Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মার্কসবাদ ও পরিবেশ (১)

অরুণাভ মিশ্র
ক্যাপিটাল-এর পাতায় মার্কস পণ্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আগেই লিখেছিলেন, ..‘পণ্যের অবয়ব গঠিত হয়েছে দুরকম পদার্থের সমন্বয়ে—  প্রাকৃতিক বস্তুর এবং শ্রমের। এদের উপরে যে উপযোগী শ্রম ব্যয়িত হয়েছে তা যদি সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে সর্বদাই অবশিষ্ট থাকে একটি বাস্তব আধার, প্রকৃতি যা মানুষের সাহায্য ব্যতীতই সরবরাহ করেছে। মানুষ কাজ করতে পারে কেবল প্রকৃতির মতোই, অর্থাৎ বস্তুর রূপান্তর সাধন করে। শুধু এইটুকুই নয়, এই রূপান্তর সাধনের কাজে সে নিরন্তর প্রাকৃতিক শক্তির সাহায্য পাচ্ছে। কাজেই, আমরা দেখতে পাই যে, শ্রমই বাস্তব সম্পদের, তথা শ্রম দ্বারা উৎপন্ন ব্যবহার মূল্যের একমাত্র উৎস নয়। উইলিয়াম পেটি যেমন বলেছেন শ্রম তার জনক এবং ধরিত্রী তার জননী।’
marxbad o poribesh -1

বস্তু জগতের ঘটনাপ্রবাহের বিশ্লেষণে মার্কস ও তাঁর অনুগামীদের দৃষ্টিভঙ্গী হল মার্কসবাদ। এটি একটি ক্রমবিকশিত দর্শন। প্রকৃতিজগৎ, মানবসমাজ আর চেতনার ভেতরকার সম্পর্কই মার্কসবাদের অন্তর্বস্তু। অন্তহীন সংগ্রামই এই দর্শনের মুখ্য বার্তা। উৎপাদিকা শক্তি আর উৎপাদন সম্পর্কের অবিরল দ্বন্দ্ব এই দর্শনে শ্রেণিসংগ্রামের রূপ ধরে প্রকাশিত হয়। উৎপাদনের ক্রমবিকাশ আর যথাযথ বন্টনের বিষয়টি মার্কসীয় দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত উৎপাদিকা শক্তি আর উন্নত উৎপাদন সম্পর্ক নিয়ে মার্কসীয় ভাবনার সমাজতান্ত্রিক সমাজে মানুষ তার ক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষেবা ও সামগ্রী পাবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সে সমাজে আর ব্যক্তি-মুনাফার জন্য ব্যবহৃত হবে না। ফলে, কোনও সামগ্রীর জন্যই মানুষের আর অভাব থাকবে না। উৎপাদন হবে অঢেল, আর সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট।

মার্কসবাদে এমন প্রেক্ষণ থাকায় সমালোচকরা মার্কসের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃতির বুকে অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা দেখেন। বাস্তুশাস্ত্র ও পরিবেশবিজ্ঞানের দিক থেকে প্রকৃতিতে এমন অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপ যে পৃথিবীতে মানবসমাজের অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলতে পারে তা নিয়ে সতর্ক করেন। সকলের প্রয়োজন মেটানোর জন্য এই তুমুল উৎপাদনের আয়োজনে মার্কসকে ‘প্রমিথিউসবাদী’ বা ‘প্রমিথিউসপন্থী’ বলেও চিহ্নিত করে দেন এই সমালোচকরা। প্রমিথিউস ছিলেন একজন গ্রিক দেবতা, যিনি আগুন জ্বালানোর প্রযুক্তি জিউসের কাছ থেকে এনে মর্ত্যবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই আগুনকে ধরা হয় জ্ঞানের ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আলো। সেই বিদ্রোহী রূপ বদলে প্রমিথিউস এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রযুক্তির ব্যাপকতম প্রয়োগে লাগামহীন উন্নয়ন ও শিল্পায়নের প্রতীক। সেখানে প্রকৃতি প্রতিনিয়ত নির্মমভাবে বলি হয় মানুষের চাহিদার স্বার্থে। প্রকৃতির যথেচ্ছ শোষণের বিরুদ্ধে মার্কস তেমন সরব নয় বলে অভিযোগ ওঠে। উৎপাদনবিলাসী এই মার্কসীয় দর্শন ‘পরিবেশ বিরোধী’ এবং ‘একান্তই মানবকেন্দ্রিক’ বলেও ছাপ লাগানো হয়ে যায়!

সত্যিই কি মার্কস পরিবেশ আর বাস্তুবিদ্যা বিষয়ে একেবারে নীরব ছিলেন? পুঁজিবাদ ক্রমবিকশিত হতে গিয়ে যেভাবে আজ পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের গভীর সমস্যা ডেকে আনছে তাতে মার্কস ‘প্রমিথিউসপন্থী’ ছিলেন কিনা সে বিতর্ক আজ আর কেবল তাত্ত্বিক তর্কের আঙিনায় পড়ে নেই, হয়ে উঠেছে ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয়। বিগত ২০-২৫ বছরে বহু গবেষণা হয়েছে বিষয়টি নিয়ে। পল বারকেট, জন বেলামি ফস্টার, কোহেই সাইতো প্রভৃতিদের গবেষণা দেখিয়েছে, পরিণত মার্কস মোটেও তথাকথিত ‘প্রমিথিউসপন্থী’ ছিলেন না। তরুণ মার্কস থেকে পরিণত বয়সের মার্কস হওয়ার পথে প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করেছেন তিনি। নিজের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছেন পরিবেশবিজ্ঞান আর বাস্তুতন্ত্রসম্মত নিয়মকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে। মার্কসের নোটবইগুলোর ক্রমোদ্ধার, যা MEGA প্রকল্পের মাধ্যমে রূপায়িত হচ্ছে, তা মার্কসের পরিবেশচিন্তার অজানা অনেক অধ্যায় খুলে ধরছে। আর সেখানেই মুছে যাচ্ছে তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হওয়া সব সমালোচনা।

(২)

ক্যাপিটাল-এর পাতায় মার্কস পণ্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আগেই লিখেছিলেন, ..‘পণ্যের অবয়ব গঠিত হয়েছে দুরকম পদার্থের সমন্বয়ে—  প্রাকৃতিক বস্তুর এবং শ্রমের। এদের উপরে যে উপযোগী শ্রম ব্যয়িত হয়েছে তা যদি সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে সর্বদাই অবশিষ্ট থাকে একটি বাস্তব আধার, প্রকৃতি যা মানুষের সাহায্য ব্যতীতই সরবরাহ করেছে। মানুষ কাজ করতে পারে কেবল প্রকৃতির মতোই, অর্থাৎ বস্তুর রূপান্তর সাধন করে। শুধু এইটুকুই নয়, এই রূপান্তর সাধনের কাজে সে নিরন্তর প্রাকৃতিক শক্তির সাহায্য পাচ্ছে। কাজেই, আমরা দেখতে পাই যে, শ্রমই বাস্তব সম্পদের, তথা শ্রম দ্বারা উৎপন্ন ব্যবহার মূল্যের একমাত্র উৎস নয়। উইলিয়াম পেটি যেমন বলেছেন শ্রম তার জনক এবং ধরিত্রী তার জননী।’

শ্রম প্রয়োগে প্রাকৃতিক বস্তু কীভাবে কাঁচামাল হয়, আর কাঁচামাল কীভাবে শ্রমকে হাতিয়ার করে পণ্য হয়ে ওঠে তাও বুঝেছি আমরা ক্যাপিটাল থেকে। সেখানে মার্কস বলেন, ‘যে সব জিনিসকে শ্রম পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাত্র সেইগুলি প্রকৃতির স্বতঃস্ফূর্ত দান হিসেবে শ্রম প্রয়োগের বিষয়বস্তু। এই ধরনের জিনিস হচ্ছে মাছ যা আমরা স্বাভাবিক পরিবেশ অর্থাৎ জল থেকে ধরি, কাঠ পাই আদিম অরণ্যের গাছ কেটে, এবং আকরিক ধাতুগুলোকে আমরা নিষ্কাশন করি তাদের শিরা থেকে।’ আজকের দিনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে আমরা প্রকৃতির ‘স্বতঃস্ফূর্ত দান’ ধরে তাকে যথেচ্ছ পণ্যে পরিণত করতে পারি কিনা? তখনই মনে রাখার দরকার পড়ে, প্রকৃতিকে জননী বলে, প্রাকৃতিক সম্পদকে মূল ভিত্তি করে মানবসমাজের বিকাশের রূপটিকে চিনিয়ে, মার্কস প্রকৃতি আর মানবের নিবিড় সম্পর্কটাকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করেছেন। সেই প্রকৃতির ধারাবাহিক ক্ষয়ে যে মানবের লয় ঘনিয়ে আসবে তাতে আর বিস্ময় কী!

১৮৬৭ সালে ক্যাপিটালের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। তার ঠিক আগে থেকেই মার্কস জীববিজ্ঞান, ভূবিজ্ঞান, রসায়ন, ও খনিজবিদ্যার অবিষ্কারসমূহ নিয়ে বিস্তৃতভাবে গবেষণা করে চলেছিলেন। এই গবেষণার বেশিরভাগটাই তিনি ক্যাপিটালে যুক্ত করেননি। জীবনের শেষ ১৫ বছরেও তাঁর ক্যাপিটালের কাজ অসমাপ্ত থাকে। কিন্তু সেই সময়েই তিনি তাঁর নোটবইগুলোতে নানা বিষয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য লিখেছেন। লিখেছেন বিভিন্ন বই ও নিবন্ধের সারাংশ এবং সে বিষয়ে তাঁর অনুভব। তাই ক্যাপিটালে তাঁর পরিবেশ ও বাস্তুবিদ্যা বিষয়ের আলোচনাকে প্রক্ষিপ্ত এবং অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রকৃতিবিজ্ঞানগত গবেষণার নোটবইতে ধরা পড়ে বিষয়টি সম্পর্কে মার্কসীয় ভাবনার পূর্ণ স্বরূপ। বস্তুত, মার্কস তাঁর নোটবইগুলোর তিন ভাগের এক ভাগই এই সময়ে লিখেছিলেন, আর সেগুলোর অর্ধেকটাই প্রকৃতি বিজ্ঞান নিয়ে। জন বেলামি ফস্টারের ‘মার্কস’স ইকোলজি’ (২০০০), এবং পল বারকেটের ‘মার্কস অ্যান্ড নেচার’ (১৯৯৯)-এর আলোচনার বাইরে কোহেই সাইতোর সাম্প্রতিক কাজগুলো এব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এনেছে। সাইতোর মতে, মার্কস যদি তাঁর রাজনৈতিক অর্থনীতিগত আলোচনা সম্পূর্ণ করতেন, তবে তিনি মানব ও প্রকৃতির মধ্যেকার এই বিপাকীয় আদান প্রদানের সম্পর্ককে (Stoffwechsel) অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং একে পুঁজিবাদের মধ্যেকার এক অন্যতম মৌলিক দ্বন্দ্ব বলে চিহ্নিত করতেন। প্রকৃতি আর মানবের পারস্পরিক দেওয়া নেওয়ার মধ্যে যে জীবনের বহমান চক্র তাকেই ‘বিপাকীয় আদান প্রদান’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

(৩)

১৮৩০-১৮৭০ পর্যন্ত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার পুঁজিবাদী সমাজের কাছে মাটির প্রাকৃতিক উর্বরতা ক্ষয়ের বিষয়টি ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবেশগত সমস্যা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পাখির বিষ্ঠার মতো জৈব সার (গুয়ানো) সংগ্রহে দেশগুলোর উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপও ছিল দ্রুত এবং বেশি পরিমাণে সেই সার সংগ্রহের লক্ষ্যে।  প্রয়োজনের তাগিদেই কৃত্রিম সারের প্রচলন ও ব্যবহারের সূচনা হলো। পণ্য হিসেবে কৃত্রিম সারের ব্যবহার কৃষির খরচ যেমন বাড়ালো, তেমনি মাটির চরিত্রগত বদলও হলো কিছুটা। ভারসাম্যমূলক কৃষির দাবিও এল। গ্রাম-শহরে কৃষি ও কৃষি-উৎপাদন ব্যবহার ঘিরে বিরোধ কমল এসবের ফলে।

জমির উর্বরতা ক্ষয়ের বিষয়টি প্রথম তুলেছিলেন জার্মান রসায়নবিদ ইউসটুস ফন লিবিগ। কিন্তু এর বৃহত্তর সামাজিক গুরুত্বের কথা ধরা পড়লো মার্কসের আলোচনায়। পরে কাউটস্কি এবং লেনিনও এবিষয়ে মাথা ঘামিয়েছেন। লিবিগের বইটি প্রকাশিত হয় ১৮৪০ সালে। বইটির নাম ছিল ‘অর্গানিক কেমিস্ট্রি ইন ইটস অ্যাপ্লিকেশন টু এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফিজিওলজি’ বা সংক্ষেপে ‘এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি’। বইতে লিবিগ বলেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং পটাশিয়াম উদ্ভিদের পুষ্টি ও বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক। প্রতিটি উৎপাদনের পর্বে জমির উর্বরতা শোষিত হয়, বিনিময়ে মেলে শস্য। খাবার আর বস্ত্রের উপাদান হিসেবে যা সংগ্রহ করতে গিয়ে মাটি থেকে পুষ্টিগুণ তুলে নেওয়া হলো, তা আর মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় থাকে না। শস্য এমনকি খড়ও বিক্রি হয়ে যায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়। জমি থেকে দূরে, এমনকি শহরে চালান হয়ে যায় সে উৎপাদন। ফলে ফসলের জৈব উপাদান এবং ধাতব আয়নগুলোর আর মাটিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে না। বরং তার বিপাকীয় অবশেষ ড্রেনবাহিত হয়ে চলে যায় নদীতে। অথচ, সুস্থিত ও টেকসই কৃষির জন্য তা জমিতে ফিরে আসা দরকার ছিল। তাই জমির উর্বরতা রক্ষায় লিবিগ সমস্ত প্রয়োজনীয় পুষ্টিকারকের একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিলেন। একেই বলে লিবিগের সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব বা ‘লিবিগস ল অফ মিনিমাম’। প্রচলিত ‘হিউমাস তত্ত্বের’ বিরোধে গিয়ে শুধু নাইট্রোজেনের বদলে লিবিগ সমস্ত পুষ্টিকারকেরই প্রয়োজনীয়তার কথা শোনালেন। আর তাই, পুষ্টিজনিত ক্ষয় পূরণের জন্য রাসায়নিক সার প্রয়োগের ধারণা এল, যার ফলে মাটি তার হারানো বিত্ত আবার ফিরে পাবে। শস্য উৎপাদনও ব্যাহত হবে না।

লিবিগের ভাবনারই বিশ্লেষণী প্রয়োগ দেখা গেল মার্কসের ক্যাপিটালের পাতায়। আধুনিক কৃষির সমস্যা প্রসঙ্গে সেখানে মার্কস লিখলেন, ‘কৃষির ক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রশিল্পের ফলাফল অধিকতর বৈপ্লবিক, এই কারণে যে, প্রাচীন সমাজের শেষ স্তম্ভ ‘কৃষককে’ সে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, এবং তার স্থানে মজুরি-শ্রমিককে স্থাপন করে। ...অযৌক্তিক সেকেলে কৃষি পদ্ধতির স্থান নেয় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। ...পুঁজিবাদী উৎপাদন জনসংখ্যাকে কতকগুলি বৃহৎ কেন্দ্রে একত্র করে, এবং শহরবাসী জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য সংঘটিত করে, একদিকে সমাজের ঐতিহাসিক চালিকাশক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে, অপরদিকে মানুষ ও মাটির মধ্যে বস্তুর সঞ্চালনকে সে ব্যাহত করে, অর্থাৎ মানুষ মাটির যেসব উপাদান খাদ্য ও পরিধেয় রূপে গ্রাস করে সেগুলি আবার মাটিতে ফিরিয়ে দেওয়ার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে; সুতরাং জমির স্থায়ী উর্বরতার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলী লংঘন করে। ...শহরের যন্ত্রশিল্পের মতোই আধুনিক কৃষিতেও গতিপ্রাপ্ত শ্রমের বর্ধিত উৎপাদনশীলতা ও পরিমাণ কেনা হয় শ্রম ক্ষমতাকেই অপচয়ে বিনষ্ট এবং রোগে ক্ষয় প্রাপ্ত করার মূল্যে। শুধু তাই নয়। পুঁজিবাদী কৃষিতে সমস্ত প্রগতিই হচ্ছে কেবল শ্রমিককে লুট করাই নয়, জমিকেও লুঠ করার কৌশলের অগ্রগতি। ...সুতরাং পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রযুক্তি বিজ্ঞানের এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে এক সামাজিক সমগ্রতায় একত্র করার দিকে বিকাশ ঘটায় কেবলমাত্র সকল সম্পদের মূল উৎস—  জমি ও শ্রমিককে হীনবল করে।’  ফুটনোটে মার্কস স্পষ্ট জানান লিবিগের বইটির ১৮৬২’র সপ্তম সংস্করণের কথা, যা আধুনিক কৃষির এই ‘জমির বিত্ত-ডাকাতি’ আর ধ্বংসাত্মক রূপকে উন্মোচিত করেছে।

মার্কস দুবার লিবিগের এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রি পড়েছিলেন। প্রথমবার ১৮৫০ এর কাছাকাছি। সেসময় লিবিগকে তাঁর আশাবাদী মনে হয়েছিল। শস্যের মধ্য দিয়ে জমির অপহৃত বিত্তকে সার প্রয়োগ আবার পুষ্ট করে উৎপাদন সচল রাখার ভাবনা ছিল সেখানে। সেই মার্কসকে অনেকটা ‘প্রমিথিউসপন্থী’ মনে হতে পারে। ১৮৪৯-১৮৫৩ পর্বের নোটবই গুলোতে, যা মুখ্যত ‘লন্ডন নোটবুকস’ নামে পরিচিত, সেরকম ভাবনার প্রতিফলনও দেখা যায়। তাছাড়া ক্যাপিটালের প্রথম সংস্করণে (যা ইংরেজিতে পাওয়া যায় না) মার্কস লিখেছিলেন, ‘সার্বিক ত্রুটিমুক্ত না হলেও লিবিগের কৃষির ইতিহাসের ওপর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য এ বিষয়ে সমস্ত রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদদের কাজের তুলনায় অনেক বেশি অন্তর্দৃষ্টির ঝলকময়।’ কিন্তু সেই মার্কস ১৮৭২-৭৩ এ ক্যাপিটালের দ্বিতীয় সংস্করণে সচেতনভাবে তা সংশোধন করে লিখলেন, ‘সার্বিক ত্রুটিমুক্ত না হলেও অন্তর্দৃষ্টির ঝলকময়।’ এবিষয়ে অন্য অর্থনীতিবিদদের কাজের সঙ্গে তুলনায় গেলেন না। কারণ ততদিনে নিজের ভাবনার সমর্থনে যুক্তি খুঁজতে গিয়ে ১৮৬৫-৬৬ নাগাদ লিবিগের বই দ্বিতীয়বার পড়া হয়েছে মার্কসের। 

১৮৬২ র সংস্করণটির ভূমিকায় লিবিগ আধুনিক কৃষির মাটি থেকে খনিজ তুলে তাকে ক্রমাগত রিক্ত করে তোলার ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সপ্রাণ আর অপ্রাণ জগতের মধ্যে অবিরাম ক্রিয়াশীল আদান প্রদানের বিপাকীয় চক্র যে ব্যাহত হচ্ছে তা নিয়ে কথা বলেছেন। বলেছেন, শস্য রপ্তানির ফলে তা দূরে শহরে চলে যাচ্ছে আর সেখানে বিপাকীয় অবশেষ  অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে, জমিতে ফিরছে না। সেইসঙ্গে কৃষিজ উৎপাদন ও সারের পণ্যে রূপান্তর, কৃষিকে ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখার জায়গা থেকে সরিয়ে কত কম সময়ে কত বেশি উৎপাদন করা যেতে পারে, কত বেশি মুনাফা হতে পারে, তাকেই লক্ষ্য করেছে । এ কাজ সম্ভব হবে আরও বেশি মাটির পুষ্টিগুণকে শস্যে শুষে নেওয়ার ফলে। তাই লিবিগ একে বলেছেন ‘ডাকাতি ব্যবস্থা’। সতর্ক করেছেন জমি ও মানুষের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়ায় এই চ্যুতি সভ্যতার ক্ষয় ডেকে আনবে। ১৮৫০ এর গোড়া থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত যে লিবিগ মনে করেছেন সমস্ত সমস্যার সুরাহা রয়েছে রাসায়নিক সারে, তিনি ১৮৬২’র এগ্রিকালচারাল কেমিস্ট্রির ভূমিকায় অনেক স্পষ্ট করে লিখলেন আধুনিক কৃষির ধ্বংসাত্মক ভূমিকার কথা। কারণ দামি রাসায়নিক সার সমস্যা মেটাতে পারবে না। যেহেতু লিবিগ উর্বরতার এই ডাকাতির কথা দৃঢ়ভাবে বললেন পুরনো আশাবাদ সংশোধন করে, তাই মার্কসও মাটির উর্বরতার বিষয়টিকে নতুন আঙ্গিকে দেখতে শুরু করলেন। সঙ্গে খতিয়ে দেখতে শুরু করলেন লিবিগের তত্ত্বের বৈধতা। হেনরি চার্লস ক্যারে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে মাটির সম্পদ হরণকে আগামী প্রজন্মের প্রতি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করলেন। ক্যারের সঙ্গে পত্র বিনিময় হল মার্কসের।


তথ্যসূত্র
১) Marx-Engels- Gesamtausgabe (MEGA), Barlin,Dietz Verlag, Akademia Verlag,1975. A part of late Marx's excerpts on natural sciences.
২) কার্ল মার্কস, ক্যাপিটাল, প্রথম খণ্ড, অনুবাদ প্রফুল্ল রায়, প্রগতি প্রকাশন, পৃ- ৬৬-৬৭
৩) ঐ, পৃ- ২২৭-২২৮
৪) কোহেই সাইতোর দুটো কাজের কথা বিশেষ করে বলবো:
ক) Kohei Saito, The Emergence of Marx's Critique of Modern Agriculture, Ecological Insights from his excerpt notebooks, Monthly Review, 2014, pp 25 - 46
খ) Kohei Saito, Marx's Ecological Notebooks, Monthly Review, 2016, pp 25 - 42
সাইতো হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ডক্টরেট, পরে বার্লিন- ব্রান্ডেনবুর্গ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সে মার্কসের নোটবুকের প্রকৃতি বিজ্ঞানগত অংশের সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
৫) কার্ল মার্কস,ক্যাপিটাল, প্রথম খণ্ড, অনুবাদ প্রফুল্ল রায়, প্রগতি প্রকাশন, পৃ- ৬১২-৬১৪


প্রকাশের তারিখ: ০৫-জুন-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুব ভালো ও সময়োপযোগী লেখা। জন বিজ্ঞান আন্দোলনের কর্মীদের খুব কাজে লাগবে।
- Puspak pal, ০৫-জুন-২০২৩


Very good thought provoking analyzing article. Step by step analysis of the topic. Thanks to you for the good subjective article on the World Environment Day.o
- Amar Kumar Ganguly , ০৫-জুন-২০২৩


খুব গুছিয়ে লেখা। কৃত্রিম সার মাটির উর্বরতাকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।এর একটা কারণ শিল্পোন্নত দেশগুলিতে কৃষিজ পণ্য রপ্তানিতে অবশেষ আরতো ফিরে আসে না বরং অপচয় হয়।..
- Tarun Datta, ১২-জুন-২০২৩


লেখাটি পড়ে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলাম। কার্ল মার্ক্স ও পরিবেশ বিষয়ে এই ধরনের লেখা এই সময়ে আরো হলে ভাল হয়। - (সম্পাদিত)
- Kaushik Sengupta, ১৫-জুন-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
পরিবেশ বিভাগে প্রকাশিত ১৪ টি নিবন্ধ
০৫-জুন-২০২৬

০৫-জুন-২০২৬

২২-মে-২০২৫

০৬-আগস্ট-২০২৪

০৪-অক্টোবর-২০২৩

০৬-জুন-২০২৩

০৫-জুন-২০২৩

০৪-জুন-২০২৩

২৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

০৯-জানুয়ারি-২০২৩