সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মেটা, মাস্ক এবং লুলা (পর্ব ২)
ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
...লুলার স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও চারটি পরস্পর সংযুক্ত বিশাল গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ল। ক্যাজু্য়াল সেলফিগুলো পরিচিত গাম্ভীর্যের মনস্তাত্ত্বিক বাধা ভেঙে দিল, সোশাল মিডিয়ার ভাষা যৌথ আত্মপরিচিতি তৈরি করল, নির্দিষ্ট কাজের বণ্টন নিষ্ক্রিয় সমর্থককে সক্রিয় প্রচারকে পরিণত করল এবং পাল্টা ভাষ্য বিরোধীদের সমালোচনাকে খণ্ডন করল। এভাবেই যুবদের ব্যক্তিগত পরিসরে রাজনৈতিক বার্তা কীভাবে পৌঁছে দিতে হয় এবং কীভাবে যুবদের ক্ষমতায়ন করতে হয়, সেটাই সফলভাবে শিখিয়েছে এই কৌশলগুলি। এই কাজে ইনফ্লুয়েন্সার ও কমিউনিকেটরদের ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ, তাও স্পষ্ট হল।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও কনটেন্ট : তরুণ দর্শকদের আকৃষ্ট করার কৌশল
ভোটপ্রচারে যুবদের বার্তা দিতে মূল হাতিয়ার ছিল স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও। ডেপুটি জানোনোসের অভিযোগ ছিল, নিষ্প্রাণ ভোটপ্রচার রাজনীতিকদের থেকে যুবদের দূরত্ব তৈরি করে। তিনি বললেন, স্মার্টফোনে ধরা অসম্পাদিত ফুটেজই সম্প্রচার করতে হবে। ফুটেজের ছবি তুলতে হবে দৈনন্দিনের আবহে, সঙ্গে থাকবে স্বতঃস্ফূর্ত কথাবার্তা। তখন লুলা চোখে পরলেন বেশ স্টাইলিশ একটা চশমা যার গ্লাসের আকার ছিল পাঁচকোণ তারা। সেটাই ছিল তাঁর কিং অফ সেলফিস-এর কনটেন্ট। ছোট ছোট ক্লিপে তিনি বার্তা দিলেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের জন্য। তথাকথিত বাঁধা ছকের বক্তৃতার প্রচার কমানো হল। এই যে ততটা মার্জিত নয় এমন সুরে কথা, এতে লোকেরা বুঝল লুলা দূরে থাকা গম্ভীর মেজাজের লোক নন। বরং, তাঁর সঙ্গে সহজেই কথা বলা যায়। এতে প্রার্থীর সঙ্গে ভোটারদের দূরত্ব কমল।
এরপর প্রচারের দায়িত্বে থাকা সংগঠকেরা লুলার ১৩ নম্বর ব্যালট চেনাতে উদ্যোগ নিলেন। জন্ম নিল প্রতীক — ‘হ্যাশট্যাগ ভোট ১৩’ এবং ‘হ্যাশট্যাগ জুভেনটুডেসকম লুলা’। এগুলো প্রচার করা হল ফাঙ্ক মিউজিক, ইন্টারনেট মিম এবং ইমোজির সঙ্গে। পাশাপাশি এল হোয়াটস অ্যাপ চ্যানেল মারফৎ কাজের তালিকা। এই সব প্রচার যাদের কাছে করা হচ্ছিল তাদের বলা হল কনটেন্টগুলো শেয়ার করুন, ভুল তথ্য থাকলে সরিয়ে দিন, অনাড়ম্বর ঢঙে প্রচার করুন। এসবের উত্তরে আসা ইমোজিকে ধরে নেওয়া হল শ্রোতার সেন্টিমেন্টের ব্যারোমিটার হিসাবে। এই চ্যানেলের মূল বিষয়টি নিয়ে বার্তা দিলেন জানোনোস : অর্গানিক অনলাইন বিকাশের জন্য চর্চা করা, সাধারণ নাগরিকদের উৎসাহ দেওয়া যাতে তারা নিজেরাই ভিডিও তৈরি করতে পারেন। এভাবে প্রতিটি সমর্থককে পরিণত করা হল স্বাধীন কনটেন্ট ক্রিয়েটরে।
এর পর এল বৃহৎ পরিসরে লাইভ স্ট্রিমিং। লুলা আর্মির একটা অনলাইন লাইভ ব্রডকাস্টের দর্শক সংখ্যা ১৫ লক্ষ ছাড়িয়ে গেল। সেখানে লুলা এলেন আন্দোলনের ‘মার্শাল’ হিসাবে। তিনি সমর্থকদের বললেন, আপনারা সকলে নেটওয়ার্ক জুড়ে প্রচারের আরও কন্টেন্ট ছড়িয়ে দিন। 
চতুর্থত এল, পাল্টা ভাষ্যের ডিকনস্ট্রাকশন। স্যান্টোসের একটা ইনস্টাগ্রাম ভিডিও শেয়ার করলেন ১৬ হাজার জন। তাতে স্যান্টোস বললেন, এতদিন ডিজিটাল পরিসরে বামেরা কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে। এবং অনেক আগেই রক্ষণশীলেরা কীভাবে পরিসরটাকে দখল করে কাজে লাগিয়েছে। তিনি বললেন, রাস্তার প্রতিবাদ ও অনলাইনের পরিসর অবিচ্ছেদ্য। এর অভাবেই বামেরা এতদিন সাফল্য পায়নি। তিনি বললেন, ইনফ্লুয়েন্সররা আসলে রাজনৈতিক সম্পদ যারা বিরোধী ন্যারেটিভ খণ্ডন করে পাল্টা যৌথ গোষ্ঠী পরিচিতি তৈরি করেন।
এতগুলো বিষয়কে মেলালে যা দাঁড়ায় তা হল, লুলার স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও চারটি পরস্পর সংযুক্ত বিশাল গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ল। ক্যাজু্য়াল সেলফিগুলো পরিচিত গাম্ভীর্যের মনস্তাত্ত্বিক বাধা ভেঙে দিল, সোশাল মিডিয়ার ভাষা যৌথ আত্মপরিচিতি তৈরি করল, নির্দিষ্ট কাজের বণ্টন নিষ্ক্রিয় সমর্থককে সক্রিয় প্রচারকে পরিণত করল এবং পাল্টা ভাষ্য বিরোধীদের সমালোচনাকে খণ্ডন করল। এভাবেই যুবদের ব্যক্তিগত পরিসরে রাজনৈতিক বার্তা কীভাবে পৌঁছে দিতে হয় এবং কীভাবে যুবদের ক্ষমতায়ন করতে হয়, সেটাই সফলভাবে শিখিয়েছে এই কৌশলগুলি। এই কাজে ইনফ্লুয়েন্সার ও কমিউনিকেটরদের ভূমিকা যে গুরুত্বপূর্ণ, তাও স্পষ্ট হল।
অন্তর্তদন্তমূলক সাংবাদিকতা ও যুবদের জন্য তথ্যের যুদ্ধক্ষেত্র
যুবদের জন্য যে ডিজিটাল পরিসর সেখানেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের লড়াই গড়ে তুলেছিল অন্তর্তদন্তমূলক সাংবাদিকতা। এর মধ্যে ছিল অন্তর্তদন্তমূলক সিরিজ ‘রেভেলানদো’ বা প্রকাশিত। এর পিছনে ছিল পডকাস্ট কালেক্টিভ ক্যালমা আরজেন্টে। এর পিছনে দাঁড়িয়েছিল স্বাধীন আউটলেট আইসিএল নোটিসিয়াস, মিডিয়া নিনজা, ৩৪২ আর্টেস, এবং ইন্টারসেপ্ট ব্রাসিল। এগুলো হয়ে উঠেছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ সব সূত্র যার মাধ্যমে তরুণ ভোটারেরা বলসোনারো পরিবারের দুর্নীতিগুলো জানতে পারত। অক্টোবরের শেষে এই সব এপিসোডের মোট দর্শক সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৫ কোটি ৩৮ লক্ষ। রেভেলানদোয় পাওয়া যেত সম্পূর্ণ অন্তর্তদন্তমূলক রিপোর্ট যা লক্ষ লক্ষ যুবদের সামনে এলিট চ্যানেলগুলোর স্বরূপ প্রকাশ করে দিয়েছিল।
সবচেয়ে প্রভাবশালী ধারাবাহিক রিপোর্ট ছিল প্যাট্রিয়া সাবমিসা (সাবমিসিভ হোমল্যান্ড)। এর প্রথম কিস্তি বেরিয়েছিল ১৬ অক্টোবর এবং উদ্বোধন করেন আন্তর্জাতিক স্তরে বিখ্যাত ব্রাজিলের অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা। কীভাবে বোলসোনারো পরিবার ব্রাজিলকে আমেরিকার অধীন রাষ্ট্রে পরিণত করছে এটা ছিল সেই বিষয়ের রিপোর্ট। এতে যে ব্রাজিলের খনিজ সম্পদের মালিকানা বিপন্ন হবে বলা হয়েছিল সেকথা। জাতীয় সম্পদ কীভাবে ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বলা হয়েছিল সেকথাও। ইউটিউবে পুরো এপিসোড দেখেছিলেন ৬০ লক্ষ মানুষ। একটা ছোট উদ্ধৃতি ইনস্টাগ্রামে কোট করা হয়েছিল ৫০ লক্ষ বার।
এর পরের শো ছিল রিপালিকা ডস লারানজাস (খড়ের মানুষের প্রজাতন্ত্র)। এই শো করেছিলেন কমেডিয়ান ফাবিও পোরচ্যাট। বলসানোরোর ছেলে, আইনজীবী উইলার টমাজ, ব্যাঙ্ককর্তা ড্যানিয়েল ভোরকারো —এদের মধ্যে চলা আর্থিক দুর্নীতি চক্রের স্বরূপ উন্মোচন করা হয় এই ভিডিওয়। এভাবে আরও অনেক দুর্নীতি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির চক্র ফাঁস করা হয়।
তথ্যভিত্তিক ভিডিওগুলির উপস্থাপনা করেছিলেন সেলিব্রিটিরা। তবে সিরিজগুলোর পিছনে ছিল তরুণ সাংবাদিকদের এবং স্বাধীন মিডিয়াগুলির যৌথ শ্রম। ইনটারসেপ্ট ব্রাজিল ও মিডিয়া নিনজা অনেকদিন ধরেই ডিজিটাল ফরম্যাটে পুঁজির সঙ্গে ক্ষমতার যোগাযোগের আসল চেহারা উন্মোচিত করে আসছিল। তবে সেলিব্রিটিদের কারণে এই কনটেন্টগুলি বহু লোকের কাছে পৌঁছেছিল। আর সাংবাদিকেরা সরবরাহ করত নিখুঁত তথ্য। এই দুই শক্তির মিলনে দুর্নীতি বিরোধী সাদামাটা কথাগুলি রিপোর্টিংয়ের ডকুমেন্টে উঠে এল। এবং তরুণদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল। রেভেলানদো ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে সরিয়ে দিয়েছিল মেটা। তবে মেটার ওপর বিপুল চাপ তৈরি করা হয় সিরিজটা ফেরানোর জন্য। এর মানে তরুণেরা শুধুই কনটেন্টগুলো উপভোগ করত না, বিভিন্ন প্লাটফর্মের বিধিনিষেধের বিরুদ্ধেও লড়াই করত।
মেটা যখন বিরোধী শক্তি
তবে এই লড়াইটা সহজ ছিল না। অভিযোগ, ব্রাজিলের দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে লুলা শিবিরের আরেক বিরোধী হিসাবে সামনে চলে আসে মেটা প্লাটফর্ম ইনকর্পোরেট। অনলাইন কনটেন্ট প্রচার করার কাজে মেটার অবস্থান এতটাই বৈষম্যমূলক ছিল যে রাজনৈতিক এবং নির্বাচন সম্পর্কিত কনটেন্ট প্রচার নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে ব্রাজিলের নির্বাচনী আদালত। এমনকী এনিয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয় রাষ্ট্রসঙ্ঘকেও। মার্কিন আইনপ্রণেতারাও মেটার এ হেন আচরণের ব্যাখ্যা দাবি করেছেন।
এর আগেও ইলন মাস্কের এক্স প্লাটফর্মের সঙ্গে বিরোধ বেধেছিল ব্রাজিলের সরকারি কর্তৃপক্ষের। ২০২২ সালের নির্বাচনে বিচারপতিরা এক্স হ্যান্ডেল থেকে কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন এবং তাঁরা ভুয়ো প্রচারের অভিযোগ আনেন। ফলে ২ বছর আগে ব্রাজিলে এক্স প্লাটফর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। 
দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে লুলার আর্মি নামের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের প্রতি আকৃষ্ট হন ১ কোটি মানুষ। লুলা অভিযোগ করেছেন, এই গ্রুপে তাঁর প্রচারে বাধা দেওয়া হয়েছে, তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছে এবং সবাইকে এই গ্রুপের বার্তা দেখতে দেওয়া হচ্ছে না। লুলার প্রচার টিমের অভিযোগ ছিল, মেটার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতিয়ার মেটা এআই লুলার প্রচার সম্পর্কিত ইমেজ সৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছে, অথচ বলসোনারোর অনুকূলে প্রচারের কনটেন্ট সৃষ্টি করে যাচ্ছে। লুলা আপত্তি জানালে মেটা এগুলিকে স্রেফ টেকনিক্যাল ত্রুটি বলে উড়িয়ে দেয়। এবং দাবি করে তারা এগুলি শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। (ভারতে মোদির টুইট নিয়ে একই কাণ্ড করেছিল মেটা এবং কেন তেমনটা ঘটেছিল তার সুষ্ঠু ব্যাখ্যা তারা দিতে পারেনি)। এ ধরনের কাণ্ডকারখানার বিরুদ্ধে মেটার সাও পাওলো অফিসের সামনে বিক্ষোভ দেখান লুলার সমর্থকেরা। তাঁরা জুকেরবার্গকে এবং বার্নি স্যান্ডার্সের নেতৃত্বাধীন মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে চিঠি লিখে এর বিচার দাবি করেন। পরে লুলা ইউটিউবের সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করব যে আমরা ডিজিটাল সাম্রাজ্যকে হারিয়ে দিতে পারি। মানব সমাজকে চিরকাল প্রতারিত করে চলতে পারবে না মেটা। ওদের নিজেদের বদলাতে হবে।’
ব্রাজিলের নির্বাচনে মেটার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল এ কারণেই যে, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ছাড়াও এই কোম্পানির মালিকানায় রয়েছে হোয়াটস অ্যাপ যা ব্যবহার করেন ব্রাজিলের ৯০ শতাংশ বাসিন্দা। তবে লুলা আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ট্রাম্পের বিগ টেক বিধি তাঁরা মানবেন না। ব্রাজিলের ফার্স্ট লেডি জানজা দা সিলভা ২০২৪ সালে ব্রাজিলে জি ২০ সম্মেলনে বলেছিলেন মাস্ককে বলেছিলেন, ‘মাস্ক, আপনি উচ্ছন্নে যান। আপনাকে আমি থোড়াই কেয়ার করি।’ মনে রাখা দরকার, ২০২৩ সালে জাইর বলসোনারো যে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেন সেখানে তাঁর মূল হাতিয়ার ছিল সোশাল মিডিয়া। সে সময় তাদের লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট লুলা, ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতিকে হত্যা করা। এ সব কারণেই এবারের নির্বাচনে মেটা ভূমিকার বিরুদ্ধে তৎপর ছিলেন লুলা ও তাঁর সমর্থকেরা।
বামপন্থী সিনেমা ও যৌথ স্মৃতি
সোশাল মিডিয়ায় এই সব কার্যকলাপের পাশাপাশি রাজনৈতিক ভাবে সচেতন ফিচার ফিল্মও নতুন করে দেখানো হয়। এই সব ছবিতে আগেই যৌথ প্রয়াসের মাধ্যমে তুেল ধরা হয় ব্রাজিলের সামরিক একনায়কত্বের যুগের ছবি। এগুলোই সেই আমলের নির্যাতনের ইতিহাস তরুণদের কাছে পৌঁছে দেয়। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ওয়ালটার সালেসের ২০২৪ সালের ছবি ‘আনিডা এসটউ অ্যাকুইয়ি’ ( ‘আমি এখনও আছি’)। মার্শেলো রুবেনসের ‘পাইভার স্মৃতি’ বইটি থেকে এই ছবির কাহিনি নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে পাইভার সংগ্রামের কাহিনি। বামপন্থী কংগ্রেস সদস্য রুবেনস পাইভাকে ১৯৭১ সালে অপহরণ করে সামরিক ডিক্টেটরের নিরাপত্তারক্ষীরা। এরপর সংসার বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী। পাশাপাশি স্বামীর কী হল সেটা জানার প্রচেষ্টাও চালিয়ে যান। এই ছবিটা ২০২৫ সালে পেয়েছিল অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট ইন্টারন্যাশনাল ফিচার। ব্রাজিল ওই পুরস্কার পেয়েছিল সেই প্রথমবার। এই ছবিটাই ব্রাজিলের তরুণদের মনে করিয়ে দিয়েছে সামরিক ডিক্টেটরশিপের যন্ত্রণাদীর্ণ দিনগুলি। দেখানো হয় ক্লেবার মেনডোনকার ফিলোর ২০২৫–এর ফিচার ফিল্ম ‘ও অ্যাজেন্টে সিক্রেটো’ ( সিক্রেট এজেন্ট)। ছবিটা তৈরি করা হয় ১৯৭৭ সালের প্রেক্ষিতে। ছবির নায়ক একজন বিক্ষুব্ধ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। নজরদারি, ইনফর্মার নেটওয়ার্ক এবং আতঙ্ক থেকে বাঁচতে তিনি সাও পাওলো থেকে পালিয়ে যান রেশিফে শহরে। ছবিটি কানস চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানোর জন্য মনোনীত হয়েছিল। রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তির মোকাবিলাই এই কাহিনির উপজীব্য। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রাজিলে এই ছবির টিকিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫০.৯ মিলিয়ন ব্রাজিলিয় টাকা। সাম্প্রতিক ছবিগুলির মধ্যে এটাই পেয়েছিল সর্বাধিক টিকিট বিক্রির গৌরব। এতে অভিনয় করেছিলেন ওয়াগনার মৌরা। তিনি ক্রমে হয়ে উঠেছিলেন বোলসানারোর কঠোর সমালোচক। পরিচালনা করেছেন রাজনৈতিক বায়োপিক মারিঘেল্লা (২০১৯)। তিনি রেভেলানদো সিরিজের জন্য উপস্থাপনা করেছিলেন প্যাট্রিয়া সাবমিসা।
নীরস ঐতিহাসিক ভাষণের বদলে এই সব ছবিগুলিই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। ছবির মধ্যে দিয়ে তারা জানতে পেরেছিল নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার এবং ইনফর্মার সংস্কৃতির দিনগুলি। যারা ব্রাজিলের এখনকার প্রজন্ম এই ছবিগুলি তাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে তাদের পূর্বসূরিদের কীভাবে টিকে থাকতে হয়েছিল সেই ইতিহাস। এসব ছবি দেখিয়েছে, সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে কী ভয়ঙ্কর লড়াই তাদের করতে হয়েছে। এভাবে ফিচার ফিল্ম ও রেভেলানদো সিরিজ একে অপরের পরিপূরক হয়ে তৈরি করেছিল প্রচারের পরিসর যা তরুণ ভোটারদের চেতনাকে শানিত করেছিল।
সংক্ষেপে
অনলাইন–অফলাইন প্রচারের তালমিল, যুবশক্তি ও প্রথাগত শক্তির এক কাতারে এসে দাঁড়ানো, লুলার নেতৃত্বে ব্রাজিলের বাম নেতৃত্বের অনলাইন পরিসরকে গ্রহণ করে ভোটারদের মধ্যেকার নতুন প্রজন্মকে টেনে আনা — এগুলোই এবারের ব্রাজিলের সফল নির্বাচনী প্রচারের বৈশিষ্ট্য। একদিকে ছিলেন প্রথাগত ভোটারেরা। তাঁরা এসেছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং শ্রমিক শ্রেণি থেকে। অন্যদিকে এসেছে বিপুল সংখ্যায় যুবরা। তাদের কাছে রাজনীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে মূলত স্বল্প দৈর্ঘ্যের ক্লিপ এবং ডিজিটাল পরিসরের মাধ্যমে। শুধুমাত্র রাস্তার মিছিলে জমায়েতে যোগ দিলে যুবদের পাওয়া যেত না। তাই লুলা নিজেই সেলফি তুলে প্রচারে নেমে পড়েন। এতেই তরুণেরা নিছক দর্শক থেকে হয়ে ওঠেন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী। এরই জেরে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের সমাবেশগুলিতে সাও পাওলো ও রিও ডি জনেইরোর রাস্তা ভরিয়ে তুলেছিলেন ছাত্র ও সামাজিক আন্দোলন সংগঠনের কর্মীরা। ফলে তারাই হয়ে ওঠেন তৃণমূল স্তরের নতুন কর্মী। এই বিষয়টি আরও যা দেখিয়ে দেয় তা হল, এটা একটা সংঘাতেরও পরিসর। এখানে মেটার মতো সংস্থাগুলি বাড়তি সুবিধা দেয় দক্ষিণপন্থীদের। এই বৈষম্যের কারণে মেটার বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হয়েছে ওয়ার্কর্স পার্টিকে।
শেষ কথা: চারটি ঘণ্টা ও চারটি ব্যালট
সিট সুইই লিখেছেন, রোজারিও আমার ব্রাজিলিয় বন্ধু। পড়ান এসপিরিটো স্যান্টোর ফেডারাল ইউনিভার্সিটিতে। তিনি আমাকে বলেছেন, ভোটের দিন তিনি চার ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া চারজন ছাত্রকে তাদের এলাকার ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছিলেন। চারটে ভোটের জন্য তিনি চার ঘণ্টা স্টিয়ারিংয়ের পিছনে বসেছিলেন। এটাই হল তৃণমূল স্তরের সমর্থকদের অঙ্গীকারবদ্ধতা। রোজারিও আমাকে বলেছিলেন, সবাই মাঠে নেমে পড়েছিল। ইমপাটিংগা, মিনাস গেরাইজ,— সর্বত্র লোকেরা টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিল যাতে গ্রামীণ কৃষকদের গাড়িতে করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার খরচ ওঠে। সালভাদোর ও সাও পাওলোয় বলসোনারোর এজেন্টরা সরকারি পরিবহণ বন্ধ করে দিয়েছিল ভোটের দিন। সাধারণ নাগরিকেরা সেদিন এগিয়ে এসে নিজেদের গাড়িতে করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আমাজন এলাকার রাজ্যগুলিতে, মূলবাসী ভোটারেরা বহু পথ নৌকো করে গিয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেছিলেন।
দ্বিতীয় দফা ভোটের আগে পারনামবুকোর ফেডারাল ইউনিভার্সিটিতে ভাঙচুর, লুঠপাটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হয়। এরপরেই মাঠে নামে ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা। অফলাইন প্রচারে যোগ দেয় ১৪ থেকে ১৭ বছরের কিশোর কিশোরীরা। যোগ দেন রাপ মিউজিক শিল্পী সহ অন্য শিল্পীরা। তারাই ব্যানার ও প্রচারের স্টিকার তৈরি করেন। বহু অল্পবয়স্ক ছাত্রছাত্রী তাদের বাবা মায়েদের রাজি করায় লুলাকে ভোট দিতে। লুলাকে জিতিয়েছেন যে ২৪ মিলিয়ন ভোটার, তাদের মধ্যে ছিলেন রোজারিওর গাড়িতে যাওয়া চার পড়ুয়াও। এভাবেই তৃণমূল স্তরের গোষ্ঠীগুলি ও যুবরা লাতিন আমেরিকায় ফের রাজনীতির মধ্যমণি হয়ে উঠেছে। মার্কিনপন্থী অ্যাজেন্ডা ও দেশীয় ক্ষমতার জোটকে তারা পিছনে ঠেলে দিয়েছে। সেকারণে, অক্টোবর ২৫, ২০২৬ তারিখটা ছিল লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে একটা বিরাট মোড় ফেরার দিন।
ঋণ: mronline.org, ব্লুমবার্গ নিউজ
প্রকাশের তারিখ: ০৫-নভেম্বর-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
