Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ব্যয়সঙ্কোচ নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন ব্রিটেনের জনগণ

বিজয় প্রসাদ
স্টার্মারের অ্যাজেন্ডা একেবার নিখাদ নয়া উদারবাদী এবং বৃদ্ধি-ব্যয়সংকোচ মডেলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর ঠিক এই মডেলটাই সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত করে ব্রিটেনকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। যারা ব্যয়সংকোচের নীতির অবসান চান তেমন কাউকেই উজ্জীবিত করতে পারেনি তাঁর হাসি। পার্লামেন্টের ডেসপ্যাচ বক্সে বসে স্টার্মার হয়ত খুশিতে ডগোমগো হয়ে হাসতে থাকবেন। তবে তাঁকে একথা অবশ্যই জানতে হবে যে, তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা সহজেই ভেঙে টুকরো হয়ে যেতে পারে। কারণ অবক্ষয় থেকে ব্রিটেনকে ঘুরে দাঁড় করানোর কোনও প্রকল্প তাঁর হাতে নেই।
The people of Britain have voted against austerity policies

যেসব রাজনৈতিক দল ব্যয়সঙ্কোচের নীতি চালিয়ে যাবার শপথ নিয়েছে, তাদের পক্ষে চিরকাল ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়। ব্যয়সঙ্কোচের নীতি স্বগোত্রীয়দের মাংস খাওয়ার মতো করে সমগ্র সমাজ জীবনকেই কুরে কুরে খায়। আধুনিক বিশ্বে যা কিছু মানুষের বেঁচে থাকাকে সম্ভব করে তুলেছে, সেই রকম সবকিছুকেই ছিন্নভিন্ন করে ফেলে ব্যয়সঙ্কোচের নীতি। নিউ লেবারদের ১৩ বছরের শাসনকালেই ব্যয়সঙ্কোচের নীতি কার্যকর করা শুরু হয়েছিল। তাদের জমানার শেষে ২০১০ সালে কনজারভেটিভ দলের ডেভিড ক্যামেরন যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখন তিনি একেবারে চরম ব্যয়সঙ্কোচের বাজেট পেশ করলেন। এর ফলে স্বাস্থ্যে ও পরিবহণে, শিক্ষাক্ষেত্রে ও নাগরিক জীবনের উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ একেবারে ছাঁটাই করে দিলেন। ক্যামেরনের বাজেটের ধাক্কায় পুরোপুরি ধসে গেল ব্রিটেন। এর ফলে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের কর্মীদের মাইনেই শুধু কমে গেল না, সেখানে কর্মীসঙ্কটও দেখা দিল। ট্রেন পরিবহণ ব্যবস্থাকে বড় আকারে বেসরকারীকরণের আওতায় আনায় ফলে সেই পরিষেবার গুণমানেরও দ্রুত অধঃপতন হল।  ক্যামেরনের পর অন্য যেসব প্রধানমন্ত্রী এলেন তাঁদের কেউই (‌ গত ৮ বছরের বেশি সময়পর্বে এসেছেন থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস বা ঋষি সুনক)‌ জানতেন না এত গভীর ব্যয়সংকোচের ধাক্কা সামাল দিয়ে কীভাবে তা কমানো যাবে কিংবা করের হার বাড়িয়ে কীভাবে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে। যেহেতু ব্রিটেনে অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ছিল হতাশাজনক (‌বেশিরভাগ সময়ে ১ শতাংশের কম, কিন্তু ২০২৩ সালে মাত্র ০.১ শতাংশ)‌, তাই সোজা কথায় বিষয়টা যা দাঁড়িয়েছিল তা হল, প্রয়োজনীয় সামাজিক পরিষেবায় বিনিয়োগের জন্য কোনও রাজস্বই সরকারের ভাঁড়ারে ছিল না। ব্রিটিশ শক্তির এই ক্ষয় আরও স্পষ্টভাবে সামনে এল যখন সুনক ম্যাঞ্চেস্টারে কনজারভেটিভ দলের কনফারেন্সে গেলেন খুব বেশি প্রচারের আলোয় আসা এইচএস২ নামে রেল প্রকল্প বাতিল করার জন্য। আসলে গত কয়েক বছর ধরেই কনজারভেটিভ দলের অস্তিত্ব টিকে ছিল তাদেরই অনুসৃত ব্যয়সঙ্কোচ নীতির সৃষ্টি করা ভগ্নস্তূপের মধ্যে।  

সুনক যখন আগাম পার্লামেন্টারি নির্বাচন ডেকে বসলেন তখনই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এই নির্বাচনে কনজারভেটিভ দল একেবারে পর্যুদস্ত হবে। যখন রিফর্ম পার্টির পার্লামেন্টারি উচ্চাকাঙ্ক্ষায় নাইজেল ফারাজ ধোঁয়া দেবেন বলে ঠিক করলেন, ফারাজই ব্রেক্সিটের অ্যাজেন্ডাকে নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, তখন দক্ষিণপন্থী ভোটারদের মধ্যে যারা কনজারভেটিভদের ত্যাগ করেছিলেন কিন্তু লেবার পার্টিকে সমর্থন করার কথা ভাবতে পারছিলেন না কিংবা বাড়ি বসে থাকতেও রাজি ছিলেন না, তাঁরা রিফর্ম পার্টির মধ্যে একটা মঞ্চ খুঁজে পেলেন। রিফর্ম পার্টির ভোটে যে লাভ হয়েছে তার বেশিরভাগটাই এসেছে কনজারভেটিভ পার্টির ভোট ভেঙে। এর ফলে ফারাজ এই প্রথম পার্লামেন্টে যাওয়ার ছাড়পত্র পেলেন  (ক্ল্যাকটন কেন্দ্র থেকে এবং ২০১৪ সাল থেকে একমাত্র ক্ল্যাকটনই ইউনাইটেড কিংডম ইনডিপেন্ডেন্স পার্টির একমাত্রে প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করে আসছিল)। রিফর্ম পার্টি অনেক ভোট কেটে নেওয়ায় বহু আসন কনজারভেটিভদের হাতছাড়া হল এবং তার জেরেই কনজারভেটিভরা একেবারে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল (দেখা গেল প্রাপ্ত ভোটের বিচারে ৯৮টি আসনে রিফর্ম পার্টি রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে এবং তারা পেল ১৪ শতাংশ ভোট, যা তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোট। এছাড়া লেবার পেল ৩৪ শতাংশ ও কনজারভেটিভরা পেল ২৪ শতাংশ ভোট)।

ফারাজের আকাঙ্ক্ষা হল কনজারভেটিভদের সমূলে উৎপাটন করে নিজেরাই দক্ষিণপন্থার মূল পতাকাবাহী শক্তি হয়ে ওঠা এবং ক্রমশ সামনে চলে আসা দক্ষিণপন্থী প্রকল্পগুলির মধ্যে থেকে ইউরোপ জুড়ে যেসব নতুন কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে তার মধ্যে ব্রিটেনকে টেনে আনা।  এটা খুবই পরিহাসের কথা যে, ব্রেক্সিটের নেতা এখন ব্রিটেনকে টেনে নিয়ে চলেছেন নতুন একটা ইউরোপীয় প্রবণতার দিকে। সেটা হল এক বিশেষ ধরনের অতি-দক্ষিণপন্থার উত্থান যা আত্মপ্রকাশ করেছে হাঙ্গারি থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত। অনেক আসনে, বিশেষ করে কনজারভেটিভদের সাবেকি ঘাঁটিগুলিতে, রিফর্ম পার্টি এগিয়ে গেছে কনজারভেটিভদের পিছেনে ফেলে, এবং লেবার পার্টির প্রার্থীদের পর তারাই রয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট প্রাপকদের তালিকায়। এই বিশেষ ধরনের অতি দক্ষিণপন্থী শক্তি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে থাকতে অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না এবং নিজেদের দেশ অধঃপাতে যাচ্ছে এই আওয়াজ তুলে তারা তাদের কথাবার্তায় ও বাক্যবিন্যাসের ধারাল প্রয়োগে নয়া উদারবাদী বাগাড়ম্বরগুলিকে ছিন্ন করে ফেলে। অথচ মুখে যাই বলুক না কেন, খোদ নয়া উদারবাদের ভেতরের অবক্ষয়গুলিকে চিহ্নিত করার বদলে, এরা সমস্যার সব দায় চাপিয়ে দেয় অভিবাসীদের ওপর এবং নিজেদের দেশে বেড়ে ওঠা নতুন সংস্কৃতির ওপর। এবং একইসঙ্গে তারা নয়া উদারবাদী নীতিগুলিই অনুসরণ করে এবং তা করে মধ্য-দক্ষিণ এবং ঐতিহ্যবাদী দলগুলির মতোই প্রবল ও সপ্রশংস উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে।

দক্ষিণ ইংল্যান্ডে যারা ধনী ও নিশ্চিন্ত চিত্তের লিবারাল, অর্থনৈতিক নীতির কারণেই কনজারভেটিভ পার্টি যাদের কাছে বেশ মনোমত দল ছিল। তারা এবার লিবারাল ডেমোক্রাটদের দিকে ঝুঁকে পড়ে কনজারভেটিভদের সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এবার লিবারাল ডেমোক্রাটদের পার্লামেন্টারি নির্বাচনের ফল হয়েছে একেবারে সেরা (এরা কনজারভেটিভদের থেকে ৬০টি আসন কেড়ে নিয়ে জিতেছে হাউজ অফ কমন্সের মোট ৭১টি আসনে)। লিবারাল ডেমোক্রেটিক পার্টি একটা বিচিত্র ভূমিকা পালন করে: এরা নিশ্চিতভাবে এবং পুরোপুরিই নয়া উদারবাদ ও ব্যয়সঙ্কোচের নীতিতে অঙ্গীকরবদ্ধ। তবে উগ্র দক্ষিণপন্থীরা অভিবাসী-বিরোধী ও বর্ণবাদী মনোভাব নিয়ে তাদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে, লিবারাল ডেমোক্রাটরা এসবের প্রয়োজন সম্পর্কে সংশয়ান্বিত হয় এবং অস্বাচ্ছন্দ্য থেকে ভোগে। সুতরাং, অনেক দিক থেকেই, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্য সম্পর্কে তাড়িত না হওয়া ধনী লিবারালদের ভন্ডামির আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে লিবারল ডেমোক্রাটরা। তবে সম্পদের বৈষম্যে তাড়িত না হলেও খুব বেশি সামাজিক সংঘাতও আবার ধনী লিবারালদের না-পসন্দ।

সুতরাং, কনজারভেটিভ পার্টি এই নির্বাচনে হেরেছে তাদের ব্যয়সঙ্কোচের ফাঁদে পড়ে এবং তাদের যারা অনুগামী তাদের পালিয়ে যাওয়ার মতো আরও অনেক আশ্রয়স্থল থাকার কারণে।

লেবারের সুবিধা

কনজারভেটিভদের ঘাঁটিতে ভাঙন ও ফাটল এবং তাদের নির্বাচনী কোয়ালিশন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল যে নির্বাচকমণ্ডলী নানা ভাগে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে। এটাই ছিল লেবার পার্টির সবচেয়ে বড় সুবিধা। হাউজ অফ কমন্সের আসন সংখ্যা ৬৫০। তার মধ্যে ৪১১ আসনেই জিতেছে লেবার। এর মানে মোট আসনের ৬৩.৭ শতাংশ এখন লেবারের দখলে। এটা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। নির্বাচনের এই ফলাফলে নতুন প্রধানমন্ত্রী কের স্টার্মার স্বভাবতই উল্লসিত। তবে সংখ্যাগুলি আরো খুঁটিয়ে বিচার করলে দেখা যাবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্ফীত হয়েছে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট (এফপিটিপি) নির্বাচনী ব্যবস্থার ফলে। এর জেরে লেবার মাত্র ৩৩ শতাংশ ভোট পেয়ে দখল করেছে প্রায় ৬৪ শতাংশ আসন। এটা এমনই এক অসঙ্গতি যা নিয়ে ব্রিটেনের মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুিল ব্যাপক আকারে নানান মন্তব্য করেছে। বস্তুত, এটা লক্ষ্য করা দরকার যে, গত দুটি সাধারণ নির্বাচনে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার পেয়েছিল ১০.৮ মিলিয়ন ভোট (২০১৭) এবং ১০.২ মিলিয়ন ভোট (২০১৯)। অথচ এবার স্টার্মার পেয়েছেন ৯.৭ মিলিয়ন ভোট। এর মানে আগের দুবারই করবিনের নেতৃত্বে লেবার এবারের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিল। উত্তর ইংল্যান্ডে তাদের ‘লাল দেওয়াল’ এবার জিতে নিয়েছে লেবার। এরকম জিতে নেওয়া প্রতিটি আসনে এবার রিফর্মের ভোট ছিল লেবারের প্রায় কাছাকাছি। মধ্য ইংল্যান্ডে বার্নলে এবং হাইন্ডবার্নের মতো আসনে এবার ২০১৯ সালে প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে কম ভোট পেয়েছে লেবার। তবু এই সব আসনে যে লেবার জিতে গেছে কারণ কনজারভেটিভ ভোট ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে এবং তার জায়গায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে রিফর্ম।

নির্বাচনে এই জয়কে স্টার্মার যদি ভাবেন তার নির্বাচনী ইস্তাহারের জয় এবং তাঁর দক্ষিণদিকে ঝুঁকে চলা নীতির জয়, তাহলে সেটা ঠিক হবে না। একথা তাঁর বোঝা উচিত যে তাঁর নেতৃত্বের সুবাদে তিনি এই নির্বাচন জেতেননি। এমনকী স্কটল্যান্ডে, যেখানকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টিকে (এসএনপি) হারিয়ে দিয়েছে লেবার, সেই সব আসনে আসলে সমস্যা ছিল এসএনপির মধ্যেই। দুর্নীতিজনিত কেেলঙ্কারি নেতৃত্বকে প্রায় ধ্বংস করে দেওয়ায় এসএনপি গুরুতর অভ্যন্তরীণ সঙ্কটে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। তাছাড়া, ব্যয়সংকোচ-বিরোধী নীতি চালু করার প্রয়াস দলেরই মধ্যেকার দক্ষিণপন্থীদের বিপুল ধাক্কা খেয়ে আটকে গিয়েছিল বালুচরে। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার স্বপক্ষে এবং ব্রেক্সিটের ব্যর্থতা নিয়ে আরেক দফা সোচ্চার হয়ে এসএনপি যদি তার সমর্থনের ভিত ফিরে পায়, তাহলে যে আসনগুলি এবার লেবার জিতেছে সেখানে তারা গভীর সমস্যায় পড়তে পারে। স্টার্মারকে যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তা হল, তাঁর অ্যাজেন্ডা একেবার নিখাদ নয়া উদারবাদী এবং বৃদ্ধি-ব্যয়সংকোচের মডেলের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর ঠিক এই মডেলটাই সমস্ত শক্তি নিঃশেষিত করে ব্রিটেনকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছে। কার্ডবোর্ডের কাটআউটে নিজের হাসিমুখের ছবি সহ ভবিষ্যতের নীতি ঘোষণা, এসব িদয়ে নির্বাচনী প্রচারে প্রাণসঞ্চার করে উঠতে পারেননি তিনি। যারা ব্যয়সংকোচের নীতির অবসান চান তেমন কাউকেই উজ্জীবিত করতে পারেনি তাঁর হাসি।  ব্যয়সংকোচ নীতির অবসান মানে ফিনান্স, এনার্জি এবং সমরাস্ত্র শিল্পের অলিগার্কদের কম সুবিধা দেওয়া, সামরিকবাদে জোর কম দেওয়া এবং সামাজিক পরিষেবায় অনেক বেশি নজর দেওয়া। তাঁর নিজের কেন্দ্রেই স্টার্মার অ্যান্ড্রু ফেনস্টেইনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন ব্যয়সঙ্কোচ ও যুদ্ধের ইস্যুতে। এর ফলে ফেনস্টেইন পেয়েছেন ২০ শতাংশ ভোট। আর স্টার্মারের নিজের গরিষ্ঠতা ক্রমশ কমেছে। ৪১০০০ ভোট (২০১৭), ৩৭০০০ ভোট (২০১৯) থেকে ১৮৯০০ ভোটে (২০২৪)। এটা পার্টির নেতা হিসাবে তার নিজের ব্যর্থতার অভিজ্ঞান।

প্যালেস্তাইনপন্থী নাকি গাজা বিরোধী?

বিশেষ করে যুদ্ধবিরোধী নীতি ও অবস্থান গ্রহণের স্বপক্ষে এত তীব্রভাবে দাবি তোলার কারণেই জেরেমি করবিনকে নির্মমভাবে অপমানিত করেছিলেন স্টার্মার পরিচালিত লেবার পার্টির শীর্ষ নেতারা এবং তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এবার তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন করবিন। (পেয়েছেন ২৪,১২০টি ভোট, তাঁর বিরোধী প্রার্থীর চেয়ে ৭০০০ বেশি)।  পার্লামেন্টে করবিন পাবেন তঁার গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের যাঁদের মধ্যে রয়েছেন চারজন নির্দল প্রার্থী। এঁদের প্রচারের মূল লক্ষ্যই ছিল গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা ( লিস্টার সাউথে শওকাত আদম, বার্মিংহাম পেরি বার-এ আয়ুব খান, ব্ল্যাকবার্নে আদনান হুসেইন এবং ডিউসবারি ও বাটলেতে ইকবাল মহম্মদ)। ভোট গণনার পর স্টার্মার যখন বলতে উঠেছিলেন তখন লোকেরা ‘প্যালেস্তাইনকে মুক্ত করো’ স্লোগান দিয়ে বারে বারে তাঁকে বাধা দিয়েছে। এবার গ্রিন পার্টি জিতেছে চারটি আসনে। তবে ৪৭টি আসনে তারা রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। গ্রিন পার্টির নেতা কার্লা ডেনেয়ারও যুদ্ধবিরতি ও অস্ত্র পাঠানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করার দাবিতে কড়া বিবৃতি দিয়েেছন। এই ৯ জন এমপি এবং লেবারদের পক্ষের কয়েকজনকে নিয়ে পার্লামেন্টার মধ্যেই গড়ে উঠবে যুদ্ধবিরোধী ব্লক। তবে যুদ্ধবিরোধী এই অংশটি কি ওয়েস্টমিনস্টারের হলগুলির মধ্যে ব্যয়সঙ্কোচ বিরোধী ব্লক হিসাবেও বেড়ে উঠতে পারবে? এটা এমন একটা প্রশ্ন যার উত্তর নির্ভর করবে এদের মধ্যে কোনও একজন এমপির এই ব্লকের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে কিনা তার ওপর। নির্ভর করবে সেই রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির ওপরেও যার সাহায্যে গড়ে তুলতে হবে ব্রিটেনের জন্য ব্যয়সঙ্কোচ-পরবর্তী ও সাম্রাজ্যবাদ-পরবর্তী একটি অ্যাজেন্ডা।

ইতিমধ্যে আইরিশ সাগরের ওপারে, আয়ারল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের কাউন্টিগুলিতে, রিপাবলিকান রাজনৈতিক শক্তি সিন ফিন অন্য যে কোনও দলের চেয়ে বেশি আসনে জিতেছে। এখন সিন ফিনের দখলে রয়েছে  সবচেয়ে বেশি সংখ্যক স্থানীয় কাউন্সিল। বেলফাস্টের (স্টোরমন্ট) ভেঙে দেওয়া বিধানসভার বেশিরভাগ আসনও তাদের দখলে। ওয়েস্টমিনস্টারে উত্তরের ৬টি কাউন্টি থেকে পার্লামেন্টে যে প্রতিনিধিত্বকারী দল যাবে  তাদের মধ্যেও সিন ফিন সংখ্যাগরিষ্ঠ। রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ডে দুটি বৃহত্তম দলের মধ্যে একটি হল সিন ফিন (তাদের ও মধ্য-দক্ষিণপন্থী দল ফিনা ফেল-এর আসন সংখ্যা এখন সমান)। এবং এখন উত্তরে বেশির ভাগ নির্বাচিত অফিসেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে সিন ফিনের।  তাই সংবিধান বদলের স্বপক্ষে সোচ্চার হওয়ার নৈতিক কর্তৃত্ব তাদেরই রয়েছে। সিন ফিনের পার্লামেন্ট সদস্যরা অবশ্যই ওয়েস্টমিনস্টারে তাদের আসনে বসবেন না। তবে পরিবর্তনের দাবি আসবে আরও অন্যান্য পথ ধরে। এটাও স্পষ্ট যে, সিন ফিনের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে প্রধানত এই কারণে যে, এই দল রিপাবলিক অফ আয়ারল্যান্ড এবং উত্তরাঞ্চলে আইন পাস করিয়ে জারি করা নয়া উদারবাদী আবাসন নীতির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিত করেছে। ব্যয়সংকোচ বিরোধী এই সব পদক্ষেপ এবং প্যালেস্তাইন ইস্যুতে একেবারে দৃঢ় অবস্থানের কারণে গোটা আয়ারল্যান্ডেই একটা কর্তৃত্বকারী অবস্থানে রয়েছে সিন ফিন। ব্রিটেনের ভবিষ্যতের মোড় ফিরতে পারে তাদের সবচেয়ে পুরনো উপনিবেশ থেকে। এখান থেকেই ব্যয়সঙ্কোচ-পরবর্তী এবং যুদ্ধ-পরবর্তী একটা অঞ্চলের নতুন মডেলের জন্ম হতে পারে।

পার্লামেন্টের ডেসপ্যাচ বক্সে বসে স্টার্মার হয়ত খুশিতে ডগোমগো হয়ে হাসতে থাকবেন। তবে তাঁকে একথা অবশ্যই জানতে হবে যে, তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা সহজেই ভেঙে টুকরো হয়ে যেতে পারে। কারণ অবক্ষয় থেকে ব্রিটেনকে ঘুরে দাঁড় করানোর কোনও প্রকল্প তাঁর হাতে নেই। অন্য শক্তিগুলো গোকুলে বাড়ছে, এবং যদি তারা একটা নতুন চেহারা নিয়ে উঠে দাঁড়ায়— তাহলে সেই ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ আরও ভাল হবে।

সূত্র: পিপলস ডেমোক্রেসি, জুলাই ৮-১৪, ২০২৪

অনুবাদ: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ১৫-জুলাই-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

ইউনাইটেড কিংডম -এর চলমান বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাটা বুঝতে সাহায্য করবার জন্য ধন্যবাদ, কমরেড বিজয়কে।
- kdroy, ১৫-জুলাই-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬