Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

শুধুমাত্র নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নয় – নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে দাঁড়াতে হবে

নন্দিনী মুখার্জী
তিলোত্তমার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে সাধারণ ভাবে দুষ্কৃতীদের ঘটানো একটি ঘটনা বলা যাবে না। ঘটনাটি ঘটেছে কর্মক্ষেত্রে, যেখানে নিরাপত্তার কোনও রকম ব্যত্যয় ঘটাই অস্বাভাবিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিস ইত্যাদি জায়গায় এই রকম ঘটনা আশা করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই এইসব জায়গায় নিরাপত্তাহীনতার অর্থ হল প্রশাসনের চূড়ান্ত অপদার্থতা। বিশেষ করে একজন ডাক্তার, যিনি হাসপাতালে সেই সময়ে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন, সেই অবস্থায় যদি তিনি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে সবচেয়ে জোরাল আঘাত আসে নারীর ক্ষমতায়নে।
stand up for women's empowerment

এক অভূতপূর্ব আন্দোলন দেখছে পশ্চিমবঙ্গ। তিনটি জায়গায় রাত দখলের পরিকল্পনা হল। সেই তালিকার প্রচার শুরু সামাজিক মাধ্যমে। মানুষ সেই তালিকায় জুড়ে দিল নিজের অঞ্চলের নাম। তালিকা লম্বা হতে লাগল। লম্বা হতে হতে কত দাঁড়াল? পঞ্চাশ? একশ? কেউ হিসেব রাখেনি। কিন্তু চোদ্দই আগস্ট সকাল থেকেই হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা আসতে লাগল এমন কোনও কোনও বন্ধুর কাছ থেকে যারা কখনো মিছিলে হাঁটেননি, প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে দূরে থাকা পছন্দ করেছেন। তারা তো যাবেনই রাত দখলের আন্দোলনে। ডাক দিলেন অন্য সবাইকে। ছড়িয়ে গেল সেই বার্তা। রাতে দেখা গেল পথে নেমে এসেছেন অসংখ্য মানুষ। যেমন ভাবা গেছিল নারীরা পথের দখল নেবেন ওই রাতে, তেমনটাই ঘটল। পুরুষরা আছেন। তবে নারীরাই সংখ্যায় অনেক এগিয়ে। এই প্রথম এই রাজ্যে কোনও মেনস্ট্রিম মিডিয়া নয়, সামাজিক মাধ্যম জন্ম দিল এক গণ আন্দোলনের।  

তারপর থেকে প্রতিদিন বন্ধুরা খবর নিয়েছেন, জানতে চেয়েছেন কোথায় মিছিল, কোথায় প্রতিবাদ সভা হবে। কাছাকাছি কোথাও খবর পেলেই গিয়ে হাজির হয়েছেন, প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন। গবেষণায় সর্বক্ষণ মাথা গুঁজে থাকা সহকর্মীকে দেখেছি স্কুলেপড়া কন্যার হাত ধরে আন্দোলন স্থলে উপস্থিত হতে। সরকারের উচ্চপদে কর্মরতাকে দেখেছি শাঁখ বাজিয়ে মিছিলের অংশ হতে। কোনও রাজনৈতিক আলোচনায় অংশ না নেওয়া গৃহবধূকে দেখেছি প্রতিবাদী কবিতা লিখে সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করতে। ক্লাস টুয়েল্ভে পড়া কন্যার আবদারে বাবাকেও যেতে হয়েছে কন্যার হাত ধরে প্রতিবাদী সভায়। আশি বছরের বৃদ্ধা মা শহরের বাইরে থাকা মেয়েকে ফোনে কাতরতা জানিয়েছেন যেতে না পারার জন্য। 

তেসরা সেপ্টেম্বরের বামফ্রন্টের মিছিল থেকেও দেখা গেছে রাস্তার পাশে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা কৈশোর উত্তীর্ণ মেয়েদের শ্লোগান “we want justice” । পুরুষরাও অভিভূত এই প্রতিবাদের ভাষায়। ডাক্তারদের সঙ্গে শিক্ষক, অধ্যাপক, আইটি কর্মীরা যেমন পথে নেমেছেন, তেমনি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ঠেলাচালক, অটোচালক, শ্রমিক বন্ধুরা স্যালুট জানিয়েছেন দীর্ঘ মিছিলকে। চৌঠা সেপ্টেম্বর রাতে রুবির মোড়ে বাইপাসের দুই রাস্তা বন্ধ হওয়ার পর আটকে পড়া বাইক চালককে দেখেছি অন্য বাইক চালকদের অস্থিরতার জন্য ধমক দিতে, ধৈর্য ধরতে বলতে। রাতে রাস্তায় আটকে পড়ে ঘরে ফিরতে দেরি হলেও বিরক্ত হননি অধিকাংশ মানুষ। 

এই আন্দোলনকে এখনও জন জাগরণের আন্দোলন বলা যাবে কি না তা সময় বলবে। কিন্তু এটা স্বীকার করতে বাধা নেই যে, শহর জুড়ে এইরকম আন্দোলনের অভিজ্ঞতা শহরবাসীর আগে কখনও হয়নি। 

অথচ ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনা আগে ঘটেনি তা নয়। তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকারের আমলে পার্ক স্ট্রিট, কামদুনি, মধ্যমগ্রামের ঘটনা সকলের স্মরণে আছে। প্রতিটি ঘটনায় শাসকের ভূমিকাও কারোর অজানা নয়। এই রাজ্য সরকারের প্রধান, রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী এবং নেতৃত্বে থাকা অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা, বারবার ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনাকে ছোট ঘটনা, সাজানো ঘটনা ইত্যাদি বলে লঘু করেছেন এবং অপরাধীদের সাজা দেওয়ার কোনরকম উদ্যোগ তো নেনই নি, বরং আইনি সাজা পাওয়ার থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। অথচ তখন এই ধরনের গণ আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। তাহলে তিলোত্তমার খুনের বিচার চেয়ে এই আন্দোলন গড়ে উঠল কেন?

এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ করতেই হবে। প্রথমত, এইরকম নৃশংস গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা অতীতে কমই ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, একযোগে কলেজ, হাসপাতাল, প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে যেভাবে তিলোত্তমার মৃত্যুর ঘটনাটিকে অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে  চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে তা অতীতে কখনও ঘটেনি। পরবর্তীকালে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে যেভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে তাও গভীর সন্দেহের উদ্রেক করে।

কিন্তু শুধুমাত্র এইজন্যই এত বড় আন্দোলন গড়ে উঠেছে বা মানুষ সাড়া দিয়েছেন তা নয়। তিলোত্তমার ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে সাধারণ ভাবে দুষ্কৃতীদের ঘটানো একটি ঘটনা বলা যাবে না। ঘটনাটি ঘটেছে কর্মক্ষেত্রে, যেখানে নিরাপত্তার কোনও রকম ব্যত্যয় ঘটাই অস্বাভাবিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিস ইত্যাদি জায়গায় এই রকম ঘটনা আশা করা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই এইসব জায়গায় নিরাপত্তাহীনতার অর্থ হল প্রশাসনের চূড়ান্ত অপদার্থতা। বিশেষ করে একজন ডাক্তার, যিনি হাসপাতালে সেই সময়ে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন, সেই অবস্থায় যদি তিনি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে সবচেয়ে জোরাল আঘাত আসে নারীর ক্ষমতায়নে। আমাদের সমাজে এখনও বহু সামন্ততান্ত্রিক উপাদান মজুত রয়েছে। এখনও সামাজিকভাবে নারী ও পুরুষের সমান অবস্থান বহু ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে স্বীকৃত নয়। সুতরাং, এই ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটলে, সমাজের পশ্চাদগামী অংশ থেকে বাধা আসে নারীর অগ্রগতির পথে। নারীর এগিয়ে চলা, শিক্ষা লাভ করা, সামাজিক উৎপাদনে অংশগ্রহণ করা  বা পুরুষের সমকক্ষ হয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগিয়ে যাওয়া — এই সব বিষয়েই নারীকে পেছন থেকে টেনে ধরা হতে থাকে। সমাজ শিখিয়ে দিতে থাকে নারী কীভাবে চলবে, কোন্‌ ধরণের পোশাক পরবে, কখন কখন বাইরে বেরোবে বা আদৌ ঘরের বাইরে পা রাখবে কিনা। পুরুষ শাসিত সমাজে রাজনৈতিকভাবেও নারীর চারদিকে লক্ষ্মণের গণ্ডি টেনে দেওয়ার চেষ্টা হতে থাকে, যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ আমরা দেখলাম তিলোত্তমার নৃশংস হত্যার পরবর্তী সরকারি নির্দেশিকায়। সরাসরি নারীকে কর্মক্ষেত্রে রাতে ডিউটি দিতে নিষেধ করা হল। অন্যান্য নিষেধাজ্ঞাও রাখা হল, যাতে নারী কখনওই কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সমকক্ষ না হয়ে দাঁড়াতে পারে। আশ্চর্যের বিষয় হল এই নির্দেশিকা যে সরকার প্রকাশ করল, সেই সরকারের মুখ্যমন্ত্রী একজন মহিলা। 

স্বভাবতই পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, বাঙালি মহিলারা তিলোত্তমার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে একেবারেই গ্রহণ করতে পারেনি। এই ঘটনা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থিতির ভিতটাকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। তাই কলকাতা, তথা পশ্চিমবঙ্গে তো বটেই, পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাঙালি মহিলারা পথে নেমে এসেছেন এই নারকীয় ঘটনার প্রতিবাদে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল উঠে পড়ে লেগেছে এই ঘটনাকে বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে এর গুরুত্বকে কমিয়ে দেওয়ার জন্য। তাদের অভিসন্ধি খুব পরিষ্কার। যদি দুষ্কৃতীদের দ্বারা ঘটানো অন্যান্য নারী নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে এই ঘটনাকে এক করে দেখানো যায়, তাহলে এর পেছনে যে ক্ষমতাশালী হাতগুলি লুকিয়ে আছে তাকে চাপা দিয়ে দেওয়া যাবে।

কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা বিজেপি মতাদর্শগতভাবেই নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধী। অতীতে বিজেপি শাসিত রাজ্যে, যেমন উত্তরপ্রদেশ বা মণিপুরে ঘটে যাওয়া নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে আমরা কখনোই কেন্দ্রীয় সরকারকে সদর্থক ভূমিকা নিতে দেখিনি। আর জি করের ঘটনায় রাজ্য বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে ফায়দা তোলার চেষ্টা করলেও কেন্দ্রীয় নেতারা সোনালি নীরবতা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নারী নির্যাতনের ঘটনা মানেই তা ক্ষমার অযোগ্য। কিন্তু সেই ঘটনা যদি কোনও নিরাপত্তার বেষ্টনীর মধ্যে ঘটে এবং যদি স্পষ্টতই মনে করা যায় যে ঘটনাটি একটি পূর্ব পরিকল্পিত হত্যার চক্রান্ত, তাহলে সেই ঘটনা পৃথিবীর নিকৃষ্টতম অপরাধ। সুতরাং সেইভাবেই তাকে দেখতে হবে। তাই আজ যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, তা দিনে দিনে আরও বর্ধিত হবে এবং অচিরেই দুষ্কৃতীদের পালক শাসকদলের ক্ষমতার ভিত্তি নাড়িয়ে দেবে। আগামী দিনগুলিতে বহু আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন অংশের মানুষের পক্ষ থেকে। নারীশক্তি একত্রিত হচ্ছে, নজর রাখছে তিলোত্তমার নির্যাতন ও খুনের বিচার কোনদিকে এগোয় সেই দিকে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলির দায়িত্ব এই আন্দোলনে সামিল হয়ে অর্ধেক আকাশের পাশে থাকার।


আরও পড়ুন:
প্রতিবাদী স্পর্ধার ফাঁসে বাঁকা শিরদাঁড়ার ফোঁস

দহনে বড় বিষ, দহনে বড় জ্বালা


প্রকাশের তারিখ: ০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

যেটা দেখা যাচ্ছে একটা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন মানুষ স্বেচ্ছায় প্রতিবাদে যুক্ত হয়েছে। কোন সামাজিক, রাজনৈতিক দল কোন মিছিল বা বিক্ষোভ সভা করলে মানুষকে ডাকতে হয় কিন্তু এক্ষেত্রে মানুষ খুঁজে নিচ্ছে কোথায় কখন মিছিল হবে। অর্থাৎ জনগণ প্রস্তুত একটা জনপ্রিয় সদর্থক নেতৃত্বের অভাব লক্ষ্য রাখতে হবে এই আবেগ বিপথে চালিত না হয়।
- প্রসূন কান্তি ভট্টাচার্য , ০৯-সেপ্টেম্বর-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লিঙ্গ রাজনীতি বিভাগে প্রকাশিত ৩৮ টি নিবন্ধ
১৮-এপ্রিল-২০২৬

০৯-মার্চ-২০২৬

১১-নভেম্বর-২০২৫

২২-সেপ্টেম্বর-২০২৫

০৬-আগস্ট-২০২৫

৩০-মে-২০২৫

২৯-মে-২০২৫

২৮-মে-২০২৫

৩১-মার্চ-২০২৫

২৮-মার্চ-২০২৫