সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কাশ্মীরের রায়- ‘ভয়ের রাজ্যে থাকব না’
শুভ প্রসাদ নন্দী মজুমদার
একদিকে রাষ্ট্রীয় হিংসা ও অপরদিকে সন্ত্রাসবাদীদের তরফ থেকে আসা হিংসায় দশকের পর দশক ধরে জর্জরিত কাশ্মীরের মানুষ রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হয়ে এখন শান্তি, স্বস্তি চায়, সর্বোপরি চায় আত্মমর্যাদা ও হৃত অধিকারের পুনরুদ্ধার। যে কাশ্মীরের জনগণ ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থেকে নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকত, তারাই এবারে দলে দলে ভিড় করেছিল ভোট কেন্দ্রগুলিতে। শুধু ভোটদানের হার নয়, বিজয়ী জোটের প্রতি সমর্থনের ঢলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের সুস্পষ্ট রায় ব্যক্ত হয়েছে।সাধারণ ভাবে বললে, এই নির্বাচনের মূল বিষয় ছিল জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ মর্যাদা পুনরুদ্ধার। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তির মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাই শেষ পর্যন্ত ৯ আগস্ট সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা হরণ করে রাজ্যের বিভাজনের মাধ্যমে দু'টি কেন্দ্রশাসিত প্রদেশের জন্ম দেয়।

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ন্যাশনাল কনফারেন্স সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে। চারজন নির্দলীয় বিজয়ী বিধায়কের সমর্থন যোগ করার পর ৯০ সদস্যের বিধানসভায় ন্যাশনাল কনফারেন্স, কংগ্রেস, সিপিআইএমকে নিয়ে গঠিত ইন্ডিয়া মঞ্চের আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩-এ। কাশ্মীর উপত্যকার কুলগাম আসনে টানা চারবারের নির্বাচিত সিপিআইএম বিধায়ক মহম্মদ ইউসুফ তারিগামী পঞ্চমবার বিজয় অর্জন করেছেন। এই জয়ের এই ধারাবাহিকতা শুধুমাত্র নির্বাচনী জোটের প্রতিফলন নয়। কাশ্মীরের রাজনীতিতে সিপিআইএম দলের স্বাধীন শক্তি বৃদ্ধিরও ইঙ্গিত বহন করে। জোটের এই বিপুল সংখ্যক আসনে জয়ের পরও এই জয়কে রাজ্যের মানুষের নিরঙ্কুশ সমর্থন সমর্থন বলা যাচ্ছে না। এখানেই লুকিয়ে আছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। রাজ্যের দু'টি অংশে নির্বাচনের ফল সম্পূর্ণ বিপরীত। ইন্ডিয়া জোট বিপুল জয় পেয়েছে কাশ্মীর উপত্যকায়। কিন্তু জম্মু অংশে একইভাবে জয় পেয়েছে বিজেপি। বিজেপির বরাবরের বিভাজনের রাজনীতি হল জম্মু ও কাশ্মীরের জনগনকে দু'টি মেরুতে ঠেলে দেওয়া। কাশ্মীর ও জম্মুকে মুসলিম ও হিন্দু পরিচিতিতে দেগে দিয়ে দু'টি অংশকে সাম্প্রদায়িক বৈরিতায় লাগিয়ে দেওয়া সঙ্ঘ পরিবারের পুরনো রাজনীতি। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার বিভাজনের এই পুরনো রাজনীতিকে আরও কদর্য চেহারা দিতে একের পর এক প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও আইনী পরিবর্তন এনেছিল। বিজেপি নেতাদের বক্তৃতায় এবং আইটি সেলের বন্যার মত পোস্টে ‘এবার কাশ্মীরে হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী’ শিরোনামে নাগাড়ে প্রচার হয়েছে ভোট ঘোষণার পর থেকে। মূলত এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই জম্মু ও কাশ্মীরের বিধানসভা আসনের পুনর্বিন্যাস করা হয়। হিন্দু ভোটদাতাদের দিকে ভারসাম্য থাকা আসনের সংখ্যা বাড়াতে বিধানসভার আসনগুলির সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। একইভাবে বিধানসভার আসনের পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে আসামেও। উদ্দেশ্য অভিন্ন, মুসলিম ভোটদাতাদের প্রভাব খর্ব করা। এই প্রক্রিয়ায় জম্মুতে আসন বৃদ্ধি হয়েছে তিনটি আর কাশ্মীর উপত্যকায় মাত্র একটি। এমনকী লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পাঁচজন সদস্য মনোনীত করার। বলা বাহুল্য, এটা ঘুরপথে বিজেপি বিধায়কের সংখ্যা বৃদ্ধির একটি অপকৌশল। এর লক্ষ্য ছিল বিজেপি প্রার্থীকে মুখ্যমন্ত্রী করার ক্ষেত্রে আসন সংখ্যার ঘাটতি থাকলে সেটা মনোনীত সদস্য দিয়ে পুষিয়ে দেওয়া। বিজেপির লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী। এক, জম্মুতে নিজেদের আসন সংখ্যা সর্বাধিক করা। দুই, কাশ্মীর উপত্যকায় বিভিন্ন চরমপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে প্রচ্ছন্নে প্রশ্রয় দিয়ে একাধিক প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ভোট বিভাজনের মাধ্যমে ইন্ডিয়া জোটের আসন সর্বনিম্ন করা। এই কাজকে রূপ দিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী চরমপন্থী ইন্জিনিয়ার রশিদ নামে খ্যাত লোকসভা সদস্যকে নির্বাচনের আগে জেল থেকে পেরোলে মুক্তি দেওয়া হয়। স্মরণ করা যেতে পারে লোকসভা নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হলেও তখন তাকে নিজের নির্বাচনী প্রচারের জন্যে মুক্তি দেওয়া হয় নি। বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের সংগঠন জামাতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে ইন্জিনিয়ার রশিদের দল আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টি প্রার্থী দিয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারে এই জোটের মূল আক্রমণ কেন্দ্রীভূত ছিল ন্যাশনাল কনফারেন্সের বিরুদ্ধে। বিজেপির ধারণা হয়েছিল যে তাদের দু'টি ছক সফল হলেই বাকিটা লেফটেন্যান্ট গভর্নর মনোনীত সদস্যদের নিয়ে রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন হয়ে যাবে। পুরো ভাবনাটিই ছিল এক ধরনের সংখ্যাগুরুবাদী হিন্দুত্বের দম্ভ। নির্বাচনী ফলাফল বিজেপির মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের মাধ্যমে জম্মুতে বিপুল বিজয় হাসিল করলেও কাশ্মীর উপত্যকায় তারা ভোট পেয়েছে সাকুল্যে ২.২ শতাংশ। যে সমস্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলিকে তারা পেছন থেকে মদত দিয়েছিল ভোটে তাদের ফলাফল হয়েছে শোচনীয়। বিচ্ছিন্নতাকামী সব সংগঠনই পর্যুদস্ত হয়েছে। এমনকী আফজল গুরুর ভাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দুশোটি ভোটও পায় নি। বিজেপি বা সঙ্ঘ পরিবার কাশ্মীরের জনগনকে যতই পাকিস্তানপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাকামী বলে প্রচার করুক, এই নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে দিয়েছে কাশ্মীরের মানুষ জঙ্গীবাদকে সমর্থন করে না। একদিকে রাষ্ট্রীয় হিংসা ও অপরদিকে সন্ত্রাসবাদীদের তরফ থেকে আসা হিংসায় দশকের পর দশক ধরে জর্জরিত কাশ্মীরের মানুষ রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হয়ে এখন শান্তি, স্বস্তি চায়, সর্বোপরি চায় আত্মমর্যাদা ও হৃত অধিকারের পুনরুদ্ধার। যে কাশ্মীরের জনগণ ভারতীয় সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থেকে নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকত, তারাই এবারে দলে দলে ভিড় করেছিল ভোট কেন্দ্রগুলিতে। শুধু ভোটদানের হার নয়, বিজয়ী জোটের প্রতি সমর্থনের ঢলের মধ্য দিয়ে কাশ্মীর উপত্যকার মানুষের সুস্পষ্ট রায় ব্যক্ত হয়েছে।সাধারণ ভাবে বললে, এই নির্বাচনের মূল বিষয় ছিল জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ মর্যাদা পুনরুদ্ধার। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে সংবিধানের ৩৭০ ধারার অবলুপ্তির মাধ্যমে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তাই শেষ পর্যন্ত ৯ আগস্ট সংসদে আইন পাশের মাধ্যমে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা হরণ করে রাজ্যের বিভাজনের মাধ্যমে দু'টি কেন্দ্রশাসিত প্রদেশের জন্ম দেয়। স্বাধীন ভারতে পূর্ণ রাজ্য থেকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অবনমনের দ্বিতীয় আর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাধিক্যে বিজয় অর্জন করলেও ন্যাশনাল কনফারেন্স-কংগ্রেস জোটের সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড়াবে জম্মু অঞ্চলে হিন্দুত্ববাদী শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কীভাবে রাজ্যের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবে। এই আশঙ্কাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন সরকারের পথচলা শুরু হবে।
এই অনিশ্চয়তা বা আশঙ্কা সত্ত্বেও এই ফলাফলের আরও বড় তাৎপর্য রয়েছে। সর্বভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে একে বিজেপির বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের বিজয় হিসেবে দেখলে ফলাফলের তাৎপর্যকে শুধুমাত্র সংকীর্ণ অর্থে দেখা নয়, সামগ্রিক বাস্তবতা থেকে দূরে থাকা হবে। স্বাধীনতার পর থেকে কেন্দ্রের সব সরকারই কাশ্মীরের বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীন থেকেছে। সেখানকার ইতিহাস, সমাজ, জনগন, তাদের আকাঙ্ক্ষা, সংগ্রাম, বঞ্চনা সম্পর্কে দেশের জনসাধারণকে অনবহিত রেখেছে। আরএসএস, জনসঙ্ঘ ও তার উত্তরসূরী বিজেপির রাজনীতি বরাবর থেকেছে কাশ্মীরের ইতিহাসের বিকৃত উপস্থাপনের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগনকে অবশিষ্ট ভারতের জনগনের কাছে হেয় করা। কাশ্মীরের মানুষের কংগ্রেস দলও বারবার বিশ্বাসভঙ্গ করেছে। কেন জম্মু ও কাশ্মীর দেশের আর দশটি রাজ্যের চেয়ে আলাদা, কেন জম্মু ও কাশ্মীর বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে এতদিন, সংবিধানে ৩৭০ ধারা যুক্ত করার কারণ কী, এ সম্পর্কে ভারতের সাধারণ মানুষ শুধু নয়, রাজনীতি সচেতন বলে পরিচিত মানুষের বেশিরভাগ অংশেরই কোনো ধারণা নেই। আরএসএস বা বিজেপি একে জম্মু ও কাশ্মীরের প্রতি কংগ্রেস সরকারের অন্যায় পক্ষপাত হিসেবে প্রচার করে এটাকে মুসলিম বিদ্বেষী রাজনীতির সাথে যুক্ত করে। ভারতের গণতান্ত্রিক শক্তিও জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসের প্রকৃত তাৎপর্য মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে পারে নি।
ব্রিটিশ শাসিত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সেই সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের স্বাধীনতা সংগ্রাম দু'টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটা সকলেরই জানা যে ভারতের সমস্ত অঞ্চলে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সরাসরি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় নি। সাড়ে পাঁচশোর বেশি রাজন্য শাসিত অঞ্চল ছিল ব্রিটিশ আশ্রিত কিন্তু সরাসরি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে নয়। ভারতের প্রায় দুই পঞ্চমাংশ অঞ্চল জুড়ে ছিল এই রাজন্য শাসিত অঞ্চল যাকে বলা হত দেশীয় রাজ্য। সরাসরি ব্রিটিশ শাসন না থাকায় বরোদা ও মহীশূর ছাড়া বাকি দেশীয় রাজ্যগুলিতে আধুনিক শিক্ষা ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ ছিল প্রায় অবরুদ্ধ। শাসন ব্যবস্থার সংস্কার বা শিক্ষা বিস্তারের কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ ছিল সরাসরি ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চলের মত। জম্মু ও কাশ্মীরের রাজবংশ ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ডোগরা শাসকেরা, আর রাজ্যের বিপুল সংখ্যাধিক্যের কৃষক ও গ্রামীণ কারিগরেরা ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের। ডোগরা রাজ পরিবার ও তাদের অমাত্যরা ছিল প্রবল অত্যাচারী ও নিষ্ঠুর শোষক এবং চরম মুসলিম বিদ্বেষী। নানা অছিলায় গরিব কৃষক ও কারিগরদের উপর চড়া হারে কর আরোপ করত। রাজা ও অমাত্যদের জীবন ছিল বিলাস আর বৈভবে ভরা, আর প্রজারা ছিল চরম অভাব ও দারিদ্র্যে জর্জরিত। ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মতপ্রকাশের একটি মাধ্যমের আত্মপ্রকাশ ঘটলেও বেশিরভাগ দেশীয় রাজ্যে ১৯২০-র আগে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম হয় নি। ১৯৩১ সালে কাশ্মীরের মহারাজার শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগন স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। রাজ প্রশাসন গুলি চালিয়ে ২২ জন বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে এর প্রত্যুত্তর দেয়। দরিদ্র প্রজাদের সিংহভাগ ছিল মুসলিম। হিন্দুরা ছিল মূলত ব্যবসায়ী ও রাজকর্মচারী। ফলে এই অসন্তোষ থেকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও দেখা দেয়। বিক্ষোভ প্রশমন ও হিংসা রোধের সমস্ত উদ্যোগ ব্যর্থ হলে মহারাজা বাধ্য হয় গ্লান্স কমিশন নামে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের। এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রজা সভা নামে একটি নির্বাচিত ব্যবস্থাপক সভা গঠন করে রাজ প্রশাসন। এই আন্দোলন থেকেই জম্মু ও কাশ্মীরের জনগনের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শেখ আবদুল্লাহ। ১৯৩২ সালে গঠিত হয় তাঁর নেতৃত্বে জম্মু ও কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স নামে প্রথম রাজনৈতিক দল। তাঁদের আন্দোলন ও সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র দিতে ১৯৩৯ সালে সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম দেওয়া হয় জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স। তাদের স্বাধীনতার লড়াই ছিল রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে। প্রধান দাবি ছিল আমূল ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকের হাতে জমি তুলে দেওয়ার। সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে দলের পতাকা হিসেবে তারা বেছে নেন লাল নিশানকে। দলের প্রধান দাবি ‘লাঙল যার জমি তার'কে লক্ষ্য রেখে লাল নিশানে অঙ্কিত হয় সাদা রঙে লাঙলের ছবি। এখনও ন্যাশনাল কনফারেন্সের পতাকা লাঙল শোভিত লাল নিশান। প্রতিষ্ঠার সময়ে তাঁরা স্থির করেন কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ থেকে সমদূরত্বের নীতি। দলের এই চরিত্র পরিবর্তনে অসন্তুষ্ট হয়ে একটি অংশ পুরনো সংগঠন মুসলিম কনফারেন্সকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং মুসলিম লিগের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। শেখ আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কনফারেন্স মৈত্রীবদ্ধ হয় জাতীয় কংগ্রেসের সাথে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে ব্রিটিশ সরকার দেশীয় রাজ্যের নৃপতিদের সামনে ভারত বা পাকিস্তানে যোগদান অথবা স্বাধীন থাকার প্রস্তাব রেখেছিল। কাশ্মীরের মহারাজা চেয়েছিলেন স্বাধীন কাশ্মীর। মুসলিম কনফারেন্স চেয়েছিল পাকিস্তান সংযুক্তি। ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের উপর দাঁড়িয়ে শেখ আবদুল্লাহ চেয়েছিলেন ভারতের সাথে সংযুক্তি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২২ অক্টোবর কাশ্মীর ছিল স্বাধীন। পাকিস্তানী হানাদারদের আক্রমণের মুখে মহারাজা ভারতের সাথে সংযুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বিদেশ, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ দপ্তর কেন্দ্রের অধীনে রেখে অবশিষ্ট বিষয় রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনে থাকার শর্তের বিনিময়ে। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারীর উচ্ছেদ ও আমূল ভূমি সংস্কারের মত ন্যাশনাল কনফারেন্সের দীর্ঘ বছরের আন্দোলনের বিষয়গুলির সুনিশ্চয়তার জন্যে সংবিধানে ৩৭০ ধারা যুক্ত করা হয়। আরেকটি বিষয় কাশ্মীরের আলোচনায় অনুল্লিখিত থাকে। দেশভাগের সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানের দাঙ্গার প্রত্যুত্তরে কাশ্মীরের মহারাজের সাথে যোগসাজশে আরএসএস তাদের অঙ্গ সংগঠন জম্মু প্রজা পরিষদের মাধ্যমে জম্মুতে নৃশংস সাম্প্রদায়িক হত্যালীলা চালায়। অসংখ্য নিরীহ মুসলিমকে হত্যা করা হয় ও জম্মুর স্থানীয় মুসলিম জনসাধারণের সংখ্যাধিক্য অংশকে জম্মু অঞ্চল থেকে উৎখাত করা হয়। এই উৎখাত অভিযান ও সমান্তরালে পাকিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের বসতি প্রদানের মাধ্যমে জম্মু অঞ্চলের জনবিন্যাসের আমূল পরিবর্তন করা হয়। এভাবেই জম্মু ও কাশ্মীরকে যথাক্রমে হিন্দু ও মুসলিম অঞ্চলে পরিবর্তিত করা হয়। স্বাধীনতার পর থেকে কংগ্রেস সরকার ধীরে ধীরে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও অধিকারের দিকগুলিকে ক্রমান্বয়ে খর্ব করে। কাশ্মীরের মানুষের ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ বিক্ষোভের উত্তর দেওয়া হয়েছে সীমাহীন সামরিক বর্বর নির্যাতন ও নিপীড়নের মাধ্যমে। যে কাশ্মীরের জনগন পাকিস্তানের হানাদারদের রুখে দিয়ে ভারতের সাথে সংযুক্তির পথে ভারতীয় সেনাকে সম্বর্ধিত করেছিল কাশ্মীরের মাটিতে একটা সময়ে, তারা কেন একটা সময়ের পর ভারতীয় সেনার বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিল এই প্রশ্নের উত্তর প্রাথমিকভাবে ভারত সরকারকেই দিতে হবে। ভারত সরকারের নিষ্ঠুর দমনপীড়নে অতীষ্ঠ হয়েই সেখানে জঙ্গিবাদ জন্ম নিয়েছে। দাবি উঠেছে স্বাধীনতার বা পাকিস্তানের সাথে সংযুক্তির। অথচ এই দুটি বিকল্পের সচেতন প্রত্যাখানের মধ্য দিয়েই কাশ্মীরের জনগন ভারতে অন্তর্ভুক্তি চেয়েছিল। কাশ্মীরের আত্মমর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধারের দাবিতে করা ন্যাশনাল কনফারেন্সের আন্দোলনকে রুখে দিতে ভারতের শাসকশ্রেণি বারবার হাত মিলিয়েছে বিচ্ছিন্নতাকামী ভারত বিরোধী শক্তির সাথে। একটা সময়ে ১৯৫৩ পূর্ববর্তী পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধার ছিল কাশ্মীরের জনগনের প্রধান দাবি। আজ পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা হারানো কাশ্মীরের জনগনের প্রধান দাবি পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদার পুনরুদ্ধার। বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার তরুণ খুন হয়েছে কাশ্মীরে, লক্ষাধিক যুবক চিরদিনের মত নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। গোটা কাশ্মীর উপত্যকা জুড়ে অসনাক্ত তরুণের কবর। সারা রাজ্য জুড়ে আতঙ্ক ও ত্রাসের এক অভূতপূর্ব রাজত্ব বিরাজ করছে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কাশ্মীরের জনগনকে মানবেতর জীবনে নিক্ষেপ করে কিছু চোখ ধাঁধানো নির্মাণকার্যকে প্রদর্শন করে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে চাইছে বাইরে। আর ভেতরে চাইছে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নানা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কাশ্মীরের আত্মপরিচয়কে মুছে দিতে। এই নির্বাচনে বিপুল উৎসাহে যোগদান ও সুনির্দিষ্টভাবে মতাভিমত প্রদানের মাধ্যমে আসলে কাশ্মীরের জনগন প্রকৃতপক্ষে ভয়ের রাজ্য থেকে মুক্তি চাইছে। মুক্তি চাইছে অপমান, অসম্মান ও অধিকারহীনতা থেকে। বিচ্ছিন্নতাকামী চরমপন্থীদের সমর্থক রাজনৈতিক শক্তির বিপুল প্রত্যাখানের মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের পক্ষপাত সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে ভারতের গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের ধারণার পক্ষে। কাশ্মীরের মানুষের এই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা তখনই পরিপূর্ণ হবে যখন জম্মুর মাটিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে প্রতিরোধ করে পরিপূরক গণতান্ত্রিক শক্তির বিকাশকে সুনিশ্চিত করতে পারবে নতুন সরকার।
প্রকাশের তারিখ: ১৪-অক্টোবর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
