সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
পার্টিকে যেতে হবে মানুষের কাছে
এম এ বেবি
২৪তম পার্টি কংগ্রেসে জোর দিয়ে একথা বলা হয়েছে যে, বিজেপি ও আরএসএসকে একে অপরের থেকে আলাদা করা যায় না, এবং এই দুই শক্তিকে শুধুমাত্র নির্বাচনী সংগ্রামের সাহায্যে পরাস্ত করা যাবে না। এই পরিস্থিতিতে, গত এক দশকে, হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি তাদের মতাদর্শগত প্রভাবের সাহায্যে ভালোরকম সমর্থনের ভিত তৈরি করেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে দরকার একটা সামগ্রিক কর্মসূচি।

৬ এপ্রিল মাদুরাইয়ে শেষ হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র ২৪তম কংগ্রেস। কংগ্রেসে গৃহীত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে প্রাথমিক যে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে তা হল, বিজেপি-আরএসএস জোটকে বিচ্ছিন্ন ও পরাস্ত করা। রাজনৈতিক প্রস্তাবে সঠিকভাবেই বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, প্রায় ১১ বছরের মোদি সরকারের শাসনের পরিণামে নয়া-ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দক্ষিণপন্থা, সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলি তাদের শক্তি আরও সংহত করেছে। রাজনৈতিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে যে, ‘মোদি সরকার হিন্দুত্ববাদী শক্তি ও বৃহৎ বুর্জোয়াদের জোটের প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং, প্রাথমিক কাজ হল এই জোটের ভিত্তি যারা সেই বিজেপি-আরএসএস এবং হিন্দুত্ব-কর্পোরেট অশুভ চক্রের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে তোলা ও তাদের পরাস্ত করা।’
এ-বিষয়ে জোর দেওয়া দরকার যে, বিজেপি এবং হিন্দুত্বের শক্তিগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে পরাস্ত করা সম্ভব হবে সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির মতাদর্শ ও কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম চালানোর মধ্যে দিয়ে। হিন্দুত্ব সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরুদ্ধে সমস্ত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সম্ভাব্য সবচেয়ে ব্যাপক জমায়েত গড়ে তোলার চেষ্টার পাশাপাশি, এ-ব্যাপারেও সিপিআই(এম)-এর স্পষ্ট অবস্থান হল, ‘নয়া-উদারাবাদী হিন্দুত্বের শক্তির শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সাফল্য পেতে হলে দরকার সিপিআই(এম) ও বামপন্থী শক্তিসমূহের স্বাধীন শক্তির বিকাশ।’
বেশ কিছু দিন ধরে পার্টি ও বাম শক্তিসমূহের স্বাধীন শক্তি ও প্রভাবের ক্ষেত্রে প্রথমে স্থিতাবস্থা ও পরে যে ক্ষয় দেখা যাচ্ছে, সেটা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণ ভিত্তিতে ক্ষয়ের কারণে পার্টির একসময়কার দুর্গ পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় পার্টির শক্তি ভালোরকম ধাক্কা খেয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যালোচনা রিপোর্টে এ-সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, বিজেপির বিরুদ্ধে পার্টি ব্যাপকতম মাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে সফলভাবে জমায়েত করতে সমর্থ হয়েছে। আবার আত্মসমালোচনার সুরে একথাও স্বীকার করা হয়েছে যে, ২৩তম কংগ্রেস আরেকটি যে-কাজের কথা বলেছিল, তা পূরণ করতে পার্টি ব্যর্থ হয়েছে। কাজটি হল একইসঙ্গে সিপিআই(এম) ও বামপন্থীদের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি করা।
২৪তম কংগ্রেসে একথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে ২৩তম কংগ্রেসে যে রাজনৈতিক-কৌশলগত লাইন গৃহীত হয়েছিল তা পুরোপুরি সঠিক। তার পাশাপাশি ২৪তম কংগ্রেস পার্টিকে ডাক দিয়েছে রাজনৈতিক, মতাদর্শগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ধারাবাহিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হতে যাতে হিন্দুত্ববাদী শক্তি ও আরএসএসের বিভিন্ন ধরনের সংগঠনের প্রভাব ও কার্যকলাপকে প্রতিহত করা যায়। ২৪তম পার্টি কংগ্রেসে জোর দিয়ে একথা বলা হয়েছে যে, বিজেপি ও আরএসএসকে একে অপরের থেকে আলাদা করা যায় না, এবং এই দুই শক্তিকে শুধুমাত্র নির্বাচনী সংগ্রামের সাহায্যে পরাস্ত করা যাবে না। এই পরিস্থিতিতে, গত এক দশকে, হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি তাদের মতাদর্শগত প্রভাবের সাহায্যে ভালোরকম সমর্থনের ভিত তৈরি করেছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে দরকার একটা সামগ্রিক কর্মসূচি।
এই লক্ষ্যে পার্টি বিশেষ নজর দেবে শ্রমিক-শ্রেণির মধ্যে, এবং শ্রমিক-শ্রেণির সদস্যরা বসবাস করেন যে সব অঞ্চলে, ট্রেড ইউনিয়নে এবং অন্যান্য গণসংগঠন ও মঞ্চগুলিতে সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজকর্ম সংগঠিত করার ওপর। অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে, যারা ধর্মে বিশ্বাসী পার্টি তাদের কাছে পৌঁছবে একথা বোঝাতে যে, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে অপব্যবহার করাটা এক বিষয় নয়, বরং এ-দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। উৎসব ও সামাজিক জমায়েতের মধ্যে পার্টি হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করবে যাতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বার্থে সেগুলির অপব্যবহার আটকানো যায়। এই ধরনের উৎসব ও সামাজিক জমায়েতের মধ্যে ভিন ধর্মের এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতিবর্ণের মধ্যে সমন্বয়ের যে-সব উদ্যোগ বিদ্যমান থাকে, পার্টি সেগুলিকে আরও উৎসাহিত ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করবে। পার্টি সামিল হবে সমাজসেবামূলক কাজকর্ম এবং জনবিজ্ঞান আন্দোলনে, উৎসাহ দেবে ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক ভাবনাচিন্তা গড়ে তোলার কাজে, উদ্যোগী হবে বৃহত্তর পরিসরে সাংস্কৃতিক কাজকর্ম গড়ে তোলার জন্য। মনুবাদী ও অন্ধবিশ্বাসনির্ভর মূল্যবোধকে প্রতিহত করাই হবে এই সমস্ত কার্যকলাপের লক্ষ্য।
পার্টি কংগ্রেস এ-বিষয়ে জোর দিয়েছে যে, পার্টির শক্তি লক্ষ্যণীয়ভাবে বৃদ্ধি করার জন্য, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সিপিআই(এম) ও বাম শক্তিগুলির পুনর্নিমাণ এবং তা প্রসারিত করার কাজটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হবে গ্রামীণ ও শহুরে গরিবদের মধ্যে কাজের ওপর এবং তাদের সংগঠিত করার প্রয়াস জারি থাকবে। ২৪তম কংগ্রেস ত্রিপুরা পার্টিকে এই নির্দেশ দিয়েছে যে পার্টিকে তৃণমূল স্তরের সংগঠনগুলিকে শক্তিশালী করতে হবে এবং এমন কর্মসূচি নিতে হবে যা শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবে। পাশাপাশি আদিবাসী জনগণের বিশেষ চাহিদা ও ইস্যুগুলির ওপরেও জোর দিতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় জনগণের আস্থা ফেরাতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালানোর পাশাপাশি পার্টি অন্য রাজ্যগুলিতেও দলের প্রভাব বাড়াতে চেষ্টা করবে। সে-কারণে ২৪তম কংগ্রেস জোর দিয়েছে যে, বুনিয়াদি শ্রেণিগুলির মধ্যে পার্টির কাজে গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রামীণ ধনীদের অশুভ চক্র গ্রামের গরিবদের ওপর যে-শোষণ চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার কাজে দুর্বলতাকে কাটানোর কথাও বলেছে পার্টি কংগ্রেস। এই বার্তাও স্পষ্ট দেওয়া হয়েছে যে, পার্টিকে স্বাধীন রাজনৈতিক প্রচার এবং গণ জমায়েতের ওপর আরও বেশি নজর দিতে হবে। এবং ‘নির্বাচনী সমঝোতা বা জোটের নামে আমাদের স্বাধীন পরিচিতিকে ঝাপসা করা চলবে না এবং স্বাধীন কার্যকলাপকে কমিয়ে আনলে চলবে না।’
বর্ণ, লিঙ্গ এবং সামাজিক ইস্যুগুলি নিয়ে কাজ করবে একমাত্র সংশ্লিষ্ট গণ সংগঠনগুলি– চিরাচরিত এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর না-করে, পার্টি এ-বিষয়ে জোর দিচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে পার্টি সরাসরি এই সব ইস্যুতে প্রচার ও সংগ্রাম সংগঠিত করবে। একইসঙ্গে এই সব প্রচার ও সংগ্রামকে শ্রেণি শোষণের বিরুদ্ধে চলা সংগ্রামগুলির সঙ্গে যুক্ত করবে।
এতদিন পর্যন্ত নির্যাতিত, নিপীড়িত, প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষদের নানা অংশ এখন সজোরে নিজেদের পরিচিতির জানান দিচ্ছে এবং তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছে। পার্টির দায়িত্ব শুধুমাত্র এইসব সংগ্রামের প্রতি সংহতি জ্ঞাপনেই শেষ হয়ে যায় না, বরং পার্টিকে সেগুলির সক্রিয় অংশ হয়ে উঠতে হবে। এমনকি কয়েক দশক আগে গৃহীত পার্টি কর্মসূচিতেও বলা হয়েছে, দলিতেরা যে জোরের সঙ্গে তাদের যেসব দাবিগুলি তুলছে এবং সেই দাবিগুলির মধ্যে যেসব গণতান্ত্রিক উপাদানসমূহ রয়েছে সেসবই আসলে সমাজের সবচেয়ে নির্যাতিত অংশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। পার্টি কর্মসূচি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে বিশেষভাবে সক্ষমদের অধিকার নিশ্চিত করা হবে যাতে তাঁরা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারেন। আদিবাসীরা যে-সব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন সেই সব ইস্যুও কর্মসূচিতে আলোচনা করা হয়েছে। পার্টি কংগ্রেস রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমাজের এই সব প্রান্তিক অংশের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি এলজিবিটিকিউ+ গোষ্ঠীর ইস্যুগুলিকেও পার্টি কর্মসূচি সামনে এনেছে।
পার্টি এ-কথা স্বীকার করে যে ভবিষ্যতে পার্টির বিকাশের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল আরও বেশি সংখ্যায় যুবদের সামনে টেনে আনা। বুর্জোয়া পার্টিগুলির থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে, যুবদের মধ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র আবেদনকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যুবরা যে-বিকল্পের খোঁজ করছে এবং যে-বিকল্পের জন্য তাদের ক্ষুধা বাড়ছে, অবশ্যই তাতে সাড়া দিতে হবে। এ-ব্যাপারে রাজনৈতিক পর্যালোচনা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আমাদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত প্রচারে একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক রয়েছে, সেটা হল আমাদের লক্ষ্য যে সমাজতন্ত্র সেই বিষয়ে প্রচার। আমরা যে বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্পের কথা বলি, তার সঙ্গে সমাজতন্ত্রকে যুক্ত করতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে আমাদের আবেদন আরও জোরদার করতে হলে এটা খুবই বেশি করে করা দরকার। বিশেষ করে সেই সব প্রজন্মের জন্য যারা উঠে এসেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং সমাজতন্ত্র ধাক্কা খাওয়ার পর।’
সূত্র- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
অনুবাদ- সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ২২-এপ্রিল-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
