা পরিকল্পনা ও সমন্বয় পরিষদ এ বছরই প্রথম গঠিত হয়েছে, যার সভাপতি হয়েছেন জেলার ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী, সহ- সভাপতি হয়েছেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি এবং সদস্য সচিব হয়েছেন জেলা সমাহর্তা। সদস্যদের মধ্যে জনপ্রতিনিধি হিসাবে আছেন জেলার সাংসদ ও বিধানসভার সদস্যগণ, জেলা পরিষদের স্থায়ী কমিটিগুলির কর্মাধ্যক্ষরা, জেলার প্রতিটি ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং প্রতিটি পুরসভার সভাপতি। এ ছাড়া সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে আছেন জেলা স্তরে প্রতিটি ভারপ্রাপ্ত সরকারী প্রতিনিধি। তাছাড়া, জেলাতে যদি কোনো বিশেষ সংস্থা থাকে (যথা, দার্জিলিং পার্বত্য উন্নয়ন পর্ষদ বা মেদিনীপুরে ঝাড়গ্রাম উন্নয়ন বোর্ড), তা হলে তার প্রতিনিধিও এই পরিষদে সদস্য হয়েছেন। জেলা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই পরিষদ সাধারণ সভা হিসাবে কাজ করছে, যার মূল দায়িত্ব রাজ্যস্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জেলা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের রূপরেখা নির্দেশ করা এবং সেই নির্দেশের মধ্য থেকে জেলার সামগ্রিক পরিকল্পনা রচিত হওয়ার পর তাকে আলোচনার ভিত্তিতে অনুমোদন করা।
এই পরিকল্পনা রচনা করার ক্ষেত্রে পরিষদের কার্যকরী অঙ্গ হিসাবে কাজ করছে জেলা পরিকল্পনা কমিটি। এই কমিটির সভাপতি হয়েছেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি এবং সদস্য সচিব হয়েছেন জেলা সমাহর্তা। জনপ্রতিনিধি হিসাবে এর সদস্য হয়েছেন জেলা পরিষদের স্থায়ী সমিতির কর্মাধ্যক্ষরা, জেলার প্রতিটি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং প্রতিটি পুরসভার সভাপতি, এছাড়া জেলা স্তরের প্রতিটি দপ্তরে ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা এর সদস্য।
একই সঙ্গে জেলার প্রতিটি ব্লকে একটি ব্লক পরিকল্পনা কমিটি গঠিত হয়েছে যার সভাপতি সেই ব্লকের পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং সদস্য সচিব ব্লক উন্নয়ন অফিসার। জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সদস্য হিসাবে আছেন পঞ্চায়েত সমিতির স্থায়ী কমিটির কর্মাধ্যক্ষরা এবং সেই ব্লকের প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান। এছাড়া ব্লক স্তরে বিভিন্ন দপ্তরের সরকারী প্রতিনিধিরা এর সদস্য।
এখানে বলা প্রয়োজন, জেলা পরিকল্পনা ও সমন্বয় পরিষদ, জেলা পরিকল্পনা কমিটি এবং ব্লক পরিকল্পনা কমিটিতে যে জন-প্রতিনিধিরা থাকবেন তাঁরা রাজনৈতিক নির্দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ রেখে এই কমিটিগুলিতে কাজ করবেন। এখানেই জেলা এবং তার নিচের স্তরের রাজনৈতিক সংগঠনের পরিকল্পনার সামগ্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
জেলাস্তরে এবং ব্লক স্তরে এই সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিকল্পনা রচনা করার অর্থ হলো : অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতে যে অর্থ বরাদ্দ আছে, তার সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিটি ক্ষেত্রে যথা কৃষি, সেচ, রাস্তা, শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদিতে প্রকল্প রচনা করা। ভূমিসংস্কার থেকে শুরু করে অগ্রাধিকারের সমগ্র বিষয়টি আমরা আগে আলোচনা করেছি।
এই অগ্রাধিকারের ধারণা নিয়ে এ বছর প্রতিটি জেলার সদ্য গঠিত জেলা পরিকল্পনা ও সমন্বয় পরিষদে এবং জেলা পরিকল্পনা কমিটিতে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনাগুলিতে রাজ্য মন্ত্রিসভার এবং রাজ্য পরিকল্পনা পর্ষদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থেকেছেন। এছাড়া জেলাস্তরে এ বছরের জন্য প্রতিটি দপ্তর এবং বিশেষ প্রকল্প (যথা জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্প বা সার্বিক গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প) থেকে মোট কত অর্থ বরাদ্দ আছে, তারও হিসাব নেওয়া হয়েছে। তারপর প্রতিটি ব্লকের ব্লক পরিকল্পনা কমিটিকে একটি বাস্তবানুগ বাজেটের ধারণা দিয়ে সেই কমিটিকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অগ্রাধিকারের মধ্যে সমন্বয় করে, বিভিন্ন উৎসের অর্থের মধ্যে সংমিশ্রণ করে এবং বাজেটের সীমার মধ্যে থেকে ব্লকের স্থানীয় সাধারণ মানুষের প্রয়োজনভিত্তিক একটি সামগ্রিক পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করতে। ব্লকের এই প্রয়োজনভিত্তিক পরিকল্পনার খসড়ায় দু'ধরনের প্রকল্প থাকবে— যেগুলি ব্লকের মধ্যেই সীমিত এবং যেগুলি সেই ব্লক ও অন্যান্য ব্লক নিয়ে পরিব্যাপ্ত। এ বছরে অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রতিটি জেলার প্রতিটি ব্লক থেকে তথ্য এবং ম্যাপ সহযোগে এই ধরনের প্রয়োজনভিত্তিক ব্লক পরিকল্পনার খসড়া রচিত হয়েছে। একইভাবে কম-বেশি পারদর্শিতার সঙ্গে প্রতিটি পুরসভা থেকেও অনুরূপ খসড়া রচিত হয়েছে। এই খসড়াগুলি তারপর জেলাস্তরে জেলা পরিকল্পনা কমিটিতে আলোচিত হয়ে, জেলার সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা পরিবর্তিত ও সংযোজিত হয়ে, রাজ্যস্তরের সঙ্গে কিছুটা আলোচিত হয়ে এবং শেষে পুনরায় জেলা পরিকল্পনা ও সমন্বয় পরিষদে আলোচিত হয়ে একটি সামগ্রিক জেলা পরিকল্পনার রূপ ধারণ করেছে। আমরা কিছুটা গর্বিত যে, প্রতিটি জেলায় একেবারে নিচুস্তর থেকে তুলে এনে জেলা পরিকল্পনা রচনা শুরু করার এই কঠিন কাজটি এ বছর প্রথম শুরু করে ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। এরপর শুরু হচ্ছে রূপায়ণের কাজ পঞ্চায়েত এবং দপ্তরগুলির মাধ্যমে। তারপর চলবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সমীক্ষা, যার ভিত্তিতে আগামী বছরে প্রতি দপ্তরের এবং প্রতিটি জেলার অর্থ বরাদ্দ নির্ধারিত হবে।
আমরা মনে করি যে, এই জেলা ও ব্লক ভিত্তিক পরিকল্পনা রচনা ও রূপায়ণের ক্ষেত্রে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ মানুষকে জেলা এবং আরও প্রাথমিক স্তরের রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে সমগ্র পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা। পঞ্চায়েত ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্ব এই কারণেই যে, তাঁরা পরিকল্পনার সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক শক্তি। অবশ্যই রাজ্যস্তরে সীমিত ক্ষমতার মধ্যে পরিকল্পনার এই প্রচেষ্টাও সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে একটি সীমিত প্রয়াস মাত্র এবং এই সীমিত প্রয়াসও বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর বিরোধিতার সম্মুখীন হবে। কিছু যদি সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে এই প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তা হলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাঁরা আরও সঠিকভাবে বুঝতে পারবেন মূল বাধার উৎস কোথায়। তখনই সীমিত পরিকল্পনার এই প্রয়াস সাধারণ মানুষের সংগ্রামী আন্দোলনের একটি অংশ হয়ে উঠবে। এই পরিকল্পনা প্রয়াসের রাজনৈতিক গুরুত্ব সেখানেই।
সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘দেশহিতৈষী’ -র ১৯৮৫ শারদ সংখ্যায় (পৃষ্ঠাঃ ২৯ – ৩৪) এই প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছিল। মূল শিরোনাম ছিল ‘পশ্চিমবঙ্গে গ্রামীণ উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়াস ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থা’।
প্রকাশের তারিখ: ০৮-জুলাই-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
