সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আমেরিকার অধীনস্থ মিত্র হয়ে থাকা আর চলবে না ভারতের
প্রকাশ কারাত
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বেশ কিছু দিন ধরে ক্ষয় পেতে শুরু করেছে এবং বহুপাক্ষিক বিশ্ব মার্কিনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ক্রমশ চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। বহুপাক্ষিক বিশ্বের শক্তি বাড়ছে। সেখানে নানা ধরনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ মার্কিন ঘেঁষা নীতির ফলে ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি।

বর্তমান পরিস্থিতির পরিহাস হল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এখন ধন্যবাদ দিতে হবে। কারণ তিনি নরেন্দ্র মোদিকে বাধ্য করছেন ভারতের বিদেশ নীতির ক্ষেত্রে পথ সংশোধন করতে যেটা অনেক দিন আগেই করা উচিত ছিল। গত প্রায় তিন দশক ধরে— সেই অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের আমল থেকে শুরু করে মনমোহন সিং সরকার পর্যন্ত, এবং তারপর মোদি সরকারের আমলে সেই গতি আরও তীব্র হয়— এই গোটা পর্ব জুড়ে ভারত ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনন্থ এক জোটসঙ্গী হয়ে ওঠার পথের পথিক। এটা ছিল কৌশলগতভাবে বিদেশ নীতিকে এমন এক পথের অভিমুখে পরিচালিত করার প্রয়াস যা স্বাধীন বিদেশ নীতির ভিত্তিতেই ক্ষয় ধরিয়েছিল এবং রণনীতিগতভাবে স্বায়ত্তশাসনের সুযোগকে সংকুচিত করে তুলছিল।
একেবারে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত মোদি সরকার সগর্বে ঘোষণা করে এসেছে যে, তারা ‘বুনিয়াদি গুরুত্ব’ রয়েছে এমন সমস্ত সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে। এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় ভূরাজনৈতিক রণনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই রয়েছে। কোয়াড (ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোয়াড্রিল্যাটারাল সিকিউরিটি ডায়ালগ) এই নতুন জোটেরই প্রকাশ। ট্রাম্প যখন প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হন তখন ভারত ভীরুর মতো ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছিল, এবং তার ফলে ভারতের বিরাট ক্ষতি হয়েছিল। এবং সেটা করেছিল ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া একতরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে। এবং তারপর ভেনেজুয়েলার কাছ থেকেও তেল কেনা বন্ধ করেছিল ভারত সরকার।
এরপর ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় ফিরলেন তখন ভারতের কাছে সেটা ছিল আমেরিকার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার একটা ঈশ্বরপ্রদত্ত সুযোগের মতো এবং সেটা দাঁড়িয়েছিল ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ওপর। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়ার ফলে গাজায় ইজরায়েলের গণহত্যা সম্পর্কে ভারত লজ্জাজনক নীরবতা পালন করে আসছে। এই গণহত্যাকে ট্রাম্প সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেন এবং প্ররোচনা দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কেন্দ্রের ওপর হামলা চালিয়েছে। এটা ভারতের বন্ধু দেশের প্রতি একটা আগ্রাসন। এবং পরমাণু অস্ত্রের দ্রুত প্রসারের বিপদকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এত কিছু সত্ত্বেও ভারত ইরানে মার্কিন হামলার প্রতিবাদ করেনি।
কিন্তু ট্রাম্পের উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান এবং শুল্ককে হাতিয়ার হিসাবে কাজে লাগিয়ে ভারতের ওপর গুন্ডামি করার যে উগ্রপন্থা, সেটা এমনকী মোদি এবং বিজেপিও হজম করতে পারছে না। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতকে এক করে দেখাটাকেও মেনে নিতে পারছে না। বাস্তবতা হল, যে মুহূর্তে ভারত ও পাকিস্তান হয়ে উঠেছে এমন দুটি দেশ যাদের ভাণ্ডারে পরমাণু অস্ত্র রয়েছে তখন তাদের মধ্যে যে কোনও সামরিক সংঘাত বাধলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ এসে হাজির হয়। কারণ আমেরিকার সঙ্গে এই দুটি দেশই স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কে বাঁধা।
এ-বছর ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে বসার আগে, বাইডেনের অধীনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাঝে মাঝেই মোদিকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার’ হিসাবে মোদি সরকারের কিছু দায়িত্ব রয়েছে। যখন ২০২৪ সালের জুলাই মাসে মোদি রাশিয়ায় গিয়ে ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন, তখন বাইডেন প্রশাসন বুঝিয়ে দিয়েছিল যে তারা মোদির এই কাজে রীতিমতো অসন্তুষ্ট। ভারতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এরিক গারসেট্টি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কে একেবারে প্রশ্নচিহ্নহীন এবং ভারত যাই করুক আমেরিকা তা মেনে নেব — এমনটা মোদি সরকার যেন না-ভাবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি জানি ভারত স্ট্র্যাটেজিক স্বায়ত্তশাসন পছন্দ করে। কিন্তু সংঘাতের সময়ে স্ট্র্যাটেজিক স্বায়ত্তশাসন বলে কিছু হয় না।’
এ-বিষয়েও যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে সামরিক সরবরাহের ব্যাপারে ভারত রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। এবং একই সঙ্গে মার্কিন অস্ত্র ও সরঞ্জাম কেনা বাড়াচ্ছে। এবং এটাই একের পর এক মার্কিন প্রশাসন দাবি করে এসেছে। এখন ট্রাম্পের ক্যাবিনেটের মন্ত্রীরা বিষয়টি আরও জোর গলায় দাবি করছেন।
দক্ষিণ এশিয়া এবং এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিনি পক্ষে যোগ দেওয়ার যে পরিণাম, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এর ফলে ভারতের বিদেশ নীতি একেবার নড়বড়ে হয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার প্রতিবেশী দেশগুলির থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যা আগে কখনও দেখা যায়নি। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব খর্ব করার পথের খোঁজের ব্যর্থ চেষ্টা এবং অত্যধিক পাকিস্তানকেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করাই এর কারণ। বিদেশ নীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্যে হিন্দুত্ববাদী বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি আমদানি করা হয়েছে। এর ফলে গোটা বিশ্বে ভারতের ভাবমূর্তি ও অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন হিন্দুত্ববাদী জাতিতত্ত্বমূলক জাতীয়তাবাদ (এথনো ন্যাশনালিজম)-এর সঙ্গে সংঘাত বাধছে বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদ MAGA বা মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন-এর। এর ফলে ভারতের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে থাকা রণনীতিগত ও বিদেশ সংক্রান্ত নীতিগুলি এখন কানাগলিতে গিয়ে পৌঁছেছে। MAGA + MIGA মিলে গিয়ে MEGA হতে পারে না।
এই প্রসঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ করা হয়েছে এবং তিয়ানজিনে শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেসনের বৈঠকে মোদির যোগদান, এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, এসবই ইতিবাচক বিকাশ। তবে অন্ধ চীন বিরোধী শত্রুতামূলক মনোভাব কাটিয়ে উঠতে গেলে এবং দু-দেশের মধ্যে পার্থক্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হলে এখন অনেক কিছুই করতে হবে।
চীনের বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি কাজে লাগানোর দারুন সুযোগ রয়েছে যার সাহায্যে ভারতে ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে গতি আনা যেতে পারে। এর জন্য বিভিন্ন সেক্টরে চীনা কোম্পানিগুলির বিনিয়োগে যে-বিধিনিষেধ চাপানো রয়েছে তা প্রত্যাহার করতে হবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, ২০২৩ সালে চীনের বৃহদাকার বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা সংস্থা বিওয়াইডি একটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতায় এদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি তৈরির জন্য ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই প্রকল্পে সবুজ সংকেত দেয়নি ভারত সরকার। এই উদ্যোগে সামিল হলে ভারত এ-বিষয়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি পেতে পারত ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে পারত। কারণ বিওয়াইডি হল বিশ্বের প্রথম সারির বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা সংস্থা। এছাড়াও রয়েছে আরও নানা ক্ষেত্র যেখানে চীনের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সহযোগিতার জেরে ভারতীয় শিল্পের সুবিধা হতে পারে এবং পরিকাঠামোর উন্নয়ন হতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বেশ কিছু দিন ধরে ক্ষয় পেতে শুরু করেছে এবং বহুপাক্ষিক বিশ্ব মার্কিনি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ক্রমশ চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। বহুপাক্ষিক বিশ্বের শক্তি বাড়ছে। সেখানে নানা ধরনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ মার্কিন-ঘেঁষা-নীতির ফলে ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে তো নিই, উল্টে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পথে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। ব্রিকস ও এসসিওর সদস্য হলেও এই ফোরামগুলিকে আরও উন্নত ও গতিশীল করে তোলার কাজে ভারত তার পুরো প্রভাব কাজে লাগায়নি।
ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যের ওপর ট্রাম্প সর্বোচ্চ শুল্ক চাপিয়েছেন এটা মোটেই দুর্ঘটনা নয়। রাশিয়া ও চীন ছাড়াও ট্রাম্প ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর ৩০ শতাংশ এবং ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন। এরা গ্লোবাল সাউথের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার প্রতিনিধি। ভারত পরের বছরে ব্রিকসের দায়িত্বে থাকবে। এটা হল সেই সুযোগ যখন ভারত নতুন নতুন নীতি সূত্রায়িত করতে পারে যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে গ্লোবাল সাউথের সহযোগিতা আরও বাড়াতে পারে।
একটা নতুন পথে চলার উপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রতিজ্ঞা কি মোদি সরকারের আছে, যে-পথ আমাদের স্বাধীন বিদেশনীতিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে এবং সত্যিকারের রণনীতিগত স্বায়ত্তশাসনকে নিশ্চিত করতে পারে? নাকি এই সরকার ফের ট্রাম্পের পরবর্তী মেজাজ বদলের সুযোগ নেওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকবে যাতে আবারও সেই পিছনে ফেলে আসা ব্যর্থ পথে ফিরে যাওয়া যায়, যে-পথে গেলে ভারত ফের হয়ে উঠবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনস্থ মিত্র?
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
সৌজন্য: পিপলস ডেমোক্রেসি
প্রকাশের তারিখ: ১৬-সেপ্টেম্বর-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
