Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

অক্টোবর বিপ্লব: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অনপনেয় স্বাক্ষর ৩

সীতারাম ইয়েচুরি
অক্টোবর বিপ্লবের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, ভারতে বলশেভিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় ব্রিটিশরাজ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল! ভারতে সদ্য গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা একের পর এক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। এর মধ্যে ছিল পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২২–২৩), কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪), পরবর্তীকালে বিখ্যাত মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা সহ কমিউনিস্টদের নিপীড়ন করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা আরও বহু অনুরূপ মামলা...
October Revolution Imprint on freedom struggles III

দ্বিতীয় পর্বের পর...

ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলন: বিভিন্ন বিপ্লবী ধারার সমন্বয়

অক্টোবর বিপ্লব ভারতের গণআন্দোলনকে দুই ভাবে প্রভাবিত করেছিল। একদিকে, জাতীয় আন্দোলনকে আরও বৈপ্লবিক করে তোলা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণআন্দোলন গড়ে তোলার কৌশল সম্পর্কে ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের নেতাদের প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে, অক্টোবর বিপ্লবের প্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে ভারতের অভ্যন্তরে তথা ব্রিটিশ সরকারের নিপীড়নের কারণে বিদেশে আশ্রয় নেওয়া বিভিন্ন সক্রিয় বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলি একত্রিত হয়ে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই ভারতীয় বিপ্লবীরা কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান, জার্মানি, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে কাবুলে স্বাধীন ভারতের একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। অক্টোবর বিপ্লবের পরপরই, ১৯১৯ সালের তৃতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধের পর আফগানিস্তান একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলি রাশিয়ার বলশেভিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। ১৯১৯ সালে এদের একটি প্রতিনিধিদল মস্কোর ক্রেমলিনে লেনিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। 

রাজা মহেন্দ্র প্রতাপের নেতৃত্বে পরিচালিত কাবুলের ইন্ডিয়ান রিভোলিউশনারি এ্যাসোসিয়েশন (Indian Revolutionary Association)-এর উদ্দেশ্যে লেনিনের প্রেরিত বার্তাটি ছিল: “রাশিয়ার শ্রমজীবী জনগণ ভারতের শ্রমিক ও কৃষকের জেগে ওঠার ঘটনাকে গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করে চলেছে। শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন ও শৃঙ্খলা, তাঁদের অধ্যবসায় এবং বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণীর সাথে তাঁদের সংহতি—এসবই চূড়ান্ত সাফল্যের নিশ্চিত ভিত্তি। আমরা মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যে নিবির ঐক্যকে স্বাগত জানাই। আমরা আন্তরিকভাবে চাই, এই ঐক্য যেন বিশ্বের সমস্ত নিপীড়িত মানুষের মধ্যে প্রসারিত হয়। কারণ, ভারত, চীন, কোরিয়া, জাপান, পারস্য ও তুরস্কের শ্রমিক-কৃষকরা যখন একসাথে হাতে হাত মিলিয়ে মুক্তির অভিন্ন লক্ষ্যে এগিয়ে যাবেন, একমাত্র তখনই শোষকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হবে। মুক্ত এশিয়া দীর্ঘজীবী হোক!”

অক্টোবর বিপ্লবের বিজয়ের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যেই লেনিন বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির সচিব এস. জে. ওল্ডেনবার্গকে বলেছিলেন: “ উদাহরণ হিসেবে আপনার নিজের বিষয়টির (ভারততত্ত্ব) কথাই ধরুন। আপনার মনে হতে পারে, এই বিষয়গুলি আমাদের থেকে অনেক দূরের, অথচ একই সঙ্গে এগুলি আমাদের অত্যন্ত কাছেরও। ... জনগণের কাছে যান, শ্রমিকদের কাছে যান, তাঁদের কাছে ভারতের ইতিহাসের কথা বলুন— ব্রিটিশদের দ্বারা পরাধীন ও নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ দুর্ভাগা মানুষের শতাব্দীপ্রাচীন করুণ দুঃখ-দুর্দশার কাহিনি তাদের শোনান। তারপর আপনি দেখবেন, তাঁরা কীরকম প্রতিক্রিয়া দেন। আর তাঁদের সঙ্গে এই যোগাযোগ থেকেই আপনারাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নতুন বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকর্ম ও গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পাবেন।”

বার্লিন থেকে সক্রিয় বিপ্লবী গোষ্ঠীটি রাশিয়ার সঙ্গে স্বাধীনভাবে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল। আফগানিস্তানে সক্রিয় বিপ্লবী এবং অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিতভাবে তারা ১৯২০ সালের অক্টোবর মাসে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পার্টি প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিন পরেই, ১৯২১ সালে আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (AICC) অধিবেশনে পার্টির পক্ষ থেকে মৌলানা হাসরত মোহানি ও স্বামী কুমারানন্দ ব্রিটিশ শাসন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। গান্ধিজি তখন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর এক দশক পরে, ১৯৩০ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত AICC-র অধিবেশনে ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর প্রস্তাব গৃহীত হয়।

অক্টোবর বিপ্লবের প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী ছিল যে, ভারতে বলশেভিক অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় ব্রিটিশরাজ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল! ভারতে সদ্য গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা একের পর এক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। এর মধ্যে ছিল পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২২–২৩), কানপুর ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪), পরবর্তীকালে বিখ্যাত মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা সহ কমিউনিস্টদের নিপীড়ন করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা আরও বহু অনুরূপ মামলা।

গদর আন্দোলন

এদিকে, অক্টোবর বিপ্লবের চার বছর আগেই, ১৯১৩ সালের ১লা নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে গদর আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতের দুর্বিষহ জীবনযাপনে অতিষ্ঠ হয়ে বহু মানুষ জীবিকার সন্ধানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত পূর্ব এশিয়ার মালয়, ফিলিপাইনস, হংকং, জাপান প্রভৃতি দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এইসব দেশের সেসময় তেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি না থাকায় তাঁরা কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সেই সময় এই দুই দেশে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটছিল। কিন্তু সেখানেও এই অভিবাসীদের চরম বর্ণবৈষম্য ও অবজ্ঞার শিকার হতে হয়। চীনা বা জাপানি অভিবাসীদের সাথে ওই দুই দেশ যেরকম ব্যবহার করত, ভারতীয়দের প্রতি তাদের আচরণ ছিল স্পষ্টতই ভিন্ন। প্রধানত পাঞ্জাব থেকে আসা এই অভিবাসীরা স্বাভাবিকভাবেই উপলব্ধি করতে শুরু করেন যে, ভারতীয়দের প্রতি এই বৈষম্যমূলক ও বর্ণবাদী শোষণের মূল কারণ হলো ভারতের ঔপনিবেশিক পরাধীনতা। ফলে, নিজেদের প্রতি সংঘটিত অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁদের সংগ্রাম স্বাভাবিকভাবেই ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষার সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যায়। এই অভিবাসীদের পাশাপাশি, দেশত্যাগ করে নির্বাসিতের জীবন বেছে নেওয়া অন্যান্য বিপ্লবী এবং উচ্চশিক্ষার জন্য আসা ব্যক্তিরাও এই ধরনের সংগ্রামে যোগ দেন।

কানাডাগামী কোমাগাতামারু জাহাজের ভারতীয় অভিবাসীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা হয় এবং তাঁদের বলপূর্বক দেশে ফিরতে বাধ্য করা হয়। ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশরা গদরপন্থীদের কট্টর ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবী হিসেবে ধরে নিয়ে বিনা প্ররোচনায় গুলি চালায়, যাতে বহু মানুষ নিহত হন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা গদরপন্থীরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ভারতে ফিরে আসেন। ১৯১৫ সালের এই অভ্যুত্থান ব্রিটিশরা নির্মমভাবে দমন করে। এরপর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একাধিক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়- একত্রে যাদের বলা হয় লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলাগুলির পরিণতিতে ৪৬ জন গদর বিপ্লবীকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং ৬৪ জনকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের সাজা দেওয়া হয়।

১৯১৫ সালের গদর বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার অল্প কিছুদিন পরেই, ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের বিজয়ের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতন একটি ঘটনা ঘটে। কমরেড লেনিন ও সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার ঔপনিবেশিক দেশগুলির স্বাধীনতা প্রতি আন্তরিক সমর্থন গদর আন্দোলনের বিপ্লবীদের গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তাঁদের মধ্যে দুজন—ভাই সন্তোখ সিং ও রতন সিং—কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের চতুর্থ কংগ্রেসে প্রতিনিধি ও পর্যবেক্ষক হিসেবে যোগ দেন। রুশ বিপ্লবে শ্রমিক-কৃষক ঐক্যের সাফল্য প্রত্যক্ষ করার পর ভারতীয় কৃষকদের সংগঠিত করার প্রয়োজনীয়তা একান্ত অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ভাই সন্তোখ সিং দুটি লক্ষ্য সামনে রেখে ভারতে ফিরে আসেন— তাঁর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল জনগণের বিপ্লবী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করা – যে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তিনি ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাঞ্জাবি ও উর্দু ভাষায় কীর্তি (শ্রম) পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন।  অন্যদিকে তাঁর আরেক লক্ষ্য ছিল কৃষক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া। ভগৎ সিংও কয়েক মাস এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি গদর আন্দোলনকে ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রথম প্রকৃত বিপ্লবী সংগ্রাম বলে মনে করতেন। ভগৎ সিংয়ের কাছে এই পত্রিকা সম্পাদনা ছিল নতুন পদ্ধতিতে বিপ্লবী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম—রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার এবং কৃষক ও শ্রমিকদের সংগঠিত করার মাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো।

লেনিন ও সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার সক্রিয় সহযোগিতায় বহু তরুণ বিপ্লবীকে রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রাচ্যের শ্রমজীবী মানুষের বিশ্ববিদ্যালয়-এ (University of the Toilers of the East) পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয়। এই শিক্ষার্থীদের শেষ দলটি ১৯৩৬ সালে ভারতে ফিরে আসে এবং দেশে ফিরেই বিপ্লবী সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ১৯৩৬ সালে সারা ভারত কিষান সভা (AIKS) গঠনের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ভারতীয় বিপ্লববাদের বিভিন্ন ধারা- বাংলার ‘অনুশীলন’ ও ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীর মতন গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী বিপ্লবী দলগুলি, বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির উদীয়মান শ্রমিকশ্রেণির নেতৃবৃন্দ—যাঁরা গ্রামীণ কৃষকদের সামন্তবাদ-বিরোধী সংগ্রামের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তুলেছিলেন, ১৯২০ সালে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর,  ক্রমশ পরস্পরের কাছাকাছি আসে এবং অবশেষে ১৯২৫ সালে তৎকালীন শিল্পনগরী কানপুরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়। এর ফলে এই সমস্ত বিপ্লবী ধারার ঐক্য আরও সুদৃঢ় হয় এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, অক্টোবর বিপ্লবের পরপরই ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে ভারতে শ্রমিকশ্রেণির বিভিন্ন আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কলকাতা, বোম্বাই ও আহমেদাবাদের মতো বিভিন্ন শ্রমিক শ্রেণীর প্রাণকেন্দ্রে হাজার হাজার শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেন। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC), যা ভারতে সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। AITUC এবং ১৯৩৬ সালের পর থেকে AIKS—উভয়ই ভারতীয় সমাজের শোষিত অংশগুলিকে, বিশেষত শ্রমিক ও কৃষকদের সংগঠিত করে স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল ধারায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি মূলত বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের শাসকগোষ্ঠী ও সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত শোষক শ্রেণিগুলির নেতৃত্বের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত করার কাজে ব্যস্ত ছিল। অন্যদিকে, শোষিত জনগণের বিপুল অংশকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সামিল করার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল কমিউনিস্টরাই। প্রকৃতপক্ষে, জমির অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সংগ্রাম এবং জমিদারদের হাতে কৃষকদের শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন- যার অন্যতম উদাহরণ ছিল ১৯৪০-এর দশকের শেষভাগে তেলেঙ্গানার সশস্ত্র কৃষক সংগ্রাম সহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের এ ধরনের লড়াই, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনগুলির ফলেই স্বাধীন ভারতে জমিদারি প্রথা বিলোপের প্রশ্নটি ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের আলোচ্যসূচিতে স্থান পায়।

সুতরাং, অক্টোবর বিপ্লবকে এমন একটি ঘটনা হিসেবে দেখা উচিৎ, যা ভারতীয় জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের চরিত্রকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছিল। একই সঙ্গে, দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংগ্রামকে, অর্থাৎ ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এই বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে জনগণের অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত করার এই সংগ্রামই বর্তমানে ভারতের চলমান সংগ্রামগুলিকে সংজ্ঞায়িত করে। অক্টোবর বিপ্লবের আদর্শ ও অভিজ্ঞতা আজও এই সংগ্রামগুলিকে অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করে চলেছে। এটি ভারতীয় বিপ্লবের গণতান্ত্রিক পর্যায়, যার লক্ষ্য হলো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ ছোট অংশীদার হিসেবে ভারতের অবস্থানের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলা এবং ভারতীয় শাসকশ্রেণির সঙ্গে জমিদার শ্রেণির জোটের অবসান ঘটানো। এই লক্ষ্য দুটি একমাত্র তখনই পূরণ হতে পারে, যখন বর্তমান ভারতীয় বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া ও জমিদার শ্রেণির জোটের শ্রেণিশাসনে পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে এমন একটি ভারতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, যার নেতৃত্বে থাকবে শ্রমিক শ্রেণি এবং যার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ থাকবে জনগণের অন্যান্য সমস্ত শোষিত অংশ। এর মধ্য দিয়েই ভারতের জনগণের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পর্যায় সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

ভারতে বিপ্লবী আন্দোলনগুলিকে শক্তিশালী করার এবং বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাস্তব পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জগুলি মোকাবিলায় যে সমস্ত পদ্ধতি গ্রহণ করছে, সেখান থেকে যথাযথ শিক্ষা নেওয়ার জন্য আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিশ্বায়নের বর্তমান পর্যায়ে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ ও তার পরিণতিতে ঘটে চলা ব্যাপক সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং বিশেষত হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলির সংহতি বৃদ্ধি ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্রতর হওয়ার মধ্য দিয়ে ভারতীয় রাজনীতির ক্রমশ দক্ষিণপন্থার দিকে সরে যাওয়া।

তাই আমাদের পার্টি কংগ্রেসগুলিতে সময়ে সময়ে সঠিক কৌশলগত পথ নির্ধারণ করা অপরিহার্য, যাতে আমরা আমাদের কৌশলগত লক্ষ্যগুলির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যেতে পারি এবং ভারতীয় জনগণের স্বাধীনতা ও শোষণমুক্তির সংগ্রামকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। এই লক্ষ্য পূরণের সংগ্রামে অক্টোবর বিপ্লবের প্রেরণা ভারতে আজও এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে।

লেখাটি প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে ডিসেম্বর মাসে ফ্রন্টলাইন পত্রিকার রাশিয়ার বিপ্লবের ১০০তম বার্ষিকী সংক্রান্ত বিশেষ সংখ্যায়।  
ভাষান্তর: অভিজ্ঞান মিত্র


প্রকাশের তারিখ: ১৪-অক্টোবর-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস ও দর্শন বিভাগে প্রকাশিত ১৭৫ টি নিবন্ধ
১৪-অক্টোবর-২০২৬

১৩-অক্টোবর-২০২৬

১২-অক্টোবর-২০২৬

১১-অক্টোবর-২০২৬

১১-অক্টোবর-২০২৬

২৬-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০৭-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০৩-সেপ্টেম্বর-২০২৬

০২-সেপ্টেম্বর-২০২৬

২৭-আগস্ট-২০২৬