Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

‘সেদিনের কথা’: নারীসাম্যের অঙ্গীকার

সৃজনী গঙ্গোপাধ্যায়
‘সেদিনের কথা’ আত্মজীবনীটিতে মণিকুন্তলা সেন বারেবারে উল্লেখ করেছেন এমন অনেক নারী কর্মী ও সংগঠক, বিপ্লবীদের কথা, যাঁরা প্রায় বিস্মৃত অথবা কম চর্চিত। এজন্য তাঁর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ বোধ করি। গ্রাম ও শহরে, জেলে ও রাস্তায়, মিছিলে ও সম্মেলনে যে সমস্ত নারীরা তিল তিল করে সংঘবদ্ধ করে তুলেছেন আন্দোলন, বিদ্রোহের কথা যাঁরা চারিয়ে দিয়েছেন মাটিতে হাওয়ায়, যাঁরা অনশন করেছেন, অত্যাচার সহ্য করেছেন, প্রশ্ন করেছেন, লড়াই করেছেন তাঁদের প্রত্যেকের কাছে বিপ্লব ঋণী। ছাত্রী থেকে কৃষক, শ্রমিক, অভিজাত ও মধ্যবিত্ত সকল নারীর সংঘবদ্ধতা কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিতের একটা শক্তিশালী অংশ।
manikuntala sen

প্রায় সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ সঙ্গী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন বরিশালের মেয়ে মণিকুন্তলা সেন। তিরিশের দশকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে খাদ্য আন্দোলন সহ বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য আন্দোলনে মণিকুন্তলা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর সেই ভূমিকা বহুল চর্চিত। তার পাশাপাশি গোটা জীবন ধরে মণিকুন্তলা ছিলেন একজন সংগঠক, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নারী আন্দোলনকে যাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রমে সার-জল-দিয়ে সংগঠিত করেছিলেন, মণিকুন্তলা তাঁদের একজন। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি একদিকে যেমন যুদ্ধ ও তার ভয়াবহতা, ক্ষয়, হিংস্রতার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করে তুলেছিলেন নারীদের ও তাদের শান্তির আহ্বানকে, অন্যদিকে এই নারীদেরই ‘আত্ম’-র অন্বেষণ ও আবিষ্কারের অঙ্গীকার নিয়ে তৈরি হচ্ছিল ‘আত্মরক্ষা সমিতি’। বস্তুত একদিকে যুদ্ধ থামানোর ডাক ও অন্যদিকে নারীদের ভেতরে যুদ্ধেরই বীজ বপন করে তোলার প্রতিজ্ঞা, এ-ছিল তাঁর সারা জীবনের চালিকাশক্তি। এই সমিতিতে কৃষক, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা একজোট হয়েছিলেন নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যকে সামনে রেখে, এমনকি অন্যান্য রাজনৈতিক চিন্তাধারার নারীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এখানে যোগ দিয়েছিলেন, নারীত্বের প্রতিনিধিত্বকে সামনে রেখে, গলা তোলার অধিকার বুঝে নিতে, তাই সেখানে সবাই ছিল সমান। তারপর চিরকাল হেঁশেল সামলে অন্নপূর্ণা নামে অভিহিত নারীরা যখন ’৪৩-এর মন্বন্তরের বীভৎসতায় ঢাকা প্রতিটা রাস্তায় হেঁটে গেলেন একের পর এক ভুখমিছিলে, যখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হককে তাঁরা বাধ্য করলেন দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের জন্য চাল বরাদ্দ করতে, যখন কলকাতার প্রথম রেশন দোকানগুলো খুলল তাঁদেরই উদ্যোগে, তখন দেখা যায়, নারীর ‘আত্ম’রক্ষা আসলে এক বৃহত্তর ধারণা, ঘর-বাইরে যে যুদ্ধগুলো নারীকে প্রতিদিন লড়তে হয়, সেই সংকটগুলোরই বৃহত্তর রূপ পৃথিবীকে ধ্বংসের সম্মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু বসুধাও তো নারী, তাই অস্ত্রে বা কৌশলে খুব বেশি হেরফের হয় না, হেরফের হয় না হকের দাবিতেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার হাঁ-এরই মধ্যে গিলে নিয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ, স্বপ্ন, সম্পর্ক, সম্পদ এবং ভয়ানক ক্ষতি হয়ে গেছে সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়া এবং না-দেওয়া অনেকগুলো দেশের। সোভিয়েতের মেয়েরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভারতসহ অন্যান্য বহু দেশের মেয়েরা নিজেরা যুদ্ধে না-গেলেও তাঁদের বহু প্রিয়জন, বহু মানুষকে পাঠাতে হয়েছিল তাঁদের অন্যের যুদ্ধ লড়তে। শুধু প্রাণই যে অপচয় হয়েছিল প্রচুর তা-ই তো নয়, সম্পদ, শিক্ষা, শিশুদের ভবিষ্যত সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিশ্বের প্রতিটা যুদ্ধের উপলক্ষ্য বা ফলাফলে যতই মহান কারণ থাক, আদতে বিজিতেরও পুরস্কার হয় নারী, পরাজিতও চায় তার পরিবার ও নারীকে রক্ষা করতে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম রক্ষাবন্ধনী গড়ে তুললেন এই নারীরাই। বস্তুত, ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে তাঁরাই কেবল অবশিষ্ট ছিলেন গলা তোলার জন্য। তাঁরা জানালেন, আর কোনো প্রিয়জনকে খোয়াতে তাঁরা সমর্থ নন।  মণিকুন্তলা লিখেছেন, গোটা বিশ্বের অসংখ্য 'মা-বোন', স্ত্রীয়েরা তখন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন তাঁদের স্বামীকে, সন্তানকে রক্ষা করার জন্য। গড়ে উঠল বিশ্বনারী সংঘ। তাঁদের স্বরে ধ্বনিত হল আগামীর শিশুর জন্য পৃথিবীকে নিরাপদ করে তোলার আহ্বান, জন্ম হল নতুন প্রতিজ্ঞার। 

‘সেদিনের কথা’ আত্মজীবনীটিতে মণিকুন্তলা সেন বারেবারে উল্লেখ করেছেন এমন অনেক নারী কর্মী ও সংগঠক, বিপ্লবীদের কথা, যাঁরা প্রায় বিস্মৃত অথবা কম চর্চিত। এজন্য তাঁর কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ বোধ করি। গ্রাম ও শহরে, জেলে ও রাস্তায়, মিছিলে ও সম্মেলনে যে সমস্ত নারীরা তিল তিল করে সংঘবদ্ধ করে তুলেছেন আন্দোলন, বিদ্রোহের কথা যাঁরা চারিয়ে দিয়েছেন মাটিতে হাওয়ায়, যাঁরা অনশন করেছেন, অত্যাচার সহ্য করেছেন, প্রশ্ন করেছেন, লড়াই করেছেন তাঁদের প্রত্যেকের কাছে বিপ্লব ঋণী। ছাত্রী থেকে কৃষক, শ্রমিক, অভিজাত ও মধ্যবিত্ত সকল নারীর সংঘবদ্ধতা কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিতের একটা শক্তিশালী অংশ। কারণ তাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতা, পরিবারে নারীর অধিকার ও অবস্থানের ধারণা এবং পোক্ত হয়েছিল রাজনীতিতে তাদের সকলের অংশগ্রহণ। যখন মেয়েরা দীর্ঘ আন্দোলনের পর বিবাহ বিচ্ছেদ চাওয়ার অধিকার পেলেন ও পৈতৃক সম্পত্তিতে তাঁদের অধিকার স্বীকৃত হল হিন্দু কোড বিলের মাধ্যমে তখন যেমন নাড়া পড়ল সমাজ ও ধর্মের গায়ে তেমনই পুরুষের স্বাচ্ছন্দ্য খানিক বিঘ্নিত হল বৈকি। এও যেমন রাজনীতির অংশ, তেমনই যখন একজন গৃহবধূ পুরুষের হাতে মার খাওয়ার বিপক্ষে, পুরুষের একাধিক বিয়ে করার বিপক্ষে টিপসইয়ের তালিকায় নিজের মতামত অন্তর্ভুক্ত করে সেও রাজনীতিরই অংশ। এখনও যখন আমাদের রাজ্যে কম বয়সে বহু মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তারা প্রয়োজনীয় শিক্ষা পাচ্ছে না, শিক্ষার গুরুত্ব জানছে না, আত্মমর্যাদার ধারণা তৈরির কোনো সুযোগই পাচ্ছে না তারা, তখন ইচ্ছা হয় কমিউনিস্ট ভাবধারাকে সামনে রেখে রাজনীতিতে আরো বেশি মেয়েরা, সমাজের সমস্ত স্তরের মেয়েরা এগিয়ে আসুক, যে 'খেয়ে-পরে' বাঁচার দাবি আজ থেকে প্রায় আশি বছর আগের কোনো মিছিলে এক গ্রাম্য বালিকাবধূ তুলেছিল, তা আবারও ধ্বনিত হোক মেয়েদের গলায়। শিক্ষার অধিকার, কাজের অধিকারের কথা গলা তুলে বলুক মেয়েরা, কারণ এই দুটি জিনিসের দরকার মেয়েদের অন্তত কখনোই মিটবে না।

মণিকুন্তলার আরো একটি বড়ো অবদান আমার মনে হয় এই যে, তিনি রাজনীতিতে প্রশ্ন করার গুরুত্ব শিখিয়েছিলেন মেয়েদের। ঘরে-বাইরে যাদের সব অধিকার কেবলই কেড়ে নেওয়া হয়, মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়, তাদের প্রশ্ন করতে শেখা প্রয়োজন। তিনি নিজেও একাধিকবার প্রশ্ন করেছেন নিজের নেতাদের, কখনো অপমানিত হয়েছেন, অবজ্ঞা পেয়েছেন, সঠিক উত্তর পাননি অনেক সময়। কিন্তু তিনি প্রশ্ন করে গেছেন। রাজনীতিতে কোনোকিছুই যে সন্দেহাতীত নয়, এবং প্রশ্ন না-করতে-করতে চুপ করে যাওয়াই যে অবধারিত হয়ে ওঠে, সেটা আর যার জন্যই ভালো হোক, রাজনীতিতে যুক্ত মেয়েদের জন্য একেবারেই ভালো নয়। পার্টিতে বিভিন্ন প্রশ্নে যখন ভাঙন দেখা দিয়েছিল, দু-ভাগ হয়ে যাচ্ছিল পার্টি, তখনকার মনোকষ্ট, পরস্পরকে সন্দেহের বাতাবরণ তাঁকে মনে মনে পীড়িত করেছে, খুব সামান্য একটি ঘটনায় তা তিনি তুলে ধরেছেন— প্রচণ্ড ঝড়জলের মধ্যে এক সন্ধেবেলা পার্টির গাড়ি ভর্তি হয়ে যাওয়ায় তাঁকে আসতে দেখে উপস্থিত বাকিরা উসখুশ করতে থাকে, অথচ কেউ তাঁকে ডেকে উঠতে পারে না, এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তিনি নিজেই সেখান থেকে সরে যান, অথচ ওই অস্বস্তিটা বিঁধেছিল তাকে, তা তিনি উল্লেখ করেছেন আত্মজীবনীতেও।

স্বাধীনতা আন্দোলনের কাল থেকেই বস্তুত নারীর সঙ্গে সংগ্রামের সংযোগ। সেই সময় নারীর আর দেশের স্বাধীনতা প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল, পরবর্তীকালে রাজনীতিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া তারই ফলাফল। ভোটাধিকার পেলেও সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে সমান অধিকার প্রাপ্তির পথ ছিল আরো অনেক দূরের পথ। সেই রাজনীতির কথাই বলতে মণিকুন্তলা পৌঁছেছিলেন কালীঘাটের যৌনপল্লিতে, একজন ভোট প্রার্থী হিসাবে। যখন তিনি তাঁদের বোঝাতে চাইছেন তাঁদের বঞ্চিত হওয়ার কারণ, সমাজ ও সরকারের অবহেলার কথা, তারা কেবলই আর্জি জানায় পুলিশের অত্যাচার আর টাকার জন্য জুলুম থেকে বাঁচার জন্যে। এ-ছিল তাঁদের রাজনীতিরই সূত্রপাত, এই সূত্রেই ‘সেদিনের কথা’-তে, যাদের আমরা খানিক করুণা করি, যাদের পদস্খলনের ইতিহাস খুঁজি দয়া করতে পারব বলে, তাদের মুখে উঠে আসে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা— এই বৃত্তি অন্য সব ব্যবসার মতোই একটা জীবিকা। দীর্ঘ ৭৫ বছর পর ২০২২ সালে এসে যার প্রতিফলন দেখা গেল মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ে, তার সূত্রপাত হয়েছিল বহু আগেই, হয়তো এই বৃত্তির আদিকালে, আমরাই তার খোঁজ রাখিনি। পাশাপাশি মণিকুন্তলা এই বইয়ে উল্লেখ করেছেন ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়ের, যা নিয়ে এখনো আমাদের দেশ তর্ক বিতর্কে প্রস্তুত নয়, নিজেদের স্বার্থেই। এখনো আমাদের দেশে নারীকে অনেক সময়েই জীবিকা ও পরিবার, উপার্জন ও সন্তানপালনের মধ্যে একটাকে বেছে নিতেই হয়, কারণ এ-কথা সর্বস্বীকৃত যে নারীকে উপার্জন করতে গেলে পরিবার ও সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে তবেই করতে হবে। কিন্তু নারীর শরীর ও একটা বিশাল সময় যে ব্যয়িত হচ্ছে শিশু ও পরিবারের জন্য, এ কি কেবল তার করারই কথা? গৃহশ্রম কি বাধ্যতামূলক নারীর জন্য? সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতে নারীকে সন্তানের বা পরিবারের জন্য যে সময় ব্যয় করতে হত, তা তার সামাজিক দায়িত্ব পালন হিসাবে বিবেচিত হত, এবং তার জন্য সরকারিভাবে তাকে পূর্ণ বেতন দেওয়া হবে এ-পরিকল্পনাও ততদিনে হচ্ছিল, মণিকুন্তলা উল্লেখ করেছেন। নারীর শিক্ষা ও অন্যান্য সমস্ত অধিকারের পাশাপাশি যে সমস্ত নারীদের জীবনের একটা বড়ো সময় কাটে গৃহশ্রমে, তাঁরা স্বেচ্ছায় সেই শ্রম দেন কিনা, না-করতে চাওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে কিনা, এবং সেই শ্রমকে অন্যান্য প্রতিটা পেশার মতই একটা পেশা হিসাবে দেখা প্রয়োজন কিনা, তা নিয়ে আলোচনা ভারতবর্ষে শুরু হওয়া প্রয়োজন। যতদিন না এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, ততদিন গৃহশ্রম আদতে মেয়েদেরই কাজ বলে স্বীকৃত হয়ে রয়ে যাবে, পুরুষের তাতে অবদান হয়ে থাকবে উপরির মতো, না-থাকলে কিছুই এসে যায় না, থাকলে তা অবশ্যই তার মাহাত্ম্য। অন্যদিকে ১৯৫৪-৫৫ সালে পাড়ার সমিতিতে মেয়েরা ব্যক্ত করতেন এক অন্য সমস্যার কথা। তাঁরা বিহিত চান অনেকগুলি সন্তান সামলানোর পরিশ্রম ও নিজেদের শরীরের জন্য। কিন্তু পার্টির মধ্যে তখন এ-নিয়ে কোনো আলোচনা বা পদক্ষেপের স্থান নেই। কিন্তু মেয়েরা এ-বিষয়ে অপেক্ষা করতে নারাজ। কমিউনিস্ট পার্টির মাতৃ সম্মেলনের সময়ে যখন শিশুর সুরক্ষা ও অগ্রাধিকারের দাবিই উঠে আসছিল, তখন দেশের মায়েরা চাইছিলেন এক বৃহত্তর সমস্যার সমাধান। কারণ অধিক শিশুর জন্ম তো মাকেও অসুস্থ করে আর শিশুই তাতে অযত্নে ভোগে। পার্টির অপছন্দ সত্ত্বেও এই সম্মেলনে ডা: রেণুকা রায়, ডা: জ্যোৎস্না মজুমদারের মাধ্যমে প্রচারিত হল কম সন্তান হওয়ার উপকারিতা, আর এই ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সমস্ত মেয়েদের গর্ভপাতের অধিকার স্বীকৃত হল। পথটা ছিল অত্যন্ত কঠিন, ভবিষ্যতেও থাকবে হয়তো, তবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনার বার্তা প্রথম প্রচারিত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির মেয়েদের সম্মেলনে, তাঁদেরই উদ্যোগে, এ-কথা আজ স্মরণ করা প্রয়োজন। 

১৯৪৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে নিরাপত্তা আইনে বন্দি হন মণিকুন্তলা। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আত্মগোপন করে মহিলা কর্মীদের মাধ্যমে কাজ করতে থাকেন। ১৯৪৯ সালে আবার গ্রেফতার হয়ে মেদিনীপুর জেলে পৌঁছান তিনি। এই জেলে তাঁর সঙ্গী ছিলেন কৃষককর্মী মেয়েরা ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে ধরে আনা সাঁওতাল মেয়েরা, তাদের অপরাধ ছিল চোলাই মদ বিক্রি। তখন তিনি বীণা দাস ছদ্মনাম নিয়েছেন। নিজের নাম প্রকাশ করলেই রাজনৈতিক বন্দির মর্যাদা অনুসারে তাঁর জন্য হাজির হবে খাট বিছানা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস। কিন্তু তিনি লেখেন— “রাজনৈতিক বন্দীর মর্যাদা নিয়ে আমি খাটে শোব, ওরা মাটিতে থাকবে এ আমার মোটেই মানতে ইচ্ছা হচ্ছিল না”। সন্ধেবেলা ওয়ার্ডের লণ্ঠনের আলোয় তিনি সমস্ত মেয়েদের নিয়ে পড়াশোনা শেখাতেন, কলকারাখানায় কীভাবে কাজ হয়, সুতো কীভাবে তৈরি হয়, কাকে বলে বিদ্যুৎ তা শেখাতেন। জেলের ভেতর খেটে জোগাড় করা উপকরণ দিয়ে কৃষক মেয়েরা তৈরি করতেন মসুর ডালের বড়া, লুকিয়ে পাড়া হত কাঁঠাল। আর বন্দি সাঁওতাল মেয়েদের সাধারণত ধরে আনা হত জেলের চাল-ঝাড়া, ডাল-ভাঙা, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি করানোর জন্য। একদিন তাদের একটি মেয়েকে জমাদারনি ঝাঁটা মারে। তার প্রতিবাদে তাঁরা সবাই খাওয়া বন্ধ করে দিলেন, মণিকুন্তলা তাঁদের বললেন জমাদারনি ক্ষমা না-চাওয়া অবধি তারা যেন না-খায়। শেষ পর্যন্ত জেলার এসে ক্ষমা চাওয়ালেন সেই জমাদারনিকে দিয়ে, তবে তাঁরা খেলেন। এই জেলে থাকতেই তিনি খবর পান ১৯৪৯ সালের ২৭ এপ্রিল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে বউবাজার-কলেজস্ট্রিট ক্রসিং-এ এক সমাবেশে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে মারা গিয়েছেন তাঁর হাতে তৈরি আত্মরক্ষা সমিতির সদস্যা অমিয়া, প্রতিভা, গীতা, লতিকা। এর প্রতিবাদে জেলে শুরু হয় দীর্ঘ অনশন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি দফায় দফায় অনশন করে যান, প্রথম দফায় ১০ দিন, দ্বিতীয় দফায় ২৩ দিন। আচ্ছন্নের মতো অবস্থাতেও তিনিই বাকি মেয়েদের ও ডাক্তারকেও সাহস জুগিয়েছিলেন তিনি বাঁচবেন বলে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে বদলি করা হয় প্রেসিডেন্সি জেলে। এখানে তিনি উল্লেখ করেন সংগ্রামী কর্মী মঞ্জুশ্রী দেবীর কথা। তাঁর অবস্থা ছিল বাকি কর্মীদের থেকে ভালো, বড়োলোকই বলা যায়। সেই প্রসঙ্গ তুলে এবং তাঁর অসুস্থ স্বামীর উল্লেখ করে একদিন জেলার তাঁকে বলেন তিনি তো চাইলেই বাড়ি যেতে পারেন। তিনি রাগে অপমানে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিলেন ঘর থেকে ওই ইঙ্গিতে। কমরেড লিউ-শাও-চির দলিল মিলিয়ে বাকি মেয়েরা চুলচেরা বিচার করতেন বড়োলোক মঞ্জুশ্রী দেবী তাঁদের শত্রু নাকি মিত্র। মণিকুন্তলা লিখেছেন, "কিন্তু লিউ-শাও-চির কৃপায় মঞ্জুদি প্রতিবারেই নিষ্কৃতি পেতেন এবং বাড়ি ও গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আমাদের মিত্রই থেকে যেতেন। গাড়িটাকে আমরা অবিশ্যি ভাঙা বলে মাফ করে দিতাম..."। এই জেলে দীর্ঘ ৫৩ দিন অনশনে ছিলেন তাঁরা। সরকার ছিল অনমনীয়, তার উপর বাইরে থেকে নির্দেশ এল নুন লেবুও নয়, শুধু জল খেয়ে থাকতে হবে তাঁদের। জেলের ভেতর অন্তত কয়েকজনের মৃত্যু না-হলে সরকারও নড়েচড়ে বসবে না আর আন্দোলনও জোরদার হবে না, তাই এই নির্দেশ। তাই শুরু করলেন তাঁরা। বাইরে থেকে খবর পেতেন ক্ষেতমজুর ও জোতদারদের লড়াইয়ের। সন্ধেবেলা ছোটো ছোটো বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁদের কাটত তর্ক বিতর্কে। শেষ পর্যন্ত পার্টি লাইন বদলের আবহে বিনা শর্তেই অনশন প্রত্যাহার করে নিতে হয় তাঁদের। তারপর ছাড়া পান জেল থেকে একসময়ে। 

জলপাইগুড়ির গ্রামই হোক বা হাওড়ার কৃষক পল্লি, যেখানেই তিনি ভোটের প্রচারে গেছেন, সেখান থেকে আহরণ করেছেন এক একটা অনন্য বার্তা। সোভিয়েতের স্পুটনিক লাইকাকে নিয়ে পরিক্রম করছে মহাকাশ আর দরিদ্র মুসলিম কৃষক পল্লিতে খবর পৌঁছাচ্ছে কমিউনিস্টরা পবিত্র চাঁদে কুকুর পাঠিয়েছে, অতএব তাদের ভোট দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। 'সেদিনের কথা'-য় মণিকুন্তলা সে কারণেই লিখেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা— "এত বড়ো একটা দেশের মানুষের মন ঘরে বসে বুঝতে চাওয়া শুধু নিরর্থক নয়, বিপজ্জনকও বটে"। এ কথা আজও বর্ণে বর্ণে সত্যি। প্রতিটা মানুষের অবস্থান বা সমস্যাকে একেবারে তার জুতোয় পা গলিয়ে না-দেখলে তাকে নিজের রাজনীতিতে শামিল করা প্রায় অসম্ভব, এবং তাকে দোষ দিয়েও লাভ নেই। প্রয়োজন কেবল অসীম ধৈর্য ও ভালোবাসা, সেই ধৈর্য্যে ও প্রেমে মণিকুন্তলার হৃদয় পূর্ণ ছিল বলেই উপদ্রুত বাংলাদেশের অগণিত বঞ্চিত, নিপীড়িত, দরিদ্র নারীর দুঃখসহোদরা তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। কর্মে ও কথায় তাঁদের প্রকৃত আত্মীয়তা অর্জন করেছিলেন— একজন যথার্থ কমিউনিস্টের মতো।


প্রকাশের তারিখ: ২৯-জুলাই-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লিঙ্গ রাজনীতি বিভাগে প্রকাশিত ৩৮ টি নিবন্ধ
১৮-এপ্রিল-২০২৬

০৯-মার্চ-২০২৬

১১-নভেম্বর-২০২৫

২২-সেপ্টেম্বর-২০২৫

০৬-আগস্ট-২০২৫

৩০-মে-২০২৫

২৯-মে-২০২৫

২৮-মে-২০২৫

৩১-মার্চ-২০২৫

২৮-মার্চ-২০২৫