সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
‘পেশাদারি শোক বলে তো কিছু হয় না’
এম পলানি কুমার
বারো দিন বাদে হরি আন্নার মৃত্যুর খবর করতে যাই আমি। তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেখি একটা ফ্রিজার বাক্সে শোয়ানো আছে তাঁর দেহ। তাঁর স্ত্রী তামিল সেলভিকে পরিবার থেকে বলা হয়েছে শেষকৃত্য এবং বিধবার কর্তব্যকর্ম করে নিতে। পাড়াপ্রতিবেশী তাঁর সারা গায়ে হলুদ মাখিয়ে তাঁকে স্নান করিয়েছেন, তারপর তাঁর থালি [বিবাহিতা নারীর মঙ্গলচিহ্ন] ছিন্ন করে দিয়েছেন। পুরো সময়টা নীরব, গম্ভীর ছিলেন তিনি।

স্বজাতি মানুষের মৃত্যু নিয়ে যখনই লিখতে বসি, মাথার ভিতরটা অসাড় লাশের মতো মনে হয়।
আমাদের চারপাশের জগতে কী চোখধাঁধানো উন্নয়ন, অথচ হাতে করে বর্জ্য সাফাইকারী মানুষগুলোর দিকে তাকিয়েও দেখে না সমাজ। রাষ্ট্র মানতেই চায় না যে এইধরনের মৃত্যু আদৌ ঘটে, অথচ এবছর লোকসভায় একটি প্রশ্নের উত্তরে, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রী রামদাস আথাওয়ালের দেওয়া তথ্য অনুসারে ২০১৯-২০২৩ সালের মধ্যে ৩৭৭ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে "নর্দমা এবং সেপটিক ট্যাঙ্কের বিপজ্জনক সাফাইকার্যের কারণে।“
গত সাত বছরে অগুন্তি মানুষের ম্যানহোলে আটকে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি আমি। শুধু চেন্নাই লাগোয়া আভাদিতেই ২০২২ সাল থেকে ১২টি ম্যানহোল মৃত্যু ঘটেছে।
১১ অগস্ট অরুন্ধতিয়ার সম্প্রদায়ভুক্ত আভাদির বাসিন্দা ২৫ বছরের হরি নিকাশি নালা সাফ করতে গিয়ে ডুবে যান। চুক্তি শ্রমিক হিসেবে সেখানে কাজ করছিলেন তিনি।
বারো দিন বাদে হরি আন্নার মৃত্যুর খবর করতে যাই আমি। তাঁর বাড়ি পৌঁছে দেখি একটা ফ্রিজার বাক্সে শোয়ানো আছে তাঁর দেহ। তাঁর স্ত্রী তামিল সেলভিকে পরিবার থেকে বলা হয়েছে শেষকৃত্য এবং বিধবার কর্তব্যকর্ম করে নিতে। পাড়াপ্রতিবেশী তাঁর সারা গায়ে হলুদ মাখিয়ে তাঁকে স্নান করিয়েছেন, তারপর তাঁর থালি [বিবাহিতা নারীর মঙ্গলচিহ্ন] ছিন্ন করে দিয়েছেন। পুরো সময়টা নীরব, গম্ভীর ছিলেন তিনি।
অন্য ঘরে কাপড় ছাড়তে গেলেন যখন, গোটা আঙিনা স্তব্ধ। লাল ইট দিয়ে তৈরি বাড়িখানা, সিমেন্ট চাপানো হয়নি। প্রতিটা খোলা ইট ক্ষয়ে ক্ষয়ে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। দেখে মনে হয় যে কোনও মুহূর্তে ধসে পড়ে যাবে বাড়িটা।
শাড়ি বদলে ফিরে এসে হঠাৎ চিৎকার করে ফ্রিজার বাক্সটার দিকে ছুটে গেলেন তামিল সেলভি আক্কা। বাক্সের সামনে বসে আছাড়িপিছাড়ি কাঁদছিলেন। তাঁর কান্নার শব্দে বাকি গোটা জটলাটা নির্বাক হয়ে গেল, ঘরে শুধু পাক খাচ্ছিল তাঁর কান্না।
“চোখ খোলো জান! আমার দিকে দেখো, মামা [আদরের ডাক]। ওরা আমায় শাড়ি পরাচ্ছে। আমি শাড়ি পরলে তোমার ভালো লাগে না, তাই না? ওঠো, ওদের বারণ করো আমায় জোর করতে।”
আজ পর্যন্ত শব্দগুলো আমার বুকের ভিতর ধাক্কা খেয়ে ফেরে। তামিল সেলভি আক্কার শারীরিক প্রতিবন্ধতা আছে, একটি হাত খুইয়েছেন তিনি। শাড়ির কুঁচি-আঁচল করতে সমস্যা হয়। সেই কারণেই শাড়ি পরেন না। এই স্মৃতিটা আমায় তাড়া করে বেড়ায় সর্বদা।
এমন যেকটা শেষকৃত্যে গিয়েছি, সবগুলো আমার ভিতরে থেকে গিয়েছে।
প্রতিটি ম্যানহোল মৃত্যুর পিছনে চাপা পড়ে থাকে বহু কাহিনি। আভাদির সাম্প্রতিক ম্যানহোল দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারিয়েছেন ২২ বছরের দীপা। তাঁর সওয়াল, ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণে কি তাঁদের জীবনে আনন্দ ফিরে আসবে? “২০ অগস্ট আমাদের বিয়ের তারিখ আর ৩০ অগস্ট আমাদের মেয়ের জন্মদিন, আর এই মাসেই চলে যেতে হল ওকে,” বলছেন তিনি। ক্ষতিপূরণের যে টাকা পেয়েছেন তাতে সংসারের সমস্ত খরচ মিটছে না।
যেসব পরিবারে ম্যানহোলে আটকে মৃত্যু ঘটে, তাদের নারী ও শিশুদের বিপন্ন বলে ধরাই হয় না। তামিলনাডুর পূর্বপ্রান্তে ভিল্লুপুরমের মাড়মপাট্টু গাঁয়ে যখন অনুশিয়া আক্কার স্বামী মারি ম্যানহোলে আটকে পড়ে মারা যান, কাঁদতেও পারেননি তিনি। আট মাসের গর্ভবতী ছিলেন কিনা। গর্ভের সন্তান ছাড়া দম্পতির তিনটি মেয়ে; বড়ো দুই মেয়ে কান্নাকাটি করছিল কিন্তু ছোটোটি বুঝতেই পারেনি কী ঘটেছে, খালি এঘর-ওঘর ছুটছিল।
ক্ষতিপূরণের টাকায় রক্তের গন্ধ লেগে আছে বলে মনে করা হয়। “কিছুতেই ওই টাকায় হাত দিতে পারি না। কিছুতে খরচ করতে গেলে মনে হয় আমার স্বামীর রক্ত চুষে খাচ্ছি,” বলেন অনুশিয়া আক্কা।
তামিলনাডুর কারুর জেলায় মৃত সাফাইকর্মী বালকৃষ্ণনের পরিবারের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম, গভীর অবসাদে ভুগছেন তাঁর স্ত্রী। জানাচ্ছেন, কাজ করতে করতে হামেশাই চারপাশের হুঁশ হারিয়ে ফেলেন তিনি। স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসতে সময় লাগে।
এই পরিবারগুলির জীবন একেবারে ছারখার হয়ে গেছে। আমাদের কাছে এগুলো খবর ছাড়া আর কিছুই না।
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ তারিখে আভাদির ভীমা নগরের বাসিন্দা সাফাইকর্মী মোজেসের মৃত্যু হয়। এলাকায় একমাত্র তাঁরই টালির চালের বাড়ি। তাঁর দুই মেয়ে, দুজনেই পরিস্থিতিটা বুঝতে পারছিল। তাঁর দেহ বাড়িতে আসার আগের দিন সেখানে গিয়েছিলাম আমি, দুই মেয়ের পরনে ছিল টিশার্ট – সেগুলোতে লেখা, ‘ড্যাড লাভস মি’ [বাবা আমায় ভালোবাসে], ‘ড্যাডস্ লিটিল প্রিন্সেস’ [বাবার ছোট্ট রাজকন্যা]। সমাপতন কিনা, বুঝতে পারিনি।
সারাদিন ধরে কেঁদেই চলেছিল ওরা, কারও কোনও সান্ত্বনাই থামাতে পারছিল না।
আমরা যতই এই ঘটনাগুলিকে নথিবদ্ধ করি, মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করি, আদতে ঝোঁকটা হল এটাকে আরও একটা খবর বলে এড়িয়ে যাওয়ার।
এক সপ্তাহ আগে শ্রীপেরুম্বুদুরের কাঞ্জিপাট্টুর কাছে তিন নিকাশি কর্মী – নবীন কুমার (২৫), তিরুমালাই (২০) এবং রঙ্গনাথন (৫০) মারা যান। তিরুমালাইয়ের সদ্য বিয়ে হয়েছিল। রঙ্গনাথন দুই সন্তানের পিতা। যে শ্রমিকেরা মারা যান তাঁদের অনেকেই সদ্যবিবাহিত, তাঁদের বিধবা স্ত্রীদের অসহায়তা দেখলে বুক ভেঙে যায়। স্বামীর মৃত্যুর কয়েক মাস পরে আত্মীয়পরিজন মুথুলক্ষ্মীকে সাধভক্ষণ করান।
আমাদের দেশে হাতে করে বর্জ্য সাফাই বেআইনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ম্যানহোল মৃত্যুর সংখ্যা আমরা কমাতে পারছি না। এই সমস্যা নিয়ে ভবিষ্যতে কীভাবে এগোনো যায় তার কোনও ধারণা আমার নেই। আমার লেখা আর ছবিই এই ঘোরতর অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমার একমাত্র হাতিয়ার।
প্রতিটি মৃত্যু আমার বুকের উপর ভারী হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, ওঁদের শেষকৃত্যে চোখের জল ফেলার কি আমার কোনও অধিকার আছে? পেশাদারি শোক বলে তো কিছু হয় না। শোক মাত্রেই ব্যক্তিগত। কিন্তু এই মৃত্যুগুলো না ঘটলে আমি কোনওদিন চিত্রগ্রাহকও হতাম না। আরও একটা ম্যানহোল মৃত্যু ঠেকাতে হলে আমায় কী করতে হবে? আমাদের কী করতে হবে?
অনুবাদ: দ্যুতি মুখার্জী
ঋণ পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া,
১৮ ডিসেম্বর ২০২২ এ প্রকাশিত
চিত্রঋণঃ এম পলানি কুমার, পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া
[কলকাতা লেদার কমপ্লেক্স থানা এলাকার ট্যানারিতে ম্যানহোল পরিষ্কার করতে নেমে তলিয়ে মৃত্যু হয়েছে তিন শ্রমিকের। পৌরসভার তিন অস্থায়ী কর্মী, ফরমেজ শেখ, হাজী শেখ, সুমন সর্দার কাজ করার সময় বর্জ্যে ডুবে যান। বেআইনি এই কাজ গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই ঘটে চলেছে, তার জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রাণ হারাচ্ছেন শ্রমিকরা, সর্বস্বান্ত হচ্ছে তাদের পরিবার। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় গোটা ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে রয়েছে এই ছবি। আর সরকারের অপদার্থতা। মার্কসবাদী পথ, পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়ার এই প্রতিবেদনটি পুনঃপ্রকাশ করছে ‘বিকশিত ভারতে’ শ্রমিকদের অবস্থাকে আরও স্পষ্ট করে তোলার জন্য। ]
প্রকাশের তারিখ: ১১-ফেব্রুয়ারি-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
