Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পঞ্চায়েত ও তৃণমূলের খড়্গধারীদের উন্নয়ন

রতন খাসনবিশ
এরাজ্যে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে দৃঢ়মূল করার প্রচেষ্টা ছিল বামপন্থীদের দিক থেকে। বলা যায় যে, এবিষয়ে তাদের আছে আদর্শগত দায়বদ্ধতা। কিন্তু বাম শাসন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তন অনেকাংশেই নিঃশব্দ পরিবর্তন। কখনও তা করা হয়েছে কাঁসরঘণ্টা বাজিয়ে। এরাজ্যে গত ১০-১২ বছরে আমলাবাহিনীর বিপুল ক্ষমতায়ন ঘটেছে। সরকারি উন্নয়নের কাজ লাইন ডিপার্টমন্টের সঙ্গে ভাগাভাগিতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পিছু হঠছে।
panchayet o trinomooler khargadharider unnoyon

ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা সরকারের একটি তৃতীয় অংশ হিসাবে স্বীকৃত হয় সংবিধানের ৭৩-তম সংশোধনী গৃহীত হওয়ার পর থেকে। আমাদের দেশে  ফিনান্স কমিশন বিভিন্ন স্তরে যে অর্থ বরাদ্দ করে থাকে সেখানে রাজ্য কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমমর্যাদায় বিবেচিত হয় এই তৃতীয় স্তরের সরকারি অর্থ বরাদ্দের প্রসঙ্গটি। সংবিধানের সপ্তম তফসিলে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সাংবিধানিক ক্ষমতা কীভাবে বণ্টিত হবে, তা নির্দিষ্ট করা আছে। সংবিধানের ৭৩-তম সংশোধনীর পর আমরা পেয়েছি একাদশ তফসিল, যেখানে পঞ্চায়েতী রাজ কোন্স্তরে রাজ্য সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগ করে নিতে পারে সেটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে। মীনাক্ষিসুন্দরমরা যতটা চেয়েছিলেন, ক্ষমতা বিভাজন সেই পরিমাণে অবশ্য হয়নি। অনিচ্ছুক কেন্দ্র রাজ্য সরকারগুলি পঞ্চায়েতী রাজকে যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে মেনে নিতে পারেনি।

পঞ্চায়েতী রাজ একটি স্বতন্ত্র সরকারি ব্যবস্থা, যেখানে ‘‌সরকার’‌ একটি অন্য ধরনের সরকার। ব্রিটিশ রাজশক্তি কিংবা তার আগের শাসকেরাও শাসন করত ওপর থেকে। সাধারণ মানুষ সরকারকে অর্থাৎ সরকারি পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দূর থেকে সেলাম করত, হাতজোড় করে সরকারি হুকুম শুনত। প্রজাদের কাছে এই সরকার ছিল মা-বাপ সরকার। দন্তী, শৃঙ্গী এবং রাজপুরুষ সমাসনে বসত। মা-বাপ সরকারের পীড়ন করার ক্ষমতা যে অসীম, সমাজের সর্বশেষ মানুষটি পর্যন্ত তা জানতেন এবং রাজপুরুষদের যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতেন।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তারাধিকার সূত্রে এই রাষ্ট্রব্যবস্থাই আমরা পেয়েছিলাম। আমলা-নির্ভর এই ব্যবস্থাটি ‘‌ভিতরে আসিও না’‌ বিজ্ঞাপন সহ সদর্পে শাসনভার গ্রহণ করেছিল ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্টের পরে। এই শাসন পছন্দ করার কোনও কারণ নেই, কারণ এই শাসনের ভিত্তি সমমর্যাদা নয়। একটি শাসনকে যদি সাধারণতান্ত্রিক শাসনে রূপান্তরিত করতে হয়, তাহলে এই রাজপুরুষ-কেন্দ্রিক শাসনের পরিবর্তন করা দরকার। আমলাদের চোখে যাঁরা ছিলেন প্রজা তাঁরাই এই সাধারণতন্ত্রে শাসকের মর্যাদা পাবেন। সাধারণতন্ত্র গড়ার সময়ে এই প্রয়োজনীয় কাজটি আমরা করে উঠিনি। সাধারণতন্ত্র গঠিত হওয়ার ৪০ বছরেরও বেশি সময় লেগেছে শাসনের এই সাধারণতন্ত্রী ধারণাটি সংবিধানে নথিভুক্ত করতে।

ব্রিটিশের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এই রাষ্ট্রব্যবস্থাটির মৌলিক দুর্বলতা কোথায়, সেটা বুঝেছিলেন এদেশের কমিউনিস্ট সহ বামপন্থী মানুষেরা। ৪৭ ব্রিটিশ-উত্তর ভারত তৈরি করার সুযোগ এল। একটা সংবিধানও গৃহীত হল। সংবিধানটিতেসাধারণতন্ত্রের বহু আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা লিপিবদ্ধ করা হল। কিন্তু রাষ্ট্রের মূল দিশায় কোনও বদল এল না। এই সীমাবদ্ধতা দূর করা ছিল একটি বামপন্থী কর্তব্য, রাজ্যস্তরে বা কেন্দ্রীয় স্তরে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর একটি বামপন্থী সরকার যা করতে পারত। ১৯৭৭- বাম সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরেই এরাজ্যের শাসন কাঠামোতে এমন কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা হল যাতে মা-বাপ সরকারের হুকুম শোনা প্রজারা প্রজাতান্ত্রিক শাসনের স্বাদ অনুভব করতে পারেন। এই পরিবর্তনটি আনা যেতে পারত জাতীয় কংগ্রেস বহুদিন যাবৎ যে পঞ্চায়েতী রাজের কথা বলে এসেছে, সেই পঞ্চায়েতী রাজ ব্যবস্থাটি জনগণের ক্ষমতায়নের কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তুলে। এই কাজটাই করার চেষ্টা করেছিলেন জ্যোতি বসুর বাম সরকার। এবিষয়ে কমিউনিস্ট শাসিত কেরালার ভূমিকাও অত্যন্ত ইতিবাচক।

কালক্রমে এই সাধারণতান্ত্রিক শাসনের ধারণাটি সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ল (‌প্রসঙ্গত, এদেশে যে সোশালিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এবিষয়ে তার ভূমিকাও অস্বীকার করা যাবে না)‌ সাধারণতন্ত্রের এই নতুন ধারণাটি সমস্যা সৃষ্টি করল আমলাশাসিত ভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থাটিতে। ব্যক্তিগত ভাবে বহু আমলাই সাধারণতন্ত্রের মূল ধারণাটি সম্পর্কে সচেতন, অনেকেই আছেন যারা মা-বাপ সরকার চালানোর জন্য সরকারি পরীক্ষায় বসেননি। কিন্তু ব্যবস্থাটি এমন যে এখানে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও মর্যাদা নেই। জেলার সবচেয়ে বড় বাংলোটি হবে জেলাশাসকের। তাঁর গাড়ি রাস্তায় চললে সেই ঔপনিবেশিক যুগের মতোই সাধারণ মানুষ ভয়ে দূরত্ব তৈরি করে।

পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা এই ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থাকে দূর করতে পারত না। অতটা ক্ষমতা তাকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু উন্নয়নের বহু কাজ, জীবনযাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু বিষয় পঞ্চায়েতী রাজে ন্যস্ত হয়েছে। এগুলি বিকল্প ক্ষমতার উৎস হতে পারত এবং তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ পেতে পারত একটি প্রকৃত রিপাবলিকান শাসনযন্ত্র। দুর্ভাগ্যবশত একাজে এদেশ আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করেনি। নয়া উদারবাদী বাজারমুখী উন্নয়ন এদেশে এখন উন্নয়নের প্রায় একমাত্র মডেল। ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য কেন্দ্র এবং রাজ্যস্তরে যে পরিমাণে উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল, তার কোনওটাই হয়নি।

এরাজ্যে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে দৃঢ়মূল করার প্রচেষ্টা ছিল বামপন্থীদের দিক থেকে। বলা যায় যে, এবিষয়ে তাদের আছে আদর্শগত দায়বদ্ধতা। কিন্তু বাম শাসন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির নেতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তন অনেকাংশেই নিঃশব্দ পরিবর্তন। কখনও তা করা হয়েছে কাঁসরঘণ্টা বাজিয়ে। এরাজ্যে গত ১০-১২ বছরে আমলাবাহিনীর বিপুল ক্ষমতায়ন ঘটেছে। সরকারি উন্নয়নের কাজ লাইন ডিপার্টমন্টের সঙ্গে ভাগাভাগিতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পিছু হঠছে। সরকারি আধিকারিকদের ঘরের বাইরে ‘‌ভিতরে আসিও না’‌ বসানো শুরু হয়েছে এবং বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় পঞ্চায়েতে যে ক্ষমতা থাকে সেটা পঞ্চায়েত স্তরের আমলারা লাইন ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভাগবাঁটোয়ারা করে নেবার চেষ্টা করেন। সম্ভব হচ্ছে না একমাত্র ১০০ দিনের প্রকল্পের টাকা লাইন ডিপার্টমেন্টে হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে। মনরেগার টাকা খরচ করার অধিকার মনরেগা আইনেই নির্দিষ্ট করা আছে পঞ্চায়েত স্তরে। ইউপিএ এর সময় এই আইন তৈরি হয়েছিল। বামপন্থীরা ছিলেন এই আইনের অন্যতম রূপকার।

পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার মূল যে স্পিরিট, গ্রামবাসীদের দ্বারা গ্রাম উন্নয়ন, এটাকেই নষ্ট করে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। গ্রামবাসীদের দ্বারা গ্রাম উন্নয়ন নয়, গ্রামোন্নয়নের খড়্গ হাতে অনুব্রতরা দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় সব পঞ্চায়েতে। এই খড়্গ হাতে দাঁড়ানোর অধিকার এঁরা পাচ্ছেন কীভাবে?‌ খেয়াল করলে দেখা যাবে এর পিছনে আমলাদের উস্কানি আছে। গ্রামবাসীরা গ্রামোন্নয়ন করবেন এবং আমলাকে সেখানে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করতে হবে, উন্নয়নের এই মডেলটি মা-বাপ সরকারের পছন্দ নয়। আধিকারিক আসবেন, তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে, তিনি খুশি হয়ে একটার জায়গায় দুটো টিউবওয়েল বরাদ্দ করবেন গ্রামের জন্য, এটাই ছিল মা-বাপ সরকারের উন্নয়ন মডেল এবং আমাদের আমলা-ব্যবস্থা সেই আদলেই তৈরি। বামপন্থীরা ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর এরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন এবং কোনও ভাবেই যাতে বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা গড়ে না ওঠে, তার জন্য তারা বদ্ধপরিকর। তৃণমূলী আমলে কোথাও গ্রাম সংসদের মিটিং হয় না। কোনও আমলার তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। কোথাও কোনও পঞ্চায়েতে পাবলিক অডিট হয় না, হবেও না। এগুলো নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়নের খড়্গ হাতে একদল লুঠেরাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বর্তমান শাসককূল। আমলারা এদের ওপরই ভরসা করে, কারণ ওই খড়্গধারী একই সঙ্গে আমলাদের ক্ষমতায়নও করে থাকে।

এই অবস্থায় ‘‌উন্নয়ন’‌ থমকে আছে তা নয়, বরং খড়্গ হাতে তা তাড়া করছে বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের। উন্নয়ন অবশ্যই ঘটছে, কিন্তু কার উন্নয়ন এর উত্তর খড়্গধারীদের কাছেই সীমিত। কেউ জানে না কার জন্য কোন উন্নয়ন, কেউ জানে না রাস্তার খোয়া তিন ইঞ্চি না পাঁচ ইঞ্চি পুরু। এসব জানার অধিকার নেই আমজনতার। সুতরাং উন্নয়নের প্রণোদনা অন্যভাবে নির্ধিরিত হচ্ছে। খড়্গধারী পঞ্চায়েত প্রধান বাইকে চাপেন, গলায় সোনার চেন, বাহুমূলে সোনার বাউটি এবং সাদা রঙের স্করপিও। এটুকু না হলে পাঁচ বছরের শানসক্ষমতা একেবারেই বৃথা যায়।

একটি জনমুখী উন্নয়ন ব্যবস্থা যে কীভাবে আগাপাশতলা জনবিরোধী উন্নয়ন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে তৃণমূল শাসন সেটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।


প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুলাই-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫৩ টি নিবন্ধ
২৯-মে-২০২৬

২৮-মে-২০২৬

২৪-মে-২০২৬

০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬