Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদ

সাত্যকি রায়
কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও কর্মসূচি রূপায়ণ দপ্তর থেকে টাইম ইউজ সার্ভে প্রকাশিত হয়। এই সার্ভেতে বাড়িতে বিভিন্ন বিনা পারিশ্রমিকের কাজ কিভাবে পুরুষ ও মহিলারা ভাগ করে থাকেন তার তথ্য প্রকাশ করা হয়। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ থেকে ৫৯ বছরের পুরুষদের মাত্র ২৯ শতাংশ পারিশ্রমিক-বিহীন গৃহকর্মে সময় ব্যয় করে থাকেন। অথচ ১৫ থেকে ৫৯ এই বয়সের মহিলাদের ৯২ শতাংশ ওই ধরনের কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন। যদি একটা গোটা দিনের সময় ব্যবহারের হিসেব ধরা যায়, ছয় বছরের বেশি বয়সের একজন পুরুষ গোটা দিনে ৬৭ মিনিট পারিশ্রমিক-বিহীন কাজে সময় ব্যয় করেন, ২৪০ মিনিট পারিশ্রমিক যুক্ত কাজে সময় ব্যয় করেন এবং ১১৩৩ মিনিট নিজের উন্নতি ও পরিচর্যা ও অন্যান্য কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন। অন্যদিকে একজন মহিলা গোটা দিনে ৩০৫ মিনিট পারিশ্রমিক-বিহীন কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন, ৫৬ মিনিট পারিশ্রমিক যুক্ত কাজে সময় ব্যয় করেন ও ১০৭৯ মিনিট অন্যান্য কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন। অতএব একজন মহিলা সদস্য বাড়ির পারিশ্রমিক-বিহীন কাজে একজন পুরুষ সদস্যের চেয়ে সাড়ে চারগুণ বেশি সময় ব্যবহার করে থাকেন। এবং একজন পুরুষ সদস্য অন্যদিকে একজন গড় মহিলা সদস্যের তুলনায় ৪.৩ গুণ সময় পারিশ্রমিক যুক্ত কাজে সময় ব্যয় করেন।
Patriachry and Captialism

পুঁজিবাদে শ্রমের যোগান অব্যাহত রাখার জন্য কতগুলি পূর্বশর্ত প্রয়োজন। এক, উৎপাদনের উপকরণের মালিকানা থেকে বিচ্ছিন্ন একদল মানুষ যাদের শ্রম বিক্রি করা ছাড়া বাঁচার কোনও উপায় থাকবে না। বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই তা সুনিশ্চিত করা হয় এবং মার্কস এই প্রক্রিয়াকে পুঁজির আদিম লুন্ঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু মানুষকে তার উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া একবার সংগঠিত করতে পারলে পুঁজিবাদের শ্রমের যোগান অব্যাহত থাকবে এরকম কোনও কথা নেই।এর জন্য যা দরকার তা হল শ্রমিককে প্রতিনিয়ত উৎপাদনের কোনোরকম উপকরণের মালিকানা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার অবস্থা পুনরুৎপাদন করা। অর্থাৎ, এই শোষণ ব্যবস্থায় শ্রমিককে প্রতিনিয়ত নিঃস্বকরণের মধ্যে দিয়ে এটা সুনিশ্চিত করতে হবে যে তার জন্য শ্রম বিক্রি করা ছাড়া বাঁচার অন্য কোনও রাস্তা খোলা থাকবে না। আদিম লুন্ঠনের প্রক্রিয়ায় যা অস্বাভাবিক বলে মনে হয় তাকে প্রতিনিয়ত স্বাভাবিক করে তোলে পুঁজিবাদ। এর সাথে যেটা দরকার তা হল প্রতিনিয়ত সবল ও সক্ষম মানুষ শ্রমিক হিসেবে তৈরি করা। 

আপাত দৃষ্টিতে এটা খুব স্বতঃস্ফূর্ত একটা প্রক্রিয়া মনে হলেও এই শ্রমিকের উৎপাদন পুঁজি সম্পর্কের বাইরে প্রতিনিয়ত সংগঠিত করার একটি ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার। গৃহ পরিমণ্ডলে এই ব্যবস্থাপনা কার্যকরী হয় পিতৃতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যে দিয়ে। শ্রমিকের প্রতিদিন বাঁচার জন্য ও পরবর্তী দিনে শ্রমের যোগান দেওয়ার জন্য তার খাওয়া-পরা ও পরিবারের ভরণপোষণ ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। কোনও একটি দেশে কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কতটা মূল্য সামাজিকভাবে স্বীকৃত তাই শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করে। কিন্তু শ্রমিকের প্রয়োজনীয় জিনিস, পরিষেবা এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় বাজারে পাওয়া যায় না। সবজি, চাল, আটা, মাছ, মাংস বাজার থেকে কিনে এনে সেই অবস্থায় খাওয়া যায় না। কোনও একটি ঘর ভাড়া নিলেই তা বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। এই সব কিছুর সঙ্গে একটি উৎপাদন প্রক্রিয়া যুক্ত যা অদ্ভুতভাবে মূল্যের বিবেচনার বাইরে চলে যায়। খাদ্যদ্রব্য রান্না করতে হয়, পরিবারের বৃদ্ধ অথবা বাচ্চাদের খেয়াল রাখতে হয়, ঘরবাড়ি বাসযোগ্য করতে, গুছিয়ে রাখতে হয়, শ্রমিকের দৈহিক ও মানসিক সাহচর্যের  প্রয়োজন হয় এবং এই সমস্ত কাজগুলি করতে যে শ্রমের প্রয়োজন হয় তার যোগান বিনামূল্যে সুনিশ্চিত করে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা।

সাধারণভাবে পরিবারের এই সমস্ত কাজ করার দায় এসে পড়ে বাড়ির নারীসভ্যের উপরে। এই সমস্ত কাজটি নারীদের বিনামূল্যে করানোর উপযোগী মূল্যবোধ সমাজ সৃষ্টি করে। এ কারণেই বাড়ির যে সমস্ত মহিলা সদস্যরা বাইরে কাজ করতে যান, তারা উপার্জন করার কারণে কিছুটা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারলেও বাড়িতে এসে বিনামূল্যে উপরোক্ত প্রয়োজনীয় শ্রমের দায়িত্ব গ্রহণ করাটাও তাদের কাছে অত্যন্ত আবশ্যিক হয়ে ওঠে। যদি এই কাজগুলো বাড়ির নারী সদস্যেরা বিনামূল্যে না করতো তাহলে এই সমস্ত শ্রম যদি মজুরির বিনিময় সংগঠিত করতে হত তাহলে সামাজিকভাবে স্বীকৃত শ্রমের মূল্য হিসেবে পুঁজিপতিকে বেশি মজুরি দিতে হতো। যেহেতু বাড়ির ভিতরের এই উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি বড় অংশের শ্রম বিনা মজুরিতে করিয়ে নেওয়া যাচ্ছে এর কারনে শ্রমিককে দেয় মজুরির পরিমাণও কম হচ্ছে। এই প্রত্যেকটি কাজের মজুরি যদি শ্রমিককে দিতে হত তাহলে সে মালিকের কাছে আরও বেশি মজুরি দাবি করত। অতএব পিতৃতন্ত্র আসলে মালিকের শ্রমিক বাবদ উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে সাহায্য করে।

এ কথা ঠিক যে সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির মহিলা সদস্যের উপার্জনের উপরে পরিবারের নির্ভরশীলতা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে গৃহের কাজে পুরুষরাও কিছুটা হাত লাগাতে শুরু করেছেন। কিন্তু এতদসত্বেও গৃহস্থালী কাজে বিনামূল্যে শ্রমসময় ব্যয় করার প্রশ্নে মহিলা এবং পুরুষদের মধ্যে বৈষম্য এখনো এক চরম অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও কর্মসূচি রূপায়ণ দপ্তর থেকে টাইম ইউজ সার্ভে প্রকাশিত হয়। এই সার্ভেতে বাড়িতে বিভিন্ন বিনা পারিশ্রমিকের কাজ কিভাবে পুরুষ ও মহিলারা ভাগ করে থাকেন তার তথ্য প্রকাশ করা হয়। এই রিপোর্ট অনুযায়ী ১৫ থেকে ৫৯ বছরের পুরুষদের মাত্র ২৯ শতাংশ পারিশ্রমিক-বিহীন গৃহকর্মে সময় ব্যয় করে থাকেন। অথচ ১৫ থেকে ৫৯ এই বয়সের মহিলাদের ৯২ শতাংশ ওই ধরনের কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন। যদি একটা গোটা দিনের সময় ব্যবহারের হিসেব ধরা যায়, ছয় বছরের বেশি বয়সের একজন পুরুষ গোটা দিনে ৬৭ মিনিট পারিশ্রমিক-বিহীন কাজে সময় ব্যয় করেন, ২৪০ মিনিট পারিশ্রমিক যুক্ত কাজে সময় ব্যয় করেন এবং ১১৩৩ মিনিট নিজের উন্নতি ও পরিচর্যা ও অন্যান্য কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন। অন্যদিকে একজন মহিলা গোটা দিনে ৩০৫ মিনিট পারিশ্রমিক-বিহীন কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন, ৫৬ মিনিট পারিশ্রমিক যুক্ত কাজে সময় ব্যয় করেন ও ১০৭৯ মিনিট অন্যান্য কাজে সময় ব্যয় করে থাকেন। অতএব একজন মহিলা সদস্য বাড়ির পারিশ্রমিক-বিহীন কাজে একজন পুরুষ সদস্যের চেয়ে সাড়ে চারগুণ বেশি সময় ব্যবহার করে থাকেন। এবং একজন পুরুষ সদস্য অন্যদিকে একজন গড় মহিলা সদস্যের তুলনায় ৪.৩ গুণ সময় পারিশ্রমিক যুক্ত কাজে সময় ব্যয় করেন।

সময়বন্টনের এই বৈষম্য মহিলাদের পছন্দের কারণে ঘটে থাকে এরকম ভাবার কোনও কারণ নেই। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ এই বৈষম্যকে প্রকট ভাবে তুলে ধরে। ২০২০-২১ সালের তথ্য অনুযায়ী শ্রম বাজারে অংশগ্রহণের তথ্য দেখলে এটা আরো পরিষ্কার হবে। শ্রম বাজারে অংশগ্রহণের হার বলতে বোঝায় কর্মক্ষম বয়সের মানুষদের মধ্যে কত শতাংশ কাজ পাচ্ছেন অথবা কাজ খুঁজছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার হল ৭৭.২ শতাংশ এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৩২.৮ শতাংশ। এবার যদি দেখা যায় জনসংখ্যার কত অংশ কর্মরত, তাহলে শহরাঞ্চলে পুরুষদের ক্ষেত্রে ৭০.৪ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৭৫.৩ শতাংশ। অথচ মহিলাদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত শহরাঞ্চলে ২১.৯ এবং গ্রামাঞ্চলে ৩৫.৮। এই তথ্য থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় আজও ভারতবর্ষে মহিলাদের কত বাধা অতিক্রম করে বাড়ির বাইরে কাজ করতে যেতে হয়। শুধু তাই নয় একই কাজে গ্রামে মহিলারা পুরুষদের মজুরির মাত্র ৬৭ শতাংশ পেয়ে থাকেন এবং শহরে তারা পুরুষদের তুলনায় ৬৯ শতাংশ মজুরি পান। এর মানে দাঁড়ালো এই যে বাড়িতে পারিশ্রমিক-বিহীন কাজের বেশিরভাগ দায় মহিলাদের নিতে হয়, বাড়ির বাইরে পারিশ্রমিকের বিনিময় কাজে অংশগ্রহণ করতেই মহিলাদের অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয় এবং জনসংখ্যার অনুপাতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের কাজ পাওয়ার হার কম এবং একই কাজে মহিলারা পুরুষদের তুলনায় অনেক কম মজুরি পেয়ে থাকেন।

এই সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কম পয়সায় শ্রমের পুনরুৎপাদন ও একই সাথে শ্রমবাজারের লিঙ্গ বৈষম্যের সুযোগ নিয়ে কম মজুরির বিনিময় কাজ করানোর সুযোগ তৈরী করে দেয়। আসলে উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনার এই অনন্য উপায় সুরক্ষিত হয় পিতৃতন্ত্র এই সামাজিক সাংস্কৃতিক কাঠামোটির মধ্যে দিয়ে। পিতৃতন্ত্রের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাপনা পুঁজিবাদের বহু আগে থেকে থাকলেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তাকে লালন পালন করে, টিঁকিয়ে রাখে মুনাফার স্বার্থেই। পিতৃতন্ত্র আসলে কম খরচে পুঁজিবাদের প্রয়োজনীয় শ্রমের সামাজিক পুনরুৎপাদনকে সুনিশ্চিত করে।


প্রকাশের তারিখ: ০১-জুন-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজন কি আজকের দিনে মেটানো সম্ভব? কেউ যদি কোনো কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দক্ষ হয়, তখন সে কাজটাই আগ্রহের সঙ্গে করবে। সেখানে কৃত্রিমভাবে যদি কাউকে এমন একটি কাজ দেওয়া হয় যাতে তার দক্ষতা নেই, কিন্তু শুধু লিঙ্গ বৈষম্য মেটাতে তা করা হচ্ছে, তাতে মূল উদ্দেশ্য পূরণ হল কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যায়। - (সম্পাদিত)
- সাগ্নিক দাস, ১৯-জুন-২০২৩


অনবদ্য বিশ্লেষণ - (সম্পাদিত)
- Tapan Ghosh, ০২-আগস্ট-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লিঙ্গ রাজনীতি বিভাগে প্রকাশিত ৩৮ টি নিবন্ধ
১৮-এপ্রিল-২০২৬

০৯-মার্চ-২০২৬

১১-নভেম্বর-২০২৫

২২-সেপ্টেম্বর-২০২৫

০৬-আগস্ট-২০২৫

৩০-মে-২০২৫

২৯-মে-২০২৫

২৮-মে-২০২৫

৩১-মার্চ-২০২৫

২৮-মার্চ-২০২৫