Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

শুধুই কি ভাতের লড়াই?

সাত্যকি রায়
শোষণ বাড়লেও তুলনামূলক বিচারে নিজেদের আয় আগের তুলনায় বেশি হলেই শ্রমজীবী মানুষ একক ভাবে বিশেষ উদ্বিগ্ন হয় না। একারণেই শ্রেণি শোষণের চেতনা শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার যাতে সে তার শ্রেণিশত্রু এবং শোষণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হতে পারে। এই সংহতির চেতনাটি কোন ভাবে রুখে দেওয়া বা বিচ্যুত করাই হল ফ্যাসিবাদী বা উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।
is it just a fight for food

উগ্র দক্ষিণপন্থা ও ফ্যাসিবাদ উভয়েরই প্রাথমিক শ্রেণিভিত্তি হল নিচের দিকের মধ্যবিত্ত মানুষ যারা নানা কারণে শুধু বিপর্যস্তই নয় হতাশাগ্রস্ত। এই হতাশাগ্রস্থ বিপন্ন মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে একচেটিয়া পুজির নিরঙ্কুশ শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে ফ্যাসিবাদী রাজনীতি। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে  গরিব নিম্নবিত্ত মানুষ শোষিত হলেও সে জীবনের অভিজ্ঞতায় আপনা আপনি তার শত্রুকে চিনতে পারে না। শত্রুকে সে চিনতে পারে তখনই যখন সে শ্রেণিসংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। শোষণের ও নিপীড়নের সম অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি সংহতি তখন তার নিজস্ব শক্তিতে পরিণত হয়। মার্কস অষ্টাদশ ব্রুমেয়ারে বোনাপার্টিজম-এর উত্থান বলতে গিয়ে বলেছিলেন শাসকদের একটি ক্ষুদ্র অংশ অসংগঠিত বৃহত্তর কৃষক ও পরজীবী গরিবদের সমর্থন আদায় করেই ক্ষমতাসীন হতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীকালে ইতালি ও জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান একই অভিজ্ঞতা বারবার তুলে ধরেছে। যুগে যুগে শাসকরা শোষিত মানুষের সমর্থন আদায় করে তাদের শাসন ব্যবস্থা কায়েম রেখেছে। এর থেকে এটাই বোঝা যায় যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শোষিত হওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে  শ্রমজীবী মানুষ সংগঠিত হয়ে যায়না। বরং তার জীবনের অভিজ্ঞতাকে ভিন্নভাবে চিনতে শিখিয়ে শাসকশ্রেণি তার কাজ হাসিল করতে পারে। মানুষের অস্তিত্বের এই ছদ্মচেতনা শাসক শ্রেণির আধিপত্যকে সুনিশ্চিত এবং গভীর করে তোলে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়লেই গরিব নিপীড়িত মানুষ তার আপেক্ষিক অবস্থানের বিচারে ধনীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এমনটা নয়। বৈষম্য বাড়লেও যদি সে মনে করে তার জীবন জীবিকার কিছু হলেও মানোন্নয়ন ঘটেছে তবে বড়লোকেরা আরও বড়লোক হলেও গরিব মানুষ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয় না। শোষণের ধারণাটি একজন মানুষ কত উৎপাদন করছে এবং তার বিনিময়ে কত পাচ্ছে তার উপরে নির্ভর করে। সে আগে কত আয় করত এবং পরে কত পাচ্ছে এর সাথে শোষণের চেতনার কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ শোষণ বাড়লেও তুলনামূলক বিচারে নিজেদের আয় আগের তুলনায় বেশি হলেই শ্রমজীবী মানুষ একক ভাবে বিশেষ উদ্বিগ্ন হয় না। একারণেই শ্রেণি শোষণের চেতনা শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার যাতে সে তার শ্রেণিশত্রু এবং শোষণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত হতে পারে। এই সংহতির চেতনাটি কোন ভাবে রুখে দেওয়া বা বিচ্যুত করাই হল ফ্যাসিবাদী বা উগ্র দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।

গ্রামসি বলেছিলেন যে শাসক শ্রেণি তার আধিপত্য কায়েম করে দুই ভাবে: একটি হলো সরাসরি প্রকট বল প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে আর অন্যটি হল শোষিত মানুষেরই সমর্থন আদায় করার মধ্যে দিয়ে। পরিণত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রকট বল প্রয়োগের ঘটনা কমই ঘটে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষের সমর্থন তৈরি করেই শাসকরা ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। উগ্র দক্ষিণপন্থা ফ্যাসিবাদের মত প্রকট বল প্রয়োগের রাজনীতি নির্ভর নয়। তার অঙ্গীকার নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই ক্ষমতা দখল করা ও তাকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু এ কথা খেয়াল রাখা দরকার যে ফ্যাসিবাদ ও উগ্র দক্ষিণপন্থা উভয়েরই প্রাথমিক শ্রেণিভিত্তি হল পেটি বুর্জোয়া অংশ। সংগঠিত শ্রমজীবী অংশের মধ্যে এই রাজনীতি শুরুতে বিশেষ সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয় না। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৬ শতাংশ ছিল শ্রমিক এবং ২১ শতাংশ ছিল কৃষক। অথচ ওই সময় নাজি পার্টিতে শ্রমিকদের অংশ ছিল মাত্র ৫ শতাংশ ও কৃষকরা মোট সদস্যের ৯ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তীকালে ফ্যাসিস্ট পার্টিগুলি ধীরে ধীরে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়। সমাজের মধ্যবিত্ত অংশ যারা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে জর্জরিত তাদের নিরাশার প্রধান কারণ হল  ক্রমবর্ধমান বিপন্নতা। একদিকে যেমন তারা সমাজের ক্ষমতাবান অংশের প্রতি ক্রুদ্ধ অন্যদিকে একই ভাবে তারা নিচের শ্রমজীবী অংশের সংগঠিত ক্ষমতার ব্যাপারে ভীত। এই মধ্যবিত্ত অংশই পুঁজিবাদী শাসনে নিজেদের অর্থনৈতিক বিপন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতিতে শক্তিমানের খোঁজ করে থাকে। অন্যদিকে শ্রমজীবী জনতাও যদি সমাজে বিকল্প চিন্তার কোন রাজনৈতিক শক্তিকে দেখতে না পায় তখন তারাও এই ‘শক্তিমান’ দক্ষিণপন্থী নেতা ও রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করে। আসলে নানা ধরণের ভঙ্গুর বিপন্ন মানুষের কাছে শাসক শ্রেণি  এমন একটি শত্রু হাজির করতে সক্ষম হয় যাতে গরিব মানুষ ফিন্যান্স পুঁজির একচেটিয়া কর্তৃত্বকে হয় দেখতেই পায় না অথবা অনিবার্য বলে ধরে নেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ধর্ম-বর্ণ বা উগ্র জাতিসত্তা শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত পরিচয়ের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থিত হয়। মনে রাখতে হবে এই পরিচয় গঠনের প্রধান ক্ষেত্রটি হল একটি নির্দিষ্ট ধরণের জীবনযাপনের প্রতি  গড়ে ওঠা সম্মানবোধ ও অন্য ধরণের যাপনের প্রতি ঘৃণা। এই ধরনের সংস্কৃতিক সত্তার সংগঠিত পরিচয় সম্পর্কে সচেতনতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতীত গৌরবের উপর আশ্রিত। তার সাথে দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার লড়াইয়ের খুব একটা সম্পর্ক নেই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এই নির্দিষ্ট যাপনের চেতনা, সাংস্কৃতিক বোধ ও পরিচয় মানুষের জীবনে হঠাৎ করে প্রথিত করা হয়েছে। এই সাংস্কৃতিক যাপন তার জীবনে অতীতেও ছিল, যা তার ব্যক্তিগত জীবনেরই অংশ কিন্তু তা শত্রু-মিত্র বিভাজনের মাপকাঠি হয়ে ওঠে ফ্যাসিবাদী রাজনীতির কারণে। আসলে ফ্যাসিবাদ ও উগ্র দক্ষিণপন্থার রাজনীতিও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এক ধরনের যৌথ সত্তার নির্মাণ করে থাকে, যার  ভিত্তি হয়ে ওঠে নবনির্মিত পরিচয় চেতনা। সমস্ত ধরনের সামাজিক রক্ষণশীলতার নতুন করে উদযাপন এই নির্মাণ প্রকল্পের অন্যতম মর্মবস্তু। গ্রামসি, রজনী পাম ডাট এবং দিমিত্রভ প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ ফ্যাসিবাদের আলোচনায় বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে উপরিকাঠামের ক্ষেত্রে লড়াইয়ের গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচনা করেছেন। জাত-পাত,ধর্ম,বর্ণ,ভাষা বা জাতিসত্তা এই সবগুলিই মানুষের জীবনে ও চেতনায় ছিল। এগুলি তার জীবন বহির্ভূত নয়। এগুলির সাথে শ্রেণিসংঘর্ষের জটিল সম্পর্ক বিভিন্ন সময় অত্যন্ত বাস্তব যদিও সে প্রসঙ্গ এই আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। আসল কথাটি হল এই পরিচয়ের ভিত্তিতে শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করণের রাজনীতির মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী বা উগ্র দক্ষিণপন্থী আন্দোলন শ্রেণির নির্মাণকে বিক্ষিপ্ত করতে পারে।

 এ কথা ঠিক যে সাংস্কৃতিক পরিচয় ভিত্তিক মেরুকরণ শ্রমজীবী মানুষকে বিভক্ত করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেকার মেরুকরণ আসলে শাসক শ্রেণিকে নিরাপদ রাখে। এই ধরনের আন্দোলন মানুষের কাজ, মজুরি, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলিকে বিক্ষিপ্ত করে পরিচয়ভিত্তিক বিরোধকে সমাজ সংগঠনের কেন্দ্রে স্থাপন করতে চায়। এটা ঠিক যে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গরিব শ্রমজীবী মানুষের কাজ ও ভাতের লড়াইকে শাসক শ্রেণি  পেছনের দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে গরীব শ্রমজীবী মানুষের জীবনের যাপন শুধুমাত্র কাজ এবং ভাত কেন্দ্রিক। মনে রাখা দরকার যে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তদের জীবনে যেমন খাওয়া এবং পরার বাইরে তার মনের জগতটি গুরুত্বপূর্ণ, সেরকম গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন শুধু পেটের নয় তাদের জীবনেও মনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। তারও জীবনে আশা, নিরাশা, জয়, পরাজয়, প্রেম, বিষন্নতা, ব্যক্তিগত আনন্দ, যৌথ সত্ত্বা এই সবগুলি তার জীবনযাপনের অংশ।এগুলিই তার জীবনচর্যার পরিসর যা একান্তভাবেই বস্তুগত। খেয়াল করলে দেখা যাবে মূল ধারার সাংস্কৃতিক মাধ্যম ও মঞ্চগুলি থেকে গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের গল্প ক্রমাগত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। তা একান্ত ভাবেই শহুরে উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এবং শ্রমজীবী মানুষের কাছে সামাজিক রক্ষণশীলতা, সুবিধাবাদী চালাকি, প্রকট অশ্লীল যৌনতা, নির্মমতা, দুর্নীতিপরায়ণতা এবং অজ্ঞানতার গরিমার নিরন্তর প্রসার ঘটানোর সংঘঠিত প্রচেষ্টা চলেছে নানা মাধ্যমে। শ্রমজীবী মানুষের মনের জগতে রক্ষনশীল জীবনশৈলী ও সংস্কৃতির আধিপত্য নতুন করে জায়গা করে নিচ্ছে। এসবই তার শ্রেণি সত্তা নির্মাণের পরিপন্থী এবং সে কারণেই বৈষম্য ও শোষণ বাড়লেও সে রুটি রুজির লড়াই থেকে দূরে সরতে থাকে। মানুষের বস্তুগত সত্ত্বাকে শুধুমাত্র আর্থিক প্রয়োজনীয়তার মধ্যে সীমিতভাবে দেখা এক প্রকার অর্থনৈতিক নির্ধারনবাদ। আসলে শ্রমজীবি মানুষের মনের জগতের লড়াইটা তার রুটি রুজির লড়াইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত। এবং সে কারণেই একটি ক্ষেত্রের লড়াইকে আরেকটি ক্ষেত্রের লড়াই দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যায় না বরং একে অপরের পরিপূরক। মেহনতি মানুষের ঐক্য, যৌথ চেতনা, শ্রেণিসংহতির প্রায়োগিক প্রতিমূর্তি নির্মাণ আর তার জীবনের লড়াই সংহাতের ইতিকথা ও তার থেকে উত্তরণের সংগ্রামকে বৃহত্তর সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিসরে উপস্থাপন করার লড়াই আজ অত্যন্ত জরুরি। প্রতিস্পর্ধি শ্রেণির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে এ কারণেই অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পাশাপাশি বিকল্প জীবন বোধের আলেখ্য রচনা একই ভাবে জরুরী।

 


প্রকাশের তারিখ: ৩০-নভেম্বর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪