সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বিচার ব্যবস্থায় অশুভ প্রবণতা
ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
আদালত যখন হিন্দুত্বের যুক্তি কাজে লাগাতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে বিপদ মাথার ওপর এসে হাজির হয়েছে– এর মানে, জল ইতিমধ্যে আমাদের মাথা ছাপিয়ে উঠে এসেছে। এখন যদি আমরা এই বিপদের মোকাবিলা করতে না পারি, যদি আমরা একে প্রতিহত করতে না পারি, তাহলে আমাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হবে।

বোম্বে হাইকোর্টের দু’জন বিচারপতির মন্তব্য গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। মাননীয় বিচারপতি রবীন্দ্র ঘুঘে এবং বিচারপতি গৌতম অনখড় তাঁদের স্ব-উদ্ভাবিত প্রজ্ঞায় একেবারে গর্জন করে উঠেছেন। বোম্বে হাইকোর্টের বেঞ্চে বসে তাঁরা কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র একটি আর্জি খারিজ করে দিয়েছেন। ইজরায়েল গাজায় যে ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে– আদালতের আর্জিতে তার প্রতিবাদ জানানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছিল।
বোম্বে হাইকোর্টের বেঞ্চ থেকে আর্জিকারীদের উদ্দেশ্যে দুই বিচারপতির বক্তব্য: ‘আগে আমাদের নিজেদের দেশের নাগরিকদের জন্য দেশপ্রেমের প্রমাণ দিন।’ একইসঙ্গে দেশপ্রেমের সুরে যোগ করেছেন, ‘আমাদের দেশে কাজ করার মতো অনেক ইস্যু আছে। আমরা এরকম কিছু চাই না। দুঃখের সঙ্গে বলছি আপনাদের দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে। গাজা আর প্যালেস্তাইনে কী হচ্ছে সেদিকে তাকিয়ে রয়েছেন। আর এখানে কী হচ্ছে তা চেয়েও দেখছেন না। নিজেদের দেশের জন্য কিছু করছেন না কেন? নিজেদের দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন।’ সেইসঙ্গে বলেছেন, ‘আমাদের দেশে অনেক ইস্যু আছে। আমরা এরকম কিছু চাই না। দুঃখের সঙ্গে বলছি আপনাদের কারোরই দূরদৃষ্টি নেই। গাজা আর প্যালেস্তাইনের ইস্যুর দিকে দেখছেন। নিজেদের দেশের দিকে দেখুন।’ আরও যোগ করেছেন: ‘দেশপ্রেমিক হোন, এটা দেশপ্রেম নয়।’
নিজেদের স্বঘোষিত-নীতিনিষ্ঠতায় মুগ্ধ হয়ে তাঁরা আরও বলেছেন, ‘আপনারা জানেন না এই ইস্যুতে কী ধরনের ঝড় উঠতে পারে। হয় প্যালেস্তাইনের দিকে, নয়ত ইজরায়েলের দিকে। কেন আপনারা এমনটা করতে চান? এটা খুবই স্পষ্ট যে, আপনারা যে পক্ষের হয়ে কথা বলতে চান, আপনারা বুঝতেই পারছেন না এর ফলে আমাদের দেশের বৈদেশিক বিষয়ে কী সমস্যা তৈরি হতে পারে?’ নিজেদের জ্ঞানভাণ্ডারের আরও মণিমুক্তো ছড়িয়ে তাঁরা বলেছেন, ‘আপনারা ভারতে নথিভুক্ত সংগঠন। আপনারা তো যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা, দূষণ, পয়ঃপ্রণালী, বানবন্যা– এই সব ইস্যুতে কাজে নামতে পারেন। আমরা কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি মাত্র। এসব নিয়ে তো আপনারা প্রতিবাদ করছেন না। অথচ প্রতিবাদ করছেন এমন ঘটনা নিয়ে যা ঘটছে আমাদের দেশের থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে।’
এটা খুবই দুঃখের, মাননীয় বিচারপতিরা জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাস জানেন না। কিংবা জানেন না বিদেশ নীতির প্রশ্নে স্বাধীন ভারতের সরকারগুলির ধারাবাহিক অবস্থান। প্যালেস্তিনীয় জনগণের স্বাধীনতার বৈধ অধিকার এবং তাঁদের নিজেদের স্বদেশ পাওয়ার অধিকার, যা ইজরায়েল ধারাবাহিকভাবে অগ্রাহ্য করে আসছে, সেই দাবিগুলির প্রতি আমাদের দেশের ধারাবাহিক সমর্থন ও সংহতির বিষয়ে মাননীয় দুই বিচারপতি একেবারে চিত্তসুখে অজ্ঞ হয়ে রয়েছেন। গাজায় যে ভয়ঙ্কর গণহত্যা চলছে সেবিষয়ে বিশ্বের জনমত কোনদিকে, এবিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসের সুবিবেচনাপূর্ণ মতামত কী, কিংবা রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থার মতামতই বা কী, সেসম্পর্কে তাঁদের কোনও ধারণাই নেই। শুধু তাই নয়। গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে তাদের নিজেদের জনগণ ক্রমশ সোচ্চার হওয়ার চাপে পড়ে এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদ পুরোপুরি লঙ্ঘন করে গাজার জনগণকে দাসত্ব বরণ করতে বাধ্য করানোর জন্য তাদের অনাহারে শুকিয়ে মারার যে কুৎসিৎ ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ইজরায়েল নিয়ে চলেছে, তার বিরুদ্ধে ফ্রান্সের মতো পশ্চিমী দেশগুলি আরও বেশি বেশি সংখ্যায় পদক্ষেপ করছে, সেগুলো নিয়েও মাননীয় বিচারপতিদ্বয়ের কোনও ধারণাই নেই।
এখন ভারত সরকারও বাধ্য হচ্ছে এই গণহত্যা কতটা ভয়ঙ্কর তা স্বীকার করতে। ২০২৫-এর ২৩ জুলাই নিউ ইয়র্কে পারমানেন্ট মিশন ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ‘বিশেষ করে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অবস্থা শোচনীয়। হু-এর হিসাব অনুযায়ী, গাজায় প্রায় ৯৬ শতাংশ হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংসপ্রাপ্ত। মানবাধিকারের হাই কমিশনারের অফিস জানিয়েছে, গত ২০ মাসেরও বেশি সময় ধরে ৬ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি শিশু স্কুলে যেতে পারছে না।’
সুতরাং, এটি এমন ছিল না যে প্রতিবাদটি বিদেশ নীতির উপর ‘ধুলো উড়িয়ে’ দিয়ে যাচ্ছিল– যেমন বলেছেন বিচারপতি ঘুঘে এবং বিচারপতি অনখড়– বরং, সরকারের নিজেকেই একটি অনস্বীকার্য মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ধুলো চাটতে হচ্ছে!
মাননীয় বিচারপতি ঘুঘে এবং অনখড় শুধুমাত্র বিদেশ নীতি সম্পর্কে তাঁদের উদ্বেগ নিয়েই তাড়িত নন। আসল সমস্যা তাঁদের কমিউনিস্ট-বিরোধী মনোভাব। না হলে দু’জনেই একথা বিলক্ষণ বুঝতেন যে, জরুরি নাগরিক ইস্যু নিয়ে তাঁরা যে নিদান দিয়েছেন, একমাত্র কমিউনিস্টরা ও সিপিআই(এম) কর্মীরাই সেগুলি নিয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে মাঠে-ময়দানে, রাস্তায় আন্দোলন-সংগ্রাম করেন। তবে তার মানে এই নয় যে– স্থানীয় ইস্যুতে সক্রিয়তা– বিশ্বব্যাপী অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংহতি প্রকাশের মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করবে– যে অধিকারগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ভারতীয় সংবিধানে।
সংবিধান পরিষদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সংবিধানের বুনিয়াদি নীতিগুলিকে ব্যাখ্যা করার। পরিষদ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের সংশ্লিষ্ট ক্ষমতার রূপরেখা গড়ে দেওয়ার ওপর। সেই অঙ্গগুলি হল আইন ব্যবস্থা, নির্বাহী ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা। এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, রাষ্ট্রের অঙ্গগুলির ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণেরও ওপরেও জোর দিয়েছিল সংবিধান পরিষদ। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে আলোচনা শেষ করার সময় জোর দেওয়া হয়েছিল সংবিধানের ৫০ ধারার ওপর। সেটা ছিল বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার ধারণা সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধান। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সংবিধান পরিষদে বিতর্ক চলাকালীন ডঃ বি আর আম্বেদকার জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘নির্বাহী ব্যবস্থা থেকে বিচার ব্যবস্থাকে স্বতন্ত্র করার প্রশ্ন সম্পর্কে, আমি যেমন বলেছি, এবিষয়ে কোনও মতপার্থক্য নেই। এবং আমার বিচারে এই প্রস্তাবে, ‘আমরা যে ধারা পাশ করেছি সেই ধারায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সেটা এখন নির্দেশাত্মক নীতির অংশ হয়ে যাচ্ছে।’ বিষয়টাকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে গিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৪ মে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘এই সভায় এবিষয়ে কোনও মতপার্থক্য থাকতে পারে না যে, আমাদের বিচার ব্যবস্থা অবশ্যই নির্বাহী ব্যবস্থা থেকে স্বাধীন হবে এবং এই ব্যবস্থাকে অবশ্যই নিজেকেই যোগ্য হয়ে উঠতে হবে।’
খুবই দুঃখের বিষয় যে, এই অন্ধকার সময়ে আমরা মুখোমুখি হচ্ছি ঠিক সেইসব বিপথগামিতার লক্ষণগুলির– যা উঠে এসেছে বোম্বে হাইকোর্টের দুই বিচারপতির বক্তব্যে। তাঁদের বক্তব্যে ‘তাঁদের’ ‘নিজেকেই যোগ্য হয়ে ওঠার’ বিষয়টি সজোরে উঠে আসছে, এমনকী তা উঠে আসছে শীর্ষ আদালতেরও কিছু আদেশের মধ্যে দিয়ে। অযোধ্যা প্রশ্নে রায় কিংবা জম্মু ও কাশ্মীরকে রাজ্যের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে সেখানকার জনগণের অধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া কিংবা পিএমএলএ আইনের সংশোধনীকে সমর্থন করে ইডি-কে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতে দেওয়া, এগুলি সবই হচ্ছে অশুভ তাড়না। একেবারে নীচুতলার আদালত থেকে শীর্ষ আদালত পর্যন্ত আমরা দেখছি সেই সব ঘটনা যখন বিচার ব্যবস্থা সেইসব প্ররোচনায় পা দিচ্ছে যার মধ্যে দিয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের রূপান্তরিত করছে ‘কার্যনির্বাহী শাখা’য়, এমনকী হয়ে উঠছে ‘কমিটেড’।
ইতিহাসের শিক্ষাকে মনে না রাখার বিলাসিতা আমরা দেখাতে পারি না। তেমনটা ঘটলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির দায় আমাদেরও বহন করতে হবে। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ন্যুরেমবার্গ আইন। ১৯৩৫ সালে নাৎসি জার্মানিতে চালু করা হয়েছিল ন্যুরেমবার্গ আইন– যা আসলে ছিল একগুচ্ছ অ্যান্টিসেমিটিক আইন। এই আইন ইহুদিদের জার্মান নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছিল। জার্মানির সাধারণ জীবনের বহু পরিসর থেকে তাদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। আদালতে বিচারপ্রক্রিয়ার নিরিখে এই আইনগুলির সঙ্গে সরাসরি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। তবে বিচার পাওয়ার যে প্রক্রিয়া, তাকে দারুনভাবে প্রভাবিত করত এই আইনগুলি। কারণ আইনি ব্যবস্থাকেই ব্যবহার করে নাৎসিরা ইহুদিদের ওপর এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন চালাত। ন্যুরেমবার্গ আইনের ধারায় স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়নি কীভাবে আদালতের কার্যপ্রণালী চলবে, তবে জার্মানির আইনি ব্যবস্থায় ন্যূরেমবার্গ আইনের গভীর প্রভাব পড়েছিল। জার্মান বিচার ব্যবস্থা, অল্প কিছু উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছাড়া, নাৎসি শাসনে ইহুদি ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের সহযোগী হয়েছিল। অনেক বিচারক ও প্রসিকিউটর বৈষম্যমূলক আইন জোর করে চাপিয়ে দিয়েছিল এবং রাজনৈতিক সুবিধালাভের আশায় আইনের নীতিগুলিকে জলাঞ্জলি দিতে তারা যে প্রস্তুত তাও বুঝিয়ে দিয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত, আমরা একটা সত্যিকারের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি– যেখানে হিন্দুত্বের মতাদর্শের বিষাক্ত চরিত্র আমাদের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সাধারনতন্ত্রকে পরাভূত ও ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। এই শক্তি সারা দেশে একটা সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী ফ্যাসিস্ত শাসন চাপিয়ে দিতে চায় এবং গোটা রাষ্ট্রের রঙ বদলে দিতে চায়। এই প্রয়াস রাষ্ট্রের সবক’টি অঙ্গকে বিপন্ন করে তুলেছে– যার মধ্যে পড়ে বিচার ব্যবস্থাও। তাই একমাত্র নিজেদের সর্বনাশের ঝুঁকি নিয়েই এই শক্তিকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি।
একজন পর্যবেক্ষকের ভাষায়– ‘আদালত যখন হিন্দুত্বের যুক্তি কাজে লাগাতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে বিপদ মাথার ওপর এসে হাজির হয়েছে– এর মানে, জল ইতিমধ্যে আমাদের মাথা ছাপিয়ে উঠে এসেছে।’
এখন যদি আমরা এই বিপদের মোকাবিলা করতে না পারি, যদি আমরা একে প্রতিহত করতে না পারি, তাহলে আমাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হবে।
ঋণ: সম্পাদকীয়, পিপলস ডেমোক্রেসি
প্রকাশের তারিখ: ০১-আগস্ট-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
