Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ভারতীয় সমাজে মার্কসবাদের প্রয়োগ প্রসঙ্গে

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
ভারতের সামাজিক ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও প্রাচীন সমাজের ভিত্তি বদলে গেছে কিন্তু ‘একটি মস্ত রক্ষণশীল শক্তি’ হিসাবে ধর্ম নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজের আর্থ-সামাজিক কাঠামো আর বহু শতাব্দী পেরিয়ে এসে আধুনিক কালের সামন্ততান্ত্রিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক ভূমিব্যবস্থা ও তার ওপরে শিল্পায়নের পুঁজিবাদী পথের বিরাট ফারাক। কিন্তু এ যুগে শাসকশ্রেণি ও তাদের আধুনিক ধার্মিকের দল অতীতের দুর্জ্ঞেয় অধ্যাত্মবাদ, বর্ণভেদ, পুনর্জন্ম প্রবল বিক্রমে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, তার পুনরভ্যুত্থান ঘটাতে চায়। তাই জাতীয় সংকট যত বাড়ে রাষ্ট্রপ্রধানের মন্দিরে মন্দিরে যাতায়াত বাড়ে, আরএসএস-বিজেপি-র ‘রামরাজত্বের’ মতাদর্শের উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসে, বিড়লাজী সমানতালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফেয়ার ও শিবমন্দিরে দান করেন। গরু ও হনুমান আজও দেবতার আসন ছাড়তে চায় না। — সতর্ক করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টচার্য। সেই ১৯৮৩ সালে, মার্কসবাদী পথের মে সংখ্যায়।
Practicing Marxism in Indian Society

মানুষ ধর্মকে গড়ে — ধর্ম মানুষকে গড়ে না। অন্যভাবে বলা চলে মানুষ যখন নিজের সন্ধান পায়নি কিংবা পেয়েও আবার নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে তখন তার যে আত্মচেতনা আর আত্মানুভূতি, তাই হল ধর্ম —  কার্ল মার্কস

(১)
১৮৭১ সালে ইংরেজ আমলে যখন প্রথম এদেশে আধুনিক পদ্ধতিতে জনগণনার কাজ সম্পন্ন হয় তখন দেশের জনসংখ্যার হিসাব মেলে পঁচিশ কোটির মতন। আর হিন্দুমতে দেবতার সংখ্যা তেত্রিশ কোটি। মানুষের থেকে দেবতারা সংখ্যায় আট কোটি বেশি। ব্যাপারটা কৌতুককর হলেও অকিঞ্চিৎকর নয়। এই পটভূমিকার ওপরই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় –- ভারতের মাটিতে কি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তথা মার্কসবাদ-লেনিনবাদের রূপায়ণ সম্ভব? মাঝে মাঝেই দেশের রাজনৈতিক মঞ্চের একশ্রেণির নেতাকে (শ্রীমতী গান্ধী, বাজপেয়ী, মোরারজী, সুব্রহ্মানিয়ম স্বামী) এই সম্ভাবনাকে বাতিল করে বক্তৃতা করতে শুনতে আমরা অভ্যস্ত। যে কথা তাঁরা বলতে চান তা কখনও কখনও তাদের আদর্শগত দেউলিয়াপনার জন্য হাস্যকর চেহারা নেয়। যেমন — মাকর্সবাদ বিদেশী (কোন দেশের?) মতবাদ। আমাদের দেশে মনীষীর অভাব নেই, ভারতীয় চিন্তা কখনই বিদেশী মতবাদের দ্বারস্থ হয়নি। সর্বোপরি ভারত সনাতন ধর্মের দেশ, অধ্যাত্মবাদ আমাদের চিন্তার ভিত্তি-মূলে, কোনও বস্তুবাদী চিন্তার ঠাঁই নেই এদেশে ইতাদি ইত্যাদি।

শেষোক্ত বক্তব্যটি সম্বন্ধেই আমাদের কিছুটা মনোযোগ দেবার অবকাশ আছে। এটি মতাদর্শগত প্রশ্নও বটে। যে কথা শুধু বুর্জোয়া-সামন্তবাদী রাজনীতিবিদরাই নন তাঁদের শিবিরের দার্শনিক প্রতিনিধিরাও অনেক পরিশ্রম করে অনেক গ্রন্থ নিরক্ষর-অধ্যুষিত এই দেশকে উপহার দিয়েছেন। এনাদের ইতিহাস ও সমাজ বিশ্লেষণের সার কথা হল পাশ্চাত্য হচ্ছে জড়বাদ ও ভোগ, ভারত হল অধ্যাত্ববাদ ও ত্যাগ। কোনও বস্তুবাদী জীবনচিন্তা-ই নাকি এখানে ছিল না। ভারত যদিও কবিতা, নাটক, স্থাপত্য,ভাস্কর্য, চিকিৎসাশাস্ত্র, ধাতুবিদ্যা, জাহাজ নির্মাণের জন্য গর্ব করতে পারে। গর্ব করতে পারে প্রাচীন পাটলিপুত্রের মতন শহর বা নালন্দার মতন বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু সে কৃতিত্ব মানবিক শ্রম ও মেধার নয়। দেবতা ও মুনিঋষিদের অলৌকিক কার্যকলাপেরই ফল।

এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাঁরা ভারতীয় সমাজ সম্বন্ধে এক ধরনের 'ব্যাতিক্রমবাদের' তত্ত্বই খাড়া করতে চান। অর্থাং ভারতীয় সমাজ, এমনই এক দৈব মহিমা সমন্বিত সমাজ যেখানে সমাজ বিকাশের অনিবার্য বস্তুগত নিয়মগুলি অচল। প্রথমেই স্পষ্ট কথাটিই বলা ভাল যে, এই ভাববাদী পন্ডিতদের বিচার পদ্ধতিটিই ভ্রান্ত। (মার্কসের মত্যুর পর) এঙ্গেলস লিখেছিলেন — 'ডারউইন যেমন জৈব প্রকৃতির বিকাশের সূত্র আবিষ্কার করেছেন, তেমন মার্কস আবিষ্কার করেছেন মানুষের ইতিহাসের বিকাশের সূত্র; মতাদর্শের অতি-বৃদ্ধির দরুন চাপা পড়ে যাওয়া এই সরল সতাটি যে রাজনীতি-বিজ্ঞান-শিল্প-ধর্ম ইত্যাদি চর্চা করার আগে মানুষের সর্বপ্রথম চাই খাদ্য, পানীয়, আশ্রয় ও পরিচ্ছদ। আর তাই জীবনধারণের আশু বৈষয়িক উপায়গুলির উৎপাদন ও তার ফলস্বরূপ একটি জনগোষ্ঠীর দ্বারা অর্জিত বা নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে অর্জিত অর্থনৈতিক মাত্রাই গড়ে তোলে সেই ভিত্তিটি যা থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইনগত ধারণা, শিল্প এমনকি ধর্মীয় ভাবধারা পর্যন্ত উদ্ভূত। অতএব এগুলোর অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে এই ভিত্তি থেকে, এতাদিন পর্যন্ত যা হয়ে এসেছে সেভাবে উল্‌টো দিক থেকে নয়।'

কিন্তু এই পণ্ডিতেরা উল্‌টো দিকেই চলতে চান। তাঁরা চিন্তা, চৈতন্যকেই সার সত্য বলে মনে করেন। ধর্মীয় ভাবনাকেই মনে করেন ইাতিহাসের চালিকাশক্তি। (চিন্তার সঙ্গে সামাজিক সত্ত্বার সম্পর্ক কী? চেতনা ও প্রকৃতির মধ্যে কোনটি আদি এই প্রশ্নের ওপর দাঁড়িয়েই দার্শনিক, ইতিহাসাবিদ-সমাজবিজ্ঞানীরা ভাববাদী ও বন্তুবাদী দুই শিবিরে বিভক্ত হয়েছেন। আমাদের ভাববাদী পণ্ডিতেরাও চিন্তাকে মনে করেন বস্তুজগৎ নিরপেক্ষ। চেতনাকে মনে করেন আদি সত্য। তাঁরা বুঝতে অস্বীকার করেন 'চেতনা শুরু থেকেই সামাজিক ফসল।' আর 'মানুষের সত্তা তার চেতনার দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং ঠিক বিপরীতভাবে, মানুষের সামাজিক সত্তাই নির্ধারিত করে তার চেতনাকে।'

ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ ও ধর্মচিন্তাকে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁরা যে ভাববাদী পথ অনুসরণ করেন তা হলো এই যে, ব্রহ্মার সৃষ্টি জগৎ সৃষ্টির আগে। 'এক বললেন, আমি বহু হব' এবং তারই ইচ্ছায় জগৎসংসার গড়ে উঠল। এইভাবে ঈশ্বরের মহিমায় সভ্যতার ঊষাকালেই আমাদের অধ্যাত্মচিন্তার সূত্রপাত। ব্রহ্মজ্ঞান সকল জ্ঞানের আদি ও আধার। বেদ-সংহিতা-ব্রাহ্মণ এই অধ্যাত্মচিন্তার শ্রেষ্ঠ ফসল। ষড়দর্শন এই ধারারই ফল। (যদিও উপনিষদের বস্তুবাদী চিন্তা বা ষড়দর্শনে সাংখ্যের বিচারপদ্ধতির স্বতন্ত্র ধারা সম্পর্কে তাঁরা নীরব)। বৃহদারণ্যক উপনিষদে মৈত্রেয়ীর মনে জড়বাদকে অতিক্রম করার জন্য যে আত্মজিজ্ঞাসা জেগেছিল —  'যেনাহং নামৃতা স্যাং কিমহম্‌ তেন কুর্যাম্!' –- তাই হল ভারত আত্মার কথা। এরই ক্রমপরিণতি বেদ ও উপনিষদের যুগ পেরিয়ে এক হাজার তিনশ বছর পর শংকরাচার্যের বেদান্তের ভাষ্যে, যাকে হিন্দু ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিমূল বলা যেতে পারে। যেখানে বিধান দেওয়া হয়েছে জীবাত্মার লক্ষ্য পরমাত্মার সঙ্গে মিলন। 'চতুবর্ণকে' স্বীকার করে নিয়ে, কঠোরভাবে তা পালন করে এই 'নশ্বর', 'দুঃখময়', 'মায়াময়' জীবজগৎ থেকে মুক্তি সম্ভব। 'চতুবর্ণকে' মেনে নিতে শিথিলতা দেখালে ‘পুনর্জন্মে’র মধ্য দিয়ে দুঃখময় পৃথিবীতে ফিরে আসতে হবে। 'মোক্ষলাভ' দেরি হয়ে যাবে।

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি ভাববাদী পণ্ডিতদের যেহেতু বিচার পদ্ধতিই ভুল তাই তাঁরা — (১) একটি বিশেষ যুগের জনসমষ্টির দর্শনচিন্তা, ধর্মচিন্তাকে সমাজ বিকাশের ধারার সঙ্গে সম্পর্কিত করতে অস্বীকার করেন। (২) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, ধর্মকেই তারা ইতিহাসের চালিকাশক্তি মনে করেন। (৩) নিজেদের মানসিক প্রবণতা-কে ইতিহাসের মধ্যে আরোপিত করেন। ফলে অনেক বাস্তব ঘটনাবলী তাঁদের চোখ এড়িয়ে যায় অথবা তাঁরা দেখেও দেখতে অস্বীকার করেন। যাকেই মার্কস বলেছিলেন ‘জুডিশিয়াল ব্লাইন্ডনেস’।

(২)
একথা অস্বীকার করার কারণ বা উদ্দেশ্য আমাদের নেই যে, প্রাচীন ভারতীয় সমাজে অধ্যাত্মচিন্তা, ঈশ্বরচিন্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে সমাজ-মানসে স্থান করে নিয়েছিল। কিন্তু এই চিন্তার সূত্রপাত কখন হয়েছিল? কীভাবে হয়েছিল? কোন সমাজ বাস্তবতার ওপর অধ্যাত্মবাদ স্থান করে নিয়েছিল? ভাববাদীদের পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য কোথায়? এই প্রসঙ্গে আলোচনার সুবিধার জন্য আমরা এঙ্গেলসের শরণাপন্ন হচ্ছি — “বংশ পরম্পরায় শ্রমের রূপান্তর হতে থাকল, শ্রম আরও নিখুঁত আরও বিচিত্র হয়ে উঠতে থাকল। শিকার ও পশুপালনের সঙ্গে সংযুক্ত হল কৃষি, তারপর সুতোকাটা, কাপড় বোনা, ধাতুর কাজ, মৃৎশিল্প, নৌচালনা। বাণিজ্য ও শিল্পের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত আবির্ভাব হলো চারুকলা ও বিজ্ঞানের। গোষ্ঠীর বদলে দেখা দিল জাতি ও রাষ্ট্র। আইন আর রাজনীতির আবির্ভাব হল আর সেই সঙ্গে ‘মানব-মনে মানব ব্যাপারেরই কাল্পনিক প্রতিবিম্ব ধর্ম’। এঙ্গেলস আরও লিখেছেন — 'সভ্যতার দ্রুত অগ্রগতির সমস্ত কৃতিত্ব গিয়ে পড়তে লাগল মনের ওপর, মগজের বিকাশ ও ক্রিয়ার ওপর, প্রয়োজনের দিক থেকে চিন্তার ব্যাখ্যা করবার বদলে মানুষ ধ্যানধারণা দিয়ে চিন্তার ব্যাখ্যা করতে শিখল (শেষ পর্যন্ত যদিও প্রয়োজনই ধ্যানধারণা হিসাবে মনের ওপরে প্রতিবিম্বিত হয়েছে ও চেতনায় ধরা দিয়েছে) এবং বিশেষ করে প্রাচীন যুগ শেষ হবার পর থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গি-ই মানব-মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।' (ডায়ালেকক্টিস্ অব নেচার)

ভাববাদী পণ্ডিতেরা আমাদের বোধবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করতে চাইলেও ভারতীয় সমাজের বিকাশে ধর্মের আবির্ভাব এঙ্গেলস-কথিত মূল সূত্রের থেকে ব্যতিক্রম নয়। প্রাচীন ভারতীয় সমাজেও অধ্যাত্মচিন্তার সূত্রপাত ঘটেছে কোন সময় থেকে? সমাজ সৃষ্টির আদিতেই কি তার আবির্ভাব? ইতিহাসের ঘটনাবলী তা প্রমাণ করে না। বেদের-ই অঙ্গ উপনিষদ যা ভারতীয় অধ্যাত্মচিন্তার সূত্রপাত ঘটিয়েছে বলে সঠিকভাবেই দাবি করা হয়। কিন্তু কে অস্বীকার করবে বিশাল বৈদিক রচনাকাল প্রায় দু-হাজার বছরের ইতিহাসকে ধরে রেখেছে এবং সেই সামাজিক ইতিহাস স্থবির নয়। বৈদিক সাহিত্যে প্রাক্-বিভক্ত ও প্রাক-অধ্যাত্মবাদী যুগ থেকে পরবর্তীতে (এঙ্গেলস কথিত) শ্রেণিবিভক্ত সমাজের একটা গোটা পর্যায়েরই পরিচায়ক। কিন্তু তার শুরু আর শেষের মধ্যে আশমান-জমিন ফারাক হয়ে গেছে। বৈদিক সাহিত্য শুরু হচ্ছে নিছক পার্থিব জগতের কামনা, বাসনা নিয়ে। অন্ন, ধন, পশু সন্তান, নিরাপত্তার কামনা। এর ওপরে আধিভৌতিক কিছু নয়। আবার কামনাও ব্যক্তির নয়, সমষ্টির। তারই জন্য যাগযজ্ঞ, তারই জন্য নির্বিচার পশু বলি। দুধ, গোমাংস, সোমরস, অশ্বমেধ, পুরোহিত, যাদুমন্ত্র –- ট্রাইবাল সমাজের সুস্পষ্ট ছবি। কিন্তু এই সমাজ বিবর্তিত হয়েছে। এসেছে পশুপালনের সঙ্গে কৃষিকাজ। অপেক্ষাকৃত উন্নত উৎপাদনের উপকরণ, ফলে উদ্বৃত্ত ফসল, খাদ্য। কিছু মানুষ কায়িক শ্রম ছাড়াই ভোগ করার সুযোগও পেয়েছে। পুরোহিতের দাক্ষিণ্য রূপান্তরিত হয়েছে অধিকারে। কারণ মানুষ বিশ্বাস করেছে এদের ‘যাদুমন্ত্রই’ উৎপাদনকে বাড়িয়েছে, নিশ্চিত করেছে। ফলে সৃষ্টি হয়েছে পরগাছা শ্রেণির। চিন্তাজগত-ও বিচ্ছিন্ন হয়েছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে। তাই বৈদিক সাহিত্যের প্রথম পর্যায়ে বৃহদারণ্যক উপনিষদে একটি কাহিনি-তে দেখা যাচ্ছে আরুণি শ্বেতকেতু-কে পনেরোদিন না খেয়ে থাকতে বলে দেখছেন যে, শ্বেতকেতু উপোসের দরুন কোনো মন্ত্রই স্মরণে আনতে পারছেন না। কিন্তু খাওয়ার পরই তার স্মৃতিশক্তি ফিরে আসছে এবং তার থেকে উপনিষদই সিদ্ধান্ত করছে-‘খাদ্যই মনের মূল’। কিন্তু এই চিন্তার বিবর্তন ঘটে গেছে পরবর্তী যুগে। ছান্দোগ্য উপনিষদে বলা হচ্ছে আত্মা হল ‘ক্ষুধাতৃষ্ণার ঊর্ধ্বে’। সমাজ বিকাশের এক বিশেষ স্তরে যখন নিরাপত্তা খানিকটা নিশ্চিত, যখন উৎপাদনের উপাদান ও পদ্ধতি প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে খানিকটা স্থিতিশীল, যখন পরজীবী শ্রেণির আবির্ভাব ঘটল তখন থেকেই ‘মায়া’, ‘পূর্বজন্ম’, ‘আত্মার অবিনশ্বরতা’ ও যাবতীয় ঔপনিষদিক দুর্জ্ঞেয় চিন্তার আবির্ভাব ঘটেছে। জ্ঞান-ও ‘পার্থিব জ্ঞান’ ও ‘বিশুদ্ধ জ্ঞান’-এ বিভক্ত হয়ে গেছে।

এদেশের ভাববাদী পণ্ডিতেরা দুটি বিষয় অস্বীকার করতে চান –- (১) সমাজ বিকাশের বিশেষ একটি স্তরেই তাবৎ মানবসমাজে ধর্মচিন্তার অভ্যুদয়। (২) ভারতীয় সমাজেও একটি প্রাক্‌-বিভক্ত-প্রাক্-অধ্যাত্মবাদী পর্যায় ছিল যেখানে 'আত্মা', 'ব্রহ্মা', 'মোক্ষ', ‘চতুর্বর্ণ’ ইত্যাদির কোন অস্তিত্বই ছিল না। শ্রেণিবিভক্ত সমাজের একটি বিশেষ স্তরে পৌঁছেই এদেশেও (বৈদিক যুগেই) সমাজ জীবনের বাস্তব প্রতিফলন হিসাবে অধ্যাত্মচিন্তার আবির্ভাব।

(৩)
এদেশের প্রাচীন সমাজ শ্রেণি বিভক্ত হবার পর (বৈদিক যুগের শেষ পর্যায়ে) দুর্জ্ঞেয় অধ্যাত্মবাদ সমাজজীবনে বড় স্থান করে নিল। শাসকশ্রেণির মতাদর্শ হিসাবে গোটা সমাজজীবনে আধিপত্যও বিস্তার করল। কিন্তু সমাজ বিকাশের বিভিন্ন স্তরে এদেশেও বস্তুবাদী চিন্তার একটি ধারাও যে ছিল সে সম্পর্কে ভাববাদী পণ্ডিতেরা এক অদ্ভুত নীরবতা পালন করেন। কিন্তু কে অস্বীকার করবে খোদ উপনিষদের অধ্যাত্মচিন্তার পাশাপাশি জড়বাদী চিন্তারও একটি ধারা ছিল। যে ধারাটি উদ্দালক আরুণির বিচারগুলির মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে উদ্দালক অপরদিকে যাজ্ঞবল্ক। বস্তুবাদ ও ভাববাদেরই যেন বিতর্ক। অনেকে উদ্দালককেই ভারতীয় দর্শন চিন্তার প্রথম পুরুষ ও বস্তুবাদী বলেই মনে করেছেন (যিনি মনে করেছেন মনের উৎপত্তি খাদ্য থেকে)।

অপরদিকে প্রাক্-বিভক্ত প্রাচীন সমাজের গোড়াপত্তন থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত জনগণের নিজস্ব জীবন চর্চার প্রতিফলন হিসাবে এক বিশেষ দর্শন এদেশেও অনিবার্যভাবেই গড়ে উঠেছে। যাকে বলা যেতে পারে 'লোকায়ত'। সাধারণের মধ্যে পরিব্যাপ্ত (লোকেষু আয়ত) এই অর্থেই লোকায়ত। বৈদিক প্রভাব বহির্ভূত অঞ্চলে বা বৈদিক প্রভাবকে বিরোধিতা করে বা উপেক্ষা কবে সাধারণ জনসমাজ বস্তুজগতকেই সারসত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছিল এবং তাই হল লোকায়ত দর্শন। যেখানে মোক্ষ, পরজন্ম-পরলোক-পরমাত্মার কোনও ভূমিকা ছিল না। বিপরীতে ছিল ভোগলিপ্সা ও নাস্তিকতারই প্রাধান্য। কাম ও অর্থ যেখানে জীবনের লক্ষ্য। তাঁরা মনে করতেন 'জগতই চূড়ান্ত সত্য' 'দেহই হল আত্মা'। লোকায়ত দর্শন শুধু বৈদিক ধর্মবিশ্বাসের-ই বিরোধিতা করেনি, উপরন্তু যাগযজ্ঞ, আচার-আচরণ, পারলৌকিক কর্ম এক কথায় ধর্মীয় অনুশাসনের-ও বিরোধিতা করেছে।

চার্বাক কোনও ব্যক্তি ছিলেন নাকি বিশেষ চিন্তাধারার বা সমচিন্তার সম্প্রদায়ের নাম সে সম্পর্কে সমস্যা অমীমাংসিত রেখেও বলা যায় যে চার্বাকের বৈদিক সংস্কৃতি ও ধর্মচিন্তা-বিরোধী বিচার, প্রাচীন ভারতের লোকায়ত ধারাটিকেই পুষ্ট করেছে ও যুক্তিবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছে। 'মোক্ষ' 'জন্মান্তর' 'কর্মফলের' বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আর নাস্তিকতার জয়গান। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা যে পার্থিব সুখভোগের দিকে তাকে তিনি স্বীকৃতি দিয়েছেন কুণ্ঠাহীনভাবে। ইহলোক-ই সারসত্য বলে স্বীকৃত হয়েছে চার্বাক দর্শনে। এ ছাড়াও পূরণ কস্যপ, মক্ষলি গোসাল, অজিত কেশকম্বলী, পকুধ কাচ্চায়ন, সঞ্জয় বেলথিপুত্ত, নিগহ নাতপুত্ত প্রভৃতি লোকায়তিকদের পরিচয় ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে। যাঁরা সকলেই ছিলেন 'ব্রাত্য' সমাজের মানুষ, এমনকি কেউ কেউ ক্রীতদাসের জীবনযাপনও করেছেন। তাঁদের পরিচয় বৈদিক ধর্মের বিরোধিতায়, হিন্দু লোকাচারের বিরোধিতায়, বস্তুবাদের জয়গানে (অবশ্যই আধুনিক অর্থে নয়) মুখর।

লোকায়ত দর্শন শুধু বস্তুবাদী দর্শন নয়, জনগণের দর্শনও বটে। জনজীবনের বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন হিসাবেই এই বস্তুবাদী দর্শন মূর্ত হয়ে উঠেছিল। বেদ-মহাভারতের যুগ থেকেই শাসকশ্রেণি যাকে কোনদিনই বরদাস্ত করতে পারেনি। মাধবাচার্য, মনু, শংকরাচার্য, কৌটিল্যের রচনায় এই ব্রাত্য ব্য পতিত গণ-সমাজের দর্শনকে বিরোধিতা করে, নিন্দা করে, তার ধ্বংস কামনা করে অনেক বিধান দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কৌটিল্য (যাঁকে মনে করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব তিনশ বছরের সমকালীন মৌর্য্য যুগের) এই গণ-সমাজকে কী করে ভেতর থেকে নাশকতামূলক কাজ চালিয়ে ধ্বংস করা যায় তারই এক প্রতিহিংসামূলক পরামর্শ লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাঁর অর্থশাস্ত্রে। ব্যাভিচারী হিসাবে নিন্দিত হয়েও কামসূত্র রচয়িতা বাৎস্যায়নের কাছেও ধিকৃত হয়েছে এই গণ-সমাজের দর্শন শ্রেণিগত কারণেই। এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়ের অবতারণা অবশাই করতে হয়। প্রাচীন ভারতের দুটি অতুলনীয় রচনা চরকসংহিতাশুশ্রুতসংহিতা। সময়ের বিচারে কণিষ্কের শাসনের সময়কাল কিনা, বা চরক কোনও প্রকৃত ব্যক্তি ছিলেন কিনা এই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। এই দুই গ্রন্থ-কে প্রাচীন ভারতের শুধু বস্তুবাদী চিন্তা নয়, বিজ্ঞানচর্চা ও আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের পদ্ধতি রচনার পথিকৃৎ বলা যেতে পারে। তাঁরা বুঝেছিলেন অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা-ই হল বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি, অন্য কিছু, অলৌকিক শক্তি নয়। শরীরের গঠন, খাদ্যের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক, প্রকৃতি ও মানবদেহ, মানবদেহ ও মৃত্যু এই সবকিছু সম্বন্ধে আধুনিক যুক্তিবাদী, বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত ছড়িয়ে আছে এই রচনায়। অদৃষ্টবাদকে তাঁরা নাকচ করেছিলেন। তাঁরা বুঝেছিলেন ‘পূর্বজন্মের’ পাপে অসুখ হয় না, গঙ্গাস্নান করলে তা সারেও না। চতুর্বর্ণের বেড়াজালে তারা চিকিৎসাবিজ্ঞানের গণ্ডীকে সীমাবদ্ধ রাখতে অস্বীকার করে ব্রাত্য সমাজের মানুষের-ও চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়ে গণতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয় রেখে গেছেন। এই বিজ্ঞান সেদিন ভারতের শাসকশ্রেণি বরদাস্ত করতে চায়নি। আয়ুর্বেদ সেদিন পরিত্যক্ত হয়েছিল উচ্চসমাজে। ব্রাহ্মণেরা সোজাসুজি এর বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে এই অমূল্য গ্রন্থের মধ্য দিয়ে প্রাচীন ভারতীয় সমাজে বিজ্ঞানচর্চার যে উন্মেষ ঘটেছিল, তা আর সামনের দিকে এগোতে পারেনি। ভারতবাসীর সত্যিই দুর্ভাগ্য।

উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলির সাহায্যে একথা প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে না যে, ভারতীয় সমাজে বস্তুবাদী চিন্তাধারা অধ্যাত্মবাদী চিন্তাধারার সঙ্গে সমান পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে। বরং অধ্যাত্মবাদী দর্শন শাসককূলের সংকীর্ণ সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকলেও শাসকশ্রেণির প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজজীবনে আধিপত্য বিস্তার করেছে, শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে ইতিহাসের অনেক পথ অতিক্রম করে আধুনিক যুগের ভাববাদী ইতিহাসকারদের হাতে এসে পৌঁছেছে। এবং তারা এই ধারাটিকেই একমাত্র সত্য বলে উপস্থিত করছেন। কিন্তু এ হল ইতিহাসের বিকৃতি। যা যুগে যুগে সমস্ত ভাববাদীরাই করেন। তাঁদের রচনার স্তূপ থেকে ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারাটিকে উদ্ধার করার কাজ এদেশেও শুরু হয়েছে। যতটুকু হয়েছে তার মধ্যে লোকায়ত দর্শনের প্রমাণ খুবই স্পষ্ট। সেখানেও রয়েছে দুরুহ সমস্যা। এমনিতেই কালের গর্ভে অনেক কিছু বিলীন হয়েছে, উপরন্তু লোকায়ত দর্শনের বিচারের ভাষ্যগুলি যে সমস্ত পুঁথিতে বিধৃত হয়েছিল সেগুলি বিশেষভাবে লোপাট হয়ে গেছে। মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে শাসকশ্রেণির লক্ষ্যই ছিল এগুলিকে ধ্বংস করা। ফলে লোকায়ত দর্শনের বিরোধীদের রচনা থেকেই (মাধবাচার্য, মনু, শংকরাচার্য, কৌটিল্য ইত্যাদি) লোকায়ত দর্শনের পরিচয় খুঁজতে হয়। কিন্তু যাঁরা এই দুর্ভাগ্যের জন্য দায়ী তাঁদের দুর্জ্ঞেয় অধ্যাত্মবাদ ও লোকাচারের পাশাপাশি জনতার বস্তুবাদ ফল্গুধারার মতনই প্রবাহিত ছিল। সেই সহজিয়ার গানের মত। এক ব্রাহ্মণ নদীতে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি ভরে জল দিয়ে তর্পণ করছিল মৃত পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে। তাই দেখে চাষীরা গান ধরেছে-‘ওগো বামুন, এত সহজেই যদি সুদূর পরলোক পর্যন্ত জল পাঠাতে পারো, তা হলে কাছে এই যে চাষের খেত সেখানে জল পৌঁছে দেবার জন্য এত হাঙ্গামা করতে হয় কেন?’ 

(8)
এখন প্রশ্ন হল যে, ভারতীয় ভাববাদী পণ্ডিতেরা বা বুর্জোয়া রাজনীতিবিদরা ভারতীয় সমাজের সনাতন ঐতিহ্যের ও অধ্যাত্মবাদের প্রবক্তা তারা বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দাঁড়িয়েও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বিজয় বৈজয়ন্তী দেখেও অল্পসংবরণ করতে চাইছেন না কেন? ১৮৪৮ সালে মার্কস-এঙ্গেলস যখন কমিউনিস্ট ইশ্‌তেহার প্রকাশ করেছিলেন, ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে সেই মহান ইশ্‌তেহারের ভূমিকায় তাঁরা লিখেছিলেন, ‘ইউরোপ ভূত দেখছে — কমিউনিজমের ভূত’। এ ভূত ঝেড়ে ফেলার জন্য এক পবিত্র জোটের মধ্যে এসে ঢুকেছে সাবেকি ইউরোপের সকল শক্তি — পোপ এবং জার, মেতেরনিখ ও গিজো, ফরাসি র‍্যাডিকেলরা আর জার্মান পুলিশ গোয়েন্দারা। এ সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশে সমাজতন্ত্রের ভিত্তিভূমি প্রতিষ্ঠিত হলেও দেশে-দেশে পোপ-জার-গোয়েন্দা জোটের তৎপরতা এখনও অব্যাহত। কিন্তু আধুনিককালে পৌঁছেও যখন বিজ্ঞান, কারিগরি জ্ঞান, মানবসভ্যতায় একটির পর একটি অসাধ্য সাধন করছে তখনও ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে বুর্জোয়া চিন্তাবিদদের এই আস্ফালনের কারণ কী? এঙ্গেলস বিষয়টি স্পষ্ট করে লিখেছেন ‘ধর্ম একবার গড়ে ওঠার পর তার মধ্যে ঐতিহ্যগত উপাদান বর্তমান থাকে। কারণ মতাদর্শের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঐতিহ্য হল একটি মস্ত রক্ষণশীল শক্তি। কিন্তু এই উপাদানের যে রূপান্তর ঘটে তা আসে শ্রেণিসম্পর্ক থেকে, অর্থাৎ যে মানুষেরা এই রূপান্তর ঘটায় তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক থেকে।’ লুদভিগ ফয়েরবাখ ও চিরায়ত জার্মান দর্শনের অবসান —- এই রচনাতেই তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একদিন ইউরোপে প্রাক-খ্রিষ্টীয় রোম ও গ্রিসের দেবতাদের বিদায় নিতে হল। কীভাবে জাতীয় গণ্ডির বেড়া ভেঙে বিশ্বধর্মের বাস্তব চাহিদায় খ্রিষ্টধর্মের আবির্ভাব হল। তিনি দেখিয়েছেন রোমান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট বিরোধের শ্রেণিরহস্য কী? কীভাবে মধ্যযুগীয় খ্রিষ্টধর্ম আধুনিক বুর্জোয়া সমাজের প্রভুদের উপজীব্য হল।

ভারতের সামাজিক ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়। যদিও প্রাচীন সমাজের ভিত্তি বদলে গেছে কিন্তু ‘একটি মস্ত রক্ষণশীল শক্তি’ হিসাবে ধর্ম নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছে। প্রাচীন ভারতীয় সমাজের আর্থ-সামাজিক কাঠামো আর বহু শতাব্দী পেরিয়ে এসে আধুনিক কালের সামন্ততান্ত্রিক আধা-সামন্ততান্ত্রিক ভূমিব্যবস্থা ও তার ওপরে শিল্পায়নের পুঁজিবাদী পথের বিরাট ফারাক। কিন্তু এ যুগে শাসকশ্রেণি ও তাদের আধুনিক ধার্মিকের দল অতীতের দুর্জ্ঞেয় অধ্যাত্মবাদ, বর্ণভেদ, পুনর্জন্ম প্রবল বিক্রমে বাঁচিয়ে রাখতে চায়, তার পুনরভ্যুত্থান ঘটাতে চায়। তাই জাতীয় সংকট যত বাড়ে রাষ্ট্রপ্রধানের মন্দিরে মন্দিরে যাতায়াত বাড়ে, আরএসএস-বিজেপি-র ‘রামরাজত্বের’ মতাদর্শের উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসে, বিড়লাজী সমানতালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফেয়ার ও শিবমন্দিরে দান করেন। গরু ও হনুমান আজও দেবতার আসন ছাড়তে চায় না।

কিন্তু এ হচ্ছে সত্যের একটি দিক, যা ক্ষয়িষ্ণু। বিকাশমান সত্যের দিকটি কী? মানবতার কোন আদর্শ, কোন বিজ্ঞান, দুর্জ্ঞেয় অধ্যাত্মবাদ ও বেদান্তকথিত অমানবিক জীবনবেদের বিরুদ্ধে ভারতীয় সমাজকে সত্যের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে? ভারতীয় জনগণের ন্যায়সঙ্গত জীবনের অধিকারকে ফিরিয়ে দিতে পারে? কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো-তে মার্কস-এঙ্গেলস লিখেছিলেন, ‘যে ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বুর্জোয়াশ্রেণি উৎপাদন করে ও উৎপন্ন দখল করে, আধুনিক শিল্পের বিকাশ তার পায়ের তলা থেকে সেই ভিত্তিটাই কেড়ে নিচ্ছে। তাই বুর্জোয়াশ্রেণি সৃষ্টি করেছে সর্বোপরি তারই সমাধি খনকদের। বুর্জোয়ার পতন এবং প্রলেতারিয়েতের জন্মলাভ, দুই-ই সমান অনিবার্য’। মার্কসবাদের ‘ঐতিহাসিক অনিবার্যতা’ এইখানেই যে ভারতীয় সমাজে তথাকথিত ‘ব্যতিক্রমবাদীদের’ নিরাশ করে এদেশেও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের চিন্তাধারা আধুনিককালের সবচেয়ে বিপ্লবীশ্রেণি, শ্রমিকশ্রেণির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মাটিতেও অনিবার্যভাবে স্থান করে নিয়েছে। ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের আবির্ভাব এদেশের অর্থনীতির বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তার ভিত্তিমূলকেই ধ্বংস করেছে, সমস্ত কাঠামোকেই ভেঙে দিয়েছে। ‘ব্রিটিশের বাষ্পযান, বিজ্ঞান কৃষি ও শিল্পের মিতালিতে’, ‘তাঁতিদের হাড়ে এখন ভারতের মাটি সাদা হয়ে গেছে’ (মার্কস)। কিন্তু যেদিন দেশের বুকের ওপর দিয়ে ব্রিটিশ সরকার রেলপথ বসিয়েছে, আর তার ইঞ্জিনের চলা দেখে গ্রামের চাষী গান বানিয়েছে, ‘কি কল খুলেছে সাহেব কোম্পানি/কলেতে ধোঁওয়া ওঠে আপনি সজনি’তখন ধ্বংসকারী, লুণ্ঠনকারী ব্রিটিশ সরকার ‘ইতিহাসের অচেতন যন্ত্র’ হিসাবেও কাজ করেছে। কারণ ‘যে বংশগত শ্রমবিভাগ-কে ভারতের জাতিবর্ণগুলি আশ্রয় করে আছে, ভারতের অগ্রগতি এবং ভারতের শন্তির পথে যেসব চরম বাধা বর্তমানে রয়েছে — রেলপথ থেকে উদ্ভুত আধুনিক শিল্প তাদের সকলেরই বিলোপ সাধন করবে’ — মার্কস। সেদিন গ্রামের সেই চাষীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আধুনিক কল-কারখানার শিল্প শ্রমিক। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে যে শিল্পায়নের সূত্রপাত, দেশীয় বুর্জোয়াশ্রেণি সে প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করে। ভারতের শ্রমিকশ্রেণির একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে ক্রমশই আত্মপ্রকাশ ঘটে। সম্প্রতি একজন গবেষক জানাচ্ছেন, মার্কসের জীবিত অবস্থাতেই কলকাতা শহর থেকে ১৮৭১ সালের আগস্টে এদেশের শ্রমিকশ্রেণির কয়েকজন প্রতিনিধি প্রথম আন্তর্জাতিকের শাখা স্থাপন করতে চেয়ে একটি আবেদপত্র পাঠিয়েছিলেন। ১৯০৮ সালে তিলকের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শ্রমিকশ্রেণির ধর্মঘট লেনিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশ্বযুদ্ধ ও জাতীয় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ঘূর্ণাবর্তে ভারতের শ্রমিকশ্রেণি ক্রমশই ইতিহাসের দিক-নির্দেশিত পথে যাত্রা শুরু করে। শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী মতবাদও তার কাছে এসে পৌঁছতে শুরু করে। আর নভেম্বর বিপ্লবের তোপধ্বনিতে উদ্ভাসিত হয়ে এদেশেও গঠিত হয় শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি। মতবাদের ক্ষেত্রে মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে অবলম্বন করে যার যাত্রা শুরু হয়। 

ভারতে আধুনিক যুগে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী চিন্তা তথা সমাজতান্ত্রিক চিন্তার প্রসার সমাজবিকাশের অনিবার্য নিয়মেই স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তীতে সৃষ্টি হয়েছে, বিকশিত হয়েছে, ব্যাপক জনমানসে ক্রমবর্ধমান শক্তি সঞ্চয় করছে। এই বস্তুবাদ বলা বাহুল্য, প্রাচীন ভারতীয় সমাজের দুর্বল অসংলগ্ন বস্তুবাদী ধ্যানধারণার মতন শুধু ক্ষীণ প্রতিবাদ হয়েই দাঁড়িয়ে নেই। সে দুনিয়াকে জয় করবার, স্বর্গকে ছিনিয়ে আনার ক্ষমতা অর্জন করেছে। দুনিয়ার এক-তৃতীয়াংশকে মুক্ত করেছে। আর ভারতের মাটিতেও সে এই কথা বলার সাহস অর্জন করেছে যে, একদিন প্রাচীন ভারতীয় সমাজ ব্রহ্মচিন্তা, বর্ণভেদ, পুনর্জন্মের, মোক্ষের অস্তিত্ব ব্যাতিরেকেই যখন চলতে পেরেছে, ভবিষ্যতেও সে চলতে পারবে। সেই বিপ্লবী মতবাদ -দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, তথা মার্কসবাদ প্রতিক্রিয়ার সমস্ত মতাদর্শের, তেত্রিশ কোটি দেবতার দিকে তাকিয়ে বলতে পারছে---'আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব’। 



মার্কসবাদী পথ-এর এই সংখ্যাটি সংগ্রহ করতে পারেন আমাদের ওয়েবসাইটের আর্কাইভ সেকশান থেকে: মার্কসবাদী পথ, ১৯৮৩ সাল, মে সংখ্যা 


প্রকাশের তারিখ: ০৮-আগস্ট-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

সমৃদ্ধ হলাম
- Tapas Sinha, ০৮-আগস্ট-২০২৪


এই সময়েও একইরকম প্রাসঙ্গিক। যতদিন ধর্মীয় ভাবাবেগের দ্বারা মানুষ পরিচালিত হবে এবং অন্যদেরও পরিচালনা করার চেষ্টা করবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের বারেবারে এই লেখাটি অধ্যয়ন করতে হবে এবং সকলকে এর যথার্থতা বিশ্লেষণ করতে হবে।
- Sambaran Pramanik , ০৯-আগস্ট-২০২৪


অনবদ্য লেখা ।
- নরেন্দু , ০৯-আগস্ট-২০২৪


এ লেখাটি যে কোথায় বেরিয়েছিল! পড়ারই সুযোগ হয় নি। কী সমৃদ্ধ রচনা! কমরেড প্রমোদ দাসগুপ্ত মারা যাবার পর কমরেড আবদুল্লাহ রসুল গণশক্তিতে একটা নিবন্ধে লিখেছিলেন, ' মৃত‍্যুরও একটা ইতিবাচক দিক। এই মুহূর্তে থেকে কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বিষয়ে চর্চা বিপুলভাবে শুরু করা দরকার, তার বিচরণের সব ক্ষেত্র নিয়ে। এতে আমরা ইতিবাচক সাফল্য পাবোই।
- Manabesh Choudhury, ১০-আগস্ট-২০২৪


খুব সুন্দর লেখা। এখনও সমান প্রাসঙ্গিক।
- বিকাশ রায়, ২৬-এপ্রিল-২০২৬


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬