সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আন্দিজে অস্থিরতা
ময়ূখ বিশ্বাস
আশঙ্কা মোরালেস এবং তার হাতে বাছাই করা রাষ্ট্রপতি আর্সের মধ্যে তৈরি হওয়া তিক্ততা। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরে তা আরোও বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘মাস’ পার্টি ভেঙে আবার বলিভিয়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সামনে। এখনও অবধি আর্স কেচুয়া এবং আইমারা আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে সদ্ভাব আছে। এটা রাষ্ট্রপতি আর্সের পক্ষে ভালো। কারণ তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক কর্মসূচির ফলে দুই জনগোষ্ঠীই মাস পার্টির বিশ্বস্ত সমর্থক হয়ে আছেন। কিন্তু দেশের প্রথম জনজাতি সমাজ থেকে ওঠা রাষ্ট্রপতি, ক্যারিশমাটিক মোরালেস মাস পার্টি করেছিলেন। তাঁর প্রভাব ও জনপ্রিয়তা সমাজে ব্যাপক।

ইউরো আর কোপা আমেরিকা ম্যাচের মাঝের সময়টুকুতে আবার বলিভিয়াতে সামরিক অভ্যুত্থান করার চেষ্টা। ২০১৯ থেকে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সামরিক অভ্যুত্থান। দেশের রাষ্ট্রপতি বলছেন, পিছনে রয়েছে সিআইএ। বিক্রি হয়ে যাওয়া মিলিটারি শাসকরা রাষ্ট্রপতি ভবন দখল করতে এলে সিংহ দুয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে রুখে দাঁড়ান বলিভিয়ার বামপন্থী রাষ্ট্রপতি লুইস আলবার্তো আর্স কাতাকোরা। ইভো মোরালেসের উত্তরসূরী, এখন দু’জনের সম্পর্ক যদিও মধুর নয়। কিন্তু এই সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সকলে একজোট। মোরালেস, আর্স এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা একযোগে মানুষকে রাস্তার দখল নিতে বলেন। এবং দেশের শ্রমিক, কৃষক, মহিলারা কয়েক মিনিটের মধ্যে তা করে দেখায়। অভ্যুত্থানের মূল চক্রী সেনাপ্রধানকে ঘাড় ধরে হাজির করা হয় সাংবাদিকদের সামনে।
২৭ জুন, ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থান দিয়ে জয় গণঅভ্যুত্থানের।
এবার দেশটার দিকে তাকানো যাক। আন্দিজ পর্বতমালার ওপর বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে তিন হাজার মিটার উঁচুতে। সেখানেই বলিভিয়ার সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম হার্নান্দো সাইলেস অলিম্পিক স্টেডিয়াম। এই মাঠে খেলা পৃথিবীর যে কোনো বড় দলের কাছে দুঃস্বপ্নের। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এত উঁচুতে হওয়ায় ফুটবলারদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াই কষ্টকর। ২০১৮ সালে ব্রাজিল দল তো ম্যাচের মধ্যেই অক্সিজেন নিতে বাধ্য হয়েছিল। আর্জেন্টিনা হেরেছিল ৭-১ গোলে। এই লা পাজের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে একটি বিশাল সবুজ সিঁড়ি যা আন্দিজ থেকে আমাজন অববাহিকায় নেমে আসে। এখানেই ইনকা সাম্রাজ্যের সময় থেকেই কোকো চাষ করে বলিভিয়ার আদি জনগোষ্ঠীর অধিবাসীরা। কোকো পাতায় কোকেনের মতো অ্যালকালয়েড থাকে। কিন্তু যখন চায়ের মতো পান করা হয় বা চিবানো হয়, তখন তা কেবল একটা হালকা উদ্দীপনা দেয়। কোকা ক্ষুধা নিবারক হিসাবে কাজ করে এবং উচ্চতাজনিত অসুস্থতাও প্রতিরোধ করে। আন্দিজের আদিবাসী বলিভিয়ানদের কাছে কোকা চিবানো স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার তাদের কাছে গাছটির গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু এই কোকোই আবার কোকেন প্রক্রিয়াকরণের কাঁচামাল হয়ে ওঠে। ১৯৮০ এর দশকে বলিভিয়া চরম নেশার সামগ্রী কোকেন বা ‘সাদা পাউডার’-এর বিশ্বের শীর্ষ সরবরাহকারী ছিলো। তখন অবৈধ মাদক ব্যবসা রোধ করার নামে মার্কিন সরকার বলিভিয়াতে সবক্ষেত্রে মাথা গলাতে শুরু করে। একদিকে কোকা নির্মূল কর্মসূচীতে, অপরদিকে বলিভিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে কোকোর গাছপালা উপড়ে ফেলার জন্য প্রচুর ডলার দেয় তাঁরা। অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো বলিভিয়ার জমি। এইরকমই এক কোকো চাষী ছিলেন ইভো মোরালেস ও তার পরিবার। মোরালেস দারিদ্র্যের মতো কোকেন উৎপাদনের মূল কারণগুলিকে তুলে ধরে আদিবাসী কোকো চাষীদের চাষের পক্ষে লড়াই করতেন। মোরালেস কোচাবাম্বা বিভাগের চাপারে অঞ্চলে স্থানীয় কোকা চাষী ইউনিয়নের প্রধান নির্বাচিত হোন গত শতকের আটের দশকে। বলিভিয়ার আদিবাসী জনজাতির প্রতিনিধি ইভো কোকা নির্মূল অভিযানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করতেন। মাটির সাথে তাঁর এই যোগাযোগ ও তাঁর প্রতিবাদী ভাবমূর্তি তাঁকে ইভোকে দেশের আদিবাসী অধিকার এবং কৃষকের জীবন-জীবিকার লড়াইয়ের অগ্রণী হিসাবে গড়ে তোলে।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ায় জনসংখ্যার দুই–তৃতীয়াংশ জনজাতি গোষ্ঠীভুক্ত৷ কলম্বাস থেকে কর্পোরেট, যুগ যুগ ধরে দরিদ্র এই মানুষগুলি দেশের ধনী, দক্ষিণপন্থী শ্বেতাঙ্গদের প্রবল শোষণ–নিপীড়ন ও ঘৃণার শিকার। তাদের এই যন্ত্রণা নিয়ে ইকিয়ার বোলেনের (Icíar Bollaín) এর ‘Even The Rain’ সিনেমাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। যেখানে বৃষ্টির জলেও মানুষের অধিকার থাকে না। বিক্রি করে কর্পোরেট। এটাই ছিলো ‘আর্নেস্তো চে গুয়েভারার বধ্যভূমি’র বাস্তবতা। এই অবস্থা বদলানোর জন্যে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে নামে বহু বামপন্থী গ্রুপ, প্রগতিশীল এনজিও, সামাজিক সংগঠন। যার সার্থক রূপ লাভ করে বামপন্থী দল ‘মুভমেন্ট ফর সোসালিজম’ (এমএএস) গঠনের মাধ্যমে। ঐক্যবদ্ধ কৃষক শ্রমিকদের একটা প্লাটফর্ম। এই দলেরই নেতা ইভো মোরালেস বলিভিয়ায় জনজাতি গোষ্ঠী থেকে আসা প্রথম রাষ্ট্রপতি। সেটা হঠাৎ করে হয়নি। ১৯৯৭ সালে আইনসভার প্রথম আদিবাসী সদস্য হন। দুই বছর পর তিনি ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা প্রান্তিক আদিবাসীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য বামপন্থী মঞ্চ ও পরবর্তীতে ‘মাস’ গঠন করেন।
২০০২ সালে মোরালেস বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেবার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি গঞ্জালো সানচেজ ডি লোজাদার কাছে অল্পের জন্য হেরে যান। পরের বছর, বলিভিয়া অশান্তিতে ফেটে পড়ে। দেশের বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারকে সরকার বিদেশী কর্পোরেটের হাতে তুলে দিচ্ছিল। আদিবাসীরা জাতীয়করণের দাবি জানায়। তখন বলিভিয়ার সামরিক বাহিনী কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে এবং জনসাধারণ লোজাদার বিরুদ্ধে ক্ষোভে জেটে পড়ে। আন্দোলনের তোড়ে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তার উত্তরসূরি, কার্লোস মেসা এবার মুখোমুখি হয় মোরালেসের নেতৃত্বে আগুনে আন্দোলনের। দেশের গরীব মানুষের কাছে 'ত্রাতা' হয়ে ওঠেন মোরালেস। তিনি অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বলিভিয়ার প্রান্তিক নিম্নশ্রেণীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর আন্দোলন তীব্র সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হয়ে ওঠে এবং সমাজতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যায়। ২০০৬ এর জানুয়ারিতে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে সরকার গড়ে বামপন্থী দল মুভমেন্ট ফর সোসালিজম (এমএএস)। ক্ষমতায় এসেই গোটা দেশের আমূল-পরিবর্তন করেন আইমারা জনজাতির ইভো মোরালেস। ২০০৯ সালে চালু করেন একটি নতুন সংবিধান। যা বলিভিয়াকে ৩৭ টি আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দিয়ে একটি ‘বহুজাতিক’ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই রঙ্গিন সমাজ ফুটে ওঠে এমএএসের পতাকাতেও। এরসাথে মোরালেস শুরু করেন ব্যাপক ভূমি সংস্কার কর্মসূচি। বৃহৎ জমির মালিকদের থেকে জমি ছিনিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠী এবং ছোট কৃষকদের মধ্যে পুনর্বন্টন। যখন নয়া উদারনীতিবাদের থাবা পড়ছে পৃথিবীর সর্বত্র, তখন উল্টো পুরাণ হয়েছিলো বলিভিয়াতে। সমস্ত বিদেশী কর্পোরেট গুলোর জাতীয়করণ। দেশের বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডার রাষ্ট্র অধিকার করেছিল মার্কিন কর্পোরেট গুলোর হাত থেকে। সরকারি সংস্থা থেকে প্রাপ্ত লাভ ব্যবহার হয়েছে দেশের জনগণের উন্নতির প্রকল্পে। গত কয়েক বছরে বলিভিয়ায় শিক্ষিতের হার একশো শতাংশে পৌঁছেছে। সকলের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়েছে। গড় আয়ু বেড়েছে এবং দেশের সংসদে মহিলা ও আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব বিপুল পরিমাণে বেড়েছে। স্থিতিশীল ঘরোয়া রাজনীতি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকে ক্রমোন্নতি, মহাদেশের ভিতর সর্বাধিক বৃদ্ধির হার, সর্বনিম্ন অপরাধের তালিকায় প্রথম সারি ইত্যাদি সকল লক্ষণীয় উন্নয়নই মোরালেসের শাসনকালের অভিজ্ঞান। এইসব কারণে বলিভিয়ার প্রথম জনজাতিভুক্ত রাষ্ট্রপতি প্রান্তজনের নয়নের মণি হয়ে উঠেছিলেন।
আর সাম্প্রতিক কালে বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সামনে আসে বলিভিয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের গুরুত্ব। তা হলো লিথিয়াম। কারণ খনিজ তেলের বিকল্প হিসাবে গাড়ি চালানোর মূল জ্বালানি হচ্ছে এই খনিজটি। বিজ্ঞানীদের অনুমান বলিভিয়ার কাছে অন্তত ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ লিথিয়াম ভাণ্ডার রয়েছে। যা মূলত পাওয়া যায় বিশ্বের বৃহত্তম লবণাক্ত সমতল ভূমি ‘সালার দে ইউনি’ (বা সালার দে তুনুপা)-তে। ইলন মাস্কের টেসলা কোম্পানির গাড়িতে এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, নানা ধরনের ব্যাটারি এবং বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক সামগ্রীর জন্য যা অপরিহার্য। যত ইলেকট্রিক গাড়ি ও স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়বে, অর্থনীতির নিয়মের দাম বাড়বে লিথিয়ামের। ফলে ভবিষ্যতের আরব দুনিয়া হয়ে উঠতে পারে বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা এবং চিলি। যেই দেশগুলোতে সব থেকে বেশি লিথিয়াম পাওয়া যায়। ইতিমধ্যেই আর্জেন্টিনার অতি দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রপতি দেশের খনিজ গুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে বেঁচে দেওয়ার জন্য শপথ নিয়ে ফেলেছে। অপরদিকে বলিভিয়া হল ‘ব্রিকস-পন্থী’ দেশ। বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসার পর বলিভিয়ায় সংবিধান সংশোধন হয়েছে। গণভোটের মাধ্যমে (মোদীর মতো একতরফা নয়)। গরীবের স্বার্থে। যা বলে, লিথিয়াম উত্তোলনের অধিকার শুধুমাত্র দেশের নাগরিকদেরই আছে। স্বাভাবিকভাবেই এই নিয়ম, মার্কিন, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশের বহুজাতিক খনি কোম্পানিগুলোর পছন্দ হয়নি। এর ওপর বলিভিয়া হল প্রথম দেশ যারা প্যালেস্টাইনে ঘটে চলা ইজরায়েলি বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রথম পদক্ষেপ নেয়। তারা সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে ইজরায়েলের সাথে। তাদের দেখা দেখি অপর দুই লাতিন আমেরিকান দেশ- চিলি এবং কলম্বিয়া, ইজরায়েল থেকে তাদের দূতদের ফিরিয়ে নেয়। বলিভিয়ার বামপন্থী সরকার তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত খনি কোম্পানির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই চীন ও রাশিয়ার কাছে বেশিরভাগ লিথিয়াম রপ্তানি করছে। ব্যবসা হচ্ছে জার্মানির সাথেও। এই লিথিয়াম থেকে প্রাপ্ত বিপুল অর্থ বলিভিয়ার বামপন্থী সরকার খরচ করছে দেশের মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহ নির্মাণ, কৃষিকাজ, সেচ ও অন্যান্য জনহিতকর কাজে। বামপন্থী সরকারের শাসনকালে জনগণের জীবন জীবিকার মান বেড়েছে বহুগুণ। গোটা লাতিন আমেরিকার মধ্যে সব থেকে বেশি দারিদ্র হ্রাস হয়েছে বলিভিয়াতেই।
কয়েক সপ্তাহ আগে বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি লুই আর্স রাশিয়ায় গিয়ে পুতিনের সঙ্গে দেখা করে, একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করে আসেন। সেটা মূলত অর্থনৈতিক। চীনের গাড়ি ও মোবাইল তৈরির বিপুল বাজারের জন্য যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে চীন ও বলিভিয়ার বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। তা প্রতিদিন বাড়ছে। চীনের কোম্পানিগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, তারা যেখান থেকে কাঁচামাল আমদানি করে, সেখানে বা তার কাছেই ফ্যাক্টরি তৈরি করে। ইতিমধ্যেই চীন ব্রাজিল এবং মেক্সিকোতে গাড়ি ও ব্যাটারি তৈরির কারখানা করেছে। স্পষ্টতই লক্ষ্য হচ্ছে গোটা আমেরিকা মহাদেশের গাড়ি এবং ব্যাটারির বাজার সম্পূর্ণ কবজা করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যেই শঙ্কা প্রকাশ করেছে, চীনের এই উদ্যোগ আমেরিকার গাড়ি শিল্পকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে। এখান থেকেই স্পষ্ট, সিআইএ কেন বলিভিয়ান জেনারেলকে দিয়ে সামরিক অভ্যুত্থান করতে গিয়েছিল। আমেরিকার কাছেও যথেষ্ট লিথিয়াম রয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য কমিউনিস্ট চীনের এই উদ্যোগ মার্কিন শাসক শ্রেণির কাছে বেশি ক্ষতিকর। তাই আর কাল বিলম্ব না করে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ‘ঘরের উঠোন’ দক্ষিণ আমেরিকার বামপন্থী দেশগুলোর ওপর মার্কিনী ষড়যন্ত্র। ২০১৯ সালে মোরালেসকে সরানোর জন্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র যে অভ্যুত্থান করেছিল, তারপর ধনকুবের মাস্ক টুইটে হুংকার দিয়েছিল, ‘We will coup whoever we want! Deal with it.’ মাস্কের এই ‘we’ বা ‘আমরা’ মানে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির বাবারা। করোনার সময় যাদের আর্থিক নীতির ফলে কাজ হারিয়েছিল কয়েক লক্ষ মানুষ এবং স্বার্থের অভাবে প্রাণ গিয়েছিল আরো কয়েক লক্ষের। আর সেই করোনা কালেই বলিভিয়াতে বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে যে ‘ফ্যাসিস্ত ক্যু’ সংগঠিত করে গণহত্যা করেছিল কয়েকশো বলিভিয়ান আদিবাসীকে। ঠিক ‘অবতার’ সিনেমার মতোই। খনিজের দখল পেতে অমানুষিক বর্বরতা। গাজা থেকে বলিভিয়া। হাত কাঁপে না সাম্রাজ্যবাদের। ২০১৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থানের নেতা জিয়েনাইন আনেজ তো ইলন মাস্ককে দেশে ব্যবসা করার জন্যে প্রকাশ্যে নিমন্ত্রণই করে বসেন।
অভ্যুত্থানের আগে চতুর্থবারের জন্য মোরালেসকে বলিভিয়ার জনগণ নির্বাচিত করলে নড়ে চড়ে বসে কর্পোরেটরা। তাই ২০১৯ সালে নির্মম সামরিক অভ্যুত্থান। প্রতিবিপ্লবী ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় আসার পরেও চুপ করে বসে থাকেনি বলিভিয়ার আদিবাসী শ্রমজীবী মানুষ ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো। কোকো চাষী থেকে খনি শ্রমিক, ‘মাস’ পার্টির ডাকে গোটা দেশে আদিবাসী জনজাতির লোকরা রাস্তায় নেমে পড়ে। রওনা দেয় রাজধানী লা পাজের দিকে। অবরোধ, ধর্মঘটে স্তব্ধ হয় দেশ। তারপর বহু মানুষের আত্মবলিদানেরর মাধ্যমে, আন্তর্জাতিক চাপে ভোট করতে বাধ্য হয় ক্যু-এর নেতারা। আর সেখানেই তারপর আক্ষরিক অর্থেই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে বলিভিয়ার সমাজতন্ত্রী নেতা ইভো মোরালেসের। ২০১৯ রাষ্ট্রপতি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। মেক্সিকো, কিউবা, আর্জেন্টিনায় কেটেছে নির্বাসন। আর ২০২০ সালে সেই দেশের নয়া বামপন্থী রাষ্ট্রপতিকে পদে বসানোর পিছনে প্রধান ভূমিকা তাঁরই। মোরালেসই প্রার্থীকে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী লুইস আর্স। যিনি বলিভিয়ায় অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৃদ্ধির অন্যতম কারিগর। তবু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোরালেসের দীর্ঘ ছায়াই ছিল শেষ সত্য। সমর্থকেরা তাঁর নামে ভোট চেয়েছে। মোরালেস নিজে বিদেশ থেকে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করেছিলেন এবং লাগাতার ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন কৃষক-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীদের সাথে।
সরাসরি লড়াই হয় মোরালেসের দল বামপন্থী মুভমেন্ট ফর সোশ্যালিজম (মাস) এর প্রার্থী লুইস আর্সে এবং গতবারের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ধনকুবের কার্লোস মেসার মধ্যে। ‘মাস’ ফিরে এসেই তাদের পুরানো সমাজতান্ত্রিক নীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। ‘মাস’-এর জয় আন্তর্জাতিক মহলেও আলোড়ন ফেলেছিলো। মুখ পোড়ে ওয়াশিংটনের। হাতছাড়া হয় বিপুল লিথিয়াম, হাইড্রো-কার্বনের সম্ভার।
তাই আবার সামরিক অভ্যুত্থান। এবারও কর্পোরেটদের পয়সায় এবং আমেরিকার অস্ত্রে সেজেগুজে বিক্রি হয়ে যাওয়া মিলিটারি অফিসাররা দখল করতে এসেছিল রাষ্ট্রপতি ভবন এবং দেশের অন্যান্য সরকারি অফিসগুলো। এবারও অভূতপূর্ব দ্রুততার সাথে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন ও কৃষক সংগঠনগুলো একসাথে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকে। ডাক দেয় প্রতিরোধের। আর রাষ্ট্রপতি আর্স, জনপ্রিয় নেতা মোরালেস সহ বামপন্থী নেতারা মানুষকে রাস্তায় নামতে বলেন এই ‘ক্যু দে তা’ বা সামরিক অভ্যুত্থানকে রুখতে।কিভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে রাস্তার দখল নিলো লাখ লাখ মানুষ তা আগামী দিনে গবেষণার বিষয়। লক্ষ লক্ষ মানুষ নেমে আসে এবং তাড়িয়ে মারে বিক্রি হয়ে যাওয়া সেনাদের। বেইমান সেনাদের মাথা সেনাপ্রধান জুনিগাকে জেলে ঢোকানো হয়।
তবু, অনেকে কিন্তু তৈরি হয়েছে এই সামরিক অভ্যুত্থান রুখে দেওয়ার পরেও। যা দেশের ভবিষ্যত ও বাম রাজনীতির জন্যে চিন্তার...
আশঙ্কা মোরালেস এবং তার হাতে বাছাই করা রাষ্ট্রপতি আর্সের মধ্যে তৈরি হওয়া তিক্ততা। ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরে তা আরোও বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘মাস’ পার্টি ভেঙে আবার বলিভিয়া রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সামনে। এখনও অবধি আর্স কেচুয়া এবং আইমারা আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে সদ্ভাব আছে। এটা রাষ্ট্রপতি আর্সের পক্ষে ভালো। কারণ তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও সামাজিক কর্মসূচির ফলে দুই জনগোষ্ঠীই মাস পার্টির বিশ্বস্ত সমর্থক হয়ে আছেন। কিন্তু দেশের প্রথম জনজাতি সমাজ থেকে ওঠা রাষ্ট্রপতি, ক্যারিশমাটিক মোরালেস মাস পার্টি করেছিলেন। তাঁর প্রভাব ও জনপ্রিয়তা সমাজে ব্যাপক। আর্স ক্ষমতায় এসে মোরালেসের বিরুদ্ধে যারা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের জেলে পাঠিয়েছিলেন। তবু আর্স ও তাঁর গুরু মোরালেসের মধ্যেকার ফাটল বেড়েছে। কথা ছিলো ২০২৫ সালে মোরালেসের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হওয়ার। আর্স নিজে ২০২২ সালে সেটা মেনে নেন। কিন্তু ২০২৫ সালে বলিভিয়ার সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেয়, কোনও রাষ্ট্রপতি পরপর বা অন্যভাবে দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। যেহেতু মোরালেস ইতিমধ্যে প্রায় ১৪ বছর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, অর্থাৎ তাকে আবার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ক্ষুব্ধ মোরালেস মনে করেন এর পিছনে রয়েছে আর্সের বিশ্বাসঘাতকতা। মোরালেস এটিকে আর্সের সরকারের ‘অভ্যুত্থান’ হিসাবে নিন্দা করেন। তিনি আরোও বলেন, যে এটি কেবল নিজের নয়, বলিভিয়ার আদিবাসী নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর প্রতিবাদে তার সমর্থকরা রাস্তায় নেমে নিরাপত্তা বাহিনীর কাঁদানে গ্যাসেরও মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশের প্রধান শহর লা পাজ, অরুরো, কোচাবাম্বা, পোটোসি এবং সান্তা ক্রুজে। মোরালেসের আরোও অভিযোগ বিদেশে পড়াশোনা করা আর্স ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করতে ‘মোরালেসের বামপন্থা’ থেকে নিজেকে সরিয়ে ‘মধ্য-বাম’ পথে দেশকে নিয়ে যেতে চান। বিরোধ বাধে আর্স সরকারের দুর্নীতি এবং মাদক পাচারের অভিযোগ ঘিরে। সরকার থেকে সরানো হয় মোরালেসের ঘনিষ্ঠ লোকজনদেরও। ফলে সরকারের প্রতি বিশ্বাসহীনতা আরো বৃদ্ধি পায়। আর সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েকদিনের মধ্যেই সব থেকে বড় অভিযোগটা আনেন মোরালেস। বলেন, রাষ্ট্রপতি আর্স নিজেই এই সাজানো ‘সামরিক অভ্যুত্থান’টা করেছেন। দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের অভিযোগ মূলচক্রী প্রাক্তন জেনারেল হুয়ান জোসে জুনিগা স্বীকার করেছেন নিজের পরিবার এবং ঘনিষ্ঠদের কাছে যে, রাষ্ট্রপতি আর্সে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। মোরালেস অভিযোগ করেন, জুনিগা বলেছে, ‘রাষ্ট্রপতি আমায় বলেছে, অবস্থা খুব খারাপ, জটিল। আমার জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্যে কিছু একটা করতে হবে।’ আর এই জুনিগাকে জেনারেল পদে বসিয়েছিলেন, আর্সই। ফলে সমস্যা আরোও জটিল হচ্ছে। বিশাল খেলায় প্রতিটা পদক্ষেপ এখনো জানতে বাকি আছে দুনিয়ার।
ইতিমধ্যেই মোরালেসের হাতে গড়া ঐক্যবদ্ধ মাস পার্টি বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হচ্ছে। কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী, শ্রমিক ইউনিয়নবাদী, আদিবাসী কর্মী, কোকা চাষী এবং বাম ও মধ্য-বামকেন্দ্রিক উভয়ে পক্ষের বুদ্ধিজীবীতে। বলিভিয়াতে পর্যাপ্ত হাইড্রোকার্বন ও লিথিয়াম রাজস্ব, যা প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজে সমৃদ্ধ দেশটির মূল সম্পদ। তা নিয়ে দেশ করোনা কালে বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে কিভাবে রক্ষা করবে, আর্স ও মোরালেসের তিক্ততা না সন্ধি, না কি তিক্ততার সুযোগ নেবে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, সেটা ভবিষ্যৎই বলবে।
প্রকাশের তারিখ: ০৩-জুলাই-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
