সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
খসে পড়েছে মোদীর অজেয় ভাবমূর্তি (প্রথম পর্ব)
অচিন বনায়েক
বছরের শেষে তিনটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হবে। এর মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা, যেখানে বিজেপির ফল খুব খারাপ হয়েছে। এছাড়া রয়েছে ঝাড়খণ্ড, যেখানে বিজেপি ভাল ফল করেছে। এই সব বিধানসভার নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল যাই হোক না কেন, তা হয় এনডিএ, নতুবা ইন্ডিয়া ব্লককে আরও উৎসাহ দেবে। বছরের বাকি ছ’মাস হতে চলেছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ৬ মাসে দেখা যাবে নীতি নিয়ে সংঘাত– যার মাত্রা, গভীরতা ও চূড়ান্ত ফল কী হবে তার আগাম ভবিষ্যৎবাণী এখন কঠিন। বলেছেন লেখক ও সমাজকর্মী, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অচিন বনায়েক। ‘দ্য রাইস অব দি হিন্দু অথরিটারিয়ানিজম’ গ্রন্থের লেখক তিনি।

ভারতের সংসদে তিনি ফিরে আসবেন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে, সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। তবে একক গরিষ্ঠতা তিনি পাননি। ক্ষমতায় টিকে থাকতে তাঁকে জোট সরকার গড়তে হয়েছে। মোদীর এই ধাক্কা অনেককে বিস্মিত করেছে। এর ফলে তাঁর স্বৈরাচারী পরিকল্পনাকে আরও ধাক্কা দিয়ে পিছু হঠানোর একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভারতের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে একটা মজাদার পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। একদিকে, যাঁরা জিতেছেন জয়টা তাঁদের কাছে মনে হচ্ছে পরাজয়ের সমান। অন্যদিকে, যাঁরা হেরেছেন তাঁরা যেন হেরেও বিজয়ী।
সংখ্যায় ঘাটতি
লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২৪০টি আসন। জোট শরিকদের আসন সংখ্যা যোগ করলে এনডিএ পেয়েছে ২৯৩টি আসন, যা সংসদে গরিষ্ঠতার জন্য দরকারি ২৭২ সংখ্যাকে ছাপিয়ে গেছে।
এর মানে বিজেপি টানা তিনবারের জন্য সরকার গঠন করবে। তবে আগের দু’বার তারা নিজেদের জোরেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। এবার তারা সেটা পায়নি। এবার বিজেপিকে সরকার গঠন করার জন্য এবং সেই সরকার চালিয়ে যাওয়ার জন্য দুই শরিকের ওপর এমনভাবে নির্ভর করতে হবে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই শরিকেরই, অতীতে কখনও বিজেপির সঙ্গে, কখনও বা বিজেপির বিরুদ্ধে কাজ করার ইতিহাস রয়েছে। অন্ধ্র প্রদেশে তেলুগু দেশম পার্টি চন্দ্রবাবুর নেতৃত্বে সংসদে ১৬টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে জনতা দল (ইউনাইটেড) বা জেডি (ইউ) ১২টি আসন পেয়েছে।
পুরো নির্বাচনী প্রচারের পর্ব জুড়ে মোদী বার বার ঘোষণা করেছেন যে, লোকসভায় বিজেপি একাই দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা বা প্রায় ৩৭০-এর কাছাকাছি আসন পাবে। এখন তাঁকে শুধু ভুল স্বীকারই করতে হচ্ছে না, দুই শরিক দলকে উল্লেখযোগ্য ছাড়ও দিতে হচ্ছে।
এবার বিজেপির জাতীয় স্তরে প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৩৭ শতাংশ। এটা ২০১৯-এর প্রাপ্ত ভোটের প্রায় সমান। তবে এই ভোট পেয়েও এই দল ৬৩টি আসন কম পেয়েছে। তবে পূর্বাঞ্চলের রাজ্য ওড়িশায় বিজেপি শক্তি বাড়িয়েছে। সেখানে দলের জনপ্রিয়তা ভালরকম বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণের রাজ্যগুলি, যেমন কেরালা ও তামিলনাড়ুতে বিজেপির ভোট সামান্য বেড়েছে।
কেন মোদীর দলের আসন কমল? হিন্দি বলয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে, বিশেষ করে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার রাজ্য উত্তরপ্রদেশে বিজেপি ব্যর্থ হল কেন? (উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যা ২৪ কোটি, যদি এটা কোনও স্বাধীন দেশ হত তাহলে জনসংখ্যার বিচারে হত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ।) এর আগের দুটো নির্বাচনে এই রাজ্যে বিজেপিরই আধিপত্য ছিল এবং প্রত্যাশা ছিল এবারও তারা এই রাজ্যে বিপুল ভোটে জয়ী হবে।
হিন্দুত্বের শক্তিগুলির গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হল এই রাজ্য। যারা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক পরিবারভুক্ত, কিংবা অন্যান্য গোষ্ঠী যাদের আনুগত্য বেশি হিন্দু ধর্মগুরু ও বর্তমানে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রতি,তাদের সকলের কাছেই উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বপূর্ণ। অথচ উত্তরপ্রদেশে এনডিএ-র চেয়ে ইন্ডিয়া ব্লক অনেক বেশি আসনে জিতেছে। এই রাজ্যের মোট ৮০টি আসনের মধ্যে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পেয়েছে ৬টি আসন এবং সমাজবাদী পার্টি (এসপি) পেয়েছে ৩৭টি আসন।
বিরোধী ঐক্য
হিন্দি বলয়ের বাইরে আরও যে দু’টি বড় রাজ্যে বিজেপি ভাল ফল করবে বলে আশা করেছিল সেগুলি হল মহারাষ্ট্র এবং পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গে ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) পেয়েছে ২৯টি আসন। বিজেপি এই রাজ্যে ১২টি আসন পেয়েছে। মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে মিলে বিজেপি ও তাদের মিত্রদের চেয়ে অনেক ভাল ফল করেছে।
আগের দু’টি নির্বাচনের তুলনায় এবারে ভোটের আগে, কর্মসূচির নিরিখে বিরোধী দলগুলির মধ্যে কোনও ঐকমত্য বা ঐক্য গড়ে না উঠলেও, তারা একজোট হয়েছিল। এর জেরেই তাদের নিজ নিজ সামাজিক সমর্থনের ভিত থেকে ভোট ঠিক জায়গায় জড়ো হয়েছিল। সংসদের মোট আসনের মধ্যে ইন্ডিয়ার আসন ২৩৪– এর মধ্যে কংগ্রেসের ১০০। গত বার কংগ্রেসের আসন সংখ্যা ছিল ৫২। ভারতে বামপন্থীদের মূল ধারার প্রতিনিধি হল কমিউনিস্ট পার্টিগুলি। তারা একত্রে পেয়েছে ৮টি আসন। গতবার এই সংখ্যাটি ছিল ৫। এর মানে যৌথভাবে কোন কোন ইস্যুতে ইন্ডিয়া ব্লক সোচ্চার হবে এবং কীভাবে সেগুলি নিয়ে লড়াই গড়ে তোলা হবে, সে বিষয়ে বামপন্থীদের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা থাকবে, যদিও সেই ক্ষমতা হবে সীমাবদ্ধ।
বামপন্থী দলগুলি স্তালিন বা মাওয়ের চিন্তাধারার ঐতিহ্যকে ছাড়েনি। তবে অর্থনৈতিক দিশার নিরিখে, বিরোধী জোটের অন্য দলগুলির তুলনায়, বামপন্থী দলগুলি অনেক বেশি সমাজ-গণতান্ত্রিক। যদিও নয়া উদারবাদী কাজকর্মে তারা কিছুটা ছাড়ও দেয়। আবার জাতীয় কংগ্রেস বা অন্য দলগুলির মতো বামপন্থীরা নরম হিন্দুত্বের খেলা খেলে না।
এই নির্বাচন যা দেখিয়ে দিয়েছে তা হল, মোদীর বহু প্রত্যাশিত নির্বাচনী-রাজনৈতিক অগ্রগতির পথে বাধা তিনটি। বাধাগুলি অর্থনৈতিক, যুক্তরাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক চরিত্রের।
হিন্দুত্বের সামনে বাধা
সম্ভবত, দেশের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ হিন্দুকে গত কয়েক দশক ধরে একেবারে জোরদারভাবে উগ্র করে তোলা হয়েছে। তারা এখন বিজেপি, সঙ্ঘ এবং অন্যান্য হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলির প্রতি ভালরকম অনুগত। এই স্তর থেকেই আন্দোলনের ক্যাডার ও কর্মী সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণে আরও বৃহত্তর, আরও প্রসারিত, এবং আরও সমসত্ত্ব ‘হিন্দু ব্লক’ তৈরি করার কাজে বাধা অনেক।
বিজেপির ক্ষেত্রে নেতিবাচক দিক হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি বিষয়ে ব্যাপক অসন্তোষের মনোভাব, বিশেষ করে বেকারি এবং ভদ্রস্থ মাইনের চাকরির অভাব। যুবদের মধ্যে বেকারি বেড়েই চলেছে এবং বেশি শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে অবস্থা দাঁড়াচ্ছে আরও শোচনীয়। বেকার স্নাতকদের অনুপাত গিয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশে।
দেশের জনসংখ্যার শীর্ষস্তরের ১ শতাংশের হাতে রয়েছে মোট আয়ের ২২ শতাংশ। সম্পত্তির বন্টনের চিত্রটা আরও ভয়ংকর।
টমাস পিকেটি ও তাঁর সহকর্মীরা যে ভারতে আয় ও সম্পত্তির অসাম্য, ১৯২২-২৩ শীর্ষক সমীক্ষা করেছেন তাতে দেখা যাচ্ছে, ১০ হাজারের কম লোকের হাতে মোট সম্পত্তির যত অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তা জনসংখ্যার নিচের দিকের ৫০ শতাংশের মোট সম্পত্তির তিনগুণ বেশি। এখন দেশে ডলার বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ২৭১ (এর মধ্যে শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই বিলিয়নেয়ার হয়েছেন ৯৪ জন)। যদি বিলিয়নেয়ার শ্রেণির তুলনা করা হয় তাহলে বিশ্বে চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই রয়েছে ভারত।
সামাজিকভাবে, বিজেপি ও হিন্দুত্বের সামনে বিপুল বাধা হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে জাতপাতের বিভাজন। বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী শক্তি চেয়েছিল, নীচু জাতের ঠাকুর-দেবতা, ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির মতো বিষয়কে গ্রহণ করে, তুলে ধরে ও স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ভাগীদার করবে। বেশ খানিকটা নমনীয় ও অমায়িক হলেও, আসলে এসব হিন্দুত্বের ব্রাহ্মণ্যবাদী বোঝাপড়াই। এই দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা লাভ দিলেও, যথেষ্ট দিতে পারেনি।
দলিত, ওবিসি (‘আদার ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস’ বা মিডল ক্লাস) এবং আদিবাসীদের কিছু অংশ বিজেপির পাশে গিয়ে জড়ো হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে থেকেছে। তবে অন্যেরা যদি এমনটা বুঝতে পারে যে, স্থানীয় ও আঞ্চলিক স্তরে তাদের কোনো লাভ হবে, তবে তারাও রাজনৈতিকভাবে ও নির্বাচনের প্রশ্নে আনুগত্য বদল করতে পুরোপুরি তৈরি। এখান থেকেই বোঝা যায় সমাজবাদী পার্টি এবার উত্তরপ্রদেশে কেন এত ভাল ফল করেছে।
একেবারে উচ্চবর্ণের নীচে যারা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বৃহত্তর ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তির চেয়ে সংকীর্ণতর জাতপাতের আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পাবে যদি তারা বুনিয়াদি জাগতিক স্বার্থের দিকে বেশি নজর দেয়। এই রকম জাগতিক স্বার্থচিন্তা রাজনৈতিক-নির্বাচনভিত্তিক সমঝোতার শ্রেণিভিত্তিক রূপগুলিকে অনেক বেশি এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। নীচু জাত এবং নীচতলার শ্রেণির সদস্য হওয়া– এ দু’টির মধ্যে একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার একটা মৌলিক ব্যাপার রয়েছে।
এছাড়া, মুসলিম ভোট একটা ব্লক হিসাবে বিরোধী দলগুলির দিকে গেছে কারণ তারা বিশ্বাস করে যে বিজেপির তুলনায় বিরোধী দলগুলি অনেক ভাল। বিজেপি নিরেট সমর্থন পায় উচ্চবর্ণগুলি থেকে, এবং এবারের নির্বাচনেও তাই ঘটেছে। নীচুতলার জাতিগুলির মধ্যে এখন যে মাত্রায় প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে তাকে স্থায়ীভাবে থিতু করার পাশাপাশি উঁচু জাতিবর্ণগুলির আনুগত্য ধরে রাখতে কতদূর যাওয়া যেতে পারে, এটা নিয়ে বিজেপির মধ্যে একটা অন্তর্নিহিত সমস্যা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈচিত্র
যুক্তরাষ্ট্রীয় মাত্রা বিচার করলে বলা যায়, আমরা এই নির্বাচন পর্যায়ে সবেমাত্র এই বিষয়টির গুরুত্বের একটা নির্ধারক স্বীকৃতি দেখেছি। ভারতের বিশাল আয়তন, স্থানিক ও ভৌগোলিক ইতিহাসের বিভিন্নতা, একইসঙ্গে এদেশের জাতিগত, ভাষাগত, সংস্কৃতিগত এবং সামাজিক স্তরে বিপুল বৈচিত্র, এগুলিই নিশ্চিত করে যে আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলির প্রভাব থেকেই যাবে।
নির্বাচনী স্তরে সব ধরনের প্রতিযোগীদের নিশ্চিহ্ন করা কিংবা তাদের অধীনস্থ করে ফেলার একটা দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা বিজেপির রয়েছে। এর মধ্যে বিজেপি সবচেয়ে বেশি টার্গেট করেছে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং মূলধারার বামপন্থীদের। কারণ এই দুই শক্তি কখনই বিজেপির সঙ্গে হাত মেলাবে না। গত কয়েক দশক ধরে, মনে হচ্ছিল বিজেপির বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করার প্রকল্পটি সফল হচ্ছে। কারণ বেশি বেশি রাজ্যে তারাই হয়ে উঠেছে প্রধান শক্তি।
অনেকগুলি আঞ্চলিক দল যারা মোদীর সঙ্গে সহযোগিতা করেছে তারা দেখেছে তারা নিজেরা ক্রমশ শক্তি খুইয়ে দুর্বল হয়েছে, কারণ বিজেপি তাদের সামাজিক ও নির্বাচনী সমর্থনের ভিত গ্রাস করে নিয়েছে। আবার বৃহৎ আকারে দলত্যাগের মাধ্যমে এই সব দলগুলির অনেক প্রাক্তন নেতা বেশি ক্ষমতাধর (এবং বেশি ধনী) দলে যোগ দিয়েছে। তবে এই সব আঞ্চলিক দলগুলি একথাও উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, উল্লেখযোগ্যভাবে ওজনদার আঞ্চলিক শক্তি হয়ে যদি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয় তাহলে বিজেপির আলিঙ্গনে আত্মসমর্পণ করা চলবে না। আদৌ কোনও গুরুতর মতাদর্শগত বা নীতিগত পার্থক্য নয়, বরং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিবেচনাই হল আসল চাপ, যা এই দলগুলিকে বিজেপির থেকে পৃথক করে রেখেছে।
এই দলগুলির সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করে এবং যে রাজ্যে যে দল বেশি শক্তিশালী সেখানে তাদের প্রাধান্য মেনে নিয়ে জাতীয় কংগ্রেস সামগ্রিকভাবে লাভবান হয়েছে। আগের নির্বাচনের চেয়ে কংগ্রেস এবার অনেক কম আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। তাদের ভোটও বেড়েছে খুব কম। অথচ তাদের আসন ২০১৯-এর ৫২ থেকে এবার নাটকীয়ভাবে বেড়ে হয়েছে ১০০।
এখন সংসদে বিরোধীদের নেতৃত্ব দেবে কংগ্রেসই। এখন সংসদে নিজেদের ইচ্ছামতো আইন ও ব্যবস্থাসমূহ পাস করানোটা বিজেপির পক্ষে আরও কঠিন হবে। উপযুক্ত সংসদীয় রীতিনীতির ওপর তারা বুলডোজার চালিয়ে চলে যেতে পারবে না, যেটা এর আগে তারা করতে পেরেছিল।
এরপর তাহলে কী?
বিদেশনীতি বিষয়ক সমস্যাগুলির অভিমুখ বিজেপিই ঠিক করবে। অতএব বিষয়টা আপাতত ছেড়ে রাখা যাক। আসলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। মোদী নিশ্চয়ই এনডিএ-কে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবেন।
বিজেপির আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাটা বেশ কঠিন ব্যাপার হবে। বিশেষ করে যখন এই মিত্রেরা বিহার ও অন্ধ্রের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে এক ধরনের বিশেষ প্যাকেজ উপহার পাওয়ার জন্য চাপ দেবে। এর ফলে একটা মাত্রায় কিছুটা বিবাদ-বিতর্ক তো হবেই, কারণ ইন্ডিয়া ব্লকের সঙ্গে থাকা (এমনকি এনডিএ-এর সঙ্গে থাকা) দলগুলির রাজ্য সরকারও বিশেষ দুই শরিক দলের সরকারের সঙ্গে এধরনের বিশেষ বোঝাপাড়ার জেরে অসন্তুষ্ট হবে।
ইন্ডিয়া ব্লক চেষ্টা করবে ঐক্যবদ্ধ থাকার। সেটাও খুব সহজ হবে না। বিজেপি বিরোধিতাই এই জোটকে ঐক্যবদ্ধ রাখার মূল শক্তি ছিল এবং থাকবে। নির্বাচন যখন আসছে তখন এই ধরনের শত্রুতামূলক মনোভাব খুব শক্তিশালী বন্ধন হিসাবে কাজ করে। কিন্তু ভোটের পর ততটা শক্তিশালী থাকে না।
এনডিএ-তে বিজেপির একার ওজনই পাঁচ ভাগের চার ভাগ। অন্যদিকে ইন্ডিয়া ব্লকে কংগ্রেসের ওজন পাঁচ ভাগের দু’ভাগ। আরও বেশি সুবিধা দিতে সরকারি সম্পদও কংগ্রেসের হাতে নেই। আলাদাভাবে কিংবা অন্যদের সঙ্গে একত্রে, বিরোধী দলগুলির হাতে এত টাকা নেই যে তা বিজেপির টাকার সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে।
বড়সড় দলত্যাগ ঘটিয়ে বিরোধীদের জিতে নেওয়া বা তাদের বিভাজিত করে দেওয়াটা এখন মোদীর পক্ষে আরও কঠিন হবে ঠিকই, তবে আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে চোখের আড়ালে বোঝাপড়া করে মোদী সবকিছু গুছিয়ে নিতে পারেন। এর ফলে মোদীর নীতির বিরোধিতায় বার বার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার যে তাগিদ, বিরোধীদের সেই প্রয়াস দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
এই বছরের শেষে তিনটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন হবে। এর মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা, যেখানে বিজেপির ফল খুব খারাপ হয়েছে। এছাড়া রয়েছে ঝাড়খণ্ড যেখানে বিজেপি ভাল ফল করেছে। এই সব বিধানসভার নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল যাই হোক না কেন, তা হয় এনডিএ নতুবা ইন্ডিয়া ব্লককে আরও উৎসাহ দেবে।
এই বছরের বাকি ছ’মাস হতে চলেছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই ৬ মাসে দেখা যাবে নীতি নিয়ে সংঘাত– যার মাত্রা, গভীরতা ও চূড়ান্ত ফল কী হবে তার আগাম ভবিষ্যৎবাণী করা এখন কঠিন। এছাড়াও সক্রিয় হবে আরেক গতিশীলতার শক্তি।
শেষ পর্ব আগামীকাল
সম্পাদিত ও সংক্ষেপিত
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
ঋণ: জ্যাকোবিন
প্রকাশের তারিখ: ২৩-জুন-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
