Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

কেন আজ ‘প্যালেস্তাইনের কবিতা’ পড়তে চাই

সায়ন্তন সেন
বহমান কেন? কবিতা কি স্রোতের মতো? কথার-পিঠে-কথার মতো? প্যালেস্তাইনের কবিতা-ই সে কথা বলবে। পাঠকের চোখ এড়াবে না, এই সংকলনে সন্নিবিষ্ট ‘পরিচয়পত্র'নাম্নী দুইটি কবিতা—
Why I want to read

১৯৯৬ সাল; তেইশ বছরের নির্বাসন শেষে স্বদেশে ফেরার অনুমতি পেলেন কবি মাহমুদ দরবিশ। দেশে ফেরার ক-দিন আগে জর্ডানে বসে একটি সাক্ষাৎকার দিলেন হিব্রু কবি হেলিট ইয়েশুরনকে। বললেন, “নির্বাসন ব্যাপারটা এমনই গেড়ে বসেছে আমার গভীরে যে অনায়াসে তাকে নিয়েই স্বদেশে যেতে পারি আমি।” হ্যাঁ, নির্বাসন ব্যাপারটা এমনই প্যালেস্তিনীয়দের কাছে। নির্বাসনে নিষেধাজ্ঞা যদি-বা মেলেও, তবু, নির্বাসনকে নিয়েই স্বদেশে ফিরতে পারেন। 

এই সাক্ষাৎকারেই তিনি বলেন আরও, “সত্য সবসময়ই দু-মুখো অথচ আমরা কেবল গ্রিসের মুখেই গল্পটা শুনেছি।...  ট্রয় নিজের মুখে তার গল্পটা বলেনি কখনও। যে রাষ্ট্র মহান সব কবিদের জন্ম দিয়েছে, তার কি তাহলে, কবি নেই এমন জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অধিকার রয়েছে? কোনও জনগোষ্ঠীর মধ্যে কাব্যের অনুপস্থিতি কি তাদের পর্যদুস্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ হতে পারে? কবিতা কি সাঙ্কেতিক কোনও ব্যাপার, নাকি তা ক্ষমতা দখলের একটা হাতিয়ারই বটে? আমি এমন এক জনতার সন্তান যারা আজও স্বীকৃতই নয়; আমি সেই না-থাকাদের হয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম, ট্রয়ের কবির যেটা কাজ।”

না-থাকাদের কবি, না-থাকাদের কবিতা। প্যালেস্তাইনের কবিতা এটাই, এই তার অনন্যতা। প্রিয় মাতৃভাষায়, সাধের বাংলায় সে-কবিতা পড়তে তো চাইবই। চাইব সকলকে পড়াতে। 

বেশ কিছুদিন আমরা ঠিক করতে পারিনি, সংকলনটার নাম কী দেওয়া যায়। ‘ইন্তিফাদা থাকবে নামে’? প্যালেস্তাইনের গণঅভ্যুত্থানের নাম ‘ইন্তিফাদা’। ‘ইন্তিফাদা’ মানে একটা বিপুল আলোড়ন, সব তাজ আর তখত্-কে নাড়িয়ে দিতে পারে— এরকম। তাহলে নাম হোক, ‘কবিতা ইন্তিফাদা’। তখনও আমরা জানতাম না, আরও গভীর অর্থে, আরও তীক্ষ্ণভাবে, আরও নির্দিষ্টভাবে আমরা ‘প্যালেস্তাইনের কবিতা’র কথাই বলতে চাইছি। প্যালেস্তাইনের আ-ব-হ-মা-ন কবিতার কথা। 

বহমান কেন? কবিতা কি স্রোতের মতো? কথার-পিঠে-কথার মতো? প্যালেস্তাইনের কবিতা-ই সে কথা বলবে। পাঠকের চোখ এড়াবে না, এই সংকলনে সন্নিবিষ্ট ‘পরিচয়পত্র'নাম্নী দুইটি কবিতা— একটি ‘কবিদের কবি’ মাহমুদ দরবিশের লেখা, আরেকটি, এই মুহূর্তে প্যালেস্তাইনের সবচাইতে প্রমিন্যান্ট কবি নজওয়ান দরবিশ-প্রণীত। শ্লাঘার ও আশ্বাসের কথা, আদি কবিতাটি আমরা পূর্ববর্তী একটা সংকলন থেকে নিয়েছি। অর্থাৎ এর আগেও বাংলায় প্যালেস্তাইনের কবিতা নিয়ে কাজ হয়েছে। কিন্তু সে-বইটিকে অ্যানথলজি বোধহয় বলা যায় না। প্যালেস্তাইনের কবিতা গল্প প্রবন্ধ  ইশতিহার-সদৃশ, ইন্তিফাদারই একটি ঝলকের মতো। এই সংকলনটি আটের দশকে প্রকাশিত হয়েছিল, প্রথম ইন্তিফাদার সময়। তারপর অনেকদিন পেরিয়ে গেছে। 

‘এখন কেন?’— এ-প্রশ্ন কেউ-কেউ নিশ্চয়ই করবেন। এখন, কারণ কোনও-কোনও বই জন্মায় এই মুহূর্তের তাড়নায়। প্যালেস্তাইনে ভয়াবহ গণহত্যা যখন কঠোরভাবে ঘটমান বর্তমান, যখন প্রতিদিন খবরের কাগজে প্যালেস্তাইনের ছোটো ছেলেমেয়েদের মুখ খুবালানো ও রক্তমাখা, দেহ ছিন্নভিন্ন, হাসপাতাল আর ইস্কুল বোমার আঘাতে বিদীর্ণ, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা আপনাদের হাতে তুলে দিতে চাই এই সংকলন। আজ, এখন, এই মুহূর্তে আমরা আরও বেশি-বেশি করে প্যালেস্তাইনের কথা বলতে চাই। তার অসহায়ত্বের কথা বলতে চাই। বলতে চাই, এখনও মানুষ এই পাশবিক হত্যালীলার বিরুদ্ধে আছে, এখনও সকলে বর্বর ইজরায়েলের খিদমতগার নয়, সেই মানুষেরা সংঘবদ্ধ হবে, এই যুদ্ধ রুখে দেবে, আর তাদের হাতে থাকবে প্যালেস্তাইনের পাথর, হাতে থাকবে প্যালেস্তাইনের কবিতাও। আজ, এখন, এই মুহূর্তে আমরা তাই ফিরে পড়তে চাই প্যালেস্তাইনের গ্রেট এক্সোডাসের ইতিহাস— ক্রমাগত আশিরনখ দেশহীনতার, স্থানহীনতার ইতিহাস; কবিতা ছাড়া, কবিরা ছাড়া, আর কী, আর কে আমাদের তা পড়তে-বুঝতে সাহায্য করবে? কবিতা ছাড়া আর কে আমাদের নিয়ে যাবে প্যালেস্তাইনের ধুঁকতে-থাকা, ফুঁসতে-থাকা হৃৎপিণ্ডটির ভিতর? তাই প্যালেস্তাইনের কবিতা। যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কবিতা। যেমন আফ্রিকান কলোনিগুলোতে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়, যেমন হারলেম রনেসাঁসের সময়, যেমন স্পেনের গৃহযুদ্ধে কবিতাও আয়ুধ হয়েছিল— সেরকম, আজ, এখন, এই মুহূর্তে, প্যালেস্তাইনের কবিতা। বিশ্বব্যাপী প্যালেস্তাইনের মুক্তিসেনাদলের একটি অস্ত্র। 

অবশ্য প্যালেস্তাইনে ইজরায়েলি আগ্রাসন আজকের কথা নয়। কেউ কেউ তাই নিবিষ্ট ছিলেন। আরও আগে থেকে, সকলে না-হোক, কেউ-কেউ নিবিষ্ট ছিলেন মাহমুদ দরবিশ, ঘাসান কানাফানিদের শব্দে। নিকটতম যুদ্ধের অভিঘাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও অন্যত্র চেনা-অচেনা অনেকেই প্যালেস্তাইনের কবিতা তরজমা করতে শুরু করেন। অর্থাৎ, রণক্ষেত্র থেকে প্যয়গাম আসছিল, তার ধাক্কায় আমরা আরও বেশি-বেশি করে প্যালেস্তাইনের কবিতা পড়লাম। ধারাবাহিক ভাবে পড়লাম। প্রথমে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে, অতঃপর তিন-চারটি (ইংরেজি) সংকলনগ্রন্থে; যত পড়ি, তত তাক-লেগে-যায়— প্যালেস্তাইনের কবিতার ভাষা, তার নিহিত তাৎপর্য আমাদের চোখের সামনে হাট করে দিতে থাকে প্যালেস্তাইনের অভিবাসনের সঠিক মানে, জানায়— কাকে বলে ‘প্যালেস্তিনীয়ত্ব’। একটা ঝিটিতি-ইশতিহার কেবল নয়, আমরা অ্যানথলজি তৈরির কথা ভাবতে থাকি। কবিতা শুধু নয়, কবিতার ইতিহাস— সেই ইতিহাসে লগ্ন দাসত্বের ইতিহাস, বশ্যতার ইতিহাস, আর কেমন করে একই জঠর থেকে জন্ম নেয় বশ্যতা ও প্রতিরোধ— সেই দুর্ধর্ষ কাহিনির একটা আভাস প্যালেস্তাইনের কবিতা দেবেই। ১৯৪৮ থেকে প্যালেস্তাইনের অনস্তিত্বের-দিকে-যাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা। ’৪৮ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত প্রতিটি দশকের একাধিক কবির কবিতা এই সংকলনে বড়ো-থেকে-ছোটোর ক্রমে বিন্যস্ত হয়েছে। দেখা যাবে, এর মধ্যে নারীকণ্ঠের স্থান অনেকখানি জায়গা জুড়ে। পরিশিষ্টে রয়েছে কবিদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, অনুবাদকদেরও। প্রথম থেকেই আরও অনেক মানুষকে, যত-বেশি-সম্ভব মানুষকে এই অনুবাদকর্মে, এই মুহূর্তের পবিত্রতম কর্তব্যে জুড়ে নিতে চাওয়াটাও একটা ‘পোলিটিক্যাল মুভ’।  হ্যাঁ, আমাদের বিরুদ্ধপ্রস্তাব এখন যতটা সম্ভব চিৎকৃত হওয়াই প্রয়োজন। 

খুঁত আলবাত আছে। থাকাটাই স্বাভাবিক। আমরা বিশেষজ্ঞ নই। এই সংকলনের বেশিরভাগ কবিতাই তরজমার তরজমা। হয়তো, হয়তো কেন নিশ্চয়ই, আমাদের অজ্ঞতাহেতু একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কবি এই সংকলনে ঠাঁই পেলেন না। তবু প্যালেস্তাইনের আবহমান কবিতার একটা আবছামতো আদল এই সংকলনগ্রন্থে ধরা পড়বে। আমরা নাচার, একে অ্যানথলজি না-ডেকে উপায় নেই। অবশ্য, সেটা খুব জরুরি কথা নয়। আসল কথা, প্যালেস্তাইনে গণহত্যা কিছুতেই থামতে চাইছে না। আসল কথা, পৃথিবীর যুদ্ধবিরোধী, আগ্রাসনবিরোধী জনমত যুদ্ধবাজের নাকের ডগায় কোনও নজির শেষ পর্যন্ত রাখতে পারছে কি না। আসল কথা, প্যালেস্তাইনে ভয়াবহ শিশুহত্যা বন্ধ হচ্ছে কি না, প্যালেস্তাইনের মানুষ তাদের মাটির অধিকার, দেশের অধিকার, খাদ্য ও পানীয়ের অতিস্বাভাবিক-অতিনগন্য অধিকারগুলি ফিরে পাচ্ছেন কি না। এই সংকলন মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার সময় এই কথাগুলোই আমরা বারবার বারবার বলতে চাই। আমাদের কণ্ঠ কর্কশ হয়ে উঠুক, মুঠো দৃঢ় হয়ে উঠুক, আমাদের মিছিল সারা পৃথিবীর পথ অবরোধ করে বলুক— ‘ইজরায়েল দূর হটো, দূর হটো মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ!’ যদি তা না হয়, তাহলে এই সংকলন, আরও অজস্র সংকলন, আয়োজিত সব পাণ্ডুলিপি মিথ্যে হয়ে যাবে। 

অথবা তা মিথ্যে হয় না, একটি ইন্তিফাদা থেকে পরবর্তী ইন্তিফাদার মাঝে নিরন্তর প্রেষণা জোগায়, ‘আবার যুদ্ধে যেতে হবে’! 


কলকাতা বইমেলা, ২০২৪-এ প্রকাশিতব্য
বই: প্যালেস্তাইনের কবিতা ১৯৪৮-২০২৩
সম্পাদনা: সৌম্যজিৎ রজক, সায়ন্তন সেন
প্রকাশক: নাটমন্দির (‘আশা নিকেতন’, রবীন্দ্র পল্লি, নর্থ লেক রোড, পুরুলিয়া ৭২৩১০১)


প্রকাশের তারিখ: ১৪-জানুয়ারি-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬