সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
দেশে উচ্চশিক্ষার বাজারের পূর্বাপর
পার্থিব বসু
উচ্চশিক্ষায় নয়া উদার অর্থনীতির বেপরোয়া যাত্রায় সাম্প্রতিকতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মোদি সরকারের নয়া শিক্ষা নীতি। উচ্চশিক্ষাকে বাজারি ব্যক্তি পণ্যে পরিণত করার যে যজ্ঞ শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়, সে কাজের বাকিটুকু শেষ করার লক্ষ্যে নয়া শিক্ষা নীতি এই সরকারের আর এক সার্জিকাল স্ট্রাইক। গোদের ওপর বিষফোঁড়া, এই সরকারের সর্বক্ষেত্রে গৈরিকীকরণের কেন্দ্রীয় অ্যাজেন্ডা।

বিশুদ্ধ জল, হাওয়া, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, শিক্ষা - এ সব মৌলিক পরিষেবার সব কিছুই যে রাষ্ট্রকে নাগরিকদের নিখরচায় যোগান দেওয়ার কথা তা শাশ্বত। নয়া উদার অর্থনীতির নির্দেশে সে সব কিছুকেই হতে হবে ব্যক্তি পুঁজির বিনিয়োগজাত পণ্য। সবকিছুর বিচার বাজারমূল্যে। মানুষের জন্যে বাজার নয়— বাজারের জন্য থাকবে মানুষ। আর সে কাজ করতে বাজারকে সব রকমের মদত দেবে রাষ্ট্র। শিক্ষা তার বাইরে থাকবে, সে কি হয়? এই মূহূর্তে বিশ্বের শিক্ষার বাজারের মোট অর্থমূল্য ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার! লগ্নির এমন বাজার ছাড়ে নাকি পুঁজি! এই যে নতুন শিক্ষানীতি – ঢাকঢোল পিটিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় যাকে চাপিয়ে দেওয়ার সব রকম আয়োজন এই সরকার করছেন – সে শিক্ষানীতির নানান গালভরা কথার মোড়কের রাংতা একটু সরালেই পরিষ্কার হয় যে, এর অন্যতম প্রধান অভিমুখই হল যা বাজারে বিকোনোর ছিল না কোনওকালে সেই উচ্চশিক্ষাকে ব্যক্তিপঁুজির হাতে – কর্পোরেট স্বার্থের হাতে সাজিয়ে-গুছিয়ে তুলে দেওয়ার বন্দোবস্তকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।
কিন্তু এ সবই কি হালে হল? দেশটা স্বাধীন হওয়ার পরের বছরগুলোতে যা ছিল রাষ্ট্রের দেয় এক প্রধান পরিষেবা এবং অবাণিজ্যিক পণ্য — কেমন করে পালটে গিয়ে তার বদল ঘটলো বাজারি পণ্যে?
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অভিমুখ ও তার বিষয়বস্তু নিয়ে তাঁদের শ্রেণিগত চরিত্রের কারণেই উনবিংশ শতকের দেশীয় বিদ্বৎ সমাজ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্বের সঙ্গে ঔপনিবেশিক শাসকদের কোথাও কোথাও মিল থাকলেও, কতগুলি বিষয়ে এক রকম সার্বিক তফাৎ ছিল। উচ্চশিক্ষা নিয়ে জাতীয় নেতৃত্বের সংশয়াতীত ঐক্যমত ছিল এই বিষয়গুলিতে— ১) বিজ্ঞান প্রযুক্তি শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়ায়, ২) সমাজের ব্যপকতম অংশের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রসারে, ৩) এবং উচ্চশিক্ষা বিস্তারে সামাজিক সমতা ও ন্যায় নিশ্চিত করাকে। স্বাধীনতার ঠিক পরেই ১৯৪৮এ তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন – যাকে আমরা জানি রাধাকৃষ্ণন কমিশন বলে। সেই কমিশনের রিপোর্টের একটা উদ্ধৃতিই বলে দেবে দেশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে কী অপরিসীম গুরুত্ব দিতে চেয়েছিল স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্র যাতে ফুটে উঠেছিল স্বাধীনতা-পূর্ব দেশনেতাদের ভাবনা– “If India is to confront the confusion of our times, she must turn for guidance, not to those who are lost in the mere exigencies of the passing hour, but to her men of science, to her poets and artists, to her discoverers and inventors. These intellectual pioneers of civilization are to be found and trained in universities, which are the sanctuaries of the inner life of the nation.” কিন্তু এমন স্পষ্ট ভাবনা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষায় সরকার কতটা জনকল্যাণকর ভূমিকা নেবে – সোজা কথায় উচ্চশিক্ষাকে যতদূর সম্ভব ভরতুকি দেবে, নাকি তাকে ঘিরে একটা বাজার তৈরিকে সমান্তরাল প্রশ্রয় দেবে — তা নিয়ে একটা টানাপড়েন কিন্তু ছিলই পরের দশকগুলো ধরে।
স্বাধীনতার পরে এবং নয়া উদার অর্থনীতির দাপট শুরু হওয়ার আগেও ১৯৯০-৯১ সালে উদারীকরণ শুরু পর্যন্ত এ দেশের সরকার আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তারে যে বিরাট কিছু রসদ জুগিয়েছেন তা মোটেও বলার উপায় নেই। শুধু উচ্চশিক্ষায় ১৯৯০-৯১ সালে বরাদ্দের বহর দাঁড়ায় দেশের জিডিপি’র মাত্র ০.৪৩%। সে হাল অব্যাহত। ১৯৯১ সালে দেশে যখন উদারীকরণ শুরু হল তার রোল মডেল হল অবশ্যই মার্কিনি। আর সেই মডেল ধরে সরকারি শিক্ষা খরচেও তো কাঁচি পড়ারই কথা। পড়ুয়া পিছু আমাদের দেশের সরকার যা খরচ করে তা এমনকি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলির তুলনায়ও শোচনীয়। মালয়েশিয়ায় পড়ুয়া পিছু সরকারি খরচ যেখানে ১১,০০০ ডলার, চীনে ২৭০০ ডলার, ব্রাজিলে প্রায় ৪০০০ ডলার, এমনকি ফিলিপিন্সেও তার পরিমাণ যেখানে ৬৫০ ডলার – এ দেশে এখন তার বহর মাত্র ৪০৬ ডলার। তবে কি সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খোলেনি। খুলেছে অবশ্যই গত ৭৫ বছরে। তবে বুঝে নিতে কষ্ট করতে হবে না যে এই রসদে আর যাই হোক দেশে সরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার এমন কোনও সর্বব্যাপী বা চোখে পড়ার মত বৃদ্ধি ঘটা সম্ভব নয়। ঘটেওনি। দেশে এই মুহুর্তে উচ্চশিক্ষায় যা গ্রস এনরোলমেন্ট বা পড়ুয়া তালিকাভুক্তি তার ৫০% বাড়াতে গেলেও রসদ লাগবে ৪০০০ কোটি ডলার। জাতীয় নলেজ কমিশনের হিসেব অনুযায়ী দেশে প্রয়োজন অন্তত ১৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়।
স্বাধীনতার সময় গোটা দেশে কুল্লে ২০টা বিশ্ববিদ্যালয় আর ৫০০ কলেজ ছিল। তখন গোটা দেশে মাত্র আড়াই লাখ ছাত্রছাত্রী পৌঁছতে পারত উচ্চশিক্ষার সেই অন্দর মহলে। আর মাত্র ৭৫ বছরের মধ্যেই মোট পড়ুয়া তালিকাভুক্তি বা গ্রস এনরোলমেন্টের বিচারে আমেরিকা এবং চীনের পরেই আমরা। দেশে এই মূহূর্তে সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে ৪২,৩৪৩টি কলেজ আর প্রায় এক হাজারের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ে (‘প্রায়’ লিখতে হচ্ছে কারণ যখন লিখছি আর যখন তা ছেপে বেরোবে তার মধ্যে আরও কটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়ে যাবে তা আঁচ করা দুষ্কর) পড়তে যাচ্ছে প্রায় চার কোটি ছাত্রছাত্রী। কিন্তু এই মহা উল্লম্ফনের পরেও স্কুল শেষ করে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের মোট তালিকাভুক্তি বা গ্রস এনরোলমেন্ট দাড়িয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। উচ্চশিক্ষায় গ্রস এনরোলমেন্টে বিশ্বের গড় ২৯%। সুতরাং এই সংখ্যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দেশে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ঘোর অপ্রতুলতাকেই। আমেরিকা (৮৯%), জার্মানি (৭০%) বা গ্রেট ব্রিটেন (৬০%) এর মতো অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত দেশগুলির কথা যদি বাদও দিই, চীন বা এমনকী ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশেও সংখ্যাটা ৫০% এর আশেপাশে। আমাদের দেশেও উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে পৌছোবার চাহিদা বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। এই মুহুর্তের উচ্চশিক্ষায় যা তালিকাভুক্তি তা ৫০% র আশেপাশে নিয়ে যাওয়াই আশু প্রয়োজন। দেশের নয়া শিক্ষা নীতিতেও ঢাকঢোল পিটিয়ে সে কথা ঘোষণা করা হয়েছে। শিক্ষানীতির এই কথাটি নিয়ে অন্তত সমালোচনার জায়গা নেই। কিন্তু এই ক্রমবর্দ্ধমান চাহিদা সরকারি মদতে মেটানো থেকে ক্রমেই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে এবং নিচ্ছে দেশের সরকার। এই বিপুল চাহিদা খুলে দিয়েছে, আজকের হিসেব অনুযায়ী, বছরে ৫৭০০ কোটি ডলারের উচ্চশিক্ষা বাজার। একের পর এক সরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে আবাহন করেছে এই বাজারে। এই সরকারের আমলে যে জাতীয় শিক্ষায় নীতি তা এই প্রক্রিয়ারই সাম্প্রতিকতম প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।
উচ্চশিক্ষাকে জনহিতকর রাষ্ট্রীয় পণ্য থেকে ব্যক্তি পণ্যে পরিণত করে উচ্চশিক্ষার সেই বাজারকে সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করে দিতে, নয়া উদার অর্থনীতির শর্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে ক্রমশ আগুয়ান এবং সততোৎসাহী হয়েছে রাষ্ট্র। নরসিংহ রাও-এর নেতৃত্বে ১৯৯০-৯১ সালে দেশে অর্থনৈতিক উদারীকরণ শুরু হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এর শুরু হলেও, তার প্রস্তুতির সুর ছিল রাজীব গান্ধী সরকারের আমলেই। ১৯৮৫ সালে ‘শিক্ষা’ মন্ত্রকের নাম পালটে করা হলো ‘মানব সম্পদ’ মন্ত্রক। ১৯৮৬ সালে এল ‘নতুন জাতীয় শিক্ষানীতি’ (নিউ পলিসি অন এডুকেশন)। সেখানে বলা হল, অর্থ সংস্থানের জন্যে বেসরকারি বিনিয়োগের কথা — বলা হলো পড়ূয়াদের মাইনে বাড়ানোর কথা। ১৯৯৩ সালে পুন্নায়া কমিটি। সে কমিটি বলল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেই যোগাড় করতে হবে তাদের রেকারিং বা চলতি ব্যয়ের ২৫ – ৩০ শতাংশ। এক কথায়, সরকার তার নিজের খরচ কমাবে সেই অনুপাতে। প্রথম দশকেই উচ্চশিক্ষায় সরকারি খরচ কমে। ১৯৯০-৯১ সালে দেশের জিডিপি’র ০.৪৬% থেকে এক-তৃতীয়াংশ কমে ২০০৪-০৫ নাগাদ উচ্চশিক্ষায় খরচ দাঁড়ায় ০.৩৭% এ। উচ্চশিক্ষায় সরকারি খরচে কোপ পড়ায় কি দশা হয়েছে দেশের সরকারি উচ্চশিক্ষা অঙ্গনের? নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা দূরে থাক— চালু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিকাঠামোরই বা কি অবস্থা? দু-একটা পরিসংখ্যানেই তার হদিশ মিলবে। ২০২১ এর ডিসেম্বরে সংসদে পেশ করা তথ্য বলছে, শুধু ৪৪টি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষকের পদ শূন্য। আর শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী সব মিলিয়ে শূন্য প্রায় ১৯ হাজার পদ। এমন কি আইআইটি গুলিতেও খালি প্রায় দেড়শোর কাছাকাছি শিক্ষক পদ। একটি সমীক্ষা বলছে, দেশের ৪৮% বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং প্রায় ৭০% কলেজে লাইব্রেরির অবস্থা শোচনীয়। পড়ুয়া-পিছু বই মাত্র ৯টি।
উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে নয়া উদারীকরণের নির্দেশ অনুযায়ী বদলে ফেলার প্রধান কোচ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডবলু টি ও। ডবলু টি ও’র সোজা-সাপটা বক্তব্য, উচ্চশিক্ষায় সরকারি খরচ গুটিয়ে ফেলতে হবে। ১৯৯৪ সালে ভারত সই করে ডবলু টি ও প্রণীত গ্যাটস চুক্তিতে। তা লাগু হয় ১৯৯৫ সালে। ডবলু টি ও’র ফরমানে ‘শিক্ষা’ মূলত চার ভাবে পণ্যায়িত হবে— বা সোজা কথায় ‘বিকোবে’। ১) শিক্ষার ক্রস বর্ডার গতায়াত (ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিক্ষা —ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার ও বিকাশ), ২) এক দেশ থেকে আরেক দেশে পড়ুয়াদের অবাধ গতায়াত, ৩) দেশে বিদেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস খুলবে এবং ৪) শিক্ষকদের গতায়াত —দেশে বিদেশি শিক্ষকরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে পড়াবেন। ভারত শিক্ষা পরিষেবা নিয়ে খোলাখুলি ভাবে ডবলু টি ও’র কাছে কোনও অঙ্গীকার না করেনি এখনও পর্যন্ত। কিন্তু নতুন যে শিক্ষানীতি তাতে এই চার বিষয়েই রয়েছে পরিষ্কার দিকনির্দেশ। ১৯৯১ পরবর্তী সময়েও উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থাপনায় দেশের সরকার যা যা করেছে তাও ঐ ডবলু টি ও-র নির্দেশ মেনেই।
খেয়াল করুন - ১৯৯৫ সালেই পাস করা হলো ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন’। সেখানে এই প্রথম উচ্চশিক্ষাকে বাদ দেওয়া হলো ‘মেরিট গুডস’ (যে পরিষেবা রাষ্ট্রের দেওয়ার কথা) এর তালিকা থেকে। এর পর ২০০০ সালে এল দেশের দুই বিখ্যাত ‘শিক্ষাবিদ’ আম্বানি ও বিড়লার নেতৃত্বে আম্বানি-বিড়লা কমিটির রিপোর্ট! এই রিপোর্টে কোনও রাখঢাক না করে স্পষ্ট বলা হল যে, উচ্চশিক্ষা কোনও সমাজ বিকাশের উপাদান নয়। উচ্চশিক্ষা হল ‘ইনফর্মেশন সোসাইটি’ গড়ার লক্ষ্যে এবং বাজারের স্বার্থে লগ্নি। বাজার ঠিক করে নেবে কী শেখানো হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। সরকার বরং বহন করুক স্কুলশিক্ষার খরচ। আর উচ্চশিক্ষাকে পুরোপুরি তুলে দেওয়া হোক বেসরকারি হাতে।
এই গোটা কর্মকাণ্ড সবচেেয় বেশি গতি পেল ২০০৯ সালে দ্বিতীয় ইউ পি এ সরকারের মানব সম্পদ মন্ত্রী কপিল সিবালের আমলের। দেশের উচ্চশিক্ষার খোলনলচে পালটে তাকে বাজারের হাতে তুলে দেওয়ার যাবতীয় আয়োজন তাঁরই ব্যগ্রতায় ছুটতে শুরু করলো হই হই করে। সিলেবাসকে বাজারসই করে বদলে ফেলা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষার গোটা ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি পুঁজির নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। শিক্ষক ও ছাত্রদের সংগঠন করার অধিকারের বিরুদ্ধেও অবস্থান তাঁর।
উচ্চশিক্ষার দায়িত্বের ভার কাঁধ থেকে হালকা করার সেই দৌড় উত্তরোত্তর আরও জোরদার হয়ে ২০১৪ সালে মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বল্গাহীন হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় গ্রস এনরোলমেন্ট বাড়াতে গেলে যে অর্থের প্রয়োজন, তার দায় ঝেড়ে ফেলে গোটাটাই বাজারের হাতে তুলে দেওয়ার যে পরিকল্পনা দেশে নয়া উদারীকরণ শুরু হওয়ার পর ভাঁজা হয়েছে নয়া উদার অর্থনীতির সূত্র এবং গ্যাট চুক্তির শর্ত মেনে — মোদি সরকারের আমলে শিখরে পৌছেছে তার রূপায়নের গতি। ডেলয়েট কনসালটেন্সি সংস্থার করা একটি হিসেব অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষা ‘শিল্পের’ বাজার মূল্য এক দশক আগে অর্থাৎ ২০১২ সালেই ছিল ৩১৪৭ কোটি ডলার। এই বিপুল বাজার ধরতে তাই নেমে পড়েছে শিক্ষা ব্যবসায়ীরা। ব্যাঙের ছাতার মতো খুলেছে উচ্চশিক্ষার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিল্প! অল ইন্ডিয়া সার্ভে অফ হায়ার এডুকেশন ২০১৮-১৯ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সংখ্যা ছিল ১৪টি, মাত্র সাত বছরে ২০১৫ সালে প্রায় ১৬০০ শতাংশ বেড়ে তা হয় ২৩৬টি। আর ২০১৫ থেকে তা আরও ৬২% শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮৪টি। আর এই সময়কালে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার মিলিয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ১৫%।
এবার তাকানো যাক কী পড়ানো হচ্ছে এই উচ্চশিক্ষার এই সব কারখানায়? নয়া উদারবাদের সূত্র অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষার বিষয়বস্তুকে হতে হবে বিশ্বায়িত পণ্য হিসেবে মানানসই। সে বিষয়বস্তুর সঙ্গে দেশের সংস্কৃতি, উন্নয়নের চাহিদা, জনভিত্তির কোনও সম্পর্ক থাকা নৈব। দু দশক আগে UNESCO এর বিপদ সম্বন্ধে বলেছিল- “…education within the realm of the market … may seriously affect the capacity of the state to regulate higher education within a public policy perspective. Declining policy capacity of the state could affect weaker and poorer nations and benefit the more prosperous ones”. ডেলোয়েট এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত এই চার বছরে দেশে কমার্স বা ম্যানেজমেন্ট কোর্সে ভর্তি হওয়া পড়ুয়ার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭৮%। এর গোটাটাই যে এই সব বেসরকারি ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ গুলিতে, তা বুঝে নিতে বিরাট মাথা না ঘামালেও চলে। উল্লেখ্য যে, এই সময়ে হিউম্যানিটিজ পড়ুয়া বেড়েছে মাত্র ১৮% আর বিজ্ঞান পড়ুয়া ছাত্রের সংখ্যা বেড়েছে ৩৮%। পাল্লা দিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে পড়ার খরচ। সেই ২০০৮ সাল থেকে শুরু করে হালের নয়া শিক্ষা নীতি ইস্তক যে উচ্চশিক্ষার প্রবেশাধিকার বা অ্যাকসেসের সমতার কথা বলা হচ্ছে ঢাকঢোল পিটিয়ে, তা যে শুধুই বায়বীয় কিছু শব্দবন্ধ তা বুঝতে এই শহরেরই দু-একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার খরচে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। বি এ (অনার্স) বা বি কম (অনার্স) পড়ার খরচ বছরে হাজার পঁচাশি থেকে সোয়া এক লাখ। বি এস সি (অনার্স) পড়তে বছরে এক লাখ থেকে দেড় লাখ। এম এ পড়তে দেড় লাখ। পারবে গরিব ঘরের ছেলেমেয়েরা? কজন বাবা-মা পারবেন এই খরচ যোগাতে? সমাজের পিছিয়ে থাকা অংশের কজন পড়ুয়ার ঠাই মিলবে এই সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে? অসাম্যের, সামাজিক অ-ন্যায়ের তীব্রতার মাত্রা সরকারি হিসেবেই নগ্ন। ২০১৯-২০ সালে প্রকাশিত অল ইন্ডিয়া সার্ভে অফ হায়ার এডুকেশনের তথ্য ঘাঁটলে বোঝা যাবে যে, বেসরকারি এবং ডিমড বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট পড়ুয়ার মাত্র ০.০৭ % তফশিলি বর্গের, ০.০৪% উপজাতি এবং ০.২১% অন্যান্য সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা বর্গের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বজনীন শাশ্বত যে ধারণা তা হল, তার আঙ্গিনা হবে হাজার মত, হাজার বিশ্লেষণ-অনুসন্ধানের ক্রিটিক্যাল ভাবনার ধারক বা আঁতুড় ঘর। সেখানে হবে জ্ঞানের নির্মাণ। সে আলোর বিচ্ছুরণে অজ্ঞানের আঁধার ঠেলে বিকাশের পথে এগোবে সমাজ ও সভ্যতা। মুক্ত চিন্তার সারস্বত স্বাধীনতা তার পূর্বশর্ত। গণতান্ত্রিক আবহ তার পূর্বশর্ত। শিক্ষকের, ছাত্রের গণতান্ত্রিক অধিকার নড়বড়ে হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাশ্বত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত পথে যায়। শিক্ষকের মাথায় যদি সদাই ঝোলে চাকরির অনিরাপত্তা, তবে কোথায় ভরসা পাবে সে ক্রিটিকাল চিন্তার তথা মুক্ত চিন্তার? বেসরকারি বাণিজ্যিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সচ্ছল পড়ুয়া টানার বেসাতি করার জন্যেই না তৈরি হয়েছে চকমকে, বিদেশ বিদেশ দেখতে ক্যাম্পাস। আর শিক্ষকদের কি হাল সেখানে? সম্প্রতি রাজস্থানে করা এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে সাঙ্ঘাতিক তথ্য। ৯৭% শতাংশ সহকারী অধ্যাপক জানিয়েছেন যে, তঁারা ইউ জি সি’র বেতনক্রম অনুযায়ী মাইনে তো পানই না, বরং অধিকাংশই (৫৮%) জানিয়েছেন তাদের বার্ষিক মোট মাইনে কুল্লে দেড় লক্ষ টাকার কাছাকাছি। অধিকাংশ অধ্যাপকই জানিয়েছেন চাকরি নিয়ে তাদের ভয়ঙ্কর নিরাপত্তাহীনতার কথা। এ কোনও বিচ্ছিন্ন চিত্র অবশ্যই নয়। বহু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে পড়ুয়ারা পড়ার খরচ টানতে না পেরে ছেড়ে দিচ্ছে পড়াশোনা। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কোর্স। শিক্ষকদের বলা হচ্ছে সব কাজ ছেড়ে পড়ুয়া খুঁজে আনতে।
এই পরিবেশে সারস্বত চিন্তা! মুক্ত চিন্তা! গণতান্ত্রিক পরিবেশ! সোনার পাথর বাটি’র মতোই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে ক্রিটিকাল চিন্তার কী দশা হয় সাম্প্রতিক একটি ঘটনা তার জাজ্বল্যমান উদাহরণ। পাঠক্রম বিন্যাস থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের উজ্বল শিক্ষাবিদদের সসম্মানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের বিচারে আর পাঁচটা বাজারি বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে থাকা অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, খ্যাতনামা চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক প্রতাপভানু মেহতা, যিনি সেখানকার উপাচার্য হিসেবেও কাজ করেছেন, তাঁকেও সরে যেতে হয়েছে মাত্র গত বছর। অপরাধ? উত্তরটা অশোকা বিশ্ববিদ্যালয় স্পষ্ট করে না দিলেও নির্দ্বিধায় বলা যায় যে– তাঁকে সরে যেতে হয়েছে কারণ তিনি মোদি সরকারের নানান নীতি ও কাজকর্মের বিরোধিতায় সরব হচ্ছিলেন বলেই। এই অশোকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে অর্থনীতির অধ্যাপক সব্যসাচী দাসকে। তাঁর অপরাধ, তিনি একটি গবেষণাপত্রে দেখিয়েছিলেন যে ২০১৯ এর সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি একটা বড় অংশের আসন জিতেছিল খুব কম ব্যবধানে যা নানা সন্দেহের দরজা খুলে দেয় এবং যা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে অশুভ। তাঁর সঙ্গে থাকার সংহতি দেখিয়ে পদত্যাগ করেন প্রখ্যাত অধ্যাপক পুল্পেরে বালাকৃষ্ণণও। এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত জ্ঞানচর্চার কী দশা হতে পারে।
উচ্চশিক্ষায় নয়া উদার অর্থনীতির বেপরোয়া যাত্রায় সাম্প্রতিকতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মোদি সরকারের নয়া শিক্ষা নীতি। উচ্চশিক্ষাকে বাজারি ব্যক্তি পণ্যে পরিণত করার যে যজ্ঞ শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের গোড়ায়, সে কাজের বাকিটুকু শেষ করার লক্ষ্যে নয়া শিক্ষা নীতি এই সরকারের আর এক সার্জিকাল স্ট্রাইক। গোদের ওপর বিষফোঁড়া এই সরকারের সর্বক্ষেত্রে গৈরিকীকরণের কেন্দ্রীয় অ্যাজেন্ডা। নয়া শিক্ষানীতিও তার বাইরে নয়। এই মূহুর্তে এক বড় ভূমিকা রয়েছে দেশের বিদ্বোৎসাহী সমাজের, জ্ঞানের চর্চার সঙ্গে যুক্ত মানুষজনদের। নয়া উদারবাদী অর্থনীতি বৌদ্ধিক চর্চার জগতের মানুষদেরই কাজে লাগায় বাজারের সর্বগ্রাসী মুখ্যতার সপক্ষে মত গড়ে তোলার জন্যে। উচ্চশিক্ষার অঙ্গনের মুক্ত, ক্রিটিক্যাল চিন্তার চরিত্র এবং গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে তারা কাজে লাগায় সারস্বত সমাজেরই একটি অংশকে। এঁদেরই বারবার কাজে লাগানো হয় উচ্চশিক্ষার অঙ্গনের শাশ্বত চরিত্রের মৃত্যুঘন্টা বাজাতে। দেশের বিদ্বৎ সমাজের তাই দায় সদা সতর্ক থাকার। দায় এই বিপন্ন সময়ে একসুরে উচ্চশিক্ষার মূল চরিত্রকে ধরে রাখতে দ্বিধাহীন আওয়াজ তোলার।
তথ্যসূত্রঃ
১। Higher Education in a Globalized Society, UNESCO (2003)
২। All India Survey of Higher Education (2022-23), Govt. of India.
প্রকাশের তারিখ: ১৬-ফেব্রুয়ারি-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
