সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মোদীর ভাষণ মানুষের কাছে শোনাচ্ছে আজগুবির মতো
সীতারাম ইয়েচুরি
চার-দফা নির্বাচন হয়ে গিয়েছে। আজ পঞ্চম-দফা ভোটের পথে দেশ। নির্বাচনী প্রচারে মোদী ও বিজেপি প্রতিদিনের জীবন-জীবিকার ইস্যু থেকে মানুষের নজর ঘোরাতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু সে কাজে তাদের সাফল্য মিলছে না। বলছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। আরও বলেছেন, ভোটদাতারা এখন কথা বলছেন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে। প্রতিদিনের সমস্যাগুলি নিয়ে। এখন যা পরিস্থিতি, তাতে স্রেফ টিঁকে থাকার জন্যই ৯০ শতাংশ মানুষকে ধার করতে হচ্ছে। গত শতকের নয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে কোয়ালিশন বা জোট গঠনের কাজে একেবারে প্রথম সারিতে রয়েছেন তিনি। চার-দফা ভোটের পর এবারের লোকসভা নির্বাচন সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ণ এক সাক্ষাৎকারে দ্য হিন্দু পত্রিকাকে জানিয়েছেন ইয়েচুরি।

চার-দফা ভোটের পর মনে হচ্ছে বিরোধী দলগুলি বেশ আশাবাদী। তারা বলছে নির্বাচনের মোড় ঘুরে গেছে তাদের অনুকূলে। এই দাবির ভিত্তি কী?
এই ধরনের দাবির ভিত্তি হল, এবার বিজেপির পক্ষে ভোটদানের ক্ষেত্রে কোনও বড় ঢেউ দেখা যায়নি। গত দুটো নির্বাচনেই সেরকম ঢেউ ছিল বড় ফ্যাক্টর। এটা ছিল প্রথম লক্ষণ। দ্বিতীয়ত, প্রচার চলাকালীন প্রতিদিনের সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপি যা যা ইস্যু সামনে আনার চেষ্টা করেছেন, তার কোনওটাই সফল হয়নি। এই সমস্ত প্রচার— যেমন, আপনার সম্পত্তি ছিনিয়ে নিয়ে মুসলিমদের দিয়ে দেবে, আপনার সংরক্ষণ কেড়ে নিয়ে মুসলিমদের দিয়ে দেবে, মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেবে— সবটাই মানুষের কাছে একটা বুজরুকির পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সাধারণ মানুষ বলছেন জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কথা, জীবন-জীবিকার কথা, বলছেন প্রতিদিনের সমস্যার কথা। ভাবতে পারেন, টিঁকে থাকার জন্য ৯০ শতাংশ মানুষকে এখন ধার করতে হচ্ছে! পরিবারের সঞ্চয় এক ঐতিহাসিক মাত্রায় তলানিতে পৌঁছেছে। একইভাবে পরিবারের ঋণও ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছে। মানুষের টিঁকে থাকার জন্য এগুলিই সত্যিকারের সমস্যা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এসব ইস্যুর ধারেকাছে ঘেঁষছেন না এবং তজ্জনিত ক্ষোভ বিরোধীদের সাহায্য করছে। তবে ইন্ডিয়া ব্লকের দলগুলির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে বিজেপির প্রচারের বিষয়গুলির কারণে।
বিরোধীদের মতানুসারে কোন্ কোন্ রাজ্যের ফল অন্যরকম হতে পারে?
বিজেপির আসন অনেক রাজ্যেই কমবে। দক্ষিণ থেকে শুরু করুন। কর্ণাটক এমন একটা রাজ্য যেখানে বিজেপি প্রায় কিছু করতেই বাকি রাখেনি (২০১৯ সালে ২৮ আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছিল ২৫টি)। ওখানে আসন কমবে। মহারাষ্ট্রেও বিজেপিকে বেশ কিছু ক্ষতির ধাক্কা সামলাতে হবে। এমনকি গুজরাটেও বিজেপির আসন কমবে। রাজস্থানেও নিশ্চিতভাবেই ওদের ক্ষতি হবে। কংগ্রেস ও আপ হাত মেলানোয় হরিয়ানায় বিরোধীরা এগোবে। উত্তরপ্রদেশেও ক্ষতি সইতে হবে বিজেপিকে, এবং অবশ্যই বিহারে গত বার যত আসন জিতেছিল নিশ্চিতভাবেই এবার ওরা সেখানে ততগুলি আসন পাবে না (২০১৯ সালে রাজ্যের ৪০ আসনের মধ্যে এনডিএ পেয়েছিল ৩৯টি আসন)। দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলেও বিজেপির আসন কমবে। বাংলায় গতবার বিজেপি আসনের সংখ্যা বেড়েছিল। এবার তার চেয়ে বেশি আসন ওরা পাবে না।
অনেকে ২০০৪ এবং ২০২৪ এর মধ্যে সাদৃশ্য টানছেন। ২০০৪ সালে ৬১টি আসন পেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল বামেরা। এখন বামেরা বেশ ভালরকম দুর্বল। এমনকী দুর্বল পশ্চিমবঙ্গেও।
ব্যাপারটা হুবহু ২০০৪ এর মতো হতে পারে না। তবে তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার পরিস্থিতির সাদৃশ্য রয়েছে এই অর্থে যে, ২০০৪ সালে পুরো লড়াইটা হয়েছিল শাইনিং ইন্ডিয়া, ফিল গুড ফ্যাক্টর ও কে (অটল বিহারী বাজপেয়ীর বিরুদ্ধে) তোমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী— এসব স্লোগানের ভিত্তিতে। আর আজকে (ওদের প্রশ্ন হল) মোদীর বিকল্প কে? এবং (ওদের দাবি হল) আমরা অর্থনীতিতে বিশ্বগুরু হয়ে উঠছি ইত্যাদি। এই সমস্ত অহংকারের পিছনে আসল সারবস্তু কিছুই নেই। ওরা যা দাবি করছে এবং বাস্তবে আসলে যা ঘটছে— এদুটো মিলছে না। ২০০৪ সালে এটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, ২০২৪ সালেও একই রকম ফ্যাক্টর কাজ করছে।
কিন্তু নির্বাচনটা হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রপতি ধাঁচের এবং সাধারণ মানুষ জানতে চান মোদীর বিপরীতে বিরোধীপক্ষের মুখ কে? তাহলে সমস্যা একটা আছে বলে মনে হচ্ছে?
আসলে এটা এমন একটা বিষয় যা কার্যত ভারতীয় রাজনীতিতে বহু বছর ধরে রয়েছে। ২০০৪ সালেও আপনাদের এই সমস্যাটা ছিল। কিন্তু আপনারা একজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছিলেন। তিনি ডক্টর মনমোহন সিং। তিনি গোটা একটা দশক ধরে দেশ চালিয়েছিলেন। আমাদের যে ন্যারেটিভে ফিরতে হবে সেটা হল, আপনি প্রথমে আপনার সাংসদকে নির্বাচন করছেন, এবং তারপর সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদেরা মিলে তাঁদের একজন নেতা নির্বাচিত করবেন। আমি মনে করি না যে, কে মোদীর বিকল্প - সেই বিষয়টা, বিকল্প নীতি কী হবে তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দিতে আমি প্রায়ই বলে থাকি যে, দেশটার নেতা (লিডার) নয়, দরকার আসলে নীতির (পলিসি)।
আপনার মতে, এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইস্যু কোনগুলি?
আমার মতে, সবচেয়ে বড় ইস্যুগুলি হল জনগণের প্রতিদিন বেঁচে থাকার মতো পরিস্থিতি এবং তাদের উদ্বেগ।
সেগুলিকেই পাশ কাটিয়ে গেছে বিজেপি এবং তার বদলে চেষ্টা চলছে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলার - এই আশায় যে, হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক ভোট সংহত হলেই ওরা জিতে যাবে। মেরুকরণ কাজ করবে কিন্তু তার প্রভাব বেঁচে থাকার ইস্যুগুলিকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারবে না।
ইন্ডিয়া ব্লকের সবচেয়ে বড় দল কংগ্রেস। বিজেপির সঙ্গে সামনাসামনি টক্করে এই দলের রেকর্ড খুবই হতাশাজনক। আপনি কি মনে করেন ইন্ডিয়া ব্লকের আঞ্চলিক দলগুলি এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারবে?
হ্যাঁ, আঞ্চলিক দলগুলিই এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। বিহারের দিকে তাকান। ওখানে আসল কাজটা তো আঞ্চলিক দলই করছে। মহারাষ্ট্রে মূলত মহারাষ্ট্র-ভিত্তিক দলগুলি বিজেপির সঙ্গে টক্কর দিচ্ছে। কর্ণাটক বা তেলেঙ্গানায়, কংগ্রেসকে দেখা হয় কর্ণাটক কংগ্রেস বা তেলেঙ্গানা কংগ্রেস হিসাবে। ওই দুই রাজ্যে কংগ্রেস এমন এক ধরনের ভূমিকা পালন করছে যা কিছু রাজ্যে আঞ্চলিক দলগুলি করে। বেশিরভাগ জায়গায়, আঞ্চলিক দলগুলি, কংগ্রেস এবং বামেদের সমন্বিত শক্তি ভালই কাজ করেছে।
বিরোধীরা বলছেন সংবিধান, গণতন্ত্র এবং তপশিলি জাতি, জনজাতি এবং ওবিসিদের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আজ এই সবকিছুই বিপন্ন। কীসের জন্য বিরোধীরা একথা বলছেন?
আমাদের সংবিধান বলে আমরা একটা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র। এটাই দেশের চরিত্র। কখনও কোথাও দেখেছেন ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, ভারত সরকার, সকলে মিলে একটা মন্দিরের উদ্বোধনে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়েছে? সংবিধান আমাদের দিয়েছে সেই মৌলিক অধিকার যার সাহায্যে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস কী হবে তা বেছে নিতে পারেন। আমরা সেই অধিকারকে সম্মান করি ও রক্ষা করি। কিন্তু রাষ্ট্র অন্য সব ধর্মকে বাদ দিয়ে একটা মাত্র বিশেষ ধর্মকে বেছে নিতে পারে না কিংবা সেই ধর্মের হয়ে প্রচার করতে পারে না। অথচ এখন ঠিক এটাই হচ্ছে এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতিগুলিকে একেবারে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে লাভ জিহাদ, গোরক্ষা কিংবা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিষয়ে যে সব আইন চালু করা হয়েছে, সেগুলির উদ্দেশ্য হল, সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিপেক্ষতার ভিত্তিকে লক্ষ্য করে আক্রমণ করা। গণতন্ত্রের কথাই ধরুন। চার্জশিট না দিয়ে কত বছর ধরে লোকজনকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে? যদি সব ধরনের বিরুদ্ধ মতকেই দেশ-বিরোধী হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আপনার নাগরিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকারগুলির কিছু কি আর অবশিষ্ট থাকে?
সংরক্ষণের প্রশ্নে বলা যায়, ওরা হয়ত সরাসরি এগুলোর ওপর হাত দেয়নি। কিন্তু যখনই রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের উদ্যোগগুলির, কিংবা শিক্ষার বেসরকারিকরণ করা হচ্ছে, তখনই সংরক্ষণের প্রভাবের বিষয়টি একেবারে অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হচ্ছে।
এরপরও বিরোধী নেতাদের জেলে পুরে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলিকে আয়কর নোটিস পাঠানো হচ্ছে যাতে তারা নির্বাচনে জোরদার লড়াই দিতে না পারে। এসবই সংবিধানের গুরুত্ব খারিজ করা ছাড়া আর কিছুই নয়।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেস-বাম জোটের মধ্যে অনেক তিক্ততা রয়েছে। এটা কি বিজেপিকে সাহায্য করবে না?
পশ্চিমবঙ্গে যে তিক্ততা রয়েছে তার উৎস হচ্ছে রাজনীতি। বাংলায় আমরা দেখেছি কীভাবে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছে, এবং কীভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা দেখেছি সেখানে কী ধরনের হিংসা হচ্ছে এবং দুর্নীতি কত গভীরে পৌঁছেছে। বামেরা এসবের বিরুদ্ধে লড়ছে। সেই লড়াই না করার বিকল্প হল তৃণমূলে যোগ দেওয়া। যে মুহূর্তে বাংলায় বাম, কংগ্রেস ও তৃণমূল এক জায়গায় আসবে, সেই মুহূর্তে লাভ হবে বিজেপির। কারণ প্রতিষ্ঠান-বিরোধী সব ভোট বিজেপির বাক্সে জমা হবে। এর মানে, ইন্ডিয়া ব্লক এক জায়গায় এলে বাংলায় বিজেপির লাভ আরও বেশি হবে।
ইয়েচুরির সাক্ষাৎকারের সম্পাদিত কিছু অংশ
দ্য হিন্দু, ১৭ মে, ২০২৪
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
আরও পড়ুন: মোদী-শাসনে বিপন্ন সংবিধান, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা
প্রকাশের তারিখ: ২০-মে-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
