Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

অগ্নিগর্ভ মণিপুর: সমস্যার উৎস সন্ধানে

শান্তনু ঝা
ড্রাগ মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের। সারা পৃথিবীর নানা সীমান্ত অঞ্চলের মতো এই এলাকার রাজনীতি ও প্রশাসনের উপর ড্রাগ কার্টেল-এর বিপুল প্রভাব। এমনকী, মণিপুর পুলিশের এক উচ্চ পদাধিকারী, বর্তমানে চাকরি ছেড়ে সামাজিক কাজে যুক্ত হয়েছেন, ড্রাগ চলাচল রোধে যাঁর ভূমিকা মণিপুরে সুবিদিত - বৃন্দা থাওনাওজাম- তিনি একের পর এক সাক্ষাৎকারে মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। মণিপুর-দিল্লির বিজেপি পরিচালিত ডবল ইঞ্জিন সরকারের ড্রাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা আসলে মিথ্যা প্রচারের ফুলঝুরি ছাড়া কিছু না। এই অঞ্চলের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী, যারা গত কয়েক বছরে অস্ত্র-সমর্পণ করে সরকারি নজরদারি ব্যবস্থায় রয়েছে, তারাই আফিম (পপি) চাষ, ড্রাগ চলাচল থেকে পয়সা তোলার কাজ চালাচ্ছে।
Manipur Violence: In search of the source of the problem

দুজন কুকি-জোমি সম্প্রদায়ের ভদ্রমহিলাকে উলঙ্গ করে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, প্রকাশ্য দিবালোকে কয়েকশো মানুষ জান্তব উল্লাসে যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে - এ চিত্র সারা পৃথিবীর হতচকিত মানুষের সাথে আমরাও দেখলাম। জানা গেল, ঘটনাটি ঘটেছে গত ৪ মে ২০২৩। এফ. আই. আর হয়েছে ১৮ মে মণিপুরের কাংপোকপি জেলায়। ব্যাস ঐটুকুই। তারপর ভিডিওটি ভাইরাল না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়নি। কাউকে গ্রেপ্তারও করা হয়নি। সে সময়ে এসব নিয়ে কোনো হেলদোলও দেখা যায়নি রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর আমরা আলোচনা করতে শুরু করলাম - আসলে কী ঘটছে মণিপুরে? সেদিনের ঘটনার পূর্বে একটি পলিথিনে মোড়া মৃতদেহের ছবি দেখিয়ে ইম্ফলে শুধুই গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়, কুকি অধ্যুষিত চূড়াচাঁদপুর জেলায় কুকি আদিবাসীরা হত্যালীলা চালিয়েছে। ব্যাস আর যায় কোথা? ক্রোধোন্মত্ত জনতা দুই কুকি বংশোদ্ভূত নারীর উপর প্রকাশ্য দিবালোকে চরম অত্যাচার নামিয়ে আনল। তাঁদের মধ্যে একজনের বাবা এবং ভাইকে হত্যা করেছে ক্ষিপ্ত জনতা। পরিচয় সন্ধানে জানা গেল, আরেক নারীর স্বামী ভারতীয় সামরিক বাহিনীর প্রাক্তন কর্মী। কার্গিল যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী। এ ঘটনায়  ভেঙ্গে পড়া অবস্থায় তাঁর সেই উক্তি আমরা সবাই শুনেছি – “দেশের সম্মান রক্ষায় সামনে থেকে লড়েছি। অথচ নিজের স্ত্রীর সম্মান রক্ষা করতে পারলাম না”। গত মে মাস থেকে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জনজাতি গোষ্ঠীর শয়ে শয়ে মানুষের প্রাণ গেছে মণিপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। সব তথ্য এখনও আমাদের কাছে এসে পৌঁছায়নি। কিন্তু কী কারণে এমন জাতিদাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ল মণিপুরে- তার পূর্ণচিত্র আমাদের কাছে আসা প্রয়োজন।  আমার নিজের অনেক ছাত্রছাত্রী, বন্ধু-বান্ধব রয়েছে মণিপুরে। মে মাসের পর থেকে দুমাস ধরে তাদের কারও সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ ছিল। অধুনা তাদের সাথে খানিক কথা বলা গেছে। তবে মণিপুরের ঘটনাবলী সম্পর্কে প্রায় কিছুই এই সন্ত্রস্ত মানুষগুলির কাছে জানা যাচ্ছিল না। বেশ কিছুদিন চেষ্টা চালানোর পর মিডিয়াসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য, কিছু প্রকাশনা, গবেষণামূলক বইপত্র ব্যক্তিগত স্তরে নানা অভিজ্ঞ  মানুষের সাথে কথাসূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে মণিপুরের সমস্যার একটি চালচিত্র হাজির করার লক্ষ্যে এই প্রবন্ধের অবতারণা। 

মণিপুরে বিভিন্ন জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘাত অতীতেও হয়েছে। তবে এমন সর্বগ্রাসী সংঘর্ষ, এক জনজাতিগোষ্ঠী আরেক জনজাতিগোষ্ঠীকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা লড়াইয়ে নেমে পড়া- এমনটা অতীতে দেখা যায়নি। এ জাতীয় সংঘর্ষ এক তরফাও নয়।   

 বর্তমান ঘটনাবলীর প্রেক্ষিত উপলব্ধি করতে হলে মণিপুরের জনচিত্র সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। সারা উত্তর-পূর্ব ভারতের মতো মণিপুরে নানা জনগোষ্ঠী রয়েছে। তবে এই জনগোষ্ঠীগুলির সবই টিবেটো-বার্মান গোত্রভুক্ত। এঁদের মধ্যে মেইতেই-রাই ৫৩%। এঁরা মুখ্যত হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং উপত্যকা অঞ্চলে বসবাসকারী। তবে এঁদের ১৬% সানামাহি এবং ৮% ইসলাম ধর্মাবলম্বী। সারা উত্তর-পূর্ব ভারতেই, বিভিন্ন জনজাতিগোষ্ঠীর মধ্যেই দেখা যায়, অনেকেই একই সঙ্গে লোকজ ধর্মের সাথেও আছেন আবার সংগঠিত ধর্মের সাথেও আছেন। ইম্ফল উপত্যকাসহ আশেপাশের কয়েকটি রাজ্যে মেইতেইরা ছড়িয়ে রয়েছেন। এছাড়াও মূলত পাহাড়ি অঞ্চলে এবং জঙ্গলে বাস করেন কুকি জনজাতি গোষ্ঠীর মানুষেরা। এই জনসংখ্যার হিসেবে এঁরা মণিপুরবাসীর ৪০%। তবে মণিপুরের পাহাড়-জঙ্গলের ৯০% জমিতে এঁদের আবাস। এর বাইরে রয়েছেন নাগা জনজাতিগোষ্ঠীভুক্ত মানুষেরা। ইম্ফল উপত্যকার উত্তর দিক থেকে নাগাল্যান্ড এবং আসামে  বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতির সম্মিলিত নাম 'নাগা'। এছাড়াও সীমিত সংখ্যায় রয়েছেন ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী’ (মেইতেইদের সাথে মিল রয়েছে, কিন্তু ভাষা বাংলা ঘেঁষা) এবং ‘কোম’ (পুরোনো কুকি জনজাতির একটি ক্ষুদ্র অংশ)।  

মেইতেইরাই মণিপুরে আধিপত্যকারী জনগোষ্ঠী। তাঁরা তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত। অতীতে খুমান, লুয়াং, মৈরাং এবং মেইতেই জনজাতিগুলি ধীরে ধীরে আধুনিক মেইতেই জনগোষ্ঠীতে মিশে গেছে। মণিপুরের রাজবংশ এই গোষ্ঠীভুক্ত এবং অপেক্ষাকৃত আলোকপ্রাপ্ত। মণিপুরের ১০% জমিতে এঁদের বাস। কিন্তু তা ইম্ফলের উপত্যকা অঞ্চলের সমতলভূমি এবং রাজধানী। এই মেইতেইরা দীর্ঘদিন যাবৎ আদিবাসী পরিচিতির দাবিতে আন্দোলন করছে - বিশেষ সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে। ২০২৩ সালের ২৭ মার্চ, মণিপুর হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এম.ভি. মুরলীধরণ মেইতেইদের এই দাবি সম্পর্কে রাজ্য সরকারকে চার মাসের মধ্যে কেন্দ্রের কাছে মতামত পাঠাতে বলেছে। হাইকোর্ট মনে করছে, মেইতেইদের সংবিধানের ১৪ এবং ২১ নং ধারা অনুযায়ী, তফসিলি উপজাতি হিসেবে বিবেচনা না করে বঞ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে কোর্টের এ হেন নির্দেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছে অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন অফ মণিপুর (ATSUM)। গত ২৪ এপ্রিল মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলে বনধ্ও হয়েছে।

মণিপুরের ভারত অন্তর্ভুক্তিকরণ হয় ১৯৪৯ এ। নব সংযুক্ত এই রাজ্যের বিশেষত পার্বত্য অঞ্চলের জন্য সংবিধানের ৩৭১ (গ) ধারা প্রযুক্ত হয়। এই সংযুক্তিকরণের বিরুদ্ধে মণিপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়েছে। কে.এল.এফ,  পি.ইউ.এল.এফ, কে.এন.এফ, ইউ.কে.এল.এফ, এম.পি.এল.এফ ইত্যাদি নানা ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ পরিচালনা করেছে। মণিপুরের সঙ্গে মায়ানমারের প্রায় চারশো কিলোমিটারের সীমানা রয়েছে। এই অঞ্চলে রয়েছে ড্রাগ মাফিয়াদের রাজত্ব। থাইল্যাণ্ড-লাওস-মায়ানমারের গোল্ডেন ট্রাইঙ্গ্যালের সংলগ্ন রাজ্য মণিপুর। মণিপুর-মায়ানমার সীমানা রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে আসাম রাইফেলস। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত ২-৩ বছরে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার ড্রাগ তারা উদ্ধার করেছে। নারকোটিকস এ্যাণ্ড এ্যাফেয়ারস অফ বর্ডার  (NAB) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, মণিপুরের পার্বত্য অঞ্চলে প্রায় ১৫,৪০০ একর জমি চাষ হয়। কৃষি ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া, পার্বত্য অঞ্চলে বিকল্প জীবিকার অভাব এমনকী গ্রামীণ কর্মসংস্থান প্রকল্পের মাধ্যমে কাজের সুযোগ না পাওয়ার ফলে এই বিস্তৃত এলাকার দরিদ্র কৃষিজীবী মানুষ হয় চুক্তির ভিত্তিতে আফিম (পপি) চাষ করছেন, অথবা আফিম ক্ষেতে মজুরের কাজ করছেন। মাঠে যখন ফসল থাকে না, তখন আফিম ক্ষেতে কাজ করলে তাঁরা বাড়তি মজুরি পান। আফিম গাছ থেকে আঠা সংগ্রহ করে তা চলে যায় মায়ানমারে। মায়ানমার-মণিপুরে সংযোগকারী ৬ টি রাস্তা রয়েছে। এর মধ্যে একটি রাস্তায় সীমানা বরাবর নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি পাঁচটি রাস্তাই থাকে নজরদারির বাইরে। একদিকে মণিপুরের রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকার ড্রাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণার কথা বলছেন, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থিতি নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ এবং সমাজ-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে রয়েছে নার্কো টেররিজমের প্রভাব৷

ড্রাগ মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের। সারা পৃথিবীর নানা সীমান্ত অঞ্চলের মতো এই এলাকার রাজনীতি ও প্রশাসনের উপর ড্রাগ কার্টেল-এর বিপুল প্রভাব। এমনকী, মণিপুর পুলিশের এক উচ্চ পদাধিকারী, বর্তমানে চাকরি ছেড়ে সামাজিক কাজে যুক্ত হয়েছেন, ড্রাগ চলাচল রোধে যাঁর ভূমিকা মণিপুরে সুবিদিত - বৃন্দা থাওনাওজাম- তিনি একের পর এক সাক্ষাৎকারে মণিপুরের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। মণিপুর-দিল্লির বিজেপি পরিচালিত ডবল ইঞ্জিন সরকারের ড্রাগের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা আসলে মিথ্যা প্রচারের ফুলঝুরি ছাড়া কিছু না। এই অঞ্চলের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী, যারা গত কয়েক বছরে অস্ত্র-সমর্পণ করে সরকারি নজরদারি ব্যবস্থায় রয়েছে, তারাই আফিম (পপি) চাষ, ড্রাগ চলাচল থেকে পয়সা তোলার কাজ চালাচ্ছে।

ইতিমধ্যে মণিপুরের এই পার্বত্য অঞ্চলে সংগঠিত অয়েল পাম চাষ করার জন্য পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের নিয়মাবলী রচনা করে, ৪ মার্চ ২০২১-এ গেজেট নোটিফিকেশনেও রয়েছে। রিপোর্টে প্রকাশ, আসলে এন বীরেন সিংহ-এর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার আদিবাসী, মুখ্যত কুকি জনজাতি গোষ্ঠীর সম্মতি ব্যতিরেকেই মণিপুরের পার্বত্য অঞ্চলের জমি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। মণিপুরের ছটি জেলায় ৬৭ হাজার হেক্টর জমি অয়েল পাম চাষের জন্য চিহ্নিত করেছে। আর সে জমি ফাঁকা করার লক্ষ্যে একদিকে আফিম চাষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রচারকে সামনে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে মেইতেইদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি ব্যবহারের অধিকারকে টোপ হিসাবে সামনে রাখা হয়েছে। জাতি দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সরকারের পক্ষে “বুলডোজার-রাজ” চালানোর সুবিধা হবে, আর সেই জন্যেই মণিপুরের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতেও প্রশাসনের আপাত নির্লিপ্তি, এবং নরেন্দ্র মোদির হিরন্ময়  নীরবতা। 

শুধুই পাম চাষ নয়, মণিপুরের এই পার্বত্য অঞ্চলে রয়েছে খনিজ আকরিকের ভাণ্ডার। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার তৈরি করা ম্যাপে চিহ্নিত করা হয়েছে লাইমস্টোন ক্রোমাইট নিকেল তামা ম্যালাকাইট বিভিন্ন প্লাটিনাম জাতীয় পদার্থের খনিজের ভাণ্ডার। ২০ মিলিয়ন মেট্রিক টন লাইমস্টোনের ভাণ্ডার রয়েছে উখরাল, তেংনৌপাল এবং চ্যাণ্ডেল জেলার গ্রামগুলিতে। রয়েছে ৬.৬ মেট্রিক টন ক্রোমাইটের ভাণ্ডার মূলত উখরাল এবং কামজং জেলায়, আর কিছুটা রয়েছে তেংনৌপাল এবং চ্যাণ্ডেলে। এই সমস্ত অঞ্চলের জমিতে মাইনিং লিজ দেওয়া শুরু হয়েছে। লাইমস্টোনের ৮টি ব্লকের জন্য ৩৪.৩৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে এই মাইনিং-এর জন্য চিহ্নিত করে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০১৭ সালে ইম্ফলে সংঘটিত বিজনেস সামিটে এই লক্ষ্যে ৩৯ টি মৌ সই হয়েছে।

এই সমস্ত প্রকল্প রূপায়ণের আগে যে প্রি-ফিজিবিলিটি রিপোর্ট এই সংস্থাগুলি তৈরি করে, তা অসত্য তথ্যে ভরা। এর ওপর নির্ভর করেই পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। এদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, উখরুলের লুংহার গ্রামের মাইনিং এলাকাগুলিতে কোনো বনাঞ্চল বা কৃষি এলাকা নেই। সবই সরকারি পতিত জমি। বাস্তবে সিরোহী, লুংহার, সিংচা-গ্যামনম এলাকাটি ঘন জঙ্গলে ঢাকা। প্রজেক্ট রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, মাইনিং লিজ এরিয়ার ১০ কিমি-র মধ্যে ইকো-সেনসিটিভ অঞ্চল নেই। কিন্তু বাস্তবে এই মাইনিং এলাকার ৪.৫ কিমি-র মধ্যেই রয়েছে 'সিরোই লিলি' নামে একটি বিশেষ বিরল এবং লুপ্তপ্রায় প্রজাতির লিলি-র বাসভূমি। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সিংচা-গ্যামনম মাইনিং এলাকায় তেমন উল্লেখযোগ্য বসতিও নেই, আবার কোনো বনাঞ্চলও নেই। এ তথ্যও সঠিক নয়।

মনে রাখা প্রয়োজন, মণিপুরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন জনজাতিগোষ্ঠী, বনাঞ্চলের জমিকে জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবহার করার অধিকারী। অথচ সেই সমস্ত অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ জমি, অয়েল পাম চাষ বা মাইনিং এর জন্য দেওয়া হচ্ছে। এই অঞ্চলগুলিতে তাংখুল নাগা এবং কুকি জনজাতিগোষ্ঠীর বাস।

সংবিধানের ৩৭১ (গ) ধারা অনুযায়ী এ ধরনের প্রকল্প  রূপায়ণের পূর্বে ঐ অঞ্চলের হিল এরিয়া কমিটির অনুমতি গ্রহণ করা আবশ্যিক। তা না নিয়ে, জাতিদাঙ্গার অজুহাতে এই অঞ্চলগুলিতে একের পর এক বসতি উচ্ছেদ চলছে। এ ধরনের মাইনিং প্রজেক্টের রূপায়নের পূর্বে নিয়মমাফিক পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র গ্রহণও করা হচ্ছে না। মণিপুর ৩ ধরণের জৈব প্রজাতি (মালয়- পলিনেশিয়ান, টিবেটো-চাইনিজ এবং ইণ্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট) এর সঙ্গমস্থল। এ জাতীয় অঞ্চলে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এভাবে অগ্রাহ্য করা বিপজ্জনক। ক্রোমাইট মাইনিং এর মতো প্রকল্পগুলির সম্ভাব্য দূষণ সৃষ্টির বিপদও বিবেচনার মধ্যে রাখা হচ্ছে না। 

ফলত মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হওয়া অমূলক নয়। অধিকার হারানোর বিরুদ্ধে আদিবাসী মানুষের সম্মিলিত বিক্ষোভ প্রতিহত করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বিভিন্ন জনজাতির মধ্যে বিভেদ তৈরি করা। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কাণ্ডারীরা দীর্ঘ দিন ধরে সংগঠিত ধর্ম ও লোকজ ধর্মের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে বিভেদের বাতাবরণ তৈরির কাজে ব্যাপৃত।

এই অঞ্চলের সমস্যা এখন বহুমুখী, এবং আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। মণিপুর, মায়ানমারের দুটি প্রদেশ সাগাইং এবং চীনের লাগোয়া। মায়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে। ফলে এই সীমান্ত অঞ্চলে বিপদ এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। চীন প্রদেশ থেকে যাঁরা এদেশে ঢুকছেন, তাঁদের সঙ্গে জাতিগত সম্পর্ক রয়েছে মিজোরাম, মণিপুরের জনজাতি সমাজের। মিজোরাম সরকার এই শরণার্থীদের এদেশে আসায় বাধা দিতে রাজি নয়। অন্যদিকে মণিপুরে এর ফলে চাপ বাড়ছে। বুলডোজার চালিয়ে, জাতিদাঙ্গাকে পরোক্ষে মদত দিয়ে কর্পোরেটদের হাতে এই অঞ্চলের জমি তুলে দেওয়ার নয়া উদ্যোগ, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ মণিপুরে বিচ্ছিন্নতার বিপদ বাড়াবে। এ বিষয়ে জাতীয় স্তরে আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কাণ্ডারীদের ‘ওয়ান ইন্ডিয়া’ প্রজেক্টের ধারণা বিপদকে বাড়াবে বৈ কমাবে না।


প্রকাশের তারিখ: ১২-আগস্ট-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

ভাল ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। - (সম্পাদিত)
- অরিজিৎ ঘোষ , ১৩-আগস্ট-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬