সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বামপন্থাই বাঁচাতে পারে সঙ্কট-জর্জর ভারতবর্ষকে
রতন খাসনবিশ
রাজনীতিকে ধর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে, অর্থনীতিকে মুক্ত করতে হবে নয়া উদারবাদী বন্ধন থেকে। এবিষয়ে স্পষ্ট দিশা দেখাবার ক্ষমতা যাদের আছে তারা হলেন ভারতের বামপন্থী চিন্তাধারার রাজনীতিবিদরা। রাজনৈতিক দিশা গঠনে তাঁদের অসীম ক্ষমতা রয়েছে। ভারতীয় বাস্তবতার এই দিকটি উপলব্ধিতে আনতে হবে যে, বামপন্থাকে বর্জন করে এই সঙ্কটজর্জর ভারতবর্ষকে একটি সঠিক দিশায় পুনর্গঠিত করা একেবারেই অসম্ভব। যাঁরা বলেন ভারতবর্ষে বামপন্থার কোনও ভবিষ্যৎ নেই তাঁদের বুঝতে হবে যে, বামপন্থাহীন ভারতবর্ষেরও কোনও ভবিষ্যৎ নেই।

আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে মূল যে বিষয়গুলি নিেয় বিজেপি ও তার প্রতিপক্ষরা আলোচনায় ব্যস্ত হচ্ছেন, তার একদিকে যেমন আছে ধর্ম, জাতপাত, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং এলাকা-নির্দিষ্ট কিছু বিশেষ বিষয়, অন্যদিকে তেমনই আছে নিয়োগহীনতা, মূল্যবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অসাম্য বৃদ্ধি — এই ধরনের কিছু বিষয়, সমস্ত ভারতবাসীকেই যা বিড়ম্বিত করে। এই দুধরনের ইস্যুগুলিতেই বামপন্থীদের কিছু বিশেষ বক্তব্য আছে, যুক্তির দিক থেকে যেগুলি খণ্ডন করা কঠিন। বস্তুত দুই বিষয়েই বামপন্থীদের কিছু বিশেষ বক্তব্য যুযুধান দুই পক্ষই নিজেদের প্রয়োজন মতো কাজে লাগায়। এতে প্রমাণ হয়, বামপন্থীদের অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার কোনও পরিকল্পনাই আজকের ভারতে সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বামপন্থার প্রাসঙ্গিকতা সমাজে ক্রমশ দৃঢ়মূল করে তুলছে। সেটাই স্বাভাবিক। বামপন্থা দাঁড়িয়ে থাকে শ্রমজীবী মানুষের জগতকে কেন্দ্র করে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা বিষয়ে শ্রমজীবীদের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী আছে যেগুলির উৎস হল সামাজিক বাস্তবতা। অ-বাম রাজনৈতিক দলগুলি সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারে না। তাদের প্রয়োজন হয় এই বাস্তবতাকে শ্রমজীবী-বিরোধী অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা করা, এবং সেই ব্যাখ্যার সামাজিক মান্যতা নিয়ে আসা। সঙ্কট যত প্রকট হয়ে ওঠে, এই প্রচেষ্টা ক্রমশই ব্যর্থ হতে থাকে। তার গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ তলানিতে এসে ঠেকে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলিকে কোনও না কোনও ভাবে শ্রমজীবী মানুষের মতাদর্শ অর্থাৎ বামপন্থী মতাদর্শ কাজে লাগাতে হয় তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করার জন্য। যারা বামপন্থী আন্দোলনে আদর্শগত ভাবে দায়বদ্ধ, তাদের এই কথাটি সবার আগে বুঝতে হবে। অ-বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলির সমস্যা কোথায়, কোন বাধ্যবাধকতার মধ্যে তাদের কাজ করতে হচ্ছে, সেটা খেয়াল করতে হবে। বামপন্থা যে শ্রমজীবীর মতাদর্শ, এই মতাদর্শের কোনও বিকল্প যে হয় না, সেটাও এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করার প্রয়োজন আছে।
ভারতবর্ষ মোদীর নেতৃত্বে আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখেছিল। দশ গ্রাম সোনার দাম ৭২ হাজার টাকা অতিক্রম করার পর এই স্বপ্ন সম্ভবত কেউই আর দেখেন না। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক ১৫ লক্ষ টাকা পেয়ে যাবেন মোদীর দৌলতে, এটা যে জুমলা স্বয়ং অমিত শাহই তা স্বীকার করেছেন। বছরে ২ কোটি নতুন চাকরির সাড়াশব্দ আর পাওয়া যাচ্ছে না। মোদীর আত্মনির্ভর ভারতে আমদানি ক্রমশ বাড়ছে, রপ্তানি ক্রমশ কমছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মোদী যে পুরোটাই বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন, নোট বাতিল ও অপরিকল্পিত জিএসটিসহ সর্বত্র তার প্রমাণ রয়েছে। অতি সম্প্রতি সিএসডিএস-লোকনীতি একটি প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মোদীর এই প্রতারণা, অথবা অন্যভাবে বললে, আচ্ছে দিন আনার ক্ষেত্রে মোদীর এই অক্ষমতা, একটা বড় অংশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মোদীর জোরের জায়গাটা, এখনও পর্যন্ত যা অনুমান করা যায়, সেটা হল তাঁর উগ্র হিন্দুত্ব এবং এলাকাভভিত্তিক কিছু নির্দিষ্ট কর্মসূচি যাতে মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায় — এই ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে টিকে থাকে।
যে জায়গায় মোদী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি অবলম্বন করে মুমকিন আনার চেষ্টা করছেন, যেটা তাঁর জোরের জায়গা, সেটিকে সরাসরি আক্রমণ করার হিম্মৎ কংগ্রেস কিংবা অন্য কোনও অ-বাম রাজনৈতিক দলের নেই। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে এখনও পালা করে শিবমন্দির ও বিষ্ণুমন্দির প্রদক্ষিণ করতে হয়, তামিলনাড়ুর এম কে স্ট্যালিন থেকে বিহারের তেজস্বীপ্রতাপ — কেউই এবিষয়ে মোদীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাবার সাহস রাখেন না। এটির কারণ স্পষ্ট। ভারতবর্ষে রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মেলাবার যে ট্র্যাডিশন আছে, এঁরা প্রত্যেকেই সেই ট্র্যাডিশনের শিকার। এই ট্র্যাডিশনের বাইরে যে রাজনীতি সেটি হল বামপন্থী রাজনীতি, যে রাজনীতি একেবারে প্রথম থেকেই ধর্মবিযুক্ত রাজনীতি। এই রাজনীতিতে যারা ভারতবর্ষে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন তাঁরা কেউই কোনওদিন মন্দির বা দরগায় যাননি, কখনও কপালে তিলক কেটে খঞ্জনি বাজিয়ে ঘুরতে দেখা যায়নি এঁদেরকে। কিন্তু সে কারণে এঁরা সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন এটাও বলা যাবে না। কেরলে ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ এক জন সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা। পশ্চিমবঙ্গ যিনি দীর্ঘদিন শাসন করেছেন সেই কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু দুর্গাপুজোর ফিতে কাটেননি বলে কোনওদিন নিন্দিত হননি। আসলে এঁরা আনতে চেয়েছেন একটি অন্য ধরনের রাজনীতি যেখানে ধর্মকে মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার হিসেবেই দেখা হয়। মোদীর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সরাসরি মোকাবিলা করতে হলে আসলে দরকার এই ধরনের এক রাজনীতি যেখানে ধর্ম রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করার অধিকার রাখে না। তিলক কাটা কংগ্রেসি নেতা কিংবা খোল-করতাল বাজানো তৃণমূলী নেতা মোদীর ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিকল্প কোনও কিছুই গড়ে তুলতে পারবেন না। বামপন্থা অপিরহার্য এই দিক থেকেই। মোদী যে পরিমাণে হিন্দুত্ববাদকে উস্কে দিচ্ছেন, প্রয়োজন হল সমানুপাতিকে ধর্মরহিত রাজনীতির বিকাশ ঘটানো। একাজ বামপন্থীদের কাজ। বামপন্থীরা যত বেশি সংগঠিত হবেন ততই মোদী মার্কা ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতিকে সরাসরি মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
যে বিষয়গুলিতে বিরোধীরা মোদীকে বিব্রত করার চেষ্টা করছেন, তার অন্যতম হল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মোদীর চরম ব্যর্থতা। তথ্যে প্রমাণিত, মোদী সব রকম ভাবেই ভাবেই ভারতীয় অর্থনীতিকে একটা নতুন দিশায় গড়ে তোলবার অঙ্গীকার পালনে ব্যর্থ। কিন্তু একথা ভাবার কোনও কারণ নেই যে কংগ্রেস বা অখিলেশ যাদব দিল্লিতে ক্ষমতায় এলে অর্থনীতির একটা সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটবে। এটা ঠিক যে, তারা হয়তো মোদীর মতো করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির বিলগ্নিকরণ মারফৎ বেসরকারিকরণ করার দিকে জোর দেবেন না। জিএসটির হারে কিছু সংশোধন এঁরা অবশ্যই আনবেন। কিন্তু দেশে বে-রোজগােরর যে সমস্যা, অসংগঠিত ক্ষেত্রের যে বিপুল প্রসার, নিয়মিত পরিচ্ছন্ন কাজের যে বিপুল অভাব, এগুলি দূর করার কোনও মন্ত্রই এরা জানেন না। কৃষি ও শিল্পক্ষেত্র মিলে ভারত যে সমাধানের অতীত সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে, এটা মোকাবিলা করার জন্য নয়া উদারবাদী অর্থনীতির একেবারে মৌলিক কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে। প্রশ্ন তুলতে হবে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সীমাবদ্ধতা এবং তৎসৃষ্ট সঙ্কট নিয়েও। এই কাজটি বামপন্থীদের কাজ। কোনও ধরনের গোঁজামিল দেওয়া রাজনীতি এ সমস্যার সমাধানের পথ দেখাতে পারে না। যেটা দাঁড়াবে, বাস্তবেও যা আমরা দেখছি, সেটা হল জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে মোদীর অপকর্মগুলির সঠিক সমালোচনার পরে এটা বলা হল না যে কংগ্রেস তার ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি ত্যাগ করবে, তার পুরনো অবস্থানের বদল ঘটিয়ে কংগ্রেস নয়া উদারবাদী অর্থনীতির সরাসরি বিরোধিতায় নামবে, যে পুঁজিবাদ ধান্দার ধনতন্ত্রের ( ক্রোনি ক্যাপিটালিজম) জন্ম দেয় কংগ্রেস মোকাবিলা করবে সেই পুঁজিবাদকেও। মোদী-বিরোধী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলির সীমাবদ্ধতা কোথায় কংগ্রেসের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোই সম্ভবত তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
সঙ্কট-জর্জর ভারতবর্ষকে একটি সঠিক দিশায় পুনর্গঠিত করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সাধ্য মোদীর বিজেপির কিংবা সোনিয়া গান্ধীর জাতীয় কংগ্রেসের সাধ্যাতীত। রাজনীতিকে ধর্মের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে, অর্থনীতিকে মুক্ত করতে হবে নয়া উদারবাদী বন্ধন থেকে। এবিষয়ে স্পষ্ট দিশা দেখাবার ক্ষমতা যাদের আছে তারা হলেন ভারতের বামপন্থী চিন্তাধারার রাজনীতিবিদরা। স্বকীয় ক্ষমতায় তাঁরা দুর্বল। কিন্তু রাজনৈতিক দিশা গঠনে তাঁদের অসীম ক্ষমতা রয়েছে। ভারতীয় বাস্তবতার এই দিকটি উপলব্ধিতে আনতে হবে যে, বামপন্থাকে বর্জন করে এই সঙ্কটজর্জর ভারতবর্ষকে একটি সঠিক দিশায় পুনর্গঠিত করা একেবারেই অসম্ভব। এসম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট রাখা প্রয়োজন। যাঁরা বলেন ভারতবর্ষে বামপন্থার কোনও ভবিষ্যৎ নেই, তাঁদের বুঝতে হবে বামপন্থাহীন ভারতবর্ষেরও কোনও ভবিষ্যৎ নেই।
আরো পড়ুন:
মতাদর্শের সংগ্রাম
হেজিমনি নির্মাণের লড়াই
প্রকাশের তারিখ: ১৪-এপ্রিল-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
