সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগ বাতিলে দায় কার?
সুকুমার পাইন
আমরা চাই একজনও অযোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী যাতে চাকরি ফেরত না পান। আবার আইনি জটিলতায় একজন যোগ্য-ও যেন কর্মহীন না হন।

বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম কাণ্ডের পর শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির নজির গড়ল এ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সর্বক্ষেত্রে নিয়োগের ব্যাপারে তৃণমূল কংগ্রেস দুর্নীতির নতুন নতুন পন্থা প্রয়োগ করে এ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক যুবতীর সঙ্গে প্রতারণা করেছে। কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সেই পথে ১৭ টি পন্থায় ২০১৬ সালে এসএসসি নবম দশম, একাদশ-দ্বাদশ, গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি পরীক্ষায় বেলাগাম দুর্নীতি করে একদিকে যেমন অযোগ্য প্রার্থীদের চাকরিতে নিযুক্ত করেছে, তেমনি ২৩ লক্ষ কর্মপ্রার্থীর প্রতি চরম অবিচার করেছে। একের পর এক মামলায় ভর্ৎসিত হয়ে দম হারায়নি রাজ্য সরকার। টাকার বিনিময়ে চাকরি পাওয়া শিক্ষক-শিক্ষিকা-শিক্ষাকর্মীদের বাঁচাতে বারবার ছুটে গেছে সুপ্রিম কোর্টে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে অযোগ্যদের স্বপদে বহাল রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কিন্তু ইতিপূর্বে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মত গঠিত বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও মহম্মদ সব্বর রশিদীর ডিভিশন বেঞ্চ নিয়োগ দুর্নীতিতে এই রাজ্যের সরকার, এসএসসি ও মধ্যশিক্ষা পর্ষদের কদর্য চেহারাটি জনসমক্ষে বে-আব্রু করে তুলে ধরেছে।
এটা ঠিক, হাইকোর্টের নির্দেশে চাকরিচ্যুত ২৫,৭৫৩ জনের মধ্যে একটা বিরাট অংশ অযোগ্য, সাদা খাতা জমা দেওয়া বা বাঁকা পথে চাকরি কেনা শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মী যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন প্রকৃত মেধাসম্পন্ন, যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরাও। টাকা দিয়ে চাকরি কেনা অযোগ্য শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের প্রতি কারোরই, বিন্দুমাত্র সহানুভূতি থাকতে পারে না। কিন্তু তৃণমূল সরকারের সীমাহীন লোভ, দুর্নীতি এবং অস্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতির ফলে পরিস্থিতির শিকার হওয়া প্রকৃত যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মী এবং ১১০০ দিন অতিক্রম করা আন্দোলনরত যোগ্য কর্মপ্রার্থীদের প্রতি সকলেরই সহমর্মিতা ও সমর্থন আছে।
তৃণমূল সরকারকে বারবার দেখা গেছে, অযোগ্যদের বাঁচাতে সব রকম বেপরোয়া প্রচেষ্টা চালাতে। এবার সরকার যোগ্যদের ঢাল করে অযোগ্যদের বাঁচাতে চাইছে। নিজেদের পাহাড়-প্রমাণ দুর্নীতি, বাংলার মেধাবী যৌবনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এরা নিজেদের অপকর্মের দায় কখনো বাংলার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের উপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, আবার কখনো ঘুর পথে কোর্টকে দোষারোপ করছে। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে, দুর্নীতির বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশীদার রাজ্য মন্ত্রিসভা সুপার নিউমেরিক্যাল পোস্ট তৈরি করে অযোগ্যদের রক্ষা করার জঘন্য নীতি থেকে দৃষ্টি আড়াল করতে আগডুম বাগডুম বকছে।
দুর্নীতির নেপথ্য-কাহিনী
২০১১ সালে রাজ্যের বর্তমান শাসক তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছতার এক বাতাবরণ তৈরি করেছে। আর সেই অস্বচ্ছতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে গত বাইশে এপ্রিল কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে এক লহমায় কাজ হারিয়েছেন এ রাজ্যের ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মী। আইনী জটিলতায় যোগ্য-অযোগ্য বিভাজনে অযোগ্য সংখ্যা ৫,২৫০, না আট হাজার বা তারও বেশি এই প্রশ্নের গোলক ধাঁধায় সাত-আট বছর চাকরি করার পর এদের একটা বড় অংশ যারা টাকার বিনিময় বা কোন বাঁকা পথে শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন, তাঁরা যেমন, আবার যারা সৎ পথে মেধা ও মননের ভিত্তিতে নিযুক্ত হয়েছিলেন তাঁরাও কর্মচ্যুত হলেন। তারপর থেকে চলছে পারস্পরিক দোষারোপ ও তরজা। নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই সংবেদনশীল বিষয়টি আজ বহুচর্চিত এবং আলোচিত। কিন্তু কেন কয়েক হাজার পরিবারকে আজ এই বিপন্নতার শিকার হতে হল?
পরিবর্তনে পাল্টে গেল এসএসসির গঠন বিন্যাস
২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান শাসক দল শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন আনলেন। বাম আমলে নিয়োগকর্তা ছিল পরিচালন সমিতি (ম্যানেজিং কমিটি)। ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব পরিচালন সমিতির হাত থেকে কেড়ে নিয়ে দেওয়া হল মধ্যশিক্ষা পর্ষদের হাতে। আবার মজার ব্যাপার, নির্দিষ্ট সময়ে নির্বাচন না করে মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ভার তুলে দেওয়া হল শাসকঘনিষ্ঠ অধ্যাপক কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের হাতে। বছরের পর বছর তাঁকে রেখে দেওয়া হল অ্যাডহক কমিটির সভাপতি পদে। আর তৈরি হল দুর্নীতির নীল নকশা। বাম আমলে আঞ্চলিক স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি বাতিল করে পুরো বিষয়টির কেন্দ্রীয়করণ করা হল । সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা নেওয়া, ফল প্রকাশ, নিয়োগের সুপারিশ করার দায়িত্ব গ্রহণ করল।
২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়
২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা গ্রহণ করা হল । ৪ ডিসেম্বর, ২০১৬, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির নিয়োগের পরীক্ষাও গ্রহণ করল এসএসসি। ২০১৬ সালের ১০ থেকে ৩১ তারিখের মধ্যে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের কাজকর্ম চলতে লাগল। ২০১৯ সালের ৪ মে এসএসসি জানালো যে, প্যানেলের মেয়াদ উত্তীর্ণ। নতুন এসএসসি আইনে বলা হয়েছিল একশ’ শূন্য পদের জন্য ১৪০ জন প্রার্থীকে ইন্টারভিউতে ডাকা হবে। পূর্ববর্তী বাম আমলে পরীক্ষার মূল্যায়ন করা খাতাপত্র পাঁচ বছর রেখে দেওয়ার আইন ছিল। আশ্চর্যজনকভাবে এই সময় আইনটি বদল করে ওএমআর শিট এক বছরের জন্য রেখে দেওয়া হবে বলে আইন পাশ হয়।
দুর্নীতি যখন পাহাড় ছোঁয়
২০১৯ সালে মাঝামাঝির সময় হঠাৎ জানা যায় যে প্রতি শূন্য পদের বিকল্প হিসেবে ৫০০ থেকে ৬০০ বাড়তি নাম অন্তর্ভুক্ত করে প্যানেল প্রকাশ করেছে। এই সময় প্রথম এসএসসি পরীক্ষার্থীরা মুখ্যমন্ত্রীর কালীঘাটের বাড়ির সামনে এবং তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখান। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য শিক্ষা দপ্তর ১ নভেম্বর ২০১৯, পাঁচ-সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটির কাজ ছিল সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশনের কাজকর্মের তদারকি করা এবং পরামর্শ দেওয়া। মজার ব্যাপার, ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এই কমিটি-টি দুর্নীতির নীল নকশা তৈরি করতে শুরু করে। ইতিমধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একের পর এক মামলা হতে থাকে। এখানে অসংখ্য উপায়ে দুর্নীতি হয়েছে বলে মামলাকারীরা কোর্টকে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ট্যান্ডন এবং বিচারপতি সামন্তের ডিভিশন বেঞ্চ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জিত কুমার বাগের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে দেন। ২০২০ সালের ১২ মে বিচারপতি বাগ নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে ওঠা অভিযোগ বিষয়ে তার তদন্ত রিপোর্ট কলকাতা হাইকোর্টে জমা দেন।
প্যান্ডোরা বাক্স থেকে যা বেরোলো
বিচারপতি বাগের ১৫০০-পাতার রিপোর্টের প্রথম ৭০ পাতায় অসম্ভব সব আশ্চর্যজনক দুর্নীতির তথ্য বের করলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বাগ। ২০১৭ সালের মধ্যে এসএসসি নবম দশম, একাদশ দ্বাদশ, গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি নিয়োগের পরীক্ষা সম্পন্ন করে। বাগ কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে প্যানেলের বাইরে থাকা কর্মপ্রার্থীরা তাঁদের ওএমআর শিট পুনর্মূল্যায়নের আবেদন করে। আর এই ওএমআর শিট পুনর্মূল্যায়নের নামে চলে দেদার দুর্নীতি। সাদা খাতা জমা দিয়ে বা ৪-৫ নম্বর পাওয়া প্রার্থীদের মূল্যায়নে বেড়ে হয় ৫২ থেকে ৫৪। আর এভাবেই র্যাংক-কে উপরে তুলে এনে অযোগ্যদের চাকরির সুপারিশ করে এসএসসি।
বাগ কমিশনের রিপোর্ট আরও বলছে, ২০১৯ সালের মে মাসে এসএসসির নিয়োগের প্যানেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পরেও বিভিন্ন স্কুল থেকে আগস্ট ২০১৯-এও শূন্য পদের তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সেই অনুযায়ী কোনও নিয়ম নীতি না মেনে নিয়োগ করা হয়। শুধু তাই নয় বাগ কমিটি বলছে, প্যানেলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও গ্রুপ সি-তে নিযুক্ত ৩৮১ জনের মধ্যে ২২২ জন হয় আদৌ পরীক্ষায় বসেননি, অথবা বসলেও কৃতকার্য হননি। শুধু তাই নয়, যুদ্ধকালীন ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি কল্যাণময় গঙ্গোপাধ্যায়ের স্ক্যানড স্বাক্ষর সমন্বিত নিয়োগ পত্র দিয়ে এদের বিভিন্ন স্কুলে নিয়োগ করা হয়।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই-কে ওএমআর শিট ভেরিফিকেশন করার জন্য বলা হয়। এখানেও এসএসসি বাম আমলের পাঁচ বছর উত্তরপত্র সংরক্ষণের নিয়মকে পাল্টে দিয়ে মাত্র এক বছরের জন্য তার সংরক্ষণের আইন পাস করেন। ফলত এসএসসি কোনও ওএমআর শিট-ই সিবিআই-এর হাতে তুলে দিতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত সিবিআই ওএমআর শিট তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত গাজিয়াবাদে ‘নাইসা’ নামে একটি কোম্পানির এক প্রাক্তন কর্মচারীর কাছ থেকে কয়েকটি ডিস্ক উদ্ধার করে। সিবিআই তদন্ত করে দেখে, এক্ষেত্রে একাদশ দ্বাদশে ৯০২, নবম দশমে ১০,৯৫২, গ্রুপ সি-তে ৩৪৮১, গ্রুপ ডি-তে ২৮৩১ জন প্রার্থী হয় সাদা খাতা জমা দিয়েছেন, অথবা চার-পাঁচ নম্বর পেয়েছেন। অথচ তাদের নম্বর বাড়িয়ে ৬০ নম্বরের মধ্যে ৫০ থেকে ৫৫ করা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গেল বেঞ্চে এই তথ্যাবলী জমা পরার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় বিচারক অবৈধ সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মীদের ৭ নভেম্বর, ২০২২-এর মধ্যে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন। প্রাথমিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ স্কুল সার্ভিস কমিশনের ১৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাদের বরখাস্ত করে। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সরকার ও অন্যান্যরা সুপ্রিম কোর্টে যায়। সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়টিকে নিষ্ক্রিয় রেখে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে একটি ডিভিশন বেঞ্চ তৈরি করে সমস্ত বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রায়দান করতে নির্দেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও মহম্মদ সব্বর রশিদীর ডিভিশন বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য শুনে ২২ এপ্রিল তার রায় ঘোষণা করেন।
দুর্নীতির সাত ১৭
প্রথম থেকেই সমস্ত নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অসংখ্য পন্থা খুলে রেখেছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। ২০১৬ সালে নিয়োগের ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে এসএসসি ডেসক্রিপটিভ প্রশ্ন দিত এবং মূল্যায়ন করা খাতাপত্র পাঁচ বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকত। এরা ওএমআর শিট চালু করে দুর্নীতির পথকে প্রশস্ত করেছে। এমনকি ওএমআর শিট মূল্যায়নের দায়িত্ব একটি কালো তালিকাভুক্ত সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে। কোনও ক্ষেত্রেই প্যানেল প্রকাশ, প্রার্থীদের কাট অফ মার্কসের বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তদন্তে জানা গেছে, এক ব্যক্তির দুটি ওএমআর শিট জমা পড়েছে। পরীক্ষা না দিয়েও চাকরি মিলেছে অনেকের। আবার প্যানেলে পিছনে থাকা ব্যক্তিরাও জাদুবলে উপরে উঠে এসেছে। সব ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়েছে অসংখ্য যোগ্য কর্মপ্রার্থী।
এক লহমায় চাকরিচ্যুত ২৫,৭৫৩ জন
২২ এপ্রিল ২০২৪, বাংলার বিদ্যালয়ের ব্যবস্থার ইতিহাসের এক বিশেষ দিন। ব্যাপম কেলেঙ্কারির পর সারা ভারতে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এক লপ্তে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায় কর্মচ্যুত হলেন ২৫,৭৫৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মী। দিনের পর দিন বঞ্চিত মেধাবী কর্মপ্রার্থীরা কলকাতার গান্ধী মূর্তি ও মাতঙ্গিনী হাজরার মুর্তির পাদদেশে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। এই রায়ে তাদের অভিযোগ শেষ পর্যন্ত মান্য হল। তবে চাকরিচ্যুত সবাই যে অযোগ্য ছিলেন, বিষয়টা তেমন নয়। অনেকেরই অভিমত যোগ্যদের ঢাল করে অযোগ্যদের বাঁচাতে গিয়ে এত বড় একটা বিপর্যয় ডেকে এনেছে এসএসসি, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ও রাজ্য সরকার।
যোগ্য ও অযোগ্যের গোলকধাঁধায় একদিকে যেমন কোর্ট, ঠিক তেমনিভাবে সাধারণ মানুষ। আর এই পরিস্থিতিতে এই সংবেদনশীল বিষয়ে ঘোলা জলে মাছ ধরার জন্য নেমে পড়েছে অনেকেই। এই জটিল অবস্থার জন্য যারা দায়ী তারা অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে বিপন্নদের পাশে দাঁড়াবার আশ্বাস দিয়ে অদ্ভুত খেলা খেলছেন। চরম বিভ্রান্তিতে সব পক্ষই। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বাংলার শিক্ষক সমাজের এবং সার্বিকভাবে বাংলার শিক্ষার। এমনিতেই বিগত তেরো বছরে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের শিক্ষানীতিতে শিক্ষার মান তলানিতে, নিয়োগ-দুর্নীতি সহ বিবিধ পদক্ষেপে ড্রপ আউট বাড়ছে, ৮২০৭ এর মতো স্কুল উঠে যাবার মুখে। সাধারণের শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। শিক্ষিত বেকারদের স্বপ্নভঙ্গ হবার ইতিহাস ক্রমশ প্রলম্বিত হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ খুঁজছেন সবাই। কিন্তু সে পথ আজ বড় গোলমেলে। তবুও সভ্যতার স্বার্থে, শিক্ষা বাঁচাবার লড়াই চালানো এই মুহূর্তের প্রধান কাজ বলেই সকলের মনে করা উচিত।
প্রকৃত যোগ্যদের পাশে এবিটিএ সহ বামপন্থীরা
দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির শিকার প্রকৃত যোগ্যদের পাশে প্রথম থেকেই রয়েছে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (এবিটিএ)। এমনকি প্রকৃত যোগ্যদের চাকরি ফেরানোর দাবিতে বামপন্থী ছাত্র যুব সংগঠন এসএফআই, ডিওয়াইএফআই-এর আন্দোলনের সাথী হয়েছে শতাব্দী প্রাচীন এবিটিএ। সিস্টেমের শিকার, কয়েক হাজার নিরপরাধ, মেধাবী, যথার্থভাবে যোগ্য প্রার্থীর চাকরি হারানোয় এবিটিএ যথেষ্ট উদ্বিগ্ন।
সৎ,ন্যায্যভাবে চাকরিতে নিযুক্ত হয়ে হঠাৎ চাকরি হারানো কয়েক হাজার শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীর আর তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে এবিটিএ। অন্যান্যরা যখন অসহায় দিশেহারা কর্মচ্যুত শিক্ষকদের কাছ থেকে মোটা পরিমাণের টাকা তুলে আইনি লড়াই এর প্রস্তুতি করছেন, সহকর্মীদের প্রতি সাংগঠনিক দায়বদ্ধতার জায়গায় দাঁড়িয়ে একটি পয়সাও কারো কাছ থেকে না নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে প্রকৃত যোগ্যদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে আছে এবিটিএ।
রাজ্য সরকারের গোপন অভিসন্ধিতে, এসএসসি-র লাগাম ছাড়া দুর্নীতিকে আড়াল করতে, অযোগ্যদের যেন তেন প্রকারেণ চাকরিতে বহাল রাখতে গিয়ে যোগ্যদের চাকরি বিপন্ন হয়েছে। আমরা চাই একজনও অযোগ্য শিক্ষক শিক্ষাকর্মী যাতে চাকরি ফেরত না পান। আবার আইনি জটিলতায় একজন যোগ্য-ও যেন কর্মহীন না হন। তৃণমূলের নীতির ফলে পুরো শিক্ষক সমাজ এবং শিক্ষাব্যবস্থা আজ সংকটে। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, শিক্ষাদরদী মানুষের সমবেত প্রচেষ্টায় এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, চাকরি হারানো যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, আন্দোলনরত কর্মপ্রার্থী, শিক্ষাদরদী-সহ সব অংশের মানুষের যূথবদ্ধ আন্দোলনই পারবে দুর্বৃত্তদের হাত থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচাতে, নিয়োগের স্বচ্ছতা আনতে এবং এই রাজ্যের সরকারের অবিমৃষ্যকারিতায় সামাজিক মর্যাদা হারানো, চাকরি হারানো প্রকৃত মেধাসম্পন্ন যোগ্য শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীদের সসম্মানে পুনর্বহাল করতে।
প্রকাশের তারিখ: ০২-মে-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
