Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

লেনিনের শিক্ষা– দুনিয়াকে বদলানো যায়

অপূর্ব চ্যাটার্জি
লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের মার্কসবাদের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের কারণ এটি একমাত্র দর্শন যা কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক ও একইসঙ্গে বৈপ্লবিক। দ্বিতীয়তঃ লেনিন দেখিয়েছেন সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণই হচ্ছে মার্কসবাদের জীবন্ত মর্মবস্তু। এরই ভিত্তিতে রাশিয়ায় তিনি শান্তি, রুটি ও জমির দাবীকে সামনে রেখে জনগণের আন্দোলনকে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকে (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন) গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ অক্টোবরে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলেন।
lesson of lenin: world can be transformed

২২ এপ্রিল ২০২৫- ভি আই লেনিনের ১৫৬ তম জন্ম দিবস। গত বছর ছিল তাঁর মৃত্যু শতবর্ষ। মৃত্যুর ১০০ বছর পরেও কমরেড লেনিন বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মনের মণিকোঠায়- তাঁর কাজ, শিক্ষা এবং তাঁর নেতৃত্বে  সম্পন্ন  সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যার চিরন্তন তাৎপর্যে আজও তিনি জীবিত। বিশ্বের মেহনতি মানুষ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনে তাঁর অবদানকে স্মরণ করে। মাত্র ৫৪ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনকালে তিনি মানব সভ্যতার বিকাশ ধারায় গুণগত পরিবর্তন সাধনে অনপণেয়  ছাপ রেখে গেছেন।

লেনিন: মার্কস-উত্তর মার্কসবাদের রূপকার

মার্কসবাদ কোনও আপ্ত বাক্য নয়– এটি সৃজনশীল প্রায়োগিক বিজ্ঞান। এর মর্মবস্তু কেবল তিনি আত্মস্থ করেননি, এটিকে তিনি নিজে বাস্তবের মাটিতে প্রয়োগ করে রুশ বিপ্লবের বিজয়ের উপযোগী করে তুলেছিলেন। কার্ল মার্কস ‘ফয়েরবাখ বিষয়ে থিসিস’-এ বলেছিলেন, ‘দার্শনিকরা এ যাবৎ পৃথিবীকে কেবল বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কথা হলো তাকে পরিবর্তন করা।’ লেনিনের নেতৃত্বে  রাশিয়ায় বিপ্লব দেখিয়েছিল দুনিয়াকে বদলানো যায়। এটা কোনও অবাস্তব, আকাশকুসুম কল্পনা নয়। এই বিপ্লব দুনিয়াব্যাপী মুক্তিকামী মানুষের লড়াই-আন্দোলনের সাফল্যের সম্ভাবনাকে ও এক শোষণহীন সমাজ তৈরির বাস্তবতাকে সামনে আনে। সমগ্র বিশ্বে এক জোরালো আত্মবিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, রাশিয়ায় বিপ্লব যদি সফল হতে পারে তবে অন্যান্য দেশেও বিপ্লব সংগঠিত করা সম্ভব এবং জয়যুক্ত হওয়া যেতে পারে। এটাই চিরায়ত প্রাসঙ্গিকতা। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে লেনিনের রণনীতি ও রণকৌশল ছিল অনন্য। মার্কসবাদের বিজ্ঞানসম্মত প্রক্রিয়া, তার সৃজনশীলতা এবং বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণ আত্মস্থ করায় পরিবর্তনশীল বিশ্বে নেতৃত্ব দিতেও তিনি সফল হয়েছিলেন। বিপ্লবী আন্দোলনের বিভিন্ন বাঁক ও মোড়ের মুখে  সঠিক কৌশল গ্রহণেও তিনি ছিলেন পটু। এটা ঠিক যে, বিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম সামাজিক নির্মাণ প্রকল্পটি ছিল রাশিয়ায় ও পরবর্তীতে চীন, ভিয়েতনাম, কিউবা এবং ইউরোপের বেশ কিছু ভূখণ্ডে সমাজতন্ত্রের নির্মাণ-যা প্রকৃত অর্থেই মানব উদ্যোগের মহাকাব্যিক উপাখ্যান। এই প্রথম পৃথিবীর মানুষ দেখতে পেলেন যে, এমন সমাজ গঠন করা যায় যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনের মান মুনাফার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। দারিদ্র-নিরক্ষরতা-কর্মহীনতার দূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসনের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার ব্যাপক কাঠামো গড়ে তোলা-প্রভৃতি সাফল্য বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামে অনুপ্রেরণা ও প্রত্যয়ের উৎসে পরিণত হয়।

লেনিনের মৌলিক ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান গুলি হল: ক) সাম্রাজ্যবাদকে বোঝার ক্ষেত্রে মার্কসবাদীদের জ্ঞান ও উপলব্ধিকে তিনি আরও বিকশিত করেছিলেন এবং বিষয়টিকে বিপ্লবী রণনীতির অঙ্গীভূত করেছিলেন; খ) গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার নীতির ভিত্তিতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলা; গ) বুর্জোয়া পার্লামেন্ট দুমাতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত; ঘ) বিপ্লবের জন্য ধৈর্যশীল প্রয়াস ও আঘাতের চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ; ঙ) সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতম গ্রন্থিতে শৃংখল ভেঙে ফেলার সম্ভাবনাকে তাত্ত্বিকভাবে সামনে আনেন; চ) শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলা গেলে অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশেও বিপ্লব সম্ভব; ছ) রাষ্ট্র শ্রেণির ক্ষমতার একটি হাতিয়ার; জ)সমাজতন্ত্র নির্মাণের জন্য প্রথমে ওয়ার কমিউনিজম ও পরবর্তীতে নিউ ইকনমিক পলিসি (নেপ) কার্যকরী করা; ঝ) জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্নের নিষ্পত্তি, ঞ) কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক গঠন... প্রভৃতি।

মার্কসবাদ সম্পর্কে লেনিনের দুটো সূত্রায়ন গুরুত্বপূর্ণ– প্রথমতঃ ‘জনগণের বন্ধুরা কারা?’ প্রবন্ধে বলেছেন– লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের মার্কসবাদের প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের কারণ এটি একমাত্র দর্শন যা কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক ও একইসঙ্গে বৈপ্লবিক। দ্বিতীয়তঃ লেনিন দেখিয়েছেন সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণই হচ্ছে মার্কসবাদের জীবন্ত মর্মবস্তু। এরই ভিত্তিতে রাশিয়ায় তিনি শান্তি, রুটি ও জমির দাবিকে সামনে রেখে জনগণের আন্দোলনকে অগ্রসর করে নিয়ে যেতে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বকে (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন) গৃহযুদ্ধে পরিণত করার ডাক দিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯১৭ অক্টোবরে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলেন।

এক্ষেত্রে বিপ্লবী সম্ভাবনাকে বা পরিস্থিতির বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়নকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র বাস্তব পরিস্থিতির বিশ্লেষণে কিংবা বিপ্লবী স্লোগানের উপর গুরুত্ব আরোপ করলে তা বিচ্যুতি ঘটায়। লেনিনকে অনুসরণ করেই স্তালিন বলেছিলেন – রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইন একশভাগ ঠিক হলেও, পার্টি সংগঠন ছাড়া জনগণের মধ্যে তার প্রভাব নিতান্তই সামান্য। একটি শক্তিশালী পার্টি সংগঠনই বিপ্লবী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। লেনিন একেই ‘বিষয়ীগত দিক’ হিসাবে চিহ্নিত করেন। বিপ্লবী লড়াই আন্দোলনের সন্ধিক্ষণে উঠে আসা নানা বিকৃতির (সংস্কারবাদী, বামপন্থী হঠকারিতার...) বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াইয়ে তিনি যেমন ছিলেন, পাশাপাশি শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পথ চিহ্নিতকরণে কিছু স্মরণীয় তাত্ত্বিক লেখালেখিও করেছিলেন। আজকের পরিস্থিতিতে মানব মুক্তির সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে লেনিনের ‘সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়’, ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’, ‘কী করিতে হইবে’, ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাসির দুই কৌশল’... এইসব রচনাগুলির মর্মবস্তু আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এক ঐতিহাসিক সংগ্রামের প্রবাহে লেনিন মার্কসীয় দর্শনকে সমৃদ্ধ করলেন। একাধারে বিপ্লবী, অন্যদিকে নিজেকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্কসবাদী দার্শনিক হিসেবে উপস্থিত করলেন। কার্ল মার্কস ও  ফ্রেডরিক এঙ্গেলস  ভাববাদী দর্শনের সাথে তীব্র সংগ্রামের পাশাপাশি যান্ত্রিক বস্তুবাদ, স্বতঃস্ফূর্ত বস্তুবাদ, আধিবিদ্যক বস্তুবাদের ভ্রান্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধারায় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে লেনিনকে সংগ্রাম করতে হয়েছিল এই বস্তুবাদী দর্শনকে রক্ষা ও বিকশিত করার জন্য। প্রকৃতি বিজ্ঞানের সেই সময়ে আবিষ্কারগুলির অপব্যাখ্যা করে বস্তুবাদকে নস্যাৎ করার এক সক্রিয় আয়োজন চলছিল। ১৯০৯ সালে মার্কসীয় দর্শনের ভান্ডারে লেনিনের উজ্জ্বল সংযোজন ‘মেটিরিয়ালিজম অ্যান্ড এম্পিরিও ক্রিটিসিজম’ গ্রন্থ। লেনিন রচিত এই গ্রন্থ সেই সময়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে এক কঠিন মতাদর্শগত সংকট থেকে মুক্ত করেছিল। বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে যে আরো প্রসারিত করে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে উত্তরণ ঘটাতে হবেসম্পূর্ণ নতুন এই পরিপ্রেক্ষিত উন্মোচনের কাজটিতে লেনিন অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।

লেনিনবাদ-সাম্রাজ্যবাদী যুগের মার্কসবাদ

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি ও তা কীভাবে কাজ করে, তার নিয়মসমূহ আবিষ্কার করেন কার্ল মার্কস। মার্কসের মৃত্যুর পরেই পুঁজিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্তরে প্রবেশ করেছিল। মার্কসীয় শিক্ষা সম্পর্কে লেনিনের অসাধারণ ব্যুৎপত্তির কারণে, তিনি মার্কসের পুঁজির পর্যবেক্ষণ ও প্রবণতার দিক উল্লেখ করে বলেছিলেন পুঁজিবাদ বিকশিত হওয়ার সাথে সাথে পুঁজির কেন্দ্রীভবন ও সঞ্চয়ের প্রবণতা এক নতুন স্তরে পৌঁছে গুণগত পরিবর্তন ঘটানোর দিকে এগুচ্ছে । লেনিন দেখালেন একচেটিয়া পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত তাগিদের কারণে পুঁজির শাসন সাম্রাজ্যবাদের পর্যায়ে এসে দুনিয়াজোড়া ব্যবস্থা হিসাবে সামগ্রিক দাসত্বের স্তরে আমাদের ঠেলে দিয়েছে। এই স্তরকে তিনি সাম্রাজ্যবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় হিসাবে অভিহিত করেন। প্রথাগত মার্কসীয় ধারণা ছিল, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব একমাত্র সেই সব সমাজে যেখানে পুঁজিবাদের পরিপূর্ণভাবে বিকাশ ঘটেছে। লেনিন এই চালু আশাবাদের ছক ভেঙ্গে দিলেন। তিনি দেখালেন সাম্রাজ্যবাদ সমগ্র বিশ্বকে পুঁজিবাদী বিশ্ব ব্যবস্থায় শৃঙ্খলিত করে ফেলেছে ঠিকই, তবে সাম্রাজ্যবাদের অন্তর্দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে তার শিকলের দুর্বলতম গ্রন্থটি ভেঙে ফেলা সম্ভব। ১৯১৭ সালে একটি অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ দেশ রাশিয়ার সফল বিপ্লব সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে গ্রামশি বলেছিলেন, এটা আসলে মার্কসের ‘ক্যাপিটাল’-এর বিরুদ্ধে সংগঠিত বিপ্লব। আসলে তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন তা হলো– উন্নত দেশে পুঁজিবাদী বিকাশের মধ্যে দিয়ে উদ্ভূত সংকট পরিপক্ক হলে বিপ্লবের অবস্থা তৈরি হবে-এরকমই সম্ভাবনার ইঙ্গিত ছিল মার্কসের পুঁজির বিশ্লেষণে। আবার রাশিয়ার এই বিপ্লব পুঁজি ও শ্রমিক শ্রেণির সরাসরি সংঘাত মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের সংঘাত হিসাবে প্রতিফলিত হয়েছিল এ কথা বললেও ভুল হবে। ফরাসি মার্কসবাদী দার্শনিক আলথুজার এ সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, এই সন্ধিক্ষণ ছিল অজস্র ঘাত-প্রতিঘাতের সংশ্লেষ এবং সংঘাতগুলির পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও বিন্যাসকে না ধরে শুধুমাত্র একমাত্রিক দ্বন্দ্বের নিরিখে বিপ্লবের প্রবাহকে বোঝার চেষ্টা করলে ভুল হবে। এটা তো ঠিক যে, একটি পশ্চাৎপদ দেশে উন্নত সমাজ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যে অজস্র সংঘাতের জন্ম দেবে তা কাঙ্খিত। কিন্তু সমগ্র বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল ইউরোপের উঠোন থেকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে পেরেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। লেনিনের অবদানের জন্যই ১৯২৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর, তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পঞ্চম কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুসারে বৈজ্ঞানিক সমাজবাদের মতবাদকে মার্কসবাদ- লেনিনবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা হল। স্তালিন বললেন, লেনিনবাদ– সাম্রাজ্যবাদী যুগের মার্কসবাদ। দুনিয়ার দেশে দেশে শ্রমজীবী মানুষকে সোভিয়েত ব্যবস্থা এতটাই আকর্ষণ করতে পেরেছিল যে কমিউনিজমের ভূতে ভীত হয়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রও জনকল্যাণমূলক ধারণা কার্যকরী করতে বাধ্য হয়েছিল মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পরিণতিতে। 

নয়া উদারবাদের দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাজতন্ত্রই বিকল্প

বৈরী বাতাবরণের মধ্যে বিপুল অগ্রগতি সত্ত্বেও ৭৪ বছর পর নানা কারণে বাইরের ও অভ্যন্তরীণ দু'রকম কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে। দুটি ক্ষেত্রে ভ্রান্ত বোঝাপড়ার ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়। প্রথমতঃ ধনতন্ত্রের শক্তিকে খাটো করে দেখে সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতির বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে ও সমাজতন্ত্রের ধারণা সম্পর্কেই বোঝাপড়ার ভুল। দ্বিতীয়তঃ সমাজতন্ত্রের নির্মাণ পর্বে বাস্তব সমস্যাবলী। এসব প্রশ্ন এই নিবন্ধে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন১৯৯২ সালে সিপিআই(এম)-এর চতুর্দশ কংগ্রেসে ‘কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয়  সম্পর্কে’ এটি চর্চা হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করে ২০০০ সালে আমাদের পার্টি কর্মসূচিকেও সময়োপযোগী করা হয়েছে এবং ২০১২ সালে কোঝিকোডে বিশতম পার্টি কংগ্রেসে মতাদর্শ বিষয়ে সম্পর্কে সর্বশেষ প্রস্তাব গৃহীত হয়। আমাদের কাছে যে বিষয়টি প্রাসঙ্গিক তা হল: সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পরেও আজকের আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির আগ্রাসনের যুগে মার্কসবাদ-লেনিনবাদে আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে প্রত্যয় জ্ঞাপন করা হয়েছে কেন? সিপিআই(এম) ত্রুটি ও বিচ্যুতিগুলি সংশোধন করে মার্কসবাদী তত্ত্বকে সময়োপযোগী করার প্রয়োজনকে মান্যতা দেয়। লেনিন যেভাবে মার্কস- এঙ্গেলসের তত্ত্বকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন বা মার্কসীয় তত্ত্ব পুনর্গঠনের প্রয়াস নিয়েছেন তার থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাড়ে তিন দশক কেটে যাওয়ার পর এখন আর পুঁজিবাদের বিজয়োল্লাস দেখা যাচ্ছে না। পুঁজিবাদ এক আদি-অন্তহীন পর্ব বা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ সেকেলে দর্শন বলে পরিত্যক্ত করা হচ্ছিল,গত সাড়ে তিন দশকে এসব ধারণা ভুল ও ভিত্তিহীন প্রমাণ হয়ে গেছে। সোভিয়েতের পতনের পর এখনো পর্যন্ত ১৫-১৬টি আগ্রাসী যুদ্ধের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো। বর্তমানে জলন্ত উদাহরণ প্যালেস্টাইন ও ইউক্রেনে বর্বরতা। সমাজতন্ত্রের সাময়িক বিপর্যয় সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বের নিরসন হয়নি। বাণিজ্য যুদ্ধ সহ নানা প্রশ্নে চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সংঘাত এই দ্বন্দ্বকে আরো শাণিত করছে। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলিতে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব যা কিছুটা স্তিমিত তা এক নতুন চেহারাও পেতে পারে। শ্রেণি ভারসাম্য সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে থাকা সত্ত্বেও একুশ শতকের দীর্ঘস্থায়ী পুঁজিবাদী সংকটে নয়া উদারবাদ যে অন্ধগলির প্রান্ত সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে সে কথাই ক্রমশঃ বেশি করে স্বীকৃত হচ্ছে। আজকের এই নয়া উদারবাদের সংকটের (২০০৮ সালের মন্দা যা আমেরিকা হাউজিং বাবল দিয়ে শুরু) বিশ্লেষণে মার্কসবাদই যে বৈজ্ঞানিক মতবাদ তা প্রমাণিত।

ধনতন্ত্রের ইতরতা প্রতিরোধের লড়াই

সিপিআই(এম)র বিংশতিতম কংগ্রেসের মতাদর্শগত প্রস্তাবের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির নির্দেশ মেনে সর্বোচ্চ মুনাফা সংগ্ৰহের উদ্দেশ্যে বিশ্ব ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যস্ত করাই নয়া উদারবাদ। সাম্রাজ্যবাদী স্তরের মধ্যে বিশ্বায়নের বর্তমান পর্যায়ে লগ্নি পুঁজির আহরণ ও কেন্দ্রীভবনকে উচ্চতর মাত্রায় নিয়ে গেছে-যা লেনিনের সময়ের  (জাতি রাষ্ট্রভিত্তিক, উৎপাদন ভিত্তিক, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অন্তর্দ্বন্দ্ব) থেকে পৃথক। এই লগ্নি পুঁজি কেবল উৎপাদন প্রক্রিয়ার উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ (appropriation) করে না, বরং কোনও উৎপাদন ছাড়াই লুটের বন্দোবস্ত (expropriation) করে যাকে মার্কস ‘প্রিমিটিভ অ্যাকুমুলেশন’ বলেছিলেন। মুনাফার সর্বোচ্চ বৃদ্ধির জন্য ধনতন্ত্রের লুটেরা চরিত্র আরো নগ্ন রূপ নিয়েছে।  ফলে এই সময়ে দুনিয়া জুড়েই  অসাম্য, বেকারি, দারিদ্র ভয়ংকর চেহারা নিয়েছে। আমাদের মত দেশে অসহনীয় আকার নিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের সাথে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এবং পুঁজি ও শ্রমের দ্বন্দ্ব তীক্ষ্ম  হচ্ছে। পুঁজিবাদের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট তার নিজস্ব গঠনগত সংকট (সিস্টেমিক ক্রাইসিস)। সংকটের বর্তমান পর্যায়ে সমস্যা অতিক্রম করতে দেশে দেশে শ্রমজীবী জনগণের উপর অভূতপূর্ব 'কৃচ্ছসাধন ব্যবস্থা' চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই চাপিয়ে দেওয়া নির্মম অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে। দক্ষিণপন্থার বাড়বাড়ন্ত সত্বেও, বিশ্বে রুখে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। সমগ্র লাতিন আমেরিকার নানা দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সরকার গঠনে মুখ্য ভূমিকায় আছে বামপন্থীরাই। শ্রীলঙ্কায় বামপন্থী সরকার গঠন ও জনস্বার্থে পদক্ষেপ অত্যন্ত ইতিবাচক। ব্যয় সংকোচ নীতির বিরুদ্ধে, সামাজিক বরাদ্দ ছাঁটাই এর প্রতিবাদে বৃটেন, ইতালি, গ্রিস সহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন শ্রমজীবী মানুষ।

পার্টি কর্মসূচির আলোকে আমাদের কর্তব্য

আমাদের পার্টি কর্মসূচিতে ভারতের বিপ্লবের বর্তমান পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক স্তরে রয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য: ক) সাম্রাজ্যবাদী বন্ধন থেকে ভারতকে মুক্ত করতে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় সংগ্রামে লিপ্ত থাকা; খ) দেশের জনগণকে বুর্জোয়া-জমিদারী শাসনের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে সামন্তবাদী শাসনের অবসান; গ) দেশের কর্তৃত্বে থাকা বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থার অবসান অর্থাৎ একচেটিয়া পুঁজি বিরোধী সংগ্রাম। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, সামন্ততন্ত্র বিরোধী ও একচেটিয়া পুঁজি বিরোধী এই ত্রিমুখী সংগ্রামে বিজয় অর্জন করতে হবে তবেই জনগণের জন্য প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এ প্রশ্নে পার্টি কর্মসূচি কৃষি বিপ্লবকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের অক্ষরেখা হিসাবে গ্রহণ করেছে যার নেতৃত্ব দেবে শ্রমিক শ্রেণি। এই গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্য অর্জনের অতি প্রয়োজনীয় হাতিয়ার শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী ও তার বিকাশের প্রয়োজনীয়তা। এই লক্ষ্যেই দিল্লিতে ঐতিহাসিক কৃষক সংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে দেশ জুড়ে ধর্মঘট, পার্লামেন্ট অভিযান, ব্রিগেড সমাবেশ সহ নানা সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছে।

আজকের সময়ের চ্যালেঞ্জ নয়া ফ্যাসিবাদ মোকাবিলা

এ মাসের প্রথম সপ্তাহে তামিলনাড়ুর প্রাচীন সাহিত্য সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী, ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনের সাক্ষী মাদুরাই শহরে উৎসাহের সাথে সিপিআই(এম)-এর ২৪ তম পার্টি কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হলো। আমাদের দেশে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের সংকট, খেটে খাওয়া মানুষের জীবন জীবিকার উপরে অসহনীয় আক্রমণ, বিশ্ব পরিস্থিতিতে জটিল অনিশ্চয়তার নতুন উপাদানের প্রেক্ষিতে ২৪তম পার্টি কংগ্রেসে রাজনৈতিক- কৌশলগত লাইন নির্ধারণ হয়েছে। ২১তম কংগ্রেস থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে হিন্দুত্বের শক্তির মোকাবিলার কথা বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রস্তাবে ‘নয়া ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি প্রথমবার ব্যবহৃত হল-অতি দক্ষিণপন্থার নানা ধারার এটি নতুনতর রূপ যেখানে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের কিছু বৈশিষ্ট্য যেমন আছে আবার নয়া উদারবাদের সংকটের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সমস্ত পদ্ধতি ব্যবহার করে জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতাসীন হচ্ছে। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে শত্রু নির্মিত হচ্ছে।

এটা ঠিক গত ১১ বছরে মোদি সরকার হিন্দুত্ব-কর্পোরেট আঁতাতের প্রতিনিধিত্ব করছে শুধু নয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আবদ্ধ। ত্রিফলা আক্রমণে দেশ আজ জর্জরিত- হিন্দুত্বের মতাদর্শ, নয়া উদারবাদী কৌশল, কর্তৃত্ববাদী আগ্রাসন। আমরা বলছি শাসক গোষ্ঠীর পরিচালনার ধাঁচটা নয়া ফ্যাসিবাদী। ২৩ তম কংগ্রেসেও আমাদের রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইন ছিল- বিজেপিকে পরাস্ত  ও বিচ্ছিন্ন করা। এটাই আশু কর্তব্য। এই শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই পরাস্ত করার সঠিকতা সহজে প্রতিপন্ন হলেও, আরএসএস/ বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর সংগ্রাম গড়ে তোলা এবং উগ্র দক্ষিণপন্থা অভিমুখী রাজনীতির সরনকে আটকানো- তা জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী প্রকৃতির। শুধু নির্বাচন মুখী সংগ্রামে নয়– বহুমুখী, সর্বাত্মক সংগ্রামের প্রশ্নটি বিবেচনায় রাখতেই হবে। হিন্দুত্ববাদী শক্তির যে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিভাত হচ্ছে তা শুধু নির্বাচনী সাফল্য থেকেই অর্জিত নয়-হিন্দুত্ববাদী শক্তি মতাদর্শগত, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে বহুমুখী কাজকর্ম ও প্রভাব বিস্তারের মধ্য দিয়েই আধিপত্য দেখাচ্ছে। যদিও গত তিন বছরে ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক শক্তির সাথে হিন্দুত্ব কর্পোরেট শাসনের শক্তির দ্বন্দ্ব ক্রমাগত বাড়ছে। নয়া ফ্যাসিবাদকে মোকাবিলার প্রয়োজনীয় মতাদর্শগত লক্ষ্য ও প্রত্যয় আছে কমিউনিস্ট ও বামেদের। কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আঁতাত, নয়া ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে পরাস্ত করার কাজ কমিউনিস্টদেরই সম্পন্ন করতে হবে। এই মূল লক্ষ্যে অবিচল থেকেই এ রাজ্যে বিজেপি ও তৃণমূল বিরোধী সব শক্তিকে এক জোট করতেই হবে। এক্ষেত্রে পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সাথে সাথে বামপন্থীদের ঐক্যকে পুনরুজ্জীবিত ও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। বিকল্প নীতি তুলে ধরতে হবে। বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্প গড়ে তোলার কাজে এগোতেই হবে। প্রতিক্রিয়ার এই পৈশাচিক শক্তিকে পরাস্ত করতে সমস্ত বাম-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে নতুন ভারত নির্মাণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জনগণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যেই আমাদের পথ চলা।


প্রকাশের তারিখ: ২২-এপ্রিল-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫১ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬

০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬