সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মাধ্যমিকে চার লক্ষ কমলঃ একটি প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া
উর্বা চৌধুরী
উন্নত গুণমানের শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করার কাজের কাজটিকে এড়িয়ে গিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রটিতে কিছু প্রসাধনীর প্রলেপ দিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিদিন নানা উপায়ে দুর্বল করার আয়োজন যে চলছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে এও ঠিক, সামাজিক সম্পদ হিসাবে সরকারি বিদ্যালয়গুলিকে চিনতে শিখে, মানসিকভাবে সংযুক্ত থেকে বিদ্যালয় স্তরের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগী হয়ে, নানা বঞ্চনা, প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে যদি লাগাতার ছাত্র-স্বার্থমুখী সংগঠিত প্রতিরোধের পরিকল্পনা আমরা নাগরিকেরাও করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আজ এভাবে সংকট তৈরি হয়ে যাওয়ার পর আমাদের বিচলিত হওয়া শুরু করতে হত না।

যেকোনো ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠুভাবে চালানোর সময়ে যখন কোনো সংকটজনক পরিস্থিতি আসে, তখন তার বিশ্লেষণ কেবল সংখ্যাগত দিক থেকে না করে, নিবিড়ভাবে বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে গুণগত বিচারেও করা দরকার। এই লেখার বিষয়টি কেবল “সংখ্যা”র কারণে উত্থাপিত নয়, এর তাৎপর্য উদ্বেগজনক, কারণ এই বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের সমাজের, সভ্যতার ভবিষ্যকালও।
২০২৩ সালের মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৯২৮ জন। তাদের মধ্যে ছাত্র রয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার ১৭২ জন এবং ছাত্রী ৩ লাখ ৫৬ হাজার ২১ জন। গত বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে এ রাজ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৫ জন। অতএব দেখা যাচ্ছে, গত বছরের থেকে এবছরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪৭ জন (প্রায় ৪ লক্ষ)।
পরিসংখ্যানের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গত বছরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে এ বছরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনার নিশ্চিতভাবে গুরত্ব রয়েছে। কারণ তা গত বেশ কিছু বছরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যার তফাতের ধারাবাহিক প্রবণতাকে ভেঙে দিচ্ছে; এ প্রসঙ্গে গত বেশ কিছু বছরের পরীক্ষার্থীর সংখ্যা নিচে উল্লেখ করা হল –
২০১৬ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা – ১১ লক্ষ ৪৭ হাজার
২০১৭ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা – ১০ লক্ষ ৬১ হাজার ১২৩
২০১৮ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা – ১১ লক্ষ ২ হাজার ৯২১
২০১৯ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা – ১০ লক্ষ ৬৪ হাজার ৯৮০
২০২০ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা - ১০ লক্ষ ১৫ হাজার ৮৮৮
২০২১ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা - ১০ লক্ষ ৭৯ হাজার
দেখা যাচ্ছে, গত সাত বছরে পরীক্ষার্থী হ্রাসের সর্বোচ্চ সংখ্যা ৮৫ হাজারের কিছু বেশি, এবং সর্বনিম্ন ৩৮ হাজার মতো। আবার একই সময়কালে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের মাধ্যমিকে ৪১ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী ২০১৭-র চেয়ে বৃদ্ধিও পেয়েছে। সেই জায়গায় ২০২৩ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ৪ লক্ষ।
মধ্যশিক্ষা পর্ষদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, ২০১৭ সালে বয়সোচিত শ্রেণিতে ভর্তির প্রশ্নে বিভ্রান্তির জন্যও অন্যান্য বছরের চেয়ে ২০২৩-এ মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী কমেছে। সে প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ২০১৭ সালের বিভ্রান্তি সত্ত্বেও যতজন ভর্তি হয়েছে, তার পরও ২০২৩ সালের মাধ্যমিকের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছিল ৯ লক্ষ মতো শিক্ষার্থী। অর্থাৎ কিনা নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও ২ লক্ষ শিক্ষার্থী এ বছর পরীক্ষা দিচ্ছে না। এরা কেউ ২০১৭ সালের ভর্তির গোলমালের অংশ নয়। অর্থাৎ কি না এই ২ লক্ষের পরীক্ষা না দেওয়ার ব্যাখ্যা ২০১৭-র ভর্তির সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে করা যাবে না। যেহেতু এই ২ লক্ষের তফাতটা আসলে গত বছরের সঙ্গে ৪ লক্ষের তফাতের সমপরিমাণই অস্বাভাবিক, সেহেতু এর সপক্ষে ভিন্ন হলেও যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা, চিহ্নিতকরণ, প্রতিবিধান জরুরি।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি রামানুজ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, কোভিড পরিস্থিতির কারণে যেহেতু স্কুল বন্ধ ছিল, এবং অনলাইন ছাড়া সম্পূর্ণভাবে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে ক্লাস হয়নি, তাতেই শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় এবং পরীক্ষার প্রস্তুতিতে খামতি হয়েছে।
এ তো গেল পর্ষদের পক্ষ থেকে দেওয়া এমন কিছু ব্যাখ্যা, যেগুলিকে শিক্ষার অধিকারের প্রশ্নে দেশের নাগরিকের দৃষ্টিকোণ থেকে নিতান্তই যান্ত্রিক, দায়হীন ঠেকে। যেন ২০১৭-র ভর্তির বিভ্রান্তির কারণে সমর্পিত বড় সংখ্যক শিশুর দায় নেওয়ার মতো কোনো দপ্তর বা মন্ত্রকের এ রাজ্যে অস্তিত্বই নাই। কার্যত এই ব্যাখ্যায় প্রমাণ হয় যে, কেবল ২০২৩ সালের মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থীর দুশ্চিন্তাজনক হ্রাসের দায় তো নিতেই হবে সরকারকে, উপরন্তু ২০১৭-র বিভ্রান্তির, যা কি না এতদিন খোলাসা হয়নি, তার দায়ও নিতে হবে এই সরকারকেই। ২০১৭-র বিভ্রান্তি কোনো নিয়তির লিখন, প্রকৃতির খেলা, বা অতিমারির নিরুপায়তা ছিল না, ওটিও ছিল একটি দাপ্তরিক ত্রুটিই। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ঘটা একটি গাফিলতি। শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ সালের বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক ভর্তিকরণের যে বিধি তাকে সুনিশ্চিত না করতে পারার মতো গুরুতর গাফিলতি। ফলে, ভর্তি যে বছর কমে যায় সে বছর কেন “ভর্তিকরণ কর্মসূচি”-র (স্পেশাল এনরোলমেন্ট ড্রাইভ) মতো বহু বছর ধরে চলা ভর্তির প্রশ্নে সফল একটি কর্মসূচিকে ফের সক্রিয় করে ভর্তির সংখ্যাকে আগের মতো করা হল না, সে কথাও মানুষকে জানাতে হবে বৈ কী!
২০২৩ সালের মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়া প্রসঙ্গে আলোচনায় ২০১৭-র প্রসঙ্গ উঠলে তার বিশ্লেষণ কেবল সংখ্যাগত দিক দিয়ে হতে পারে না। গুণগত দিক দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে যে দেশের আইন অনুযায়ী সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক, সেই দেশের অন্যতম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় গাফিলতি কেবল অতিমারি পরিস্থিতিতে হচ্ছে না, বরং স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও (২০১৭) হয়েছে।
এইবার আসি অতিমারি পরিস্থিতিতে সরকারের তরফ থেকে প্রায় দুই বছর বিদ্যালয় বন্ধ থাকা, অনলাইন ক্লাসকে একমাত্র বিকল্প হিসাবে প্রচার করে সরকারের কার্যত হাত গুটিয়ে বসে থাকার প্রসঙ্গে। পর্ষদের পক্ষ থেকে ২০২৩ মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী কমে যাওয়ার পিছনে অতিমারির প্রসঙ্গ এনে যে কারণ দেওয়া হয়েছে, তা কোনো অনিবার্য কারণ ছিল না, ফলে তার পরিণামও এই রকম দুর্দশাগ্রস্ত হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল না। বরং গোটাটাই ঘটেছে সরাকারি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে।
শিক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মানুষ, বিশেষত শিক্ষকদের মতামত, দুর্ভাবনার কথা শুনে মনে হচ্ছে -
- অতিমারিতে সরকারের পক্ষ থেকে টানা দুবছর কোনো যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা ছাড়া বিদ্যালয় বন্ধ রাখার,
- তারপরও গ্রীষ্মের ছুটির নামে দুইমাস বিদ্যালয় বন্ধ রাখার,
- লক্ষ লক্ষ বঞ্চিত, দরিদ্র শিশুর জন্য নিষ্ফলা, এবং সাধারণভাবে শিক্ষাবিজ্ঞানের দিক দিয়েও বিদ্যালয় শিক্ষার পক্ষে অকার্যকর অনলাইন পদ্ধতিকে একমাত্র বিকল্প হিসাবে চাউড় করে দিয়ে কটা ট্যাব বিতরণের মতো দায়সারা কাজ ছাড়া আর কিচ্ছুটি না করার
- স্কুলগুলিতে বিভিন্ন বিষয় সহ বিজ্ঞানের শিক্ষকের অভাব
- ব্যাপক হারে শিক্ষকদের বদলির প্রক্রিয়া চালু করার
- বিদ্যালয় সংক্রান্ত বন্দোবস্তকে সচল রেখে শিশুশ্রমকে রোধ করার প্রয়াস না করার
- বিদ্যালয় সংক্রান্ত বন্দোবস্তকে সচল রেখে বাল্যবিবাহকে রোধ করার প্রয়াস না করার
- বিদ্যালয় বন্ধ রাখাকালীন বিকল্প উপায় হিসাবে কমিউনিটি ভিত্তিক পরিষেবা চালু না করার, (যা কি না এক কালে এডুকেশান গ্যারান্টি স্কিম, বা অল্টারনেটিভ স্কুলিং নামক প্রতিবিধানে প্রস্তাবিত, চর্চিত, রূপায়িত ছিল)
- এতগুলি দিন বিদ্যালয় বন্ধ রেখে একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি জিইয়ে রেখেও শিশুদের লেখাপড়ার প্রতি যাতে ভীতি, অনীহা তৈরি না হয় সেজন্য তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক স্বাস্থ্যের জন্য সরকারিভাবে তেমন কিচ্ছু না করার-
-অবধারিত পরিণতি হল পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় এই ব্যাপক ঘাটতি।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার এক শিক্ষকের কথায় – স্কুল বন্ধ থাকার দিনগুলিতে শিক্ষকদের বদলির জন্য রিলিজ অর্ডার সই করতে গেছেন, এই সব কাজের বদলে তাঁরা শিশুদের অ্যাকাডেমিক দিকটিতে বেশি করে এনগেজ হতে পারতেন।
শিক্ষকদের সঙ্গে বিদ্যালয় স্তরের সংকট নিয়ে দাপ্তরিক আলোচনা করার ফুরসত কি কারো আছে? না কি কেবল প্রকল্প রূপায়ন করতে গিয়ে বেনিফিশিয়ারির ডেটা কালেক্ট করার কাজই চলছে, শিক্ষকেরা চাইল্ড ট্র্যাকিং-এরমতো কাজে ভাবনাচিন্তার কাজ নয়, শিক্ষকতায় সৃজনশীলতার কাজ নয়, যেন কেবল ডেটা সাপ্লাইয়ের জায়গা হয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চল, প্রান্তিক অঞ্চল শিক্ষকশূন্য হয়ে যাচ্ছে – আক্ষেপ করে জানাচ্ছেন হিঙ্গলগঞ্জের হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক, পুলক রায় চৌধুরী।
শিক্ষক চন্দন কুমার মাইতি জানাচ্ছেন, শিশুশ্রমে যুক্ত হয়ে পড়ছে বহু বাচ্চা। রাজ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত।
গোটা অবস্থার দিকে তাকিয়ে এ বছর মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থীর সংখ্যায় অস্বাভাবিক হ্রাসের কারণের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক বিপন্নতা, দারিদ্র, দুর্দশা জড়িয়ে আছে বলে মনে হলেও, নিবিড় পর্যবেক্ষণে বোঝা যায় যে, এই দুর্দশা নির্মিত, স্বয়ংজাত নয়। উন্নত গুণমানের শিক্ষাকে সুনিশ্চিত করার কাজের কাজটিকে এড়িয়ে গিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রটিতে কিছু প্রসাধনীর প্রলেপ দিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতিদিন নানা উপায়ে দুর্বল করার আয়োজন যে চলছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তবে এও ঠিক, সামাজিক সম্পদ হিসাবে সরকারি বিদ্যালয়গুলিকে চিনতে শিখে, মানসিকভাবে সংযুক্ত থেকে বিদ্যালয় স্তরের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগী হয়ে, নানা বঞ্চনা, প্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে যদি লাগাতার ছাত্র-স্বার্থমুখী সংগঠিত প্রতিরোধের পরিকল্পনা আমরা নাগরিকেরাও করতে পারতাম, তাহলে হয়তো আজ এভাবে সংকট তৈরি হয়ে যাওয়ার পর আমাদের বিচলিত হওয়া শুরু করতে হত না।
প্রকাশের তারিখ: ২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৩
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫১ টি নিবন্ধ
২৪-মে-২০২৬
০৭-মে-২০২৬
২৯-মার্চ-২০২৬
২২-মার্চ-২০২৬
১৯-মার্চ-২০২৬
১৩-মার্চ-২০২৬
০৪-মার্চ-২০২৬
২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
