Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মার্কসবাদ ও পরিবেশ (২)

অরুণাভ মিশ্র
মার্কস বুঝলেন, নিয়ন্ত্রণহীন কৃষি নিয়ে যায় অসচেতন সমাজতন্ত্রের দিকে। নিয়ে যায় অরণ্যবিনাশের দিকে। আর যদি নিয়ন্ত্রিত হতে পারতো, তবে তা সচেতনভাবেই সমাজতন্ত্রের অভিমুখী হতে পারতো। তাই নিয়ন্ত্রিত কৃষি পরিবেশ ও বাস্তুবান্ধব। ভারসাম্যমূলক কৃষি জলবায়ুকে যেমন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে তেমনি রুখে দেবে অরণ্য বিনাশ। সমাজতন্ত্র এখানে এসে পরিবেশবিজ্ঞানকে আশ্রয় করে চলতে চায়। মার্কসবাদ আর ইকোলজি  উভয়েই তখন একমুখী, আর সে মুখ সমাজতন্ত্রের দিকে। প্রকৃতি আর পরিবেশ হয়ে দাঁড়ায় সেই সমাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ভিত!
marxbad o poribesh -2

(৪)

এই সময়ে আমরা মার্কসকে মৃত্তিকা বিজ্ঞান নিয়ে আরো গভীরভাবে চর্চা করতে দেখছি। এঙ্গেলসকে লিখছেন,

‘আমি শোরলেমার কাছে জানতে চাই জার্মান ভাষায় কৃষি রসায়নের সর্বাধুনিক ও সর্বোত্তম বইটি কী, সেই সঙ্গে খনিজ সার আর নাইট্রোজেন সার বিষয়ে এখনকার দুই বিবাদী পক্ষের পারস্পরিক যুক্তিগুলি কী কী? সবশেষে যখন আমি এই বিষয়ে চর্চা করেছিলাম তখন দেখেছি জার্মানিতে এক্ষেত্রে অনেক নতুন ভাবনা এসেছে। তিনি কি লিবিগের ‘সয়েল এগজশন থিওরি’র বিরুদ্ধ ভাষ্য দেওয়া কোনও জার্মান বিজ্ঞানীর কথা জানেন? মিউনিখের কৃষি বিজ্ঞানী ফ্রাস-এর অ্যালুভিয়ান থিওরি সম্পর্কে কিছু কি তার জানা আছে? ‘গ্রাউন্ড রেন্ট’ বিষয়ক অধ্যায়ের জন্য এ বিষয়ের সর্বশেষ অবস্থা এবং জিজ্ঞাসাগুলো আমার জানা দরকার। শোরলেমা যেহেতু এ বিষয়ের একজন দক্ষ মানুষ তাই তাঁর পক্ষেই তথ্যগুলো জানানো সম্ভব।’

প্রায় সমসময়ে মার্কস তার ক্যাপিটালের তৃতীয় খণ্ডে এমন এক ভবিষ্যৎ সমাজের ছবি আঁকলেন যেখানে গ্রাম ও শহরের বৈরিতা থাকবে না, ফলে উৎপাদকেরা যথাযথ ভাবে মানব ও প্রকৃতিতে বিপাকীয় আদান প্রদান ঘটাতে পারবেন। পরে তিনি জানলেন, ড্যুরিংও একই রকম একটা তত্ত্ব দিয়েছেন। ড্যুরিং তাঁর তত্ত্বকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির একমাত্র ভিত্তি বলে দাবি করার পর, জমির বিত্ত ক্ষয়ের তত্ত্বের সমর্থকদের মার্কস যাচাইয়ের চোখে দেখতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে লিবিগ তাঁর সমালোচকদের সামলাতে গিয়ে ধীরে ধীরে ম্যালথাসের তত্ত্বের দিকে অনেকটাই ঝুঁকে পড়লেন। ভয় দেখালেন, কয়েক বছরেই গুয়ানো বা পাখির বিষ্ঠার মতো প্রাকৃতিক সার ফুরিয়ে যাবে। তখন আর মাটিকে দেওয়ার কিছু থাকবে না। এও বললেন, ‘ঈশ্বর না করুন, যদি এখন ১৮১৬ ও ১৮১৭’র মতো পর পর দুবছর আবার দুর্ভিক্ষ এসে হাজির হয়, তবে তখন যারা বেঁচে থাকবে তারা শত সহস্র মানুষকে রাস্তায় মরে থাকতে দেখবে।’ খাদ্যের অভাবে এভাবে জনসংখ্যার তুমুল ক্ষয়ের কথা ম্যালথাসের তত্ত্বেই রয়েছে। লিবিগের ভাবনায় ম্যালথাসের এমন প্রকট প্রভাব দেখে মার্কস সোচ্চারে লিবিগকে সমর্থনের জায়গা থেকে সরে এলেন।

এই সময় এথেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যার প্রফেসর এবং রাজ উদ্যানের পরিদর্শক ফ্রাস এর অ্যালুভিয়ন থিওরির কথা জানতে পারেন মার্কস। মার্কসের নোটবুকে প্রথম ফ্রাসের কথা দেখা যায় ১৮৬৭ সালে। ১৮৬৮তে তাঁর নোটবুক লেখে ফ্রাসের ‘অ্যাগ্রেরিয়ান ক্রাইসিস অ্যান্ড দেয়ার  সলুশনস’ নামে ১৮৬৬ সালে ছাপা বইটির কথা। ফ্রাসের বইতে লিবিগের তত্ত্বের সমালোচনায় বহু ঐতিহাসিক কৃষি পদ্ধতির কথা আলোচিত হলো যা প্রাকৃতিকভাবে মাটিকে বহুদিন পুষ্ট করে গেছে। তার একটি হল পলি পড়ার তত্ত্ব বা ‘অ্যালুভিয়ন থিওরি’। এই পলিতে, ভূতত্ত্ববিদ লায়েল জানিয়েছেন, প্রভূত খনিজ সম্পদ থাকে। এইসব খনিজ আবার উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য বেশ সহায়ক। তাই নদী সংলগ্ন উপত্যকা ও অববাহিকা অঞ্চলে কোনও সার ছাড়াই প্রতি বছর ভালো শস্য হয়। দানিউব, নীল, পো বা মিসিসিপির অববাহিকায় এটা দেখা যায়। ফলে, অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করে নদীর জলকে যদি চাষের মাঠে পাঠানো যায় তবে মাঠ সেইসব পলি পেয়ে যাবে। তাই তাদের উর্বরতার সমস্যা আর থাকবে না। 

মার্কস এসব পড়লেন। নোটবুকে টুকলেন। কিন্তু এই অ্যালুভিয়ন তত্ত্বের থেকে তাঁকে আকর্ষণ করলো ফ্রাসের ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড দ্য প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ড ওভার টাইম’ বইটির বক্তব্য। ১৮৬৮’র ২৫শে মার্চ এঙ্গেলসকে চিঠিতে লিখলেন, বইটাতে জলবায়ু আর উদ্ভিদ জগত সময়ের সঙ্গে বা ইতিহাসের পর্বে পর্বে কীভাবে বদলায় তার প্রমাণ রয়েছে।… তাঁর দাবি, চাষের ফলে কৃষির মাত্রা অনুযায়ী জমি থেকে আর্দ্রতা হারিয়ে যায়। সে কারণেই উদ্ভিদেরা দক্ষিণ থেকে সরে সরে ক্রমে উত্তরে যায়, অর্থাৎ সমতল থেকে পাহাড়ে। ফলে ঊষর প্রান্তর তৈরি হয়। কৃষির প্রাথমিক ফল প্রয়োজনীয়, কিন্তু শেষমেশ তা বৃক্ষনাশী হয়ে দাঁড়ায়। তাই কৃষি যখন সচেতন ভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলে (বুর্জোয়া হিসেবে তার তা করার কথাও নয়) তখন সে পেছনে ফেলে যায় মরু অঞ্চল। পারস্য, মেসোপটেমিয়া, গ্রিস সর্বত্র এটা দেখা গেছে। এটা একটা অসচেতন সমাজতান্ত্রিক প্রবণতা।

মার্কস বুঝলেন, নিয়ন্ত্রণহীন কৃষি নিয়ে যায় অসচেতন সমাজতন্ত্রের দিকে। নিয়ে যায় অরণ্যবিনাশের দিকে। আর যদি নিয়ন্ত্রিত হতে পারতো, তবে তা সচেতনভাবেই সমাজতন্ত্রের অভিমুখী হতে পারতো। তাই নিয়ন্ত্রিত কৃষি পরিবেশ ও বাস্তুবান্ধব। ভারসাম্যমূলক কৃষি জলবায়ুকে যেমন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে তেমনি রুখে দেবে অরণ্য বিনাশ। সমাজতন্ত্র এখানে এসে পরিবেশবিজ্ঞানকে আশ্রয় করে চলতে চায়। মার্কসবাদ আর ইকোলজি  উভয়েই তখন একমুখী, আর সে মুখ সমাজতন্ত্রের দিকে। প্রকৃতি আর পরিবেশ হয়ে দাঁড়ায় সেই সমাজতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ভিত!

ফ্রাস ব্যাপক কাঠ ব্যবহারের বিরুদ্ধে ওই সময়ে দাঁড়িয়ে সচেতন করেছেন। মার্কস ফ্রাস পড়তে পড়তে বুঝেছেন ইউরোপে অরণ্য ধ্বংসের সমস্যার প্রকৃতি আর নোট বইতে মন্তব্য হিসেবে লিখেছেন,

‘ফ্রান্সে এখন তার আগের বন সম্পদের একের বারো অংশের বেশি অবশিষ্ট নেই। ইংল্যান্ডের ৬৯টা বড় বনের আছে মাত্র চারটে। ইতালি আর দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপীয় উপদ্বীপ অংশে যে সমস্ত গাছ আগে সমতলে দেখা যেত আজ তাদের পাহাড়ি অঞ্চলেও দেখা যায় না।’

ফ্রাসের বই পড়ে মার্কসের উপলব্ধি পরিবেশগত ভারসাম্য ও পুঁজিবাদী উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে কাঠের ব্যাপক ব্যবহারজনিত সমস্যাটিকে কেবল ভূবৃত্ত হরণেই সীমাবদ্ধ রাখলো না, অরণ্য ধ্বংসের গভীরতায় নিয়ে এলো। ক্যাপিটালের দ্বিতীয় খণ্ড লেখার সময় মার্কস লিবিগের তত্ত্বকে নস্যাৎ করেননি। কিন্তু ফ্রাসের কাজকে তিনি দেখলেন এক অসচেতন সমাজবাদী প্রয়াস হিসেবে। এ থেকে পরিষ্কার, মার্কস এখন মানুষ এবং প্রকৃতির বিপাকীয় আদান-প্রদান মূলক মিথস্ক্রিয়াকে সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন।

 (৫)

ফ্রাস পড়ার মধ্য দিয়েই অরণ্য বিনাশের ফলাফল বিষয়ে মার্কসের আগ্রহের নিবৃত্তি হলো না। তিনি পড়লেন  জন ডি টুকেটের ‘হিস্ট্রি অফ দি পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট স্টেট অফ দ্য লেবারিং পপুলেশন’। শুধু পড়লেন না, গুরুত্বপূর্ণ পাতাগুলোর বক্তব্যের সারাংশ ও নিজস্ব মন্তব্য রাখলেন তাঁর নোটবইতে। তেমনি এক পাতায় তিনি টুকেটের যুক্তিকে আশ্রয় করে লিখলেন, 

আমাদের পূর্বপুরুষদের একটা ব্যাপারে অলসতা বড় দুঃখের, তা হল গাছকে যত্ন করে বড় করে তোলায় অবহেলা এবং  অনেকক্ষেত্রে যথেচ্ছ বন ধ্বংস করা, অথচ সেই জায়গায় নতুন তরুণ চারা গাছ না লাগানো। এই সাধারণ অপচয় বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল লোহা গলানোর কাজে সমুদ্র-কয়লার ব্যবহারের আগে। তখন লোহার প্রয়োজনে এত বেশী ব্যবহার হতো যে মনে হত এতেই বুঝি দেশের সব গাছ ও কাঠ শেষ হয়ে যাবে! …যাই হোক, এখন বৃক্ষরোপণ শুধু এর প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরে না, সেই সঙ্গে তা এলাকার অঙ্গসজ্জা বা অলংকার হয়ে দাঁড়ায়, এবং এর দেয়াল ঝোড়ো হাওয়া রুখে দেয়।… নেড়া ভূমিতে ব্যাপক বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব প্রথমেই বোঝা যায় না। ঠান্ডা বাতাস ঠেকাতে তখন কিছুই থাকে না, গৃহপালিত পশুগুলো খাবারের অভাবে বাড়তে পারে না, ফসলের মাঠ উত্তাপে ঝলসায়, যেন তারা লাঠির বাড়ির আঘাতে বিধ্বস্ত। উপরন্তু তা পশুদের উষ্ণতা আর আরাম যোগায়। দেয় অর্ধেক খাবার।’

সরাসরি না উল্লেখ করলেও ফ্রাস এবং টুকেটের কাজ দেখার অভিজ্ঞতা মার্কসের ক্যাপিটাল এর দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিকে সমৃদ্ধ করেছিল। ১৮৬৮- ১৮৭০ সালের মধ্যে লেখা হয়েছিল এটি। ইতিমধ্যেই ক্যাপিটালের তৃতীয় খণ্ডের পাণ্ডুলিপিতে মার্কস লিখে ফেলেছেন, ‘অরণ্য বিনাশ কখনোই ব্যক্তিগত সম্পদের সমাজে ভারসাম্যমূলক হবে না। এটা মোটামুটি ভারসাম্যমূলক হলেও হতে পারে রাষ্ট্রিক সম্পদ মালিকানার সমাজে।’

এবার মার্কস নজর দিলেন ‘আধুনিক ডাকাতির’ প্রশ্নটিতে যা আজ কেবল শস্য উৎপাদন নয়, অরণ্যবিনাশেও ব্যাপ্তি পেয়েছে। ফ্রেডরিক কির্চকের ‘ম্যানুয়াল অফ অ্যাগ্রিকালচার বিজনেস অপারেশন’ (১৮৫২) পড়লেন তিনি। ক্যাপিটালের দ্বিতীয় খণ্ডে তা থেকে উদ্ধৃত করে বললেন, ‘সংস্কৃতি এবং শিল্পের উন্নয়ন সাধারণভাবে দেখায়, যে প্রবল তেজে অরণ্যনিধন চলে তার উল্টো পিঠে সংরক্ষণ ও পুনসংস্থাপন উদ্যোগকে লাগে যৎকিঞ্চিৎ।’  মার্কস নিশ্চিত জানতেন, অরণ্যবিনাশের বিপদ শুধুমাত্র কাঠকে অপ্রতুল করে তুলবে তাই নয়, জলবায়ুকেও বদলে দেবে। আর তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে মানব সভ্যতার অস্তিত্বই সংকটময় হয়ে উঠবে।

কৃষি সমস্যা নিয়ে পরে কাউটস্কি এবং লেনিনও কাজ করেছেন। কাউটস্কি বললেন, সারের যোগান মাটির উর্বরতার হ্রাসকে রুখতে পারলেও, ক্রমান্বয়ে তার বেশি বেশি ব্যবহার কৃষির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। লেনিন ১৯০১ সালে কৃষি সমস্যায় তাঁর ‘ক্রিটিকস অফ মার্কস’ এ বললেন, ‘প্রাকৃতিক সারের জায়গায় কৃত্রিম সারের প্রতিস্থাপনা কিছু জায়গায় ইতিমধ্যেই (অংশত) হয়েছে, যদিও তা প্রাকৃতিক সার নষ্ট করা এবং সংলগ্ন নদী ও অঞ্চলের বাতাসকে অযৌক্তিকভাবে দূষিত করাকে বিন্দুমাত্র খণ্ডন করে না। এখন অবশ্য নর্দমার বর্জ্যকে কৃষিকাজে ব্যবহারের ফার্ম বড় বড় শহরের কাছে গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর সাহায্যে বর্জ্যের যৎসামান্য অংশকেই কেবল কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে।’ ১০

(৬)

শুধু তো কৃষি নয়, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় কেমন করে প্রতি মুহূর্তে ব্রিটেনের পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে তাও উঠে এলো মার্কসের কলমে। তাঁর ‘ইকনমিক অ্যান্ড ফিলজফিক্যাল ম্যানাসক্রিপ্ট অফ ১৮৪৪’এ তিনি লিখলেন, নিত্য নব চাহিদা আর তাকে পূরণ করার বিবিধ সব পথ সাজিয়ে দিচ্ছে পাশব অবক্ষয়। …এমনকি শ্রমিকদের নির্মল বাতাসের প্রয়োজনীয়তাটুকুও আজ সেখানে গৌণ। সভ্যতার মহামারীতুল্য, বিষাক্ত বাতাসে মোড়া, অতীতের গুহার মতো আলো- হাওয়া-পরিচ্ছন্নতাহীন খুপরি ঘরের আবার বাসিন্দা হয়েছে মানুষ। এই দূষণের আর পচে ওঠা মানবতার নোংরা, এই সভ্যতার কাদাজল, আজ তার জীবনের অঙ্গ। ধনবাদী উৎপাদনের সংস্কৃতি এটাই দেয়।

যুগপৎ মানুষ আর পৃথিবীকে শোষণের এই সংস্কৃতিই ধনবাদী সংস্কৃতি। তার স্বার্থ কেবল ও কেবলমাত্র মুনাফা। সেই মুনাফার সর্বগ্রাসী নেশায় সে মানবস্বার্থ তো বটেই এমনকি পৃথিবীর স্বার্থকেও ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়। প্রকৃতি থেকে উপাদান নিয়ে তা থেকে কাঁচামাল আর কাঁচামাল থেকে ক্রমাগত পণ্য বানিয়ে চলে। পণ্য তৈরির অনিবার্য উৎপাদ হিসেবে বেড়ে চলে বর্জ্য। তাই ধনবাদ উচ্ছেদ না হলে ব্যক্তিশোষণ যেমন বন্ধ হবে না, তেমনি ধরাকে ধারাবাহিক আর অনিয়ন্ত্রিত দোহন করার দুরভিসন্ধিও দূর করা যাবে না।

প্রকৃতি ও মানবের ক্রিয়াশীল দ্বন্দ্বের প্রকৃতিটা ঠিক কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে কলম ধরেছিলেন এঙ্গেলস। বলেছিলেন, আশু স্বার্থপুরণে আগ্রহী হয়ে চটজলদি কোনও পদক্ষেপ যদি প্রকৃতির ওপর নেওয়া হয় তবে প্রকৃতিতে তা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা ডেকে আনতে পারে। এঙ্গেলস লিখেছিলেন, 

‘আমরা মানুষেরা প্রকৃতির উপর যে বিজয় অর্জন করেছি তা নিয়ে নিজেদের বেশি পিঠ চাপড়ানি দেওয়ার দরকার নেই। প্রতিটি বিজয়ের জন্য প্রকৃতি আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়। এ কথা ঠিক যে, প্রতিটি বিজয় প্রথমত আমরা যে ফল চেয়েছিলাম, তা এনে দিয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয়ত এবং তৃতীয়ত, ভিন্ন অপ্রত্যাশিত ফল দেখা দিয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রথমটির নেতি ঘটিয়েছে। মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, এশিয়া মাইনর ও অন্যত্র যারা বনভূমি ধ্বংস করে কৃষিযোগ্য জমি সংগ্রহ করেছিল তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে বনের সঙ্গে জল সংগ্রহের কেন্দ্র বা আর্দ্রতার ভাণ্ডার সরিয়ে তারা ঐ দেশগুলির বর্তমান হতাশ পরিস্থিতির ভিত্তি স্থাপন করছে। …এইভাবে প্রতি পদক্ষেপে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে আমরা প্রকৃতির ওপর যেন সেই রকম শাসন না চালাই, যা কোন বিজয়ী বিদেশি জাতির ওপর চালানো হয়, যেন মনে না হয় যে আমরা প্রকৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে। বরং আমরা আমাদের রক্ত- মাংস ও মগজ-সহ প্রকৃতির অঙ্গ; আমরা তার মাঝেই বিদ্যমান, এবং আমরা তার উপর প্রভুত্ব করার যে কথা বলি তার বাস্তবতা এইটুকুই যে, অন্য সব প্রাণীর তুলনায় আমাদের সুবিধে আমরা তার নিয়মাবলী শিখতে ও সার্থক ভাবে  প্রকাশ করতে পারি।’ ১১

কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে যে মার্কস ও এঙ্গেলস একশো বছরের বুর্জোয়া শাসনকালে প্রাকৃতিক শক্তিকে বশ্যতা স্বীকার করিয়ে উৎপাদিকা শক্তির বিপুল বিকাশে চমৎকৃত, তাঁরা যেন আজ অনুপস্থিত। ক্রমবিকশিত হয়েছেন নিজেরা, বিকশিত করেছেন তাঁদের ভাবনা চিন্তা। বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে এভাবে নিজেদের সংশোধিত করে ক্রমশ যাঁরা এগিয়ে যেতে পারেন, তাঁরাই যথার্থ সৎ ও প্রগতিশীল ও বহমান। মার্কসবাদে পরিবেশ নিয়ে চিন্তাভাবনার এই সততা, প্রগতিমুখীনতা আর বহমানতা আছে। আগামীর সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে সে আজ পরিবেশ ও ইকোলজি রক্ষার সংগ্রামকে অন্যতম হাতিয়ার করে এগিয়ে যেতে চায়।

মার্কসের সমালোচকদের প্রসঙ্গে আসি একটু। তাদের সমালোচনার প্রত্যুত্তরে পল বারকেট একটা কথা বলেছিলেন, সেটা উল্লেখ করি। বারকেট বলেছিলেন, ‘যারা প্রকৃতিকে মূল্য না দেওয়ার জন্য মার্কসকে দোষারোপ করেন, তাদের উচিত নিজেদের সমালোচনাকে পুঁজিবাদের দিকে পরিচালিত করা।’ ১২ উত্তরটি যথাযথ। বাস্তবিকই পুঁজিবাদ প্রকৃতি ও পরিবেশের সর্বাত্মক ক্ষয় যেমন করছে তেমনি নিজেদের মধ্যে এক অমীমাংসেয় সমস্যাও জিইয়ে রাখছে। পুঁজিবাদের উচ্ছেদের মধ্য দিয়েই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাই পরিবেশ সমস্যার জন্য সমালোচনার কেন্দ্রকে যারা পুঁজিবাদ থেকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন তারা সমস্যা জিইয়ে রাখার দুরভিসন্ধিতেই তা করছেন।

জন বেলামি ফস্টারের উপলব্ধি, ধনতন্ত্রের মধ্যেই একটি বিচ্ছিন্নতার উপাদান আছে। এই ব্যবস্থায় উৎপাদন হলো প্রকৃতির সঙ্গে একটি বিপাকীয় আদান প্রদানের ঘটনা। এখানে যে উৎপাদন সম্পর্ক রয়েছে তা বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্পন্ন। ফলে প্রকৃতির সঙ্গে উৎপাদনজনিত আদান প্রদানে বিচ্ছিন্নতা স্বতঃসিদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। তাই যে সব শক্তি ধনতন্ত্রে অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে, তারাই তার পরিবেশ সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আর মার্কস? পরিবেশ নিয়ে তার ভাবনার কোথায় উত্তরণ হলো? ক্যাপিটালের তৃতীয় খণ্ডে তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘..এমনকি একটা গোটা সমাজ, একটা জাতি, অথবা বিদ্যমান সমস্ত সমাজ সামগ্রিকভাবেও এই ধরিত্রীর প্রভু নয়, তারা এতে বসবাসের অধিকারী আর উপভোক্তামাত্র। এক দায়িত্ববান গৃহকর্তা হিসেবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এই ধরিত্রীকে এক উন্নততর অবস্থায় পৌঁছে দিতে হবে।’ ১৩

এর চেয়ে কোনও বড় পরিবেশ-প্রতিবেশগত উপলব্ধির কথা আমরা কল্পনা করতে পারি? প্রতিবেশে শুধু বাস করা নয়, শুধু তার উপকরণে তুষ্ট হওয়া নয়, তার আলো, জল, বায়ু, লতা, ফল, গাছ ,মাছ, খনি, মণি— সব ভোগ করে শূন্য করে দেওয়া আমাদের নৈতিক বা বাস্তবিক কোনও কর্তব্যই নয়। বরং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাকে আরো নির্মল, আরো সম্পদময়, আরো দূষণ মুক্ত, আরো জীববৈচিত্রপূর্ণ করে যেতে হবে। এও এক মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক কর্তব্য।

মার্কসবাদের এই উপলব্ধিই হোক আমাদের পরিবেশ ভাবনার মর্মবস্তু।


তথ্যসূত্র

৬) অরুণাভ মিশ্র, বিজ্ঞানচর্চা ও সমাজচেতনা, রেড কেমিস্ট শোরলেমা, এভেনিল প্রেস, ২০২২, পৃ- ৫১; Karl Marx and Friedrich Engels, Collected Works, vol 42, pp - 507-508
৭)  Karl Marx and Frederick Engels, Selected Correspondence, Foreign language Publishing House, Moscow, pp - 243
৮) MEA, Sign B 111,1, John Devell Tuckett, A History of the Past and Present State of Labouring Population, London, 1846, Vol. 2, pp - 402
৯) MEGA Il, Vol. 4.2, pp - 670
১০)V I Lenin, Collected Works, Vol. 5, Progress Publishers, Moscow,1961, pp - 155-156
১১) ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, বানর থেকে মানুষে উত্তরণে শ্রমের ভূমিকা, মার্কস-এঙ্গেলস নির্বাচিত রচনাবলী, খণ্ড ৯, প্রগতি প্রকাশন, ১৯৮১, পৃ- ৯৭
১২) Paul Burkett, Marx and Nature, St. Martin's Press, New York, 1999, pp - 99
১৩)  Karl Marx, Capital, Vol. 3, pp- 911


প্রকাশের তারিখ: ০৬-জুন-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
⁠বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিভাগে প্রকাশিত ১৪ টি নিবন্ধ
৩০-জুন-২০২৬

০৫-জুন-২০২৬

২২-মে-২০২৫

০৬-আগস্ট-২০২৪

০৪-অক্টোবর-২০২৩

০৬-জুন-২০২৩

০৫-জুন-২০২৩

০৪-জুন-২০২৩

২৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৩

০৯-জানুয়ারি-২০২৩